দেশপ্রেমিকদের স্বপ্নের নায়ক

tribute-to-siraj-ud-daulah-on-his-293th-birthday-by-9th-descendants

আজ ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলা, বিহার-ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা জন্মদিন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। বাংলার বীর নবাব আলিবর্দি খানের নাতি। আলিবর্দি খানের কোনও পুত্র ছিল না। ছিল তিন কন্যা। তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড় ভাই হাজি আহমদের তিন পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। নওয়াজিশ মুহাম্মদের সঙ্গে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সঙ্গে মেজো মেয়ে এবং জায়েন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের। আমিনা বেগমের তিন পুত্র ও দুই কন্যা। পুত্ররা মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা, ইকরামউদ্দৌলা, মির্জা মেহেদি। আলিবর্দি খান যখন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তখন তাঁর তৃতীয় কন্যা আমিনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তাঁর নানার কাছে ছিলেন খুবই আদরের, যেহেতু তাঁর কোনও পুত্র ছিল না, মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। আলিবর্দি খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে সিরাজ তাঁর সঙ্গী হন। আলিবর্দি যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলাকে তরুণ বয়সেই পাটনার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেন। রাজা জানকীরামকে যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার রাজপ্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। আলিবর্দি খান দরবারে স্নেহভাজন দৌহিত্রকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা করেন, আমার পরে সিরাজউদ্দৌলাই বাংলা-বিহার-ওড়িশার মসনদে বসবে। ইতিহাসে এই ঘটনা সিরাজউদ্দৌলার যুবরাজ হিসেবে অভিষেক বলে অবিহিত । সিরাজউদ্দৌলা তখন ঝকঝকে তরুণ। সিরাজকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তাঁর আত্মীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। অনেকেই তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। সিরাজউদ্দৌলা মসনদে বসেই প্রশাসনে বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে এলেন। মিরজাফরকে সেনাবাহিনীর প্রধান বখশির পদ থেকে সরিয়ে মিরমর্দ্দানকে নিয়োগ করলেন। মোহনলালকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসালেন। এরপর সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কলকাতার কাশিমবাজার কুঠির ব্যাপারে মনোযোগী হন। সিরাজউদ্দৌলা তাদের এদেশে কেবল বণিক ছাড়া আর কিছু ভাবেননি। এ কারণে ১৭৫৬ সালের ২৯ মে কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করা হয়। ইংরেজরা নবাবের হাতে যুদ্ধাস্ত্র তুলে দিয়ে মিথ্যা মুচলেকার মাধ্যমে এ যাত্রায় মুক্তি পায়। কলকাতার নাম বদল করে নবাব আলিবর্দি খানের নামানুসারে ‘আলিনগর’ রাখা হয়। এই ঘটনার পর ইংরেজরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। জগত্ শেঠের মাধ্যমে মিরজাফরকে মসনদে বসানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে ফেলে। পরিকল্পনায় যোগ দেন রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, মিরন, মির কাশিম, ইয়ার লতিফ খান, ঘসেটি বেগম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ১৭৫৭ সালের ৫ জুন মিরজাফরের গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার পরিনাম ২৩ জুনের পলাশী যুদ্ধ। চুক্তি সম্পাদনের পরই রবার্ট ক্লাইভ পলাশীর প্রান্তরে সেনা জড়ো করলেন। সিরাজউদ্দৌলাও তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত হতে হয়। নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে বাংলাকে উদ্ধারের জন্য নবাব কিছু বিশ্বস্ত অনুগামী নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যান। কিন্তু বিধি বাম, ২৯ জুন বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে প্রিয়তমা সহধর্মিণী বেগম লুত্ফুন্নিসা ও একমাত্র সন্তান কন্যা উম্মে জোহরাসহ আটক করে বিশ্বাসঘাতকেরা। ২ জুলাই মিরজাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মুহাম্মদি বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে।

এভাবেই বীর দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও অস্তমিত হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সততা, দেশপ্রেম, আদর্শ, চেতনা, ভালোবাসা আজও দেশপ্রেমিকদের হূদয়কে অনুপ্রাণিত করে। একারণেই  বাংলার  মানুষের স্বপ্নের নায়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আর মিরজাফর আজও খলনায়ক বা বিশ্বাসঘাতকের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।

Sat 19 Sep 2020 18:45 IST | ওয়েব ডেস্ক