শঙ্খ ঘোষের ক্লাস 

এত বড় একজন ছান্দসিক ও ছন্দপাণি কবি আমাদের ছন্দ শিখিয়েছিলেন— ভাবলে আজ রোমাঞ্চ অনুভব করি।

Sankha-ghosh-.png

 

 | অমিতাভ দেব চৌধুরী | 


উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেখলাম, উত্তরপূর্বাঞ্চল অশান্ত। বাঙালিদের নানাভাবে নানা জায়গায় অপমানিত, অপদস্থ, প্রহৃত কিংবা নিহত হতে হচ্ছে। অভিভাবকরা প্রমাদ গুণলেন এবং এর একমাত্র উদ্ধারকর্তা হিসেবে আমার কলকাতাবাসী কাকার হাতে আমার উচ্চশিক্ষার ভার সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। কাকা জানালেন, আমি কলকাতায় চলে আসতেই পারি, তবে প্রান্তীয় ও গ্রামীণ একটি পরিবেশ থেকে সরাসরি মহানগরে না এসে, বরং বিশ্বভারতীর গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ বেয়ে এলে তা আমার পক্ষে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ও শোভন হবে। কিন্তু বাদ সাধল উত্তরপূর্বের চিরাচরিত ‘লাহে লাহে’ পন্থা ও বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের অন্তত ওই বছরটির জন্য চূড়ান্ত নিয়মানুবর্তিতার মাঝখানের দ্বৈরথ। অর্থাৎ, আমাদের রেজাল্ট বেরোবার আগেই বিশ্বভারতীর ফর্ম ফিল-আপ করার শেষদিন চলে গেল। কাকার ইচ্ছে ছিল, আমি বিশ্বভারতীর চিনাভবনেও অ্যাডমিশন নিয়ে নেব এবং চিনে ভাষাটাও শিখে নেব। তাতে ভাত-কাপড়ের চিন্তা থাকবেই না, ভবিষ্যতে জে-এন-ইউ’র দরজাও আমার পড়াশোনার জন্য খুলে যাবে। কিন্তু কী আর করা যায়! শেষ পর্যন্ত অগতির গতি কলকাতা শহরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত যাদবদের একপুরে আমার ঠাঁই হল। এবং কিছুদিনের মধ্যেই, আশ্চর্য, আমিও যাদব-সদৃশ আচরণ করতে শুরু করলাম। কাঁধে ঝোলাব্যাগ চড়ালাম— তাতে সেই সময়ের পক্ষে অবধারিত কাফকা (ট্রায়াল, মেটামরফোসিস), কামু (হ্যাপি ডেথ, আউটসাইডার), সার্ত্র (নসিয়া, আই লোদ মাই চাইল্ডহুড অ্যান্ড অল দ্যাট রিমেনস্ অব ইট) তাতে ছিলেনই, আর ছিলেন জীবনানন্দ (রূপসী বাংলা, মহাপৃথিবী, মাল্যবান, গ্রাম ও শহরের গল্প), শক্তি চট্টোপাধ্যায় (হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য) আর অবশ্যই শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ)।

তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিগলি, ঘরদোর, অন্দর-বাহির সবকিছু চিনে নেবার সময়। একদিন নীলরতন এসে খবর দিল, ‘ও কী রে, একতলার একটা ঘরে লেখা রমা প্রসাদ দে। সেখানে দাঁড়ালেই প্রসাদ দিয়ে দিচ্ছে। গিয়ে দেখলাম, নীল রমা ও প্রসাদের মাঝখানে অযথাই একটি কমার আমদানি করেছে। পরবর্তীতে, রমাপ্রসাদ স্যারের ক্লাস করতে গিয়ে বুঝেছিলাম তিনি ইংরিজিভাষার প্রসাদগুণ কতটা সহজভাবে তাঁর বক্তৃতার লাইনে লাইনে নিয়ে আসতে জানেন। একদিন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পুত্র, সহপাঠী মৈনাক বলল, ‘তিনতলায় চল, তোকে একটা জিনিস দেখাব। আমাদের বিভাগ ইংরিজি ছিল দোতলায় উঠে বাঁদিকে ডানদিকে কম্প্যারেটিভ লিটারেচার। তিনতলায় উঠে বাঁদিকে বাংলা, ডানদিকে দর্শন বিভাগ। বাংলা বিভাগের বাঁদিকের একেবারে শেষপ্রান্তের ঘরটির কাছে আমাকে নিয়ে এসে মৈনাক থামল। দেখলাম লেখা, ‘চিত্তপ্রিয় ঘোষ। বললাম, 'তো?’ মৈনাক বলল, ‘তুই জানিস না?” বললাম, ‘কী?’ মৈনাক বলল, সে কী রে, এটাই তো শঙ্খ ঘোষের ঘর। এবার আমার চমকাবার পালা। বললাম, তা কী করে হয়?’ মৈনাক বলল, এটাই তো স্যারের আসল নাম। তিনজন কবি-শোভিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে—যাঁদের মধ্যে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ও নবনীতা দেবসেন তুলনামূলক সাহিত্য পড়াতেন—শঙ্খ ঘোষই ছিলেন সবচেয়ে ছাত্রপ্রিয়। এর কিছুদিন বাদে মৈনাকই আবার খবর আনল, শঙ্খ স্যার আমাদের পাসকোর্সের বাংলা পড়াচ্ছেন এবার। অবিশ্বাস্য! কিন্তু সত্যি।

আমাদের আগের চেনাজানা আর কোনও ব্যাচকে শঙ্খ ঘোষ পাসকোর্সের বাংলা পড়িয়েছিলেন কিনা জানা সম্ভব ছিল না, কিন্তু আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমাদের পরের আর কোনও ব্যাচে যে তিনি পাসকোর্সের বাংলা পড়াননি—একথা বুক ঠুকে গর্বের সঙ্গে বলতে পারি। পড়াবেনই বা কেন? তিনি শঙ্খ ঘোষ। এমএ’র ক্লাস নিয়ে, ইউজির অনার্স ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ পড়িয়ে ইংরিজিতে অনার্স-নেয়া পশ্চিমাভিসারীদের তিনি প্রাচ্যবিদ্যা পড়াতে যাবেন কেন? তাঁকে কি তা সাজে? একমাত্র আমাদের ব্যাচেরই সেই সৌভাগ্য হয়েছিল। অর্থাৎ কিনা আমাদের ব্যাচের বেড়ালদেরই ভাগ্যে সে বছর শিকে ছিঁড়েছিল।

সে যাই হোক, গর্বের কথাগুলি আপাতত সরিয়ে রেখে বিবরণে মনোনিবেশ করি। শঙ্খ ঘোষ আমাদের 'মেঘনাদবধ কাব্য’ পড়িয়েছিলেন। কোর্সে তার প্রথম তিনটি সর্গ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনমাসের মত ক্লাস নিয়েছিলেন তিনি। সপ্তাহে একটি করে। অর্থাৎ প্রায় বারোটি ক্লাস। মৈনাক আর আমি একটি ক্লাসও বাদ দিইনি।

ক্লাসে ঢুকেই সরু একটা অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার খুলে আমাদের রোল কল সেরে নিতেন। তারপর সেই রেজিস্টারটা টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে তার ওপর নিজের দুইটি হাত আড়াআড়ি ভাবে রেখে যেন ভর দিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে, একদৃষ্টিতে সোজা তাকিয়ে আত্মমগ্নভাবে একটানা বলে যেতেন। প্রথমদিন, আশ্চর্য, মাইকেল নিয়ে প্রায় কিছুই বললেন না। বললেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ নিয়ে। enjambement নিয়ে। বলেই, ছন্দের বাগানে ঢুকে পড়লেন। পরপর তিনদিন বাংলা ছন্দের ওপর ক্লাস নিয়েছিলেন তিনি। ইংরিজি সাহিত্যের বেশিরভাগ ছাত্রের কাছেই ব্যাপারটা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছিল। আর আমাদের মত দু-তিনজনের কাছে মনে হয়েছিল হঠাৎ-পাওয়া ধন। এত বড় একজন ছান্দসিক ও ছন্দপাণি কবি আমাদের ছন্দ শিখিয়েছিলেন— ভাবলে আজ রোমাঞ্চ অনুভব করি। তবে তখন এসব কিছুই মনে হয়নি। হয়ত এরকমভাবে ভাবার বয়সই সেটা ছিল না। এমনকী আমরা যে রবীন্দ্রনাথের পূর্ববর্তী শ্রেষ্ঠ কবিটির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য পড়ছি রবীন্দ্রনাথের পরের পরের প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ (অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্ভবত ব্যাকরণসম্মত নয়, তবু এ ছাড়া অন্য কোনও শব্দবন্ধও মাথায় আসছে না) একজন কবির কাছে এই বোধটুকুও তখন জাগেনি। তবে ছন্দ পড়াতে গিয়ে স্যার কিন্তু কখনও ওই ‘তানপ্রধান’ কিংবা ‘শ্বাসাঘাতপ্রধান’-জাতীয় নামের বৃত্তে আমাদের পাক খাওয়াননি। এটুকু মনে আছে। মনে আছে, তিনি অপেক্ষাকৃত সরল ও সর্বজনপরিচিত নাম ‘অক্ষরবৃত্ত’, ‘মাত্রাবৃত্ত আর ‘স্বরবৃত্ত’কেই বেছে নিয়েছিলেন।

এরপর একদিন কাব্যের বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচনা করলেন। ভার্জিলের ‘ইনিদ’ আর তাসোর ‘জেরুজালেম ডেলিভার্ড’-এর প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন তাঁর আলোচনায়। মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গে আছে, বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদে শোকেবিহ্বল রাবণ তার প্রাসাদশিখরে উঠে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করছেন। চারদিকে বানরসৈন্যদের দেখে, তাদের সেতুবন্ধন কর্ম দেখে, সমুদ্রকে সম্বোধন করে বলে উঠছেন : ‘কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে, প্রচেতঃ!' এই লাইনটিকে শঙ্খ ঘোষ প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে একটু অন্যরকম করে বুঝিয়েছিলেন। ওই ‘ব্যাজস্তুতি’ অর্থাৎ প্রশংসাচ্ছলে নিন্দা বা বিদ্রুপ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেও, বলেছিলেন যে যদিও সাহিত্যের সঙ্গে বাস্তবের সমীকরণ করা সম্ভব নয়, তবু, আমরা যেন একথা কখনও না ভুলি যে মাইকেল নিজে পরাধীন ভারতের একজন কবি হিসেবে রাবণের সঙ্গে কোথাও একটা একাত্মতাবোধ করছেন। রাবণের স্বর্ণলঙ্কা তখন সম্পূর্ণই বহিরাগত-বেষ্টিত। ঠিক যেভাবে আমাদের এই দেশটাও তখন ছিল ওরকমই বহিরাগত-বেষ্টিত। সেতুবন্ধন-বুকে নিয়ে (এখন লিখতে গিয়ে ভেবে দেখছি, সাহেবরাও তো একধরনের সেতুবন্ধনের মাধ্যমেই এসে ঢুকে পড়েছিল এমনকী আমাদের অন্দরমহলেও, যে সেতুবন্ধনের নাম দেওয়া যেতে পারে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন) মালা কিংবা শৃঙ্খল-পরা ওই সমুদ্রকে দেখে রাবণের এই বিদ্রুপ তাতে আসলে পরাধীন একটি জাতির এক প্রধান কবির অন্তরাত্মারই আর্তনাদ!

নিঃসন্দেহে এই ব্যাখ্যাটি অন্যরকম। অনন্যও। তাই এটার কথা স্পষ্ট মনে রয়ে গেছে। আর মনে আছে স্যারের শেষদিনের ক্লাসের কথা। সেদিন ক্লাসে ঢুকেই স্যার জানালেন, তোমাদের কোর্স শেষ। আজই আমার শেষ ক্লাস। তারপর পড়ানো শেষ হয়ে যাবার পর চিরাচরিতভাবে বেরিয়ে যেতে গিয়েও গেলেন না। সাধারণত বাংলা পড়ানো হত রুটিনের একেবারে প্রথম ক্লাসগুলোয় অথবা একেবারে শেষদিকে। শঙ্খ ঘাষের ক্লাসগুলো শেষদিকেরই ক্লাস ছিল। অর্থাৎ, ওই ক্লাসের পরপরই আমাদের ছুটি। তো স্যার বেরোতে গিয়েও বেরোচ্ছেন না দেখে, সহপাঠিনী পিউ বোস বাঁ হাতের ঘড়িটিকে তিন-চারবার পরপর চোখের সামনে এনে দেখতে গিয়েছিল। আমরা তা দেখিনি। স্যার ঠিকই দেখতে পেয়েছিলেন। স্যারের কথায় আমরা পিউর ঘড়িদর্শন ক্রিয়াটি সম্পর্কে অবগত হলাম। স্যার পিউকে হঠাৎ বলে বসলেন, তুমি তোমার বাঁ হাতটাকে দিয়ে বড্ড বেশি পরিশ্রম করাচ্ছ। ওটাকে একটু রেহাই দাও। তারপর সবাইকে একযোগে সম্ভাষণ করে বললেন, রোসো, তোমাদের এক্ষুনি ছেড়ে দেব। কিন্তু আমার পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরেছে। ঝিঁঝিঁটা সেরে যাক, আমিও বেরিয়ে যাব। তোমরাও চলে যেতে পারবে। তবে যতক্ষণ ঝিঁঝিঁ-ধরাটা সারছে না, ততক্ষণ আমি তোমাদের বরং একটা গল্প বলি। বলে, ছোট্ট গল্প বলেছিলেন আমাদের।

গল্পটা আর কিছুই না, কিছুদিন আগেই তিনি নাকি মৌলালি না কোত্থেকে একটা এস-বাসে করে যাদবপুর আসছিলেন। মাঝে কোন একটা জায়গায় এসে বাস থেমে গেল। আর এগোচ্ছে না। বাসযাত্রীদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা জেগে উঠল। অনেকেই বাস থেকে নেমে দেখতে গেলেন কী হয়েছে। কেউ কেউ সিটে বসে গলা বাড়িয়ে বুঝতে চাইলেন কী হয়েছে। কেউ বললেন, ট্রাফিক জ্যাম। কেউ বললেন, অ্যাক্সিডেন্ট। আবার কেউ কেউ মিছিলনগরীর মিছিল-প্রবণতাকেই বাসের ওই নট-নড়নচড়নের জন্য দায়ী করলেন। শঙ্খ স্যার চুপচাপ তাঁর সিটে বসেছিলেন এতক্ষণ। এবারে, তাঁরও মনে হল, তাই তো, বাস যে ছাড়ার নামই নিচ্ছে না! তিনিও, শেষমেশ সিট ছেড়ে বাস ছেড়ে নেমে দেখতে গেলেন ওই দেরির কারণ কী।

‘তখন, সত্যিই জ্যাম হল’—বলে, গল্প শেষ করলেন শঙ্খ ঘোষ। তার পায়ের ঝিঁঝিঁ-ধরা ততক্ষণে সেরে গেছে।

আমরা মাইকেলের জগত থেকে নেমে এলাম কবি শঙ্খ ঘোষের পৃথিবীতে। বাবরের প্রার্থনার ভাষায়। সমসাময়িকতার বুকে এক চিরায়ত ভাষা খোঁজার চিরন্তন মর্মরে। দরজা খুলে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে গেলেন তিনি। আর আমরা বেরিয়ে এলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তার ঘড়ি-দেখার ব্যামোর জন্য পিউকে অনুযোগ করার কথাও ভুলে গেলাম সবাই।

কবি ও গল্পকার: শিলচর।

Sun 25 Apr 2021 18:33 IST | অমিতাভ দেব চৌধুরী