বরাকের ফারহানা আমাদের গর্ব

এসে দেখে যারে তালেবান, কীরকম মানুষের ধর্মকে, মনের ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িকতা আর সামাজিক অন্ধকারকে অতিক্রম করে নিরন্তর লড়ছেন ভারতের প্রান্তিক প্রদেশের, প্রান্তিক জেলার একজন দুঃসাহসী। এরকম মহিলারই সবক শেখান, মানুষের সঙ্গে মানুষকে মিলিয়ে দেন। সেতু গড়েন হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের। 

Hailakandi-Zila-Parishad-President-Farhana-Khanam-Choudhury

হাইলাকান্দি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারহানা খানম চৌধুরি

 

বি | শে | ষ | র| চ | না

 

 

বা হা র  উ দ্দি ন

স্মৃতিকে নিজের ছায়ার মতো পাশে নিয়ে স্মৃতির শহর হাইলাকান্দিতে হাঁটছি। নিঃসঙ্গ হয়েও নিঃসঙ্গ নই। শহরের পল্লবিত গাছপালা, রাস্তাঘাট, পুরনো বাড়ি, অলিগলি কথা বলছে, উজান পথে উস্কে দিচ্ছে আমাকে। বুঝতে পারছি, উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটিরও অর্থ  আছে। বালক বয়সের চেনা মুখ, বন্ধু, সহপাঠিদের খুঁজছি। পরিচিত চোখের দেখা নেই। বন্ধুরা,  নিবিড় স্বজনরা কোথায় গেল? সবাই বুঝি হারিয়ে গেছে? যে-সব মুখ চোখে ভাসছে, তাদের কেউই আমাকে চেনে না, ডাকনাম তো দূরের কথা, ভালো নামটাও জানে না। জানার কথা নয়, কালে ভদ্রে আসি, গ্রামের বাড়িতে একরাত বড়োজোর দুরাত কাটিয়ে পালিয়ে যাই। এবার বাধ্য হয়ে টানা ৯ দিন থাকতে হচ্ছে। পারিবারিক কাজে। দিনভর বাড়িতে। রাতে এর বাড়ি, ওর বাড়ি। শহরের ওপর দিয়ে ছুটে যাই উত্তর থেকে দক্ষিণে। দক্ষিণ থেকে পূর্বে কিংবা পশ্চিমে। থামা হয় না, কোথাও নামা হয় না। 

প্রিয় শহর পুরোপুরি বদলে গেছে। বদলে যাচ্ছে আসাম টাইপের ঘরবাড়ি। জনবিন্যাস। মানুষের অভ্যাসও। দ্রুত বদলের রূপকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কেউ লুঙ্গি পরে না। লুঙ্গির ওপর শার্টের মানানসই রেওয়াজ আর নেই। মেয়েদের, শহর লাগুয়া তরুণীদের পোশাক-আশাকেও দিন বদলের ছোঁয়া। রাস্তাঘাটে একটাও বোরখাও নজরে পড়ল না। শালীন সালোয়ার কামেজ, কুর্তি অথবা শাড়ি পরে সবাই ঘুরছে। অনুশাসনহীন। স্বাধীন। শারদ প্রাতের ফুলের মতো পবিত্র। এদের ঠেকায় কে? স্রোত হয়ে ছুটছে। আগামী দিনে, আশা করি আরও বেশি ছুটবে। 

পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশের গ্রাম শহরেও এরকম ছবি বারবার দেখেছি। তারা ক্ষুদ্র নয়, আপন ডানায় ভর করে উড়তে শিখেছে। জগৎ দেখছে। দেখিয়ে দিচ্ছে তাদের বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসের নমুনা। সম্ভবত একেই বলে সামাজিক গতি (সোশাল মবিলিট)। মেয়েদের হাত ছুঁয়ে মেয়দের হাত ধরে, মাতৃত্বের স্পর্শ নিয়ে সূর্যমুখী হয়ে ওঠে যা। 

সেদিন নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করতে করতে হাইলাকান্দির হাসপাতাল রোড হয়ে, মিশন রোড পেরিয়ে কালিবাড়ি রোডের মোড় থেকে ঐতিহাসিক হার্বাট গঞ্জ বাজারের সামনে হাজির আমি। স্মৃতিমগ্ন আমি। ওখান থেকে দুপাশের দোকানপাট, অফিস, আদালত পেছনে রেখে হাঁটতে হাঁটতে বাটা চৌমাথায়। পাশেই জেলা পরিষদের অফিস। ভিড়ে ঠাসা চত্বর, সামনে গাড়ি, বাইক। চৌহদ্দিতে ঢু মারতেই নজরে এল পরিষদের চেয়ার ম্যানের নেমপ্লেট, ফরহানা খানম চৌধুরি। প্রশ্ন জাগল, এরকম গুরুতবপূর্ণ পদাধিকারী মহিলাটি কে? শহরের না গ্রামের বাসিন্দা? পর্দানশিন না ব্যতিক্রম? কৌতূহল  বাড়তি উৎসাহ জোগাচ্ছে। নিজেকে সামলে রেখে ওর বিশেষ সচিবের ঘরে ঢুকে বললাম, চেয়ারম্যানের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। রষকষহীন প্রবন্ধের মতো ভারি মুখের ভদ্রলোক আমল দিলেন না, উনি মিটিং-এ ব্যস্ত বলেই এড়িয়ে গেলেন। বসে থাকলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বাইরের কোলাহলে সূর্যাস্তের ছায়া। বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। সচিবের ওপর ভরসা করে লাভ নেই। পাত্তা দিচ্ছেন না। পাশে বসে থাকা অন্য একজনকে বললাম, ভিজিটিং কার্ডটা একটু ভেতরে দিয়ে আসুন। কার্ডের ওপর চোখ বুলিয়েই ভদ্রলোক সোজা চেয়ারম্যানের ঘরে। মুশকিল আশান হয়ে সাদা মাটা পোশাকের মহিলা বেরিয়ে এলেন।পরনে সাধারণ শাড়ি, লম্বা হাতা ব্লাউজ । বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো মাথায় সাবেকি ঘোমটা। চাকচিক্যহীন পোশাক। চেয়ারে বসেই জিজ্ঞেস করলেন, বিশেষ কোনও কাজ আছে? না তেমন কিছু নেই। আলাপ করতে এসেছি। একজন মহিলা জেলা পরিষদের শীর্ষে, জেনে ভালো লাগছে। শুনে হাসলেন, এই পদে যখন বসি, কাজ করি, আমি তখন মহিলা নই, মা নই, নারী-পুরুষের ভেদাভেদকে গুরুত্ব দিই না। আরও দশজনের মতো কাজ করি। সবার পরামর্শ আমার ভরসা। এখানে আমি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। মানুষকে সেবার সুযোগ দিয়েছেন, সে কথা ভুলিনা। তিন বছর ধরে দায়িত্ব সামলাচ্ছি। আমার আগেও একজন মহিলা এ পদে ছিলেন। তাঁর দক্ষতা অস্বীকার করি না। কিন্তু আমার ধরণ আলাদা। বলেই একটু থামলেন। এবার সুযোগ পেয়েই আমার প্রশ্ন, চারপাশের সমাজ রক্ষণশীল। পুরুষের ভূমিকা যেখানে মুখ্য। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব সামলাতে অসুবিধা হয়না? বাধা আসে না?' হঠাৎ জ্বলে উঠলেন ফারহানা। এত তেজ, দীপ্তি তার চোখে এতক্ষণ লক্ষ করিনি। 

বললেন, কীসের বাধা? কে দেবে বাধা? সবাই আমরা পরস্পরের সহযোগী। বাড়িতে, বাড়ির বাইরেও আমার স্বামী মাসুক আহমেদ চৌধুরি আমার দিশারি। ছোটবেলা থেকেই আমি বর্হিমুখী। অর্ন্তমুখী নই। একদম নই। কম কথা বলি। বেশি বলে কী লাভ !
আপনার স্বামী কী করেন ?

রাজনীতি আর সমাজসেবা। জাতীয় কংগ্রেসের ছাত্রনেতা ছিলেন। এখন তাঁর রাজনীতির মোড় ঘুরেছে। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তাঁকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। দলমতের ঊর্দ্ধে থাকা একটি মানুষ। তখনই  আমার অন্য এক প্রশ্ন। এমন সহজ প্রশ্নের দিক উনি ঘুরিয়ে দেবেন, একদম ভাবিনি।

বিয়ের পরেই কি আপনার রাজনীতি শুরু?

না। আমার বাবা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরি বনবিভাগে চাকরি করতেন। মা মিনারা খাতুন সংসার সামলাতেন। মা-বাবা দুজনেই আমার জীবন গড়ার কারিগর। স্কুল জীবনেই খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িয়ে পড়ি। বিয়ের পর আমার স্বামীর হাতে  গড়া নজরুল যুব পরিষদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। বুঝতে পারি, সাংস্কৃতি আর রাজনীতির মধ্যে একটি সেতু আছে। তাকে ব্যবহার করতে হবে। আমি ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। রাজনীতিও হাতছানি দেয়। প্রতিবন্ধকতা ছিল, আড়চোখের ঈর্ষাও ছিল। রক্ষণশীলতাও আটকাতে চেয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে। ভোটে দাঁড়ালাম। বিপুল ভোটে জিতলাম। জয় আর মানুষের পছন্দ কাঁধে দায়িত্ব চাপাল। তা অস্বীকার করিনি।

ফারহানা বলছেন থেমে থেমে। আমি শুনে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে প্রশ্ন। অপ্রীতিকর হলেও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাবার ঝোঁক নেই তাঁর। বললাম, ক্ষমতার জন্যই কি রাজনীতির সঙ্গে ওঠাবসা?

'একদম না।' ক্ষমতা আসে। ক্ষমতা চলে যায়। বুদবুদের মতো তার স্বভাব। আমি বিশ্বস করি, আগে সমাজের ইচ্ছাপূরণকে গুরুত্ব দিতে হয়। পরে রাজনীতি। অর্থাৎ আগে সমাজ,  অনেক পরে রাজনীতি। আমার ধারণা, সৎ রাজনীতি কাজ দাবি করে। এ রাজনীতির রং নেই। দল নেই। কাজের পরিসর খুঁজতে আমরা এদল ওদল করি। দক্ষতা থাকলে যে কোনও দলের সদস্য হয়ে কাজ করা যায়। এই যে, আমাদের জেলা পরিষদের ১১ জন সদস্য, এই যে ৬২ টি আঞ্চলিক পঞ্চায়েত ও ৬২ টি গ্রাম পঞ্চায়েত আমাদের সঙ্গে যুক্ত। সবার সদিচ্ছা, দাবিদাওয়া মেনেই আমাকে কাজ করতে হয়। সহযোগিতার জন্য সবার কাছে ঋণী। উন্নয়নের প্রশ্নে প্রতিটি পঞ্চায়েতই আমাকে নিবিড় আত্মীয়তায় বেঁধে রেখেছে। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।আমি দলের রং বুঝি না। মতের ভিন্নতা বুঝি না। যা বুঝি, তা হচ্ছে প্রতিযোগিতাহীন সমাজকর্ম। যার নাম উন্নয়ন। এখানে আমরা সবাই সমান। একই নৌকার যাত্রী।
ফারহানা কথাবার্তায় মুগ্ধতা বোধ বাড়ছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। বুঝতে পারছি ব্যস্ততা থেকে ওকে এরকম সরিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না। আমরাও কয়েকটি কাজ পড়ে আছে। কথাবার্তার ইতি টানতে চাইছি। কিন্তু কথার ওপর কথা বাড়ছে। ভেতর থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে এল, হাইলাকান্দি প্রান্তিক, গরিব জেলা। কলকারখানা নেই। চাষবাস কমে গেছে। কর্মহীনতা বাড়ছে। করোনা সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজের রক্ষণশীলরা একদিকে, আপনি আরেকদিকে। অস্বস্তি বোধ করেন না।

জ্বলে উঠলেন ফারহানা, কীসের অস্বস্তি। করোনার আবহে নিজেকে বাড়িতে আটকে রাখি নি। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম ছুটতে হয়। মৃত্যুকে ভয় পাই নি। মৃত্যুকে হরদম তাড়া করেছি। বিনামূল্যে মানুষের চিকিৎসা, ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। অর্থ যোগাতে হচ্ছে। বন্যার সময়েও আমারা একইভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াই। যে কোনো উৎসবেও এরকম। লোক দেখানো কাজ নয়, এটা আমাদের দায়িত্ব। এ দায়িত্বে অবহেলা মানেই পাপ। আমি ধর্মভীরু মানুষ। আমার ধর্মে রক্ষণশীলতার, তালিবানি খবরদারির জায়গা নেই। সমাজ নিষ্ঠ রাজনীতির পরিসর বিস্তৃত। কেউ যদি আমাকে বলে, খেলাধূলো পাপ, ছবি আঁকা পাপ, সঙ্গীত চর্চা পাপ, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ পাপ, আমি তাদের শাস্ত্র ঘেঁটে দেখিয়ে দেব, আমার ধর্ম মানবিক। আমার ধর্ম বৈষম্য বিরোধী, দারিদ্র বিরোধী, সামাজিক অনাচার বিরোধী। আজ যারা অস্ত্র দেখিয়ে ভয় চাপিয়ে দিচ্ছে। মেয়েদের যা তা বলছে। পরবাসী, উদ্বাস্তু বানিয়ে দিচ্ছে, তাদের বলতে ইচ্ছে করে সভ্যতার ইতিহাস পড়ো, অতীতকে খোলা চোখে দেখো। তা হলে, বুঝতে পারবে, মহিলাদের শক্তি অশেষ। তারা মায়ের জাত। তারাই প্রকৃতির খাঁটি বন্ধু। অর্ধেক আকাশ নয় তারা, পূর্ণ আকাশেরই অংশ। শুধু সন্তানের জন্ম দেয় না, সন্তানকে মানুষ করে। প্রকৃতির বেসমানকে আয়ত্তে এনে তাকে উর্বরা, শস্যশ্যামলা করে তোলে।

রাত নামছে। বাইরের শহরের টিমটিম আলো। ফারহানাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। শহর থেকে দূরে, রতনপুরে। আমাকে শহর ঘেঁষা লক্ষীরবন্দে। আলো ঝলমল গ্রামে। ফিরতে ফিরতে মনে হল, আমাদের এই গ্রামেই গত শতকের ৩৯-৪০ সালে একজন মহিলা মেয়েদের জন্য স্কুলের পর স্কুল গড়েছেন। প্রথমে বাড়িতে। পরে নদীতুল্য খাল পাড়ে। রক্ষণশীলদের ষড়যন্ত্র স্কুল পুড়িয়েছে। ভষ্ম থেকে আবার উনি স্কুল গড়েছেন। রাতে লন্ঠন জ্বালিয়ে স্বামী-স্ত্রী বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেয়েদের পড়াশুনোর গুরুত্ব বোঝাতেন। ফারহানা আর তাঁর স্বামী মাসুক আহমেদও সম্ভবত ওই বিগত দম্পতির  উত্তরসূরি। তাঁদের রাজনীতিও প্রকারান্তরে মানুষ গড়ার কারিগর। ফারহানা আমাদের গর্ব। তাঁর জয়ধ্বনি দরকার। একথাও বলা জরুরি, তোরা এসে দেখে যারে তালেবান, কীরকম মানুষের ধর্মকে, মনের ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িকতা আর সামাজিক অন্ধকারকে অতিক্রম করে নিরন্তর লড়ছেন ভারতের প্রান্তিক প্রদেশের, প্রান্তিক জেলার একজন দুঃসাহসী। এরকম মহিলারই সবক শেখান, মানুষের সঙ্গে মানুষকে মিলিয়ে দেন। সেতু গড়েন হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের। 
 

Sun 12 Sep 2021 16:05 IST | বাহার উদ্দিন