পেশা

galpo-by-pulak-banerjee.png

চিত্র: অনিতা রায় চৌধুরী

►গ ল্প 


কার্ডিওলজিস্ট ফোরামের সেমিনারে বক্তৃতা দিতে কলকাতায় এসেছে ডাক্তার অতনু সেনগুপ্ত । দীর্ঘদিন আমেরিকায় কাটিয়ে, প্রায় তিন দশক পরে,  কয়েকটা দিনের জন্য হলেও,  দেশের মাটিতে পা রেখেছে অতনু। তাঁকে দেখে অনুমান করা কঠিন, পদমর্যাদায় তাঁর অবস্থানটা ঠিক কোথায় ! সহজ অঙ্গভঙ্গি, গায়ে সাদামাটা পোশাক । এখনও মাটির কাছাকাছি রয়ে গেছে । সেমিনারের আগে দু’দিন, আর পরে মাত্র দু’দিন; সাকুল্যে মোট পাঁচ দিন। তারমধ্যে শেষ দু’দিন  দার্জিলিং-টা ঘুরে নিয়ে, বাগডোগরা থেকে দিল্লি হয়ে, ঐ পথেই আমেরিকা ফিরে যাবে। সময়কম। তাই আজই টালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে, ছোটকাকার সঙ্গে দেখা ক’রে আসবে বলে ঠিক ক’রে ফেলল।

দুপুর-দুপুর হোটেল থেকে বেরিয়ে, পায়ে-পায়ে ধর্মতলার মোড়ে এসে দাঁড়াল।শুনেছে এখন বি.বা.দি. বাগ থেকে কুঁদঘাট পর্যন্ত মিনিবাস চলে। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করার পর, কুঁদঘাট-গামী মিনিবাসের দেখা না পেয়ে, অতনু’র মাথায় যখন ধীরে-ধীরে বিরক্তি  চেপে বসছে, ঠিক তখনই একটা এস.ইউ.ভি. গাড়ি  অতনু’র গা-ঘেঁষে এসে প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষল’। 

আরে অতনু না ! কী করছিস এখানে,—অতনু’র দিকে তাকিয়ে, ড্রাইভিং-সিটে বসা ভদ্রলোক  গাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার ক’রে জানতে চাইলেন। মুখে একগাল চেনা ছেপলা হাসি। 

অতনু এক নজরে চিনতে পেরেছে শঙ্করকে। শঙ্কর মানে শঙ্কর চক্রবর্তী, সেই ক্লাস ওয়ান থেকে ইলেভেন পর্যন্ত সহপাঠী। ভালো ছাত্র ছিল শঙ্কর । ক্লাসে সব সময় প্রথম দশ-জনের মধ্যে থাকত।ছোট থেকেই ও বড় বেশি দূরন্ত ছিল। যত বড় হয়েছে, দূরন্তপনার পাশাপাশি ছেবলামি আর চ্যাংড়ামি মিলে-মিশে, অদ্ভূত আকার নিয়েছিল। শঙ্করের হাসিতে এতদিন বাদেও, হুবহু সে স্বভাবেরই প্রতিফলন দেখতে পেল অতনু। 

শঙ্করের দিকে তাকিয়ে অতনু হালকা ক’রে মাথা নাড়ায়। ডান হাতটা স্টিয়ারিং-এ রেখে, বাঁ  হাতে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে শঙ্কর অতনু’র কাছে জানতে চাইল, কীরে, কোথায় যাবি ! উঠে পড়, এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কী দেখছিস ? 
ইঙ্গিত বুঝতে পেরে অতনু পরিষ্কার ভাবে শঙ্করকে জানাল, কুঁদঘাটের দিকে যাব ভাবছি, মিনিবাসের জন্য অপেক্ষা করছি।
আমিও তো ঐ দিকেই যাব। নে-নে চটপট উঠে আয়, শঙ্করের মধ্যে একইরকম হড়বড়ানি এখনও রয়ে গিয়েছে। অতনু’র নজর এড়ায়না।                                                                                                                                                               এই বয়সে  রোদ্দুরের মধ্যে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছিস। চোখমুখের কী অবস্থা! বুঝে উঠতে পারিনা, এত পড়াশুনা ক’রে তোদের লাভটা কী হ’ল ! গাড়ি পর্যন্ত কিনতে পারিসনি এখনও?

অতনু’কে চুপ ক’রে থাকতে দেখে, শঙ্কর জানতে চাইল, কী-রে, চুপ ক’রে আছিস কেন ? গরম লাগছে , এ.সি.-টা বাড়িয়ে দেব ? দেখ না, তোদের মত মেলা পড়াশুনা না করেও, আমি এসকোডা-টা চড়ে বেড়াচ্ছি ; আবার মিসেস-এর জন্য একটা বোলেরো বাড়িতে রাখা আছে। ওর  দরকার হলে, ওটা নিয়ে  বেরিয়ে যাবে। একটা ছোট হুণ্ডাই আছে, ছেলেটাকে স্কুলে দেওয়া- নেওয়া ক’রে ড্রাইভার। 

আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের শঙ্কর’কে খুঁজে পাচ্ছে অতনু। এবার আর চুপ ক’রে না-থেকে,  অতনু শঙ্করের কাছে জানতে চাইল, ‘তুই কি করছিস এখন ?’

গাড়ি চালাতে-চালাতে বাঁ-হাত দিয়ে বুক-পকেট থেকে  ভিজিটিং-কার্ড বের ক’রে, অতনু’র দিকে বাড়িয়ে দেয় শঙ্কর। কার্ডটা হাতে নিয়ে, ভালো ক’রে তাতে চোখ বোলাল অতনু। কার্ডের মাথায় বাঁদিকে ইংরাজিতে লেখা ‘শঙ্কর চক্রবর্তী’ ; তার নীচে লেখা ‘রেকনাস প্রাইভেট লিমিটেড’। অতনু কার্ডটা দেখার পরে শঙ্করের কাছে জানতে চাইল, কীসের ব্যবসা করে এই ‘রেকনাস প্রাইভেট লিমিটেড’ ? নামটাও তো বেশ অদ্ভূত দিয়েছিস ! ‘রেকনাস’ মানেটা কী ?

ইংরাজিতে আমার নামের লেটারগুলো উলটে দিলেই হয়ে যাবে ‘রেকনাস’। পুরাণো ক্যালকাটা মুভিটোন স্টুডিও’র পিছন দিকে, টালি’র নালার গায়ে ফ্যাক্টরি বানিয়েছি। পাউডার তৈরি করি।
                কী দিয়ে ?
                চক-ডাস্টের সঙ্গে মানুষের হাড়ের গুড়ো মিশিয়ে।
                শঙ্করের জবাব শুনে, অতনু জানতে চাইল,  মানুষের হাড় কোথায় পাস ?


 কেন , রোজ সংবাদপত্র খুললেই তো চোখে পড়ে ,কত-শত নিখোঁজ মানুষের ছবি-সহ কত বিজ্ঞাপন ! এদের কত জন খুন হচ্ছে, কত জন আত্মহত্যা করছে, কে তার খবর রাখে ! বেওয়ারিস লাশগুলোই তো আমার ব্যবসাটা বাঁচিয়ে রেখেছে। এই তো , আমি এখন আসছি হাওড়ার বাঁধাঘাট থেকে। খবর পেয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। গঙ্গার জলে ভেসে ওঠা একটা লাশ জল থেকে তুলে, কয়েক হাজার লোকের ভিড় সামলে, একটা ম্যাটাডরে পোস্ট-মর্টেমের জন্য মর্গে পাঠিয়ে দিলাম। আসলে লাশ চলে যাবে সোজা আমার ফ্যাক্টরিতে।  


একটা কাটা-ঘুড়ি উড়তে-উড়তে গাড়ির উইণ্ড-স্ক্রিনের উপরে এসে পড়ল। শঙ্কর  ঘুড়িটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল— ঘুড়ি আমাদের  সুন্দর বার্তা দিয়ে যায়। ওড়, ওড়, যত পারো ওড়। কিন্তু মাটির সাথে, তোমার মূলের সাথে যুক্ত থেকো। সে যোগ কেটে গেলেই, ভোকাট্টা ঘুড়ির মতন, জীবনটাও কোথায়  যে ছিটকে পড়ে, তা কেউ জানে না !


শঙ্করের জবাবে অতনু’র কৌতূহল নিরসন হতে চায় না। জানতে চায় অতনু,  এত-এত লাশ থেকে এত-এত হাড় পাচ্ছিস ; তার মানে তোর পাউডারের প্রোডাকশন্‌-ও তো প্রচুর ! এত পাউডার মার্কেট করিস কোথায় ?

আরে না-না ! সব লাশ ছাড়িয়ে কি আর হাড় বের করি! লাশের কণ্ডিশন বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনার জন্য কখনও গোটা লাশ, কখনও  আবার হাত-পা, হার্ট, লিভার,কিডনি কেটেকুটে সাপ্লাই দিতে হয়। কখনও আবার লাশের অবস্থা অনুযায়ী, চামড়া-মাংস ছাড়িয়ে-ছুড়িয়ে হাড়গোড় বের ক’রে নেওয়া হয়। 

এই কাজগুলো করে কে ? লোকজন রেখেছিস নিশ্চয়। তুই তো ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে। তোর বাবা-জ্যাঠারা তো খুব গোড়া, নিষ্ঠাবাণ ব্রাহ্মণ ছিলেন। ওঁরা তোকে এ কাজে বাধা দেননি?

হাসতে-হাসতে শঙ্কর জানাল, বাধা আবার দেয়নি ! তবে বাধা দিয়ে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই আমাকে তো তুই ভালো করে চিনিস ! আমি যদি কোনো কাজ করব বলে মনে করি, তাহলে আমাকে আটকাবে কে ! মন্ত্রী-সান্ত্রী সব লেভেল পর্যন্ত গিয়েছিল ওরা, করতে কিছুই পারেনি।ধীরে-ধীরে সব লেভেলে, আমি মান্থলি ক’রে নিয়েছি ; কোথাও কোনও সমস্যা হয় না।মাখনের মত ব্যবসা চালাচ্ছি।

এখন কি তুই বাড়ি ফিরছিস তাহলে ?
না-না এখনই বাড়ি ফিরব কী ক’রে ! আমি যাচ্ছি ফ্যাক্টরি’র দিকে। লাশটা যতক্ষণ না ফ্যাক্টরি’তে ঢুকছে, ততক্ষণ বাড়ি ফেরা সম্ভব নয় । আমাদের ঐ আগের বাড়িতে আর থাকিনা। বিশ- পঁচিশ বছর হয়ে গেল, বাড়ি ছেড়েছি। ঐ বাড়ির সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ নেই। ওরাও কেউ আর আমার খোঁজ রাখে না, আমিও রাখি না। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে একটা পুরনো বাংলো কিনে বছর পনেরো ধরে ওখানেই আছি। সময় ক’রে একদিন চলে আয়  চুটিয়ে আড্ডা মারা যাবে। তারপর একটু থেমে, অতনুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে শঙ্কর বলল, আরে এই দেখ, এতক্ষণ ধরে আমি  শুধু আমার কথাই একতরফা বলে যাচ্ছি। তুই কী করছিস, তা তো জানা হ’ল না। কাজ-কর্ম কি করিস, না আতলামি করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলি ?

টালিগঞ্জ ফাঁড়ির সিগনালে গাড়ি দাঁড়াতেই, অতনু ‘সায়েন্স-সিটি অডিটোরিয়ামের’  সেমিনারের একটা কার্ড শঙ্করের হাতে দিয়ে বলল, সময় পেলে চলে আসিস, দেখা হবে। আমি এখন যাচ্ছি, ছোটকাকাকে সেমিনারে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। 
কার্ডটা হাতে নিয়েই শঙ্করের চোখে পড়ল, মোটা-মোটা হরফে লেখা— গেস্ট-লেকচারার অতনু সেনগুপ্ত, বিশ্বের অন্যতম সেরা হৃদবিজ্ঞানী ; গবেষক, ক্লিভল্যাণ্ড হসপিটাল, ওহিয়ো সিটি, আমেরিকা । খানিকক্ষণ চুপ ক’রে থাকার পর শঙ্কর আবার মুখ খুলল, এতটা পথ একসাথে এলাম , এত বক-বক করলাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে দিলি না আমাকে।

শঙ্করের গাড়ি টালিগঞ্জ ট্রামডিপো পার হয়ে, কুঁদঘাটের রাস্তা ধরতেই একটা কাটা-ঘুড়ি উড়তে-উড়তে গাড়ির উইণ্ড-স্ক্রিনের উপরে এসে পড়ল। শঙ্কর বাঁদিক চেপে গাড়িটা থামিয়ে, গাড়ি থেকে নেমে ঘুড়িটাকে ছাড়িয়ে নিল। অতনু’ও গাড়ি থেকে নেমে, শঙ্করকে বলল,” তুই আমাকে এখানেই নামিয়ে দে ; একটা রিক্সা ধরে গলির ভিতরে ঢুকে যাব। আসলে কী জানিস— ঘুড়ি আমাদের  সুন্দর বার্তা দিয়ে যায়। ওড়, ওড়, যত পারো ওড়। কিন্তু মাটির সাথে, তোমার মূলের সাথে যুক্ত থেকো। সে যোগ কেটে গেলেই,  ঘুড়িটার মতন, আমাদের জীবনটাও কোথায় কেটে গিয়ে যে ছিটকে পড়বে, তা কেউ জানে না !


ছোটকাকার সাথে কথাবার্তা সেরে, পুরনো পাড়ায় ঘুরতে-ঘুরতে কুঁদঘাট মিনিবাস স্ট্যাণ্ডে এসে পৌঁছল অতনু। ধর্মতলার হোটেলে ফিরে যাওয়ার জন্য, একটা ফাঁকা মিনিবাসে উঠে পড়ল। বাসের সামনের দিকে ড্রাইভারের বাঁদিকের লম্বা সিটটায় গিয়ে বসল সে। সিটটা অতনু’র খুব ভালো লাগে। বহুদূর পর্যন্ত সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ডানে-বাঁয়ে কোথাও কোনো বাধা নেই—দৃষ্টি ছুটছে । 

টালিগঞ্জ ট্রাম-ডিপো পেরোতেই  কণ্ডাক্টর টিকিটের বাণ্ডিলে খচাৎ-খচাৎ শব্দ ক’রে টিকিট কাটতে শুরু করল। অতনু পার্স থেকে কুড়ি-টাকার নোট বের ক’রে কণ্ডাক্টরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ধর্মতলায় যাব। প্রত্যুত্তরে কণ্ডাক্টর জানাল, রাখুন, পরে নিচ্ছি।— বলেই পেছন দিকে চলে গেল। ঘাড় তুলে একবার কণ্ডাক্টরের মুখের দিকে তাকাতেই, অতনু বুঝতে পারল , আরে এ তো গোবিন্দ।

গোবিন্দ অতনু’র সঙ্গে পড়েছে। ছোটবেলা গোবিন্দ’র বাবা মারা যান। মা পরিচারিকার কাজ ক’রে গোবিন্দ’কে বড় করেছেন। প্রতিবছর বুকলিস্ট বেরোনোর পরে গোবিন্দ’কে নিয়ে ওর মা অতনু’দের বাড়ি আসাতেন। অতনুর বাবা গোবিন্দ’র বই-খাতা কেনার জন্য প্রতিবছর গোবিন্দ’র মাকে সাহায্য করতেন ; অতনু জানে সেটা। ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক আগে গোবিন্দ’র মা’ও মারা গেলেন। গোবিন্দ’র আর পরীক্ষা দেওয়া হ’ল না। এরপর সে  আর কোনোদিন স্কুলে আসেনি।

টালিগঞ্জ ফাঁড়ি পার হতেই , বাসে ভিড় বাড়ল। গোবিন্দ’কে আর দেখা যাচ্ছে না।গোবিন্দ কি পেশাগত কারণে আসতে লজ্জাবোধ করছে, না-কি নিজের কাজে সে স্বাভাবিক ভাবেই ব্যস্ত, ঘুরে-ফিরে এ কথা বারবার অতনু’র মাথায় ঘুরঘুর করছে। সামনের উইণ্ড-স্ক্রিনের ভিতর দিয়ে, ভালো ক’রে দেখা যাচ্ছে না কলকাতাকে । অতনু এবার বাসের সামনের দিকে ওর মনটাকে মেলে দিল। রাসবিহারী মোড় থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো প্যাসেঞ্জার বাসে উঠল। একজন অতনু’র সামনে এসে দাঁড়িয়ে টিকিটের টাকা বাড়িয়ে দিয়ে, কণ্ডাক্টরকে বলল, একটা ভবানীপুর দেবেন !

গোবিন্দ সাত-টাকার টিকিট আর তিন টাকার কয়েন লোকটার হাতে দিতেই, লোকটা চিৎকার ক’রে উঠল, আমি আপনাকে এক শ’ টাকার নোট দিয়েছি মশাই; আপনি আমাকে তিরানব্বই টাকা ফেরত দেবেন। তিন টাকা ফেরত দিচ্ছেন কেন,  নব্বই টাকা চোট !
গোবিন্দ মৃদু স্বরে বলল, আপনি দশ টাকার নোট দিয়েছেন; তাই সাত টাকার টিকিট কেটে তিন টাকার কয়েন ফেরত দিয়েছি। কলকাতায় দেখছি আবার আর একটা নতুন পেশা চালু হয়ে গেল। নতুন-নতুন পেশার চাপে সাধারণ মানুষের জীবন একেবারে জর্জরিত। সারাদিন চার-পাঁচটা বাসে এ খেলা দেখাতে পারলেই, দিনের শেষে চার-পাঁচশ’ টাকা কামানো কোনও ব্যাপারই নয় । আমরা সারাদিন গাধার খাটুনিও খেটেও এত আয় করতে পারিনা ! 

লোকটা এবার বেশ রূঢ়ভাবে স্বর চড়াল,  কী বলছেন  মশাই ! ফালতু নাটক না ক’রে,  তিরানব্বই টাকা ফেরত দিন।               গোলমালটা আরও বাড়তে যাচ্ছিল; হঠাৎ ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন বলে উঠল, ড্রাইভার সাহেব , বাসটা বাঁদিকে চেপে ভবানীপুর থানার সামনে রাখুন। অনেকদিন ধরে তক্কে-তক্কে ছিলাম এই মালটার খোঁজে। আজ রাসবিহারী মোড়ে মক্কেলকে দেখে, পিছন-পিছন উঠেছি—আজ ঠিক ধরেছি চাঁদু’কে। কাল বেহালার বাসে ভালোই কামিয়েছ ; আজ চলো একটু মামাবাড়ি থেকে ঘুরে আসবে।— পিছন থেকে কলার ধরে লোকটাকে টেনে নামাতে-নামাতে, সাদা পোশাকের পুলিশ-ভদ্রলোক গোবিন্দ’কে বলে গেলেন,  একটা কমপ্লেন পেপার তৈরি করা থাকবে ; ফেরার পথে সই ক’রে দিয়ে যেও। 

বাসটা ধর্মতলা পৌঁছনোর আগেই , গোবিন্দ’র হাতে সেই কুড়ি টাকার নোটটা গুঁজে দিয়ে টিকিট কেটে, গোবিন্দ’কে ‘ আসছি রে’ বলে ধর্মতলায় বাস থেকে নামতেই , অতনু’র কানে এল, সান্ধ্য-পত্রিকার হকাররা বাস, ট্যাক্সির জানালায়-জানালায় ঘুরে, জোর গলায় পত্রিকা ফেরি করতে-করতে হাঁক পাড়ছে, জোর খবর, জোর খবর—জনরোষে পুড়ে ছাই , টালিগঞ্জের পাউডার ফ্যাক্টরি। মন্ত্রীর নিখোঁজ ছেলের লাশ চুরি ; আগুনে পুড়ে ছাই টালিগঞ্জের পাউডার ফ্যাক্টরি। জোর খবর, জোর  খবর...!                                                                                                                                                                  
 

Sat 17 Oct 2020 12:43 IST | পুলক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়