ভিখিরি সমিতি’র সদস্যরা

story-bhikhiri-samitir-sadasara-by-Sayantani-Bhattacharya-

চিত্র: তনুপ নাথ

►গ ল্প 

সোনার পালঙে শোবো মোরা, রুপোর জলে গা ধোবো/ এ জেবনে ভরাট জেবন পাব। ভারী সুন্দর গান ধরেছেন কুচুমশাই। স্বরচিত গান। ফুলকুমার, নিন্নাবুড়ি, নুড়িবাবু, মিহিদাদা, কুমুলালের মন গান শুনে ফুরফুর করছে। ফুরফুরের মধ্যে খানিক কান্নাও আছে বটে। কান্না গলার কাছে ঢেউ তুলছে। এদিকে গঙ্গার জলে চাঁদের আলো পড়ে জল চিকচিক করছে। শহরের অন্য আলোগুলো চাঁদের আলোকে গিলে খাবে বলে তেড়েফুঁড়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু চাঁদের আলো সব্বাইকে ছাপিয়ে গেছে। কুচুমশাই গাইছে, জেবনের রঙে রসে মন আনচান/ তোমার ওই চোখের জলে ডাকল বান...। কুচুমশাইয়ের দরাজ গলা গমগম করছে।  

নিন্নাবুড়ি ফোস করে নিশ্বাস ফেলল। ফুলকুমার ফিসফিস করে বলল, কি হলো গো ঠাকুমা? কুচুমশাইয়ের গানে যাতে অসুবিধা না হয় তাই নিন্নাবুড়ি ফুলকুমারের থেকেও গলা নামিয়ে বলল, কেমন যেন দুঃখু দুঃখু পাচ্ছিরে ফুলকুমার। কুচুমশাই এমন সুন্দর জেবনের গান গাইছে আর আমরা সেই জেবন থেকেই ছুটি নেবে বলে কিনা মা গঙ্গার কাছে এসেছি!  

ফুলকুমার বলে, তা কী করবে বলো ঠাকুমা, 'পথের ধার ভিখিরি সমিতি'র মিটিং-এ তো তাই ঠিক হল। ঠিক হল আর বেঁচে থেকে লাভ নেই, আজই সবাই মিলে মা গঙ্গার কাছে জেবন দেব। ফুলকুমার আর নিন্নাবুড়ির কথা বোধহয় কানে গেছিল নুড়িবাবুর। আহা তার বড় নরম মন। আর থাকতে না পেরে নুড়িবাবু তাই কেঁদে উঠল। কান্না শুনে বিরক্ত হয়ে কুচুমশাই গান থামিয়ে দিলেন। মিহিদাদা নুড়িবাবুর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, আহা ষাট ষাট।  
কুমুলাল বলল, ও নুড়িবাবু, কাঁদো কেন?
নুড়িবাবু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, মরণের সময় ওরকম জেবন জেবন করে গান গাইতে আছে? আমার মরার ইচ্ছেটা কেমন ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে । 
কুচুমশাই বললেন, তা বললে তো হবে না, একসঙ্গে মরব বলে ঠিক যখন করেছি, তখন মরবোই। 'পথের ধার ভিখিরি সমিতি'র মিটিং-এ তো তাই সিদ্ধান্ত হল।   

নিন্নাবুড়ি কুচুমশাইকে ভয় পায়। ভিখিরি সমিতির মোট এই ছয় জন সদস্য। কুচুমশাই তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়। বয়েস নয় নয় করেও নব্বুই হবে। চোখে দেখতে পান না ঠিকই, কিন্তু এমনিতে শক্তপোক্ত আছেন। শোভাবাজার মেট্রোর বাইরে চট পেতে বসে ভিক্ষে করেন। সামনে থালা পাতা থাকে, কুচুমশাই নিজের মনে গান গাইতে থাকেন, থালায় টাকা পড়তে থাকে। মুখ ফুটে কারোকে বলেন না, দাও। কুচুমশাই সামনে এলেই নিন্নাবুড়ির বুকটা কেমন ধরাস ধরাস করে। নিন্নাবুড়িরওতো মেঘে মেঘে কম বেলা হলো না, এ'বছর সত্তরে পড়েছে। যৌবন যখন ছিলো তখন ওই শোভাবাজার-চিৎপুর ঘেষে ওই পাড়ায় থাকত। আরে ওই পাড়া গো, ওই পাড়া। জীবনে উচ্চাকাঙ্খা ছিল। ইচ্ছে ছিল বয়েস বাড়লে ঠেকের মাসী হবে। হাতে পাঁচ-দশটা ডবকা মেয়ে থাকবে। তাদের কামাইয়ে নিন্নাবুড়ির চলে যাবে। কিন্তু সে আর হল কই? স্টোভ বার্স্ট করে নিন্নাবুড়ির সারা গা-মুখ পুড়ে গেল। কী যে জ্বালা আগুনে পোড়ার! তা তারপর আর ওই পাড়ায় ফিরতে পারেনি। গিরিশ পার্কের মোড়ের ভিখিরি হয়েছে। নিন্নাবুড়ি অদ্ভুত ঘ্যানঘ্যানে গলায় সারাদিন, এ বাবু, এ মাইয়া, এ দিদি রুপায়া দো বলে ভিক্ষে করে। নিন্নাবুড়ি খাঁটি বাঙালি, কিন্তু ভিক্ষে করতে গেলেই মুখ থেকে হিন্দি বেরোয় কেন কে জানে! কুচুমশাইয়ের কথার জবাবে আজ নিন্নাবুড়ি সাহস করে বলেই ফেলল, তা কুচুমশাই মরতে আমারো ইচ্ছে করে না।    

কুচুমশাইয়ের ভুরু কুঁচকে গেল। নিন্নাবুড়ি থেমে থেমে বলল, আজ আমার কামাই হয়েছে প্রায় একশো টাকা। বেঁচে থাকলে কাল বিরিয়ানি খাব। কিন্তু মরে গেলে যে আর বিরিয়ানি খাওয়া হবে না। আর এই একশো টাকাটাই বা কাকে দিয়ে যাব? আমিতো মা গঙ্গায় ডুবে মরবো, কিন্তু এই একশো টাকা তো মরবে না।  খাটনির টাকা তো আর জলে দিতে পারি না। 

কুচুমশাই গলা খাঁকড়ে নিয়ে বললেন, আর কে কে মরতে চাওনা বল।  


নব্বুইয়ের কুচুমশাইয়ের অমাবস্যার রাতে, গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় আরো দু-একশো বছর হেসেখেলে বাঁচা যায়। চাঁদের আলো থাক বা না থাক, বেঁচে থাকাটাই জরুরি।  


ফুলকুমার বলল, কুচুমশাই মরতে আমিও চাই না। আমি জানি, আপনি বলবেন আমার বেঁচে থাকার তো কোনও কারণই নেই। আমার দু হাত নেই, দু পা নেই, বেঁচে থাকার কারণও নেই। তবু আমি বাঁচতে চাই কেন? তা এর উত্তর আমার কাছে নেই। আমিতো চাকা লাগানো পিঁড়িতে বসে ভিক্ষে করি। শ্যামবাজার থেকে জানবাজার সব জায়গায় ঘুরি। দেখি মানুষের আর শেষ নেই। পিলপিল করছে মানুষ। ভিক্ষেও দেয় এরা। এইতো কাল আমার রোজগার হয়েছে দেড়শো টাকা। জমানোর কৌটোয় পঞ্চাশ ফেলেছি, তিরিশে ভাত-ডাল সাপটেছি আর বাকি সত্তরে চাঁদনি থেকে সানগ্লাস কিনেছি। তা সে সানগ্লাস যখন চোখে দিয়েছি নিন্নাবুড়ি বলে কি আমাকে নাকি সলমল সলমন লাগে। আমার বয়েস হবে এই পঁচিশ-তিরিশ, এ বয়সেই মরে যাব?

ঠিক এই সময় কুমুলাল কেশে উঠলো। ফুলকুমার কুমুলালের কাশির অর্থ বুঝতে পেরে বললো, আহা ঠিকাছে ঠিকাছে, বয়েস নাহয় একটু কমিয়ে বলেছি, তা বলে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের বেশি হবে না।

কুমুলাল আবার কাশলো। ফুলকুমার বললো, আচ্ছা বাবা পঞ্চাশ। পঞ্চাশের একদিনও বেশি নয় আমার বয়েস। তা এই বয়সে মরে যাব?  
নুড়িবাবু কুচুমশাইয়ের থেকে সাত-আট বছরের ছোট হবে। বললো, আমার আজকাল রোজগারপাতি খুব কম হচ্ছে।
মিহিদাদা মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, সেতো বুড়ো তোমার স্বভাবের জন্য। ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের গায়ে হাত দাও কেন! বুড়ো হয়েছ, তাও নোলা গেল না।

নুড়িবাবু রেগে যায়। বলে, বেশ করেছি মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছি। কার বাপের কি? আরে ভাই আমি কি তোদের মতো জন্ম ভিখিরি? ছেলে হাওড়া স্টেশনে বসিয়ে রেখে পগাড় পাড়। ভাড়াবাড়িতে ফিরেও গেছিলাম, দেখি বাড়িওয়ালা নতুন ভাড়াটে বসিয়েছে। সে বললো ছেলের ঠিকানা জানে না। আমি বুঝলাম, ছেলে বাপকে তার সংসারে চায় না। সেই থেকে ভিক্ষে করি। তা মাঝে মাঝে মনে হয় ওই বুঝি আমার ছেলের বৌ, ওই বুঝি আমার নাতনি, ওমনি হাত চেপে ধরি। আর তোরা বলিস কিনা আমার স্বভাবের দোষ!   

নুড়িবাবু হাঁফাচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নিন্নাবুড়ির সঙ্গে একটা স্টিলের গ্লাস ছিলো। তাতে করে মা গঙ্গার জল নিয়ে এসে নুড়িবাবুর মাথায় দেয়, শান্ত করতে চেষ্টা করে। নুড়িবাবু হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, তবু আমি মরতে চাই না। মরলে যে আর কোনওদিন ছেলে, বৌমা, নাতনিকে দেখা হবে না।

মিহিদাদা নুড়িবাবুকে রাগিয়ে দিয়ে বেশ লজ্জিত হয়ে আছে। তবু সাহস করে বলে ফেলে, নাহ, আমিও মরতে চাই না। মানছি আমার হাত-পা সব ব্যাঁকা, অনাথ মানুষ, মরলেই আপদ চুকে যায়। কিন্তু তারপর ভাবি মরেই যদি যাব তো এতদিন কষ্ট করে বাঁচলাম কেন? আমিতো জন্ম থেকেই এমন। তা একটু বড় হতে যখন বুঝলাম আমি কোনওদিন ঠিক হব না, তখন মরলাম না কেন? আজ মরলে এতদিন কষ্ট করে বেঁচে থাকাটা মাটি হয়ে যাবে।

তিন ফুট আট ইঞ্চির কুমুলালও বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছের কথা বলেই ফেলল। তার স্থির বিশ্বাস বেশিদিন তাকে ভিক্ষা করে খেতে হবে না, খুব তাড়াতাড়ি সে সাকার্সে একটা কাজ পাবে।    

সবার কথা শুনে কুচুমশাইয়ের মন কেমন কেমন করে উঠল। মনের চোখ দিয়ে তিনি দেখলেন এই গভীর রাতে, গঙ্গার ধারে পরীরা নেমে এসেছে। পরীরা সব ভিখিরিদের চোখে ঘোর তৈরি করে দিচ্ছে, বাঁচার ঘোর। চাঁদের আলোও হয়েছে আরেক শয়তান। সে তার মায়া ছড়িয়ে দুনিয়ার রূপ মেলে ধরছে। হাওড়া ব্রিজের আলো গুনগুন করে জ্বলছে, এপার-ওপার নিস্তব্ধ হয়ে আছে আর তার মাঝে 'পথের ধার ভিখিরি সমিতি'র ছ' জন সদস্যের মন বদলে যাচ্ছে। কিন্তু কুচুমশাই জানেন কাল সূর্য উঠলেই জীবন কত খ্যানখ্যানে হয়ে উঠবে। জীবন তাদের দুয়ো দেবে, মাথা নুইয়ে দেবে, ঘাড় ধরে ঝুঁকিয়ে শহরের রাস্তায় হেঁটে চলা লক্ষ লক্ষ রকমারি জুতোর ধুলো চাটতে বাধ্য করবে। কাল আবার সবার মনে হবে বেঁচে কি লাভ! কুচোমশাই একটু কঠিন স্বরেই বললেন, কাল কিন্তু আমরা সব ভিখিরিরা মিলে ঠিক করেছিলাম সবাই একসঙ্গে মরব, আজই মরব। কি, করিনি?

কেউ কোনও উত্তর দিল না।

কুচুমশাই বললেন, দ্যাখো তোমরা দুর্বল হয়ো না। বেঁচে থেকে আমাদের কোনও লাভ নেই। আমাদের অবস্থা কিছু মাত্র বদলাবে না, ফলে আমাদের মরাই ভালো। চলো আমরা একসঙ্গে এই ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে মা গঙ্গার জলে ঝাঁপ দিই। আমাদের জ্বালা জুড়োক। 
মিহিদাদা ফিসফিস করে বলল, কি করে জানলেন?

কুচুমশাই অবাক হয়েই বললেন, কোনটা কি করে জানলাম?  

এই যে আমাদের জীবন আর বদলাবে না? না, হয়তো ভালো কিছু হবে না, ধরেই নিলাম ভালো কিছু হবে না। কিন্তু খারাপ কিছু তো হতেই পারে। খারাপ কিছু হওয়াটাও তো বদল। সেটা দেখার জন্যও কি বাঁচা যায় না? 

তোমরা ভুল করছ। এই অবস্থা থেকে আরও খারাপ অবস্থায় যাওয়ার কোনও মানে হয় না, মরাই ভালো। 

এদিকে রাত পড়ে এসেছে। দু-একজন প্রাতঃভ্রমণকারী ‘পথের ধার ভিখিরি সমিতি’র গোল জমায়েতের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। নিন্নাবুড়ি বলে, ভোর হব হব করছে। এসময় মরাটা খুব কঠিন। কেউ না কেউ ঠিক বাঁচিয়ে দেবে। একবার বাঁচিয়ে দিলে তখন আর যমও নিতে আসবে না। আমি বলিকি আজ সারা দিন ভিক্ষা করি। ভিক্ষা করতে করতে মন শক্ত করি। রাত হোক, রাতে আমরা ঠিক মরব। কথা যখন দিয়েছি কুচুমশাই মরব তো বটেই।  

নিন্নাবুড়ির প্রস্তাব পাঁচ-এক ভোটে পাস হয়ে যায়। কুচুমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।        

কুচুমশাই স্বরচিত গান ধরেছেন, জীবন আমার আলোয় আঁধার/ না দেখা যায় এপার-ওপার। ‘পথের ধার ভিখিরি সমিতি’র সবাই এ’রাতেও জড়ো হয়ে গান শুনছে। গান শেষ হলেই সবার একসঙ্গে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে মরার কথা। কিন্তু চাঁদের আলো, শহরের মধ্যরাতের নির্জনতা আর জীবনের পরীরা একে একে নেমে মরার ইচ্ছেকে আজও বদলে দিতে থাকে। কথায় কথায় ভোর হয়ে যায়। নিন্নাবুড়ির প্রস্তাব আজও পাঁচ-এক ভোটে পাস হয়ে যায়। মরা আর হয়ে ওঠে না। কুচুমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার জন্মান্ধ চোখকে দুয়ো দিয়ে বলেন, এসব ওই চাঁদের শয়তানি খেলা। আহা কেমন সে চাঁদের আলো, যে মরাকে বাঁচায় বদলে দেয়? আমার আর সে আলো দেখা হল না। ঠিক আছে, সামনে তো অমাবস্যা, দেখি তখন আমাদের মরা আটকায় কোন শালা চাঁদ!    

 

অমাবস্যার রাত। ‘পথের ধার ভিখিরি সমিতি’র সদস্যরা গঙ্গার ধারে বসে আছে। জীবন একই ভাবে চলছে। ভালো-খারাপ কোনও বদল নেই। কুচুমশাই গান গাইছেন, ও আমার জীবনপুরের রাত/ ও আমার দুঃখদিনের ভোর/ ও আমার ছলাৎ ছলাৎ এগিয়ে চলা নদী/ মনের মানুষ মিলতো যদি...। আজ আর চাঁদের আলো নেই। আজ কে বাঁচায় তবে! আজ গানের পরে গান গাইতে থাকে কুচুমশাই, মরার কথা বলে না। বুক ভরে গান গায়। তারা খসছে দু-একটা। খসে যাওয়া তারার জন্য কিছু নক্ষত্র কাঁদছে। একটু আলো দেখা যাচ্ছে, ভোর হয়ে এলো। নিন্নাবুড়ি বলে ওঠে, ওই যা, ভোর হয়ে গেলো যে। ও কুচুমশাই, আজও তো মরা হল না।  

নব্বুইয়ের কুচুমশাইয়ের এই অমাবস্যার চাঁদের রাতে, গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় আরো দু-একশো বছর হেসেখেলে বেঁচে থাকা জরুরি। চাঁদের আলো থাক বা না থাক, বেঁচে থাকাটাই জরুরি।       


                                                                                                  

        
 

Sat 17 Oct 2020 13:51 IST | সায়ন্তনী ভট্টাচার্য