লঙ্কাগড়ের লঙ্কাকান্ড

novela-lankagarer-lanka-kando-Sudhendu-Chakroborty.png

|ধা রা বা হি ক|►পর্ব এক

 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার নাড়াজোল রাজবংশ। সেই রাজবাড়ির রাজবাড়ির পরিখায় তরবারি হাতে পাহাড়া দিতেন স্বয়ং দেবী জয়দুর্গা। জনশ্রুতি  তাঁর অসির জ্যোতিতে অত্যাচারি ইংরেজরা চোখ ঢাকত। বর্গীরাও এই জনপদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না। সেই দেবী জয়দুর্গার অন্তর্ধান রহস্য নিয়েই ভিন্নধর্মী  এই উপন্যাস

|শুদ্বেন্দু চক্রবর্তী|

ঠিক যেন অবশেষে কালো মেঘ কেটে যাচ্ছে।চারিদিকে ক্রমশ একটা নিশ্চিন্ত নিশ্চিন্ত ভাব।আসলে আগের বছরটা রঙ্গীলের প্রায় পুরোটাই ঘরবন্দী কেটেছিল।মাঠে গিয়ে খেলতে যাবার উপায় নেই, স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার উপায় নেই।যা হবে সব ওই ছোট্ট ট্যাবের সামনে।লক্ষণনাথে যাবার সময়ও রঙ্গীলের মনে হয়েছিল চারপাশে যেন আঁটোসাঁটো কড়া অলিখিত কিরফিউ চলছে।টিভি খুললেই খালি অতিমারীর কথা। মোবাইলে কান রাখলেই ভাইরাস আর ভাইরাস। এরই মধ্যে নতুন বছর ভেসে এল খুশির খবর।ভাইরাসকে জব্দ করতে ভ্যাকসিন তৈরি! একরকম নয়। একেবারে চার পাঁচরকম।আরও আনন্দ হচ্ছিল তার এই কথা শুনে যে অবশেষে এইবার স্কুল খুলবে সকলের। প্রথমে দাদা দিদিদের। তারপর আস্তে আস্তে সকলের। রঙ্গীলের এখন ক্লাস ফোর চলছে। কিন্তু ক্লাস ফাইভ হতে আর বেশি দেরী নেই । অনলাইন ক্লাসে প্রায় প্রতিদিনের ছোট ছোট ক্যুইজ খেলার পর স্কুলের দিদিমণি জানালেন এই প্রশ্নোত্তর খেলাগুলোই আসলে বার্ষিক পরীক্ষা ছিল। বোঝো! তা সে কথা এমন চুপিচুপি বললে হয় নাকি! দিদিমণি একথাও বললেন যে আগামী কয়েকদিন পর কয়েকদিনের লম্বা ছুটি। এই সংবাদটিও তো কম আনন্দর নয়। তাই না?


               অবশ্য খুশির সংবাদ আরও আছে বৈকি। ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজারের পাশে রঙ্গীলদের বাড়িটা এখন বেশ গমগম করছে। ছায়ানট রহস্যভেদের পর রঙ্গীলের মাসতুতো বোন তিন্নি আর তার অভিভাবক বুধোমাসি কলকাতাতে তাদের বাড়িতেই থেকে গিয়েছিল কিছুদিন। ঘটনাটির পর রবিন মেসো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। বুধোমাসি স্কলারশিপ পেয়েছে কানাডায়। তাই তাকে ফিরতে হবেই ।কিন্তু তিন্নি নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই আর ফিরবে না ওখানে। তিন্নি ওই দেশে ক্লাস থ্রিতে পড়ত। সেই মতো রঙ্গীলের মা কলকাতার কয়েকটা স্কুলে কথা বলে এসেছে। তার মধ্যে দু তিনটে স্কুলে সাড়া মিলেছে। সেই স্কুলের তালিকায় রঙ্গীলের স্কুলও ছিল।শেষমেশ ঠিক হয়েছে তিন্নি রঙ্গীলের স্কুলেই ভর্তি হবে! এই কদিনে তার সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে রঙ্গীলের। তিন্নি শুধু অসাধারণ ছবিই আঁকে না। তার অসম্ভব ভালো স্মৃতিশক্তি। এই বয়সে সতেরোর নামতা গড়গড় করে বলে দিতে পারে।তার আরেকটা গুণ হলো ক্যারাটের পারদর্শিতা। কানাডায় সে একটা তোজোতে কিয়োকুশিন শিখেছে। তিন্নি অবশ্য ক্যারাটের সঙ্গে চোকস্ল্যাম দিতেও ওস্তাদ। রঙ্গীলদাদার ছায়াসঙ্গী সে।

              রঙ্গীলের আনন্দর আরও কারণও রয়েছে।গতকাল রাতে তার বাবা শতনিক ফিরেছে মিশর থেকে। মিশরের হায়রোগ্লিফিক্স আর ক্রিপ্টোলজি নিয়ে বাবা এতোদিন ভারত সরকারের একটি বিশেষ মিশনে কাজ করছিল। সেই কাজ সমাধা করে কিছুদিন বাবা কলকাতাতেই থাকবে ঠিক হয়েছে।কিন্তু তার বাবার পায়ের তলায় যে সর্ষে।আর সেই সর্ষের টানে তাদের কলকাতায় থাকা আর হচ্ছে কখন? গতকাল রাতে বাপি তাকে দেখিয়েছে মোবাইলে অমূল্যজ্যেঠুর পাঠানো বার্তা।অমূল্যজ্যেঠু আসলে একজন রাজামশাই! না এতে ঘাবড়ে যাবার মোটেই কিছু নেই। তবে একথা শুনে প্রথম, রঙ্গীলও একটু অবাক হয়েছিল বৈকি। বাবাই তখন বুঝিয়ে দিল তাকে।ব্যাপারটা হচ্ছে কি,অমূল্যজ্যেঠু হলেন রঙ্গীলের দাদুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দাদুর নেশা ছিল দাবা খেলার।জ্যেঠু ছিলেন দাদুর সেই খেলার সঙ্গী। কিন্তু তাঁদের মধ্যে বয়সের ফারাক ছিল প্রায় দশ বারো বছরের।মাত্র একবারই রঙ্গীল তাঁকে দেখেছিল ঠাকুমার মৃত্যুর স্মরণসভায়। তখন রঙ্গীল আরেকটু ছোট। অমূল্যনারায়ণ সম্পর্কে তাঁর দাদুর বন্ধু। সেই সূত্রে তিনিও তো রঙ্গীলের 'দাদু'ই। কিন্তু এই 'দাদু' সম্বোধনে তাঁর প্রবল আপত্তি। তাই রঙ্গীলকে সেইবার তিনি ডেকে বোঝালেন আলাদা করে। 'দাদু' নয়।'জ্যেঠু' ডাকলেই তিনি খুশি।সেদিনই রঙ্গীলের মনে হয়েছিল,বয়সে যতোই বড় হোন না কেন,অমূল্যজ্যেঠুর মনের ভিতর একজন ছোট্ট ছেলে ছটফট করছে। কিন্তু এই জ্যেঠুর আসল পরিচয় সে জানতো না এতোদিন।সেকথা তাকে বাপি জানালো গতরাতে।

   

illastration-td-sarkar.png
অলঙ্করণ: দেব সরকার

   ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় বাংলার নাড়াজোল রাজবংশ একটি বিশিষ্ট অধ্যায় লিখে রেখে গেছে।প্রায় সাড়ে ছশো বছরের পুরনো এই রাজবংশ সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে।বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু সেই বাড়ির অন্দরমহলে বসে বিপ্লবের পরিকল্পনা করতেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেবার আগে এই রাজবাড়ির মাঠেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন।এই রাজবাড়ির পরিখায় তরবারি হাতে পাহাড়া দিতেন স্বয়ং দেবী জয়দুর্গা। তাঁর অসির জ্যোতিতে অত্যাচারি ইংরেজরা চোখ ঢাকত। বর্গীরা নাড়াজোল জনপদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না।

— অথচ এতো ঐতিহ্যশালী একটি ইতিকথা কেমন আমরা ভুলে গেলাম বল তো রঙ্গীল।
বাপির কথা রঙ্গীলকে ভাবিয়ে তোলে।সত্যিই তো।সে হঠাৎগঞ্জের ছবিই হোক বা শোণিতপুরের গোপনকথা। কতো সীমিত তাদের জানার পরিধি! শোণিতপুর যে আসলে দক্ষিণেশ্বরের আদিনাম, এ কথা কেইই বা জানতো।মনে মনে সে নাড়াজলের রাজবাড়ির একটা ছবি এঁকে ফেলল।
— তোর অমূল্যজ্যেঠু হলো সেই রাজবাড়ির বর্তমান বড়কুমার।
— কী লিখেছে জ্যেঠু?
— তোকে পড়ে শোনাচ্ছি তবে...

  ‘ স্নেহের শতনিক।কেমন আছো সকলে? আশা করি তুমি ও তোমার পরিবার সুস্থ আছো।তুমি দেশে ফিরছো শুনে খুবই পুলকিত হয়েছি।'বেঙ্গল টাইমস' ইজিপ্টে তোমার গবেষণার কথা বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে লিখেছে।আমি আমার গ্রামে সকলকে তোমাদের কথা বলেছি।তোমার ছেলে রঙ্গীলের কথাও মাঝেমাঝে শুনতে পাই লোকমুখে।লক্ষণনাথে যে মাদলাপঞ্জির পাতা উদ্ধারের চেষ্টা ও করেছিল তা আমাদের এখানে অনেককে খুব আনন্দ দিয়েছে।

   আমার শরীরটা একটু ভেঙে পড়েছে।বিশেষত গতবছর ঝড়ের পর ঘর মেরামতির কাজ চলাকালীন যে ধকল শরীরে পড়েছে, মনে হয়,তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমার শরীরে।আমি সুস্থ থাকতে থাকতে ভাবছিলাম একবার তোমাদের যদি এখানে আনতাম।আমাদের রাজবাড়ির পাশেই আছে লঙ্কাগড়।সেখানে আছে জলহরি।তোমরা এলে তোমাদের শোনাবো অনেক অনেক গল্প। হালদার দীঘির বাবরশাহ রহস্যর কথাও কিন্তু এখানে অনেকে জেনে গিয়েছে।তারাও মনে মনে ক্ষুদে রঙ্গীলকে দেখতে চায়।স্কুল কলেজ খুলে যাবার আগে একবার ঘুরে যেও আমাদের প্রাসাদ।আমি বন্দোবস্ত করে রাখব ।আমার আরো একটি আশঙ্কার কথাও বলব তখন তোমাদের। তবে সেকথা এখন থাক।
         তোমাদের প্রতীক্ষায় রইলাম।

ইতি

অমূল্যজ্যেঠু।’

কী আশ্চর্য ঘটনা।অমূল্যনারায়ণ বাপিরও 'জ্যেঠু ' আবার রঙ্গীলেরও! ঠিক যেমন কল্পকথায় রাজামশাইরা খুঁজে বেড়াতেন আশ্চর্য পুষ্করিণী। সেই পুকুরে ডুব দিলে পাওয়া যাবে অনন্তযৌবন। অমূল্যজ্যেঠুও হয়তো এইভাবেই তাঁর বয়সকে স্তব্ধ করতে চান। তিনি সকলের জ্যেঠু।গল্পদাদুর মতোই সর্বজনীন।
—কী রে।যাবি নাকি?
—যাবো। নিঃশ্চয় যাবো।

কখন তাদের কথোপকথনে মাঝে নিঃশব্দে চলে এসেছে মাম আর তিন্নি।তারাও একসঙ্গে সুর ধরে হেঁকে উঠলো।
— বেশ তো?আমরা বুঝি বাদ? আমরাও যাবো।
সকলের উৎসাহের নতুন সঞ্জীবনী পেয়ে বাপি লিখে দিল অমূল্যজ্যেঠুকে।এই সপ্তাহান্তেই তারা কয়েকদিনের জন্য যাবে লঙ্কাগড়ে।বড় গাড়ি করে।

রাতে রঙ্গীল বীর হাম্বিরের স্বপ্ন দেখলো।এই গল্প সে শুনেছে মায়ের মুখে।অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "রাজকাহিনী" পড়ে শোনাতেন তার মাম।রঙ্গীল দেখলো পাঁচশো রাজপুত সৈন্য নিয়ে কৈলোরের কেল্লা থেকে চিতোরের পথে রওনা দিচ্ছেন বীর হাম্বির।তার পরণে সোনার সাঁজোয়া, হাতে খোলা তরবারি।তাঁর ঔজ্জ্বল্যে চিতোরের শূন্য সিংহাসন ঝলমল করে উঠছে।প্রাসাদের বাইরে তার আবাহনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন গড়পতি মালদেব।আর পদ্মফুল বরমাল্য হাতে সখীসমাবেশে ভিতরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন কমলকুমারী।হঠাৎ হাম্বিরের পাগড়ি থেকে কুঁচো ফুলের পর্দা সরে যেতেই রঙ্গীল চমকে উঠলো।একি! তার স্বপ্নে এ তো হাম্বির নয়।হাম্বিরের পোশাকে এ যে অমূল্যজ্যেঠু! নাড়াজোল রাজবাড়ির বড়কুমার অমূল্যনারায়ণ খান।

ক্রমশ...

Sat 20 Feb 2021 12:21 IST | শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী