ধারাবাহিক:বোবাযুদ্ধ ♦পঞ্চম পর্ব♦

bobajuddha-5-deb-sarkar.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার

অন্যরকম উপন্যাস►


এই সময়ের দুর্নীতি আর বিভ্রান্তির সামাজিকতা নিয়ে আরেক ধরনের বৃত্তান্ত। সমাজকে, সমাজের অন্তরের টানাপোড়েনকে ভিন্ন চোখে খতিয়ে দেখলেন তেজস্বী, সংশয়হীন লেখক বনানী দাস।


♦পঞ্চম পর্ব♦


|১৬|


এটা রাইটার্স বিল্ডিং। প্রবেশ করার মুখে তার অফিসার-সূচক লালকার্ডটির ব্যবহার হঠাৎ রানিকে কিঞ্চিত আত্মসমীহে ব্যস্ত করে। নয়ত এই বিপুল নিরাপত্তায় কন্ঠকিত স্থানটিতে প্রবেশ করা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে কতটা কষ্টকর তা বোঝা শক্ত নয়। সকাল থেকে বসে থেকেও শেষদুপুরে জানা যায় মন্ত্রীমশাই দূরবর্তী কোন শহরে ব্যস্ত, কখন ফিরবেন ঠিক নেই। বড় বড় সময়ের ঢেউ-এর নাম অপেক্ষা। জেলা অফিসের বস সাধনবাবুর অনুরোধ মতো রাণীর চিঠিটাকে মন্ত্রীর কাছে পাঠাতে আপত্তি করেন নি।  সেটুকু সম্বল করে এই বড়বাড়ি পর্যন্ত এসেও রাণী অনিশ্চিয়তার কুয়াশা দেখে। এখানে আসার আগে কলকাতায় তার অফিসের বন্ধুরা পার্টিলাইনে তমুক নেতার সঙ্গে দেখা করবার কিংবা ওই চেয়ারম্যানের দলবলের সঙ্গে মিলিজুলি করে নেবার পরামর্শ দেয়। সেসব কানে নিয়েই রাইটার্সের এই অলিন্দে ব্যাগ থেকে কেক বের করে মুখে দিতে দিতে শূন্য মনে অপেক্ষা করে যায় মেয়ে আধিকারিকটি। সন্ধ্যার মুখে মুখে মন্ত্রীমশাই -এর একান্ত সচিব যেতে বলেন তাকে। পুরো রাইটার্স বিল্ডিংটিই নাকি রাইটার্স অর্থাৎ দলিল লেখকদের জন্য তৈরি, তাই ঘরগুলো কোনটাই খুব প্রশস্ত নয়! তবে রাণীর দপ্তরের মন্ত্রীর ঘরটি বড়োই বলা যায়। বড় কার্পেট, বড় ঘোরানো টেবিলের ওপাশে নেহাতই খোশমেজাজে বসে থাকা ব্যক্তিটি পূর্ব পরিচিতির সূত্র ধরেই রানিকে বেশ একটু অতিরিক্ত গুরুত্বই প্রদর্শন করেন। এমন কি রাণীর বসবাসের শহরের চমচমের খবরাখবরও নেন সহাস্যে। নারী আধিকারিকটি এবার গুছনো বাক্যবন্ধে তার কর্মস্থলের সমস্যাগুলি বলে যায়। মন্ত্রীমশাই শোনেন এবং লিখিত রিপোর্টে চোখ বোলান।

একবাক্যে স্বীকার করেন সংস্থার পরিচালকদের কাজকর্ম নিন্দনীয় এবং রাণীর কর্মপদ্ধতি ঠিকঠাকই আছে। রাণী কানাঘুষো শুনেছিল সাক্ষীর কোন সূক্ষ্ণপথে মন্ত্রীজীর সঙ্গে একটি বাঁধন আছে, তাই সে কোনরকম ব্যক্তি সমালোচনা বাদ দিয়ে শুধু অপকর্মগুলিকে বলে যায়। মনে হয় কোন বড়সর ত্রুটি তার হয়নি, তথ্য পরিবেশনে। কারণ ঘটনার প্রতিবিধান করতে 'ঠিক আছে দেখছি' শব্দ গুলি মন্ত্রীমহোদয় বেশ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই বলে ওঠেন।

রাইটার্সের অলিন্দে সম্ভবত  ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়  ছাড়া আর কোন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আবক্ষ মূর্তি নেই। রাণী তার পূর্ব অভিজ্ঞতার মাঝে একটু হোঁচট খায় প্রতিবারই যখন তার চোখে সাদা ফলকে জ্বলে ওঠে সেই বি বা দী তিন যুবকের নাম, যারা মূলত: রাণীর মতো কৃপাপ্রার্থনা করতে নয় কৃপাকারকদের হত্যা করে ধ্বংস করতে চেয়েছিল একটি ক্ষয়রোগী ব্যবস্থা। তারপর ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মেনেই নিতে হয়েছে সেই ব্যবস্থা, সেই ক্ষয়রোগ, একটু অন্যভাবে, এই দেশের মানুষকে।

এসবই রাণী ভাবতে থাকে ফিরে আসতে আসতে একা একা। ভুতুড়ে লোকাল ট্রেনে সন্ধ্যা উজিয়ে যাওয়া সেই প্রত্যাবর্তন।

* * *

আরও একসপ্তাহ কেটে যায়। চারুবাবুর ফাইল যথাস্থানে থাকে। তার বরফ-নিষ্ক্রিয়তা এক রদ্দায় ভেঙে দেবার জন্য ছোকরা বস কিচ্ছু করেন না।  নিজের অফিসের দরজা বন্ধ থাকে, সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ রাণীর। রোজ রোজ জেলা অফিসে আসতে এবং হাজিরা দিতে হয়। সুদর্শন ইস্যু ক্লার্ক শুভ্রাংশুকে বেশ বিরক্ত মনে হয় এই হাজিরা নেওয়ার ভারী কাজটির জন্য। চারুবাবুকে বেশ নিশ্চিন্ত ও ফুরফুরে লাগে। স্নিগ্ধাকে দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় নিজেকে সে গুটিয়ে রেখেছে এই সব কিছু থেকে। নয়নদা এই অফিসের, কলকাতা অফিসের,  এবং মন্ত্রীমশাই -এর 'আঠারো মাসে বছরের' নানান গল্প শোনায়। একদিনের গল্পটি বড় 'আমোদদানকারী'। চারুবাবুর সঙ্গে অনেকক্ষণ গুজগুজ ফুসফুস অন্তে হঠাৎ নাকি সাক্ষীগোপাল ঘরের মাঝে উঠে দাঁড়ায় এবং কোমর বেঁকিয়ে বিচিত্র নাচ দেখাতে দেখাতে বলতে থাকে— এমন অফিসার দিয়েছেন আমাদের, তিনি তো আবার নাচনেওয়ালী, নাটক করনেওয়ালী... হি হি হি হি।

এই গল্পে নারী আধিকারিকটি কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কারণ যদি তার প্রতিক্রিয়াতে এই কদর্য বিষয়টি সম্বন্ধে কোন বিলাপ, অনুযোগ, অভিযোগ বা খেদ এসে যায়। এর কোনটাই সে চায় না। তার শুধু আবছা মনে হয় স্নিগ্ধা যেমন এই দৃশ্যে অসম্ভব ক্ষুদ্ধ হয়েছে, অফিসের কারও কারও কি এই মিমিক্রি বা নকলকারীতে হাসি পেয়েছিল চারুবাবুর মতো! তার এও মনে হয় অফিসে কেউ কি আছেন যার মনে হয়েছিল যে ব্যক্তিগত জীবনে, নাচনেওয়ালী ও গানওয়ালী হলেও একজন মানুষের ন্যায্য কাজকর্মের অগাধ ভুবনটি একটুও কম হয় না!

পরপর তিনদিন অফিসের কারো দিকেই তাকাতে পর্যন্ত ইচ্ছে না করার পর নারী আধিকারিকটি তুচ্ছ প্রশ্ন করে বসে গম্ভীর মুখে কাজ করে চলা সাধনবাবুকে, আমার কি করার আছে সাধনাদা!
—কিচ্ছু না! এখন শুধু চুপচাপ দেখে যাও। ঘা টা ঠিক জায়গায় পড়েছে। ওরা দুর্বল বলেই এত ঘৃণ্য ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে চাইছে। তুমি গায়েই মাখবে না। তাহলে তোমার নীতিবোধকেই অপমান করা হবে। বুঝেছ!

—হ্যাঁ দাদা। আপনাকে এক লাইন গান শোনাবো!
পরম আগ্রহে বাড়িয়ে দেওয়া সাধনদার অন্তঃকরনে এবার গান ঢেলে দেয় রাণী,
ঘরের পাশে আরশি নগর
সেথায় একজন পড়শি বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে ।।
—তোমার রবীন্দ্রগানের প্রবণতা কিন্তু বাউলেও প্রভাব ফেলেছে।
—আপনার কথা মনে রাখব।

|১৭|


পুতানের জন্মদিন পুতান বোঝেনা অথচ দূর গ্রাম থেকে আসা তার দিদান ও ঠাকুমা কি যে হুল্লোড় তৈরী করেন তা আশ্চর্য্য। এর মাঝে মুকুল ও রাণীর চাপা বিষন্নতা শঙ্কার বাজার প্রায় উবে যায়। কেক না পায়েস এই দ্বন্দ যখন পুতানের মাথার দুধগন্ধ ছাপিয়ে বাড়িকে মাতিয়ে তোলে তখন যথার্থ্যই যেন স্বর্গ নেমে আসে। দরজার টোকা খুলে, দেখা যায় নগেন ও শঙ্কর দাঁড়িয়ে। 
আপনার নামে হাইকোর্টের শমন আছে ম্যাডাম!

নগেনের চিকিৎসাসংক্রান্ত গলা উচ্চারণ করে। আগত সন্ধ্যার মুখে  অশুভ মেঘ এই জন্মদিনের বাড়িটিকে  যেন গিলে নেয়। কিছুই হয়নি মুখ করে নারী আধিকারিকটি দুই কর্মীকে ড্রয়িংরুমের ভেতরে এনে বসায়। তারপর দরজা বন্ধ করে শুরু হয় বন্ধু, পরিচিত মহলে ফোনাফুনি। যদি কেউ একটু সুপরামর্শ দেন এই শমন নামক উৎপীড়নটিকে কিভাবে  গ্রহণ করা উচিত সেই বিষয়ে। এটি কি নিয়ে নেওয়া উচিত নাকি ফিরিয়ে দেওয়া! কোর্ট সম্বন্ধে আবল্যভীতি সত্বেও প্রায় আধঘন্টা ধরে বন্ধুদের, হিতাকাঙ্খীদের কথাবার্তা শুনে দরজাখুলে বারান্দাস্থ লোকদের সামনে আসে রাণী। পিছনে মুকুল, বড় প্রচ্ছন্ন ও সবল পশ্চাৎপটের মতো, ততক্ষণে সেখানে পুতান পৌঁছে গেছে। চালাচালি হচ্ছে নিম্নোক্ত সংলাপ।

— আমার মা-কে দরজা বন্ধ করে দিয়েছ কেন? তোমাদের মারব!
— না না বাবু! আমরা কিছু করিনি!
— করেছ! তোমরা দুষ্টু! তোমাদের আমি তলোয়ার দিয়ে কেটে দেব!
রাণী এসে যাওয়ায় নগেন বলে,
— ম্যাডাম দেখেছেন এই শিশুর মনেও কী হয়েছে!
— আপনারা ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। সুবালাদি পুতানকে নিয়ে যাও। দিন আমাকে শমন। কোথায় সই করতে হবে বলুন!

* * *


রাণী ম্যাডামের অফিসে জমি নিয়ে ঝামেলা, তার থেকে তালাবন্ধ এবং তার থেকে হাইকোর্টের কেস হয়েছে— এই খবরে জেলা অফিস  ম ম করে। অথচ গোদা চল্লিশ পাতার শমনটি ধৈর্য্য ধরে পড়ে ফেললে রাণী। দেখে ওতে জমি বা গুদাম নিয়ে বিরোধ বিষয়ে একটি কথাও নেই। উল্টে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কৃত কর্মীদের সঙ্গে  যোগসাজস, বর্তমান কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সংস্থার অশুভ চিন্তায় তথ্য প্রমাণাদি লোপ ইত্যাদি অলীক ও অবাস্তব বিষয় পাতার পর পাতা লেখা আছে। অর্থাৎ যারা ন্যায়কে দুপায়ে মাড়িয়ে গেল তারাই হাইকোর্টে তার বিরুদ্ধে অবান্তর মমালা করল। আশ্চর্য্য ব্যাপার। চাকরীসূত্রেই অবশ্য তার বস এবং কোলকাতা অফিসের প্রধানও এই মামলায় অভিযুক্ত।
যাইহোক, মোটাসোটা শমন হাতে নারী আধিকারিকটি কলকাতা অফিসে পৌঁছে যায়। দেখা করে আইনের সর্ব্বোচ্চ পদাধিকারী হংসনারায়ণ বাবুর সঙ্গে। আশ্বস্ত করার মতো একটি হাসি দিয়ে তিনি চেয়ারে বসান রাণীকে।

— তোমার কেসটাতে মারুতি ভট্টচার্যকে দেওয়া হয়েছে সরকারী উকিল। তুমি তিন নম্বর বার লাইব্রেরীতে ওঁকে পেয়ে যাবে।
— বার লাইব্রেরী কোথায়! আমি চিনিনা স্যর!
—বার লাইব্রেরী, হাইকোর্টের সিঁড়ি, মুহুরি, কোর্টরুম, মমালার লিস্ট সব চিনে যাবে। আগে হাইকোর্টে যাবার শুঁড়িপথটা তো চেন! আরে মারুতিবাবু! আপনার কথাই হচ্ছিল! এই আপনার নতুন কেসের ক্লায়েন্ট। জেলা থেকে আসছে, রাণী...

মারুতি ভট্টচার্যের সুগোঁফ, সুশ্রী মুখ। চোখদুটি, ভ্র ও নিরাপত্তাহীন। প্রথম সাক্ষাতেই রাণী তার দৃষ্টিতে শতাব্দীর পিসিমাদের দেখে। যারা একটু তেরিবেরি করা বৌমাদের দৃষ্টির কশাঘাতে ভৎসৃত করতেন! তার আন্দাজ সঠিক প্রমাণ করে মারুতি বাবু বলে উঠেন,

—ও আপনিই! সত্যি আপনারা বাঁধাবেন গণ্ডেগাল আর আমরা খেটে মরব! আরে বাবা অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন চালাতে গেলে কি অতো আবেগপ্রবণ হলে চলে! জিততে পারবেন না! কিছুতেই জিততে পারবেন না! যা সব অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে...
—সবগুলোই মিথ্যে অভিযোগ!
—কি বললেন! মিথ্যে! এই যে হাইকোর্টটা দেখছেন এখানে প্রায় সবই মিথ্যে —সত্যি কিছু নেই— আমিও মিথ্যে— খোলাখুলিই বলছি—আপনিও—
— আমি মিথ্যে নই।
—কি বললেন! আপনি মিথ্যে নন! কোন না কোন ধান্দা ছাড়া কেউ চলে আজকাল! আরে বাবা আপনি তো আর হেভেন থেকে নেমে আসেন নি!
—আমাদের কেসটা কাইন্ডলি দেখবেন!
—আমি আমার বিদ্যে অনুযায়ী লড়ব, ঠিক আছে তো! এবার চলি! আসি স্যর! ১৩০ নম্বর কেসের রিটটা পাঠিয়ে দেবেন।
মারুতিবাবু চলে যাবার পর রাণী থম ধরে খানিকক্ষণ বসে। হংস নারায়ণ বাবু বলেন,
—সরকারী উকিলের কথায় কিছু মনে কোর না। ওরা কমপ্লিকেটেড হয়, তুমি আর দেরি কোর না! ট্রেন ধরতে হবে না!
হংসনারায়ণ বাবুকে এত করিৎকর্মা লোকজন, ফাইল, উকিলের মাঝে এত শুভ্র ও স্বচ্ছ মনে হচ্ছে কেন! এত আইনের ক্লেদের মাঝে উনি পদ্মফুলের মত স্নাতচোখে তাকিয়ে আছেন! 'কিছুতেই বিশ্বাস কোর না' ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে। রাণীর 'আসি স্যর' বলে দরজাটা খুঁজতেও যেন অসুবিধে হয়।
—শোনো
—পিছন ফিরে রাণী দেখে হংসনারায়ণবাবুর চোখে নিশ্চিন্ততার বাসা বাঁধা।
—বলুন স্যর!
—তোমার হয়ে সুকৃতি হালদার  লড়তে রাজী হয়েছেন।
—মানে! উনি কে!
—আমাদের দপ্তরের প্রাক্তন উচ্চপদস্থ অফিসার। এখন হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। খবরের কাগজে তোমার ওপরে পরিচালকদের দুর্ব্যাবহারের খবর পড়ে উনি তোমার হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছেন।
—কিন্তু ওর ফি'স !
—উনি কিছু নেবেন না। এই মমালাটা নৈতিকতার জন্য লড়বেন। খুব শ্রদ্ধাভাজন উকিল সুকৃতিবাবু, শ্রদ্ধেয় মানুষও।

|১৮|


নিউ সেক্রেটারিয়েট  বিল্ডিং-এর করিডোর ধরে হেঁটে যায় মহিলা আধিকারিকটি। দুপাশে থিকথিকে করনিক সমাজ। তার মাঝে মাঝে প্রাইউডের বাক্সে সাজান উচ্চপদের আধিকারিকগণ। এখানে কেউ স্বার্থ ছাড়া আসা যাওয়া করে না। জীবনের স্বার্থ আর  নীতির স্বার্থ  দুই কি আলাদা, অনিবার্যভাবেই আলাদা! যদি কখনো দুই  সূচীমুখ মিলে যায়! তখন এই করিডোরের মানে আলাদা। রাণী জানে সুকৃতি হালদারও নিশ্চই জানেন!

রাণী এখন হংসনারায়ণবাবুর কথায় এক নম্বর কোর্টে সুকৃতি হালদারকে খুঁজতে বেরিয়েছে হাইকোর্টে। সব কোর্টের মধ্যে এই কোর্টটিই সবচেয়ে বড়। এখানে দুজন বিচারপতি বর্ণাঢ্য আসন এবং দেওয়াল জোড়া ব্রিটিশ আমলের বিলিফের কাজ। তার উগ্র রাজকীয় রং এবং অভিজাত অভিঘাত দর্শনার্থী মাত্রকেই থমকে দেয়। এখন বিচারকেরা কেউ নেই। বিচারকদের সামনের ধাপের মুহুরী, লেখক পার হয়ে সার সার বসে আছেন উকিলবাবুরা। সকলেই চুপ এবং মূদু আলাপী।  এক অসাধারণ সম্ভ্রম ও নীরবতার মধ্যে চেয়ারাসীন তাঁরা। কিভাবে সুকৃতি হালদারকে খুঁজে বার করবে রাণী এদের মধ্যে। তার চোখ পর পর পরখ করে যায় কালো কোটেদের। প্রথম সারির তূতীয় জায়গায় বসে যে প্রৌঢ় তার গোলাপের মত গাত্রবর্ণ, তীক্ষ্ণ নাক, সূচালো ঠোঁট এবং শীর্ণ কাঠামো। কি ঋজু তার বসে থাকবার মেদহীন ভঙ্গী। রাণী এগিয়ে যায়।

bobajuddha-4D_deb-sarkar.png
দেব সরকার

—নমস্কার! আমি অ্যাডভোকেট সুকৃতি হালদারকে খুঁজছি।
—বলুন, আমিই সুকৃতি হালদার! রাণী অবাক হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। একেবারে সঠিক মানুষটির সামনেই সে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে।
—আমি রাণী। জেলা থেকে আসছি... স্যর আমি শুনেছি আপনি আমার হয়ে অর্থাৎ সরকারের হয়ে দাঁড়াতে রাজি হয়েছেন... কি বলে আপনাকে ...
It will be my pleasure!

 

|১৯|

সাদার মধ্যে ফুলফুল সালোয়ার কামিজ পরা ঐ যে মধ্যবয়াসিনী নারীটি, সাধারণের মধ্যে একটু আলগা শ্রী আছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে হাইকোর্টের  অলিন্দে, ওই রাণী, জীবনে জন্মান্তরে কোনদিন হাইকোর্টের সিঁড়ি বেয়ে তাকে অভিযুক্তের ভূমিকায় উঠতে হবে-ভাবেনি। তবু লঞ্চঘাট ঠোট হাঁটাপথ পেরিয়ে যত সে হাইকোর্টের দিকে এগোতে থাকে সুদর্শন ও সুদর্শিনী কালো কোর্টের নারী পুরুষেরা ভিড় বাড়তে থাকে। বিখ্যাত সিঁড়ির মাঝপথে রাখা বিখ্যাত মানুষের মূর্তি। উনি কে, কিভাবে কৃতি কিচ্ছু জানে না রাণী। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই দোতলায় বূহৎ গ্লোসাইনবোর্ডে কোর্টের নম্বর ও কেস নম্বর দৃশ্যমান।

কখনো এক একটি কালো কোর্টের দল। মধ্যে রাজকীয় মধ্যমণি কালো। আশপাশে সন্দেশের মতো মিষ্টি চেহারার নারী-কালোকোট বা টুকটুকে তরুণ-কালো। কী জ্যোর্তিময় এই বাহিনী। এদের আশেপাশে গাঁয়ের উৎপীড়িত, মফস্বলের ধান্দাবাজ বা ভগ্ন পরিবারের বধূ ঘুরঘুর করে বড় দীনতায়। মূলত: এ কোর্টের সমস্ত সওয়াল জবাবই এখনও বিশুদ্ধ ইংরেজিতে হয়, এরাজ্যের সংখ্যা গরিষ্ঠ আধিবাসী এসব অলীক কথোপকথন বোঝেনা। নিজের ঠাঁই -এ তাড়া খাওয়া মানুষ এই ভুঁই-এ এসেও ধমক খেতে থাকেন রাশভারী উকিলবাবু। যাকে আড়ালে অর্থকুমীর আখ্যা দিলেও সামনে কিছু বলার সাহস নেই একদম।

পরপর অনেকগুলি বার লাইবেরি। সেখানে গিজগিজ করছে আইন-কুশলীগণ। বার-লাইব্রেরির বাইরে পাতা সারি সারি কাঠের টেবিল ও সংলগ্ন চেয়ার, তাতে থাকেন মুহুরী বা অ্যাসিট্যন্ট নাম্নি ডালপালা মানুষজন। ভিতরের উকিলবাবুদের ক্লায়েন্টদের লম্বা চওড়া কথা বলে, আতঙ্কিত করে। সাহায্য করে, কখনো প্রতাড়িত করে, চলে এদের টালমাটাল রোজগারের নসীব। আছে সুস্থ বেতন কাঠামোর সুদেহী সিকিওরিটিগন। হাইকোর্টের নিজস্ব পোষাক ও বেল্টপরা বৃদ্ধ  ও নুব্ধ এরা বিশেষ পদক্ষেপ এসে বৃহৎ চেয়ারটি নড়ালেই বিচারক বসে পড়বেন বিচারে, কিংবা সাধারণ লোকটি হয়ে উঠবেন বিচারক। এইসব আদি, যুগপ্রাচীন রীতিনীতির মাঝে গড়িয়ে চলে হাইকোর্টের খিলান গম্বুজ-জীবন।

বারান্দার ধার ঘেষে ঘেষে বসে আছে উকিলদের ব্যবহৃত  বো, টাই-এর দোকান। সেইসব ছেড়ে দিলেও হাইকোর্টে প্রধান দর্শনীয় যথারীতি নারী-উকিল। সাদা বা সাদাটে সালোয়ার, শাড়ি বা প্যান্ট শার্টের ওপর কোট গাউন তাদের পোষাক। সমাজের অন্য অংশের মতোই, নারীরা এখানে কান্ড নয়, শাখা প্রশাখা মাত্র, রাণী জানে। তার জেলাতে জাঁদরেল সরকারী উকিলের পাশে বসে একজন্ম কাটিয়ে দিলেন সুসজ্জিতা, রুচিশীলা  শীলা-উকিল। অসুরের মতো চেহারার সিনিয়রকে মাঝে মাঝে প্রক্সি দেওয়া ছাড়া তাকে সওয়াল করতে কখনো দেখেনি কেউ। কিন্তু শোনা যায় প্রতিটি কেসে তার প্রাপ্য অর্থ তার অ্যাকাউন্টে চলে যায়। এইধরণের সম্মানদানের অসম্মান মেয়েরা অনেক সময়েই বোঝেন না। যেন অন্য উকিলদের মতো তেড়েমেড়ে সওয়াল জবাব করতে গেলে শীলা দিদিমণির গ্ল্যামার একেবারেই কমে যেত। এমত ভ্রান্তিকে সম্ভবতঃ পারিপার্শ্বিক এবং শীলাও ভোগেন।
এখানেও জুনিয়র হয়ে সিনিয়রের পাশে দশক কাটিয়ে দেন অনেক মেয়ে উকিল। কিন্তু রাণীর চোখ ফুটে ওঠে যখন তাকে দেখায় অন্য সত্য। ঐ যে ভূশন্ডি কালো জাঁকালো মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন করিডোর ধরে, উনি ইউ.পি-র সোমদত্তা মিশ্র। একবার তার ,সওয়াল শুনে, ইংরেজীতে সূচালো যুক্তি শুনে, শ্রদ্ধায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল সে। অথবা ঝকঝকে ফর্সা মৈথিলী মিত্রর মূদু সবল কন্ঠ! যা থামিয়ে দেয় এজলাসের পুরুষ উকিলের জবরদখলকারী গলা। সিনিয়রের অতিরিক্ত গায়ে পড়া স্বভাবকে লাথি মেরে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়া পূবালি ভট্টাচার্যরাও আছেন। তবে এটা সত্যি একটা শক্তপোক্ত জায়গা খুঁজে নিতে মেয়েদের অতিক্রম করতে হয় অনেকটা অতিরিক্ত পথ। যেহেতু মহিলাদের আইনি কূটকচালের সমাধান দক্ষতা নিয়ে আজও সন্দেহের অন্ত নেই।

—সে কি! মেয়েছেলে উকিল ! ওতো জজের ধমকে কেঁদেই...
এইসব বলার লোক কম নেই। তবে সচরাচর দুই মেয়ে উকিলে মর্যাদাপূর্ণ বন্ধুত্ব  দেখেছে রাণী। আর দেখেছে সমকামী দুই মেয়ে উকিলের নির্ভরতা, একান্ততা। দেখলে সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার।

একরকম সিনেমা দেখার মজায় রাণী হাইকোর্ট দেখে, বাঙাল না হয়েও। সে জানে ক্ষমতাবানের স্বার্থে আঘাত লাগলে সে এইক্ষেত্রে লড়াই শুরু করে ক্ষমতাহীন প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে। বিচারালয়ের খোলা হাটখোলা দোকানে টাকার বিনিময়ে যে কোন কেস ফাইল করা তাদের কাছে খেলনাপাতি। তারপর নানান কৌশলে সুদীর্ঘ সময় চলতে থাকে বিচার পর্ব। ইতিমধ্যে হেনস্তা ও আর্থিক চাপে হাওয়া কমে আসে প্রতিবাদীর। অর্থ অনর্থের নানান কারসাজিতে পুরো ব্যাপারটিকে দখলে আনে ক্ষমতাবান। একসময় রায় বের হয়, যখন রায়ের কোনও যৌক্তিকতা নেই। আদালতের বাইরেই সময়ের শাস্তি পাওয়া হয়ে গেছে প্রতিবাদীর।

এসব জানা তার । অর্থ বা রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান লোকেদের বিরুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা শূন্য জেনেও রানীর জীবনের কাছে বড় কৃতজ্ঞ লাগে মাঝে মাঝে। তার চোখের সামনে এই নাট্যশালা খুলে ধরার জন্য।  ভোরে পুতানকে ছেড়ে প্রেসার কুকারে আলুসেদ্ধ ভাত বসানো, সেগুলোকে গলাধঃকরণ করে কাগজপত্রের ভারী ব্যাগ সহ রিকশো যাত্রা। অর্থের অভাব, মুকুলের ধার করে আনা টাকা, বিপন্নতা, সব থাকে, শুধু বিভ্রান্তি থাকে না বলেই মেয়ে আধিকারিক রাণী মেহগানি গাছের মত সোজা থাকে। এক বিচিত্র প্রসন্নতা তাকে ভর করে, যা হার জিতের অনেক ওপরে। সেখানে সততার মধ্যে তার চিরজিত লেখা আছে জলের রঙে।

|২০|

সপ্তাহে অন্ততঃ দুদিন হাইকোর্ট এবং অবশিষ্ট দিনগুলি জেলা অফিসে হাজিরা দিতে হয় রাণীকে। হাজিরা খাতায় তার নাম না থাকায় রোজই সুন্দরপানা শুভ্রাংশুর কাছে লিখিত চিঠি দিতে হয়, 
রোজ রোজ এই আপনার অ্যাটেনডেন্স জমা নেওয়া, রিয়েলি...
—খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি তোমার!
—না তা নয় তবে---একটা কিছু করুন ---এর শেষ তো করতে হবে—
—শেষটা তো আমার হাতে নেই ভাই, ওটা বিচার ব্যবস্থার হাতে...
—হ্যাঁ হাইকোর্টের চক্কর তো! কবে যে আপনি মুক্তি পাবেন! আদৌ পাবেন কিনা!
—তোমার দুশ্চিন্তা দেখে ভাল লাগল ভাই!
পাশ থেকে বড় বাবুর খোঁচা শোনা যায়।
—ম্যাডাম, হাতি কাদায় পড়লে ব্যাঙেও...হাঃ হাঃ হাঃ
—আমাকে হাতি বলছেন! বাঃ খুব ভাল লাগল। শুভ্রাংশু কিন্তু ব্যাঙ হলেও ওর মাথায় মস্ত ছাতি আছে। কর্মচারী ইউনিয়নের ছাতি। আমার ডাক জঙ্গলের গভীরে মিলিয়ে যায়, ওর ডাক শোনা যায় ঘ্যাঙর ঘ্যাং ঘ্যাঙর ঘ্যাং। কি বুঝলেন বড়বাবু কে জানে! তবে উনি এবং শুভ্রাংশ খুব কিছুক্ষণ হাসলেন। যদিও নিজেকে এইসব চাল দেওয়া নেওয়ার একজন ভাবতে রাণীর ঘেন্না হয় তবু আজকাল তার এইসব মশকরা করনেওয়ালাদের শুধু মুখে ছেড়ে দিতে আর ইচ্ছে করে না। দুরন্ত একটা জুলুম যেন বিশাল পাখা মেলে ঢেকে আছে পারিপার্শ্বিক।  মুখে হাসি আর বুকে তেতো নিয়ে ফিরে আসে সে বাড়িতে। অফিসে একরকম অনুক্ত গুনগুন চলতেই থাকে। সততা বা ন্যায়ের জন্য সে এই দুর্গতী সয়ে চলেছে, এ কথা নয়, চালু হয়েছে এসব তার নির্বুদ্ধিতার ফলাফল।
শহরেও ছড়ানো জিজ্ঞাসাচিহ্ন। লোকেদের সংশয় রোজ রোজ বেড়ে যায়। সাধারণ, সুশীলা চেহারার এই মহিলাটি কি প্রকৃত সরলা! তার সম্বন্ধে গুজ্ঞনের শেষ নেই। আসলে সাক্ষীর সঙ্গী সাথীদের তরফে অপপ্রচারের কোন শেষ নেই তো! এর কতটা নকল কতটাই বা খাঁটি বিশুদ্ধ জনগন নামক বৃহৎ ডায়ানোসোরসের তো জানবার উপায় নেই। সে শুধু সামনে যা পায় ঘাস পাতা চিবিয়ে ফেলে। রাণীর মনে হয় এক সুমহান ভ্রান্তির বৃত্তে তাকে শুধু আরো আরো ঢেকে ফেলা হচ্ছে। এর মাঝেও সে কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে সুবালাদির পরিচর্যার ওপর। পুতানকে দেখাশোনা তো বটেই চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া তার মত ব্যর্থ গৃহকর্ত্রীকে সে ভাত, জলখাবার  জুগিয়ে যায় সময়মতো, অসময়ে রাণীর তিরিক্ষি মেজাজকে পরোয়া করে এবং আরও অনেক কিছু।
তারপর  রাণীর  কৃতজ্ঞতা পেয়ে যান এই শহরের কিছু মানুষ। যারা  এক সন্ধ্যেতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন।  মুকুল চিনিয়ে দেয়। 
ইতি পঞ্চানন সেনাপতি। প্রবীন সাংবাদিক। সাক্ষীগোপাল, শান্তদের সঙ্গে একই দল করেন। সেসব তোয়াক্কা  না করে  প্রচন্ড  ক্ষুদ্ধ উনি ওদের  অনেক বছরের দুর্নীতীর বিরুদ্ধে। তুমি ওদের মেনে নাওনি, তার জন্য তোমায় ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন।
-এ সুহাস। রাজনীতি নেই ওর। লোকনীতি আছে।  প্রচুর খবরাখবর রাখে।  হাইস্কুলে  পড়ায়।  ও তোমার সমর্থক হয়ে গেছে। 
জয়প্রসন্ন সরকার। প্রাইমারী টিচার। বহু মানুষের ঋন আছে এঁর কাছে। লোকের ভাল করার এক তাড়নায় ভোগেন ইনি। সঙ্গে অনেক সংগঠনের মাথা। জয়প্রসন্ন বাবু আমাদের বড্ড স্নেহ করেন। তুমি হয়ত জাননা আমাদের পারিবারিক অনেক সমস্যাতেই এই দাদার সঙ্গে কথা বলি আমি। ইনি আজ তোমাকে সাহস দিতে এসেছেন।

একরাশ সুগন্ধের মতো এই মানুষদের আশ্বাস যেন আচ্ছন্ন করতে চায় রাণীকে । পর মুহূর্তে তার মনে হয় বাকিটা ধোঁয়া, সন্দেহের সংশয়ের, অবিশ্বাসে ক্রমেই নাকানি চোবানি খেয়ে যাচ্ছে সে।
ব্যক্তিবর্গ চলে যান। মুকুল দূরে কোথাও বেড়াতে যাবার গল্প করে। কোন কথাই  কানে ঢোকেনা যেন।  পুতানের ঘরময় দুষ্টুমি কেমন অস্পষ্ট মেঘ চলাচলের মত মনে হয়। ফোন বেজে ওঠে,
—হ্যাঁ বল উস্রিদি
— কোন পরিবর্তন হল!
— না! হাইকোর্টে অনেক ডেট পড়ছে, কিন্তু এখানে একচুলও নড়ছে না ধর্মের কল।
— তাহলে এবার হাতুড়ির বাড়ি চাই...
— সেটা কি! অত রাগ করছ কেন উস্রিদি । তুমি তো উত্তেজনা পছন্দ করো না! 
রাগটা স্বাভাবিক। এবার এবার 'কানা গলি সদর রাস্তা'
— তুমি পাগল হলে উস্রিদি!
— ধরে নে তাই । এবার, ওই যা বললাম...

♦♦♦—♦♦♦

 

Mon 11 Jan 2021 18:53 IST | বনানী দাস