কবিদের রাজা

charles-baudelaire.png

 ধাlরাlবাlহিlক  প্রlবlন্ধ


যে সাধনার বলে অমঙ্গল বিশ্বরূপ ধারণ করে, যেটাই বোদল্যের –এর কবিতার ভিত্তি। কুৎসিত, বীভৎস, বিকট, মর্মান্তিক আর কদর্যের রূপকে কবিতায় নিপুণ শিল্পীর মতো চিত্রায়িত করেছেন তিনি । ভাবনার ঊর্দ্ধে উঠে অনন্তের ইঙ্গিতময় সন্ধান দিয়েছেন, স্থূল জগতকে অতিক্রম করে আমাদের নিয়ে গেছেন এক অদৃশ্য জগতে ।---দ্রষ্টা আর কবিদের রাজা শার্ল বোদল্যের –এর কবিসত্তাকে এভাবেই ভিন্নভাষায়, ভিন্নচোখে খতিয়ে দেখলেন ফরাসি সাহিত্যের মগ্ন প্রেমিক এবং সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার স্থিতধী পুরুষ সৈয়দ কওসর জামাল ।


তিনিই ‘প্রথম দ্রষ্টা, কবিদের রাজা, প্রকৃত ঈশ্বর’ বিশ্ব কবিতায় আধুনিকতার স্থপতি, সেই কবি শার্ল বোদল্যের সম্পর্কে তাঁর মৃত্যুর পর একটি চিঠিতে (১৮৭১) এসব লিখেছিলেন আর এক ক্রান্তদর্শী--- জঁ আর্তুর ব়্যাঁবো। ব়্যাঁবোর বয়স তখন ১৭ বছর। বোদল্যেরকে তবু চিনতে ভুল হয়নি তাঁর। এই সেই বোদল্যের যাঁর কবিতার অভিসারে রোমান্টিক কবিতার মহীরূহ ভূপাতিত হয়েছে, কবিতা সম্পর্কে এতদিনের প্রচলিত সব ধারণাকে ভেঙে তাঁর কবিতা শুধু অন্তর্মুখীই হয়নি, সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোর সচেতনভাবে বিপর্যয় ঘটিয়েছে। এ বিপর্যয় কবি ধারণ করেছেন তাঁর চেতনায়, মস্তিষ্কে, স্নায়ুকোষে, যৌন ইন্দ্রিয়ের শিহরনে। আর এসব তিনি ঘটিয়েছেন উনিশ শতকে, তাঁর ‘ক্লেদজ কুসুম,’ প্যারিস-চিত্র ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে দিয়ে। বোদলেয়ারের জগতে শুধু সৌন্দর্য নয় কুৎসিতও কাম্য, অমৃত নয়  গরল আত্মসাতের আকাঙ্ক্ষা, শুধু প্রেম নয় অ-প্রেম ও দুঃখের উপাদানও এ জগতে আদৃত। কবির আত্মসন্ধানের জন্য চাই আত্মানুসন্ধান, আত্মবিবমিষা, রোগ-দুঃখ, পাপের অভিজ্ঞতা। আর এভাবেই কবি পৌঁছতে পারবেন তার অদৃশ্য, অশ্রুত ও অজানা জগতে --– আর এই অনুসন্ধানই কবির কাজ। ভিক্তর য়্যুগোর আবেগ-উচ্ছ্বাস ও গোতিয়ে-র সৌন্দর্য নির্মাণ চেষ্টার পর  ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’-এর কবিকে ‘প্রথম দ্রষ্টা’ অভিধা দিয়ে ব়্যাঁবো ভুল করেননি। বেদল্যের কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৭ সালে, আর এই সালটিকেই আধুনিক কবিতার জন্মক্ষণ বলে মনে করেছেন কাব্যসমালোচকেরা। প্রতীকবাদীরাও তাঁর কবিতায় খুঁজে পেয়েছেন প্রতীকবাদিতার লক্ষণ।

poet-T.-S.-Eliot-and-Jean-Nicolas-Arthur-Rimbaud.png
      টি এস এলিয়টের এবং জঁ আর্তুর ব়্যাঁবো ।


 নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে বোদল্যেরকে বলা হয় রোম্যান্টিকদের শেষ এবং আধুনিকতাবাদীদের প্রথম কবি। ইংল্যান্ডে টি এস এলিয়টের কাছে বোদল্যের ছিলেন কষ্টিপাথরের মতো; যিনি বোদল্যের-এর কবিতা অনুবাদ করেছেন ইংরেজিতে এবং তাঁর সঙ্গে আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে খুবই উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ লিখেছিলেন এলিয়ট। জার্মান কবি স্টেফান জর্জ আধুনিকতা ও বোদল্যের-এর মধ্যে সংযোগ-সেতু হয়ে ছিলেন, তাঁর অনুবাদে বোদল্যের-এর ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ জার্মান ভাষায় এখনও অপরিহার্য অনুবাদগ্রন্থ। ইংরেজ লেখক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বোদল্যের-এর আধুনিকতার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, তাঁর কবিতা এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে; এই কবিতা তার শরীরে ধারণ করেছে আধুনিক সময়ের ভাঙন, ব্যর্থতা ও মিথ্যাচারের লক্ষণগুলো। আমরা স্মরণ করতে পারি ১৮৫০ সালে নগরকেন্দ্রিক পণ্য-পুঁজির আবির্ভাব প্রভাবিত করেছে প্যারিসের জীবনকে। বোদল্যের এ সমাজকে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকাতে বাধ্য করেছেন তাঁর কবিতার দিকে, যে কবিতা আহত করতে চায় প্রচলিত জনমানসকে, প্রচলিত পাঠাভ্যাসকে। তাঁর আধুনিকতা যুগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তার মর্মবস্তু পরবর্তী সময়েরও আলোচনার বিষয় উঠেছে। 

বোদল্যের-এর কবিতাযুগ ভিকতর য়্যুগো প্রমুখ রোম্যান্টিক কবিদের যুগ। অথচ রোম্যান্টিক বোদল্যের অর্জন করতে চেয়েছেন কাব্যের অভিনবত্ব। অদ্ভুত তাঁর কবিতার জগৎ। কেউ একে বলেছেন কালো রোম্যান্টিকতা। প্রকৃতি তাঁর আরাধ্য নয়, তবু তিনি খুশি হন প্যারিসের সূর্যাস্ত, জ্যোৎস্নারাত, বৃষ্টির দিন ও কুয়াশাছন্ন শহরের গলিপথ দেখে। প্যারিসের নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবন, বেশ্যাদের কলহ, যৌনতা, পাপের পঙ্কিল পরিবেশ তাঁকে আকর্ষণ করেছে বেশি; এই জীবন তাঁর কবিতার স্বচ্ছন্দ উপকরণ। এসব উপকরণ অবশ্যই তাঁর কবিতার বহিরঙ্গের দিক। এ উপকরণের মধ্যে দিয়ে যে মর্মবস্তুর সন্ধান আমরা পাই তা এক অন্তর্মুখী জগৎ। আত্মানুসন্ধানের মধ্যে দিয়েই ধরা পড়েছে কবির সৌন্দর্যচেতনা, সৌন্দর্য ও আনন্দের অনিত্যতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বোধ, আর  মৃত্যুচিন্তা। বাইরের জগতের চিত্রময় বাস্তবতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা  তাঁর অন্তর্জগতের ঈশ্বরবোধ, পাপ ও স্খলনের অনুভূতি প্রকাশে সহায়ক হয়েছে। এ অনুভূতি বিষাদক্লিষ্ট, যন্ত্রণাদগ্ধ। তাঁর কবিতার শরীরে আছে সময়চেতনার ছাপ আর আছে এমন এক মানসিক অবস্থা, যার নাম নির্বেদ। এই নির্বেদই বোদল্যের-এর কবিতার মূল সূর। ‘আনুই’ ‘স্প্লিন’ কবিতাগুলোর মোটিফ হয়ে আছে। 

বোদল্যের-এর কবিতা ও কবিতা সম্পর্কে ভাবনাকে তাঁর জীবন থেকে বিচ্যুত করে দেখা যাবে না। এই জগৎ থেকে তাঁর বিচ্ছিন্নতা ও অন্য জগতের সন্ধান সূচিত হয়েছে তার ব্যক্তিজীবন, শৈশবকাল ও তাঁর সংবেদনের মধ্যেই। এইসব আত্ম-উপাদান তাঁর শিল্প আর ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর জীবন নিরন্তর এক যাত্রার মতো—তাঁর কবিতাও এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তের দিকে আমাদের আকর্ষণ করে। স্বর্গের স্বপ্ন চূর্ণ, চিরকালীন সম্পর্কের ভিতর গড়ে ওঠা প্রেম ও নারী --- এই সম্পর্ক নির্মাণে ব্যর্থ। শহর জীবন নরকতুল্য, যা মানুষের সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দেয়। শূন্যতাই সেখানে বাস্তব হয়ে ওঠে। একদিকে নারীর প্রেমের টান, অন্যদিকে, প্রবল ঘৃণার উদ্রেক—এই দুই টানাপোড়েনের নিষ্পেষণে শুধু কবিতাই নয়, ব্যক্তি বোদলেয়ারও নিষ্পেষিত। তাঁর রূপসী নারী বিষাদপ্রতিমা, আর চুম্বনরতা নারীর চোখও অশ্রুতে রিক্ত। যে আত্মনিপীড়ন কবির অভিপ্রেত বলে মনে হয়, তা সরাসরি কবিই বলেছেন। মাতাল হও—‘সুরা, কবিতা, পুণ্য যার দ্বারাই সম্ভব, মাতাল হও।’ ঈশ্বর ও শয়তান, প্রেম ও যন্ত্রণা এই বৈপরীত্যই বোদলেয়ারকে আধুনিকতার উদ্গাতা করেছে। এ কথা শুধু কবিতার নয়, তাঁর জীবনলব্ধ চেতনার নির্মিত সত্যে।

মাত্র ৪৬ বছরের জীবন। জন্মেছিলেন প্যারিসে, ৯ এপ্রিল, ১৮২১, মৃত্যু ১৮৬৭। এই সংক্ষিপ্ত জীবনেই ফরাসি কবিতায় আধুনিকতার স্রষ্টা হয়ে চিরজীবিতের দলে নিজের স্থান করে নিয়েছেন বোদল্যের। তাঁর বয়স যখন মাত্র ছ’বছর, পিতা ফ্রাঁসোয়ার মৃত্যু হয়। তবু মা ক্যারোলিনের সঙ্গে আনন্দেই দিন কাটছিল শিশু বোদল্যের-এর। মা ছিলেন লণ্ডনের মহিলা। আর বোদল্যেরকে দেশাশুনার জন্য ছিল মমতাময়ী পরিচারিকা মারিয়েত, la sevante au grand coeur, বোদল্যের নিজেই বলেছেন। শার্ল সর্বদাই মনে রেখেছেন তাঁদের সাদা ছোটো বাড়িটার কথা, যেখানে ছিল নিস্তব্ধতা-- a blanche maison, tetite mais tranquille । তবু বালক শার্লির জগৎ তছনচ হয়ে যায় যখন ১৮২৮ এ মাদাম বোদল্যের আবার বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁর নতুন স্বামী মেজর ওপিক। ওপিক শার্লের প্রতি ছিলেন খুবই স্নেহপ্রবণ, কিন্তু  বালক শার্ল তাঁকে ক্ষমা করতে পারেনি তাঁর ভালোবাসার অধিকারে ভাগ বসানোয়। 


সৌন্দর্য ও মৌলিকতা শুধু নয়, তাঁর আগ্রহ ছিল অ-দৃশ্য পৃথিবীর প্রতি। প্রকৃতি নয়, তাঁর আস্থা মানুষের সভ্যতায়, সৃষ্টিতে, নগর জীবনে, কারণ শহরই আধুনিকতার নিদর্শন। এই নির্মাণ-- সমগ্র জীবনকেই নির্মাণ করতে চেয়েছেন তিনি-- শিল্পের বিষয় হিসেবে।



  ১৮৩২ থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত তাঁরা বাস করেছেন লিয়ঁতে, মেজর ওপিক তখন লেফটেনান্ট কর্নেল। শার্লকে পাঠানো হয়েছে পঁসিয়ঁ দেলর্ম ও পরে রয়াল কলেজে পড়াশুনার জন্য। বোর্ডিং স্কুলে শার্লের সমস্যা দেখা দেয়। অদ্ভুত বিষণ্ণতার শিকার হন শার্লি, যা সারা জীবন তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। তার মনে হয়েছে এ জীবন ক্লান্তিকর ও নিষ্ঠুর। এ তার পছন্দের পৃথিবী নয়। মসিয়ঁ ওপিক প্যারিসে ফিরে এলে শার্লকে পাঠানো হয় লিসে ল্যুই-ল্য-গ্রঁদ-এ। স্কুলে সমবয়সীরা বুঝতে পারত না শার্লকে। তাঁর মনের জটিলতা ধরার ক্ষমতা ছিল না তাদের। এ সময়ই সে রোম্যান্টিক কবিদের কবিতা পড়তে শুরু করে এবং নিজেও কবিতা লেখে। তখনকার বুর্জোয়া সমাজকে সে অপছন্দ করেছে খুব। লাটিন ভাষায় খুব ভালো রেজাল্ট করলেও একটি ক্লাস-নোট অন্যদের কাছে পৌঁছে না দেবার অপরাধে তাকে লিশে থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর শার্ল ভর্তি হন ইকল দ্য দ্রোয়াত-এ। এখানে তিন বছর থাকার সময় শার্ল মিশেছেন লাতিন কোয়ার্টারে লাকোঁত দ্য লিস, থিয়োফিল গোতিয়ে ও জেরার দ্য নেরভাল এর মতো কবি লেখকদের সঙ্গে। এই সময় বোদল্যের শুকনো নেশার জায়গা বোয়াসার সালঁতে যেতে শুরু করেন এবং হাসিস ক্লাবের সদস্য হন। তাঁর এইসব আচরণে বিরক্ত হয়ে মাদাম ও মসিয়ঁ ওপিক বোদল্যেরকে ব্যবসার কাজে কলকাতা পাঠাতে চাইলেন। ১৮৪১ সালের মে মাসে বোদল্যের কলকাতার উদ্দেশ্যে জাহাজে পাড়ি দিলেন। মরিসাস দ্বীপে জাহাজ থামে, জাহাজের কিছু মেরামতির কাজের জন্য জাহাজ সেখানে আটকে থাকার সময় তিনি ভ্রমণের আগ্রহ ফ্রান্সে ফিরে এলেন। তাঁর ধারণা আরও গাঢ় হল যে, পৃথিবীতে আনন্দ পাওয়ার মতো কিছু নেই।
    পরের বছর, ১৮৪২-এ, বোদল্যের-এর বয়স একুশ হলে সাবালকত্বের অধিকারে তাঁকে তাঁর পিতার সম্পত্তির মালিকানা দেবার প্রশ্ন ওঠে। প্রথমেই পঁচাত্তর হাজার ফ্রাঙ্ক হাতে পেয়ে অমিতব্যয়ী স্বেচ্ছাচারিতার কবলে পড়েন বোদল্যের। হিসেব করে টাকা খরচ করার কথা কখনও তাঁর মাথায় আসেনি। এ বছরই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় সুন্দরী অভিনেত্রী জান দ্যুভাল-এর সঙ্গে, যিনি হয়ে উঠলেন বোদল্যের-এর Vénus noire, কৃষ্ণকলি ভেনাস। এক বছর খুব আনন্দেই তাঁর কাটল জান-এর সঙ্গে। বোদল্যের এ সময় একটি চিঠিতে লিখেছেন—জান দ্যুভাল তাঁর ‘একমাত্র বিনোদন, একমাত্র আনন্দ ও একমাত্র বন্ধু’। কিন্তু দুর্যোগ শুরু হল তার পরেই। জান বোদল্যের-এর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন না, সুযোগমতো হতে পারতেন নৃশংস, তাঁর শিক্ষাদীক্ষাও বোদল্যের-এর উপযোগী ছিল না। তিনি ছিলেন অশিক্ষিত, বেহিসেবি ও মদ্যাসক্ত। এইসব কারণে তাঁদের মধ্যে গোলযোগের সীমা ছিল না। ইতিমধ্যে বোদল্যের-এর টাকা শেষ হয়ে আসছে। দু’বছরের মধ্যে তাঁর আর্থিক অবস্থা  করুণ হয়ে উঠছে। উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর যা পাওয়ার কথা তার অর্ধেক ইতিমধ্যে শেষ। ওপিক দম্পতি উদবিগ্ন হয়ে শার্লের বাকি সম্পত্তি একটি ট্রাস্টের হাতে অর্পণ করলেন এবং তাঁর দায়িত্বে থাকলেন বিচারবিভাগীয় অভিভাবকে। এখন থেকে মাদাম আঁসেল মূল টাকার ওপর পাওয়া সুদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মাসে মাসে টাকা দেবেন শার্লকে। অতিরিক্ত টাকার অনুরোধ মাদাম আঁসেল উপেক্ষা করতেন।  এরকম পরিস্থিতিতে উত্তেজিত ও বিধ্বস্ত বোদল্যের বাবা-মার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখলেন না।

Walter-Benjamin-and-Stefan-George.png
ওয়াল্টার বেন্জামিন এবং জার্মান কবি স্টিপেন জর্জ  


 ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ কাব্যগ্রন্থে যেমন দেখি, জীবনের কাছে কোনো আনন্দই আর পাওয়ার নেই। ব্যক্তিগত জীবনেও জান-এর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্দশার কারণ হয়ে উঠেছে। পাওনাদারের ক্রমাগত অত্যাচারে হতাশ, তার ওপর তাঁর অসুস্থতা তাঁকে বিধ্বস্ত করে তুলেছে। কিন্তু আত্মগর্বিত বোদল্যের তাঁর পরিচিত লোকজনের কাছে এইসব গোপন করে রাখলেন। যাঁর কাছে নিজেকে খানিকটা প্রকাশ করতেন তিনি তাঁর মা। তাঁকে এক চিঠিতে বোদল্যের লিখছেন,  এত যে তিনি হাঁটতে ভালোবাসতেন সে হাঁটা তিনি ছেড়েছেন এই ভয়ে যে  তাঁর কাপড় ও জুতো তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যাবে। তাঁর মা কনস্তান্তিনোপলে থাকেন, সেখানে তাঁর স্বামী মসিয়ঁ ওপিক অ্যামবাসাডার নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি ফ্রান্সে ফিরে পুত্রের শোচনীয় অবস্থা দেখে তাঁর নিজের  সব টাকা দিয়ে দিলেন বোদল্যেরকে। সে টাকায় শুধু প্রয়োজনীয় খরচটুকু মেটানো সম্ভব হয়েছিল বোদল্যের-এর। 

আয় বাড়ানোর জন্য বোদল্যের এবার শিল্পসমালোচকের কাজ শুরু করলেন। ১৮৪৫ সাল নাগাদ তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকল। তবু পাওনাদারের ঋণ মেটে না। আত্মহত্যার কথাও এ সময় ভেবেছেন তিনি। মসিয়ঁ ওপকে-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছেন এবং তাঁদের কাছে গিয়ে কয়েক মাস বাস করেন। কিন্তু মসিয়ঁ ওপিক যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে জীবননির্বাহ করা আর সম্ভব ছিল না। তাই আবার বোদল্যের নিজের মতো করে বাঁচতে চাইলেন। ফিরে এলেন লেখার জগতে। ১৮৪৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে রেভারেন্ড ক্রোলির ইংরেজি উপন্যাসের ফরাসি অনুবাদ—‘ল্য জন অঁশঁতর’। লিখছেন প্রচুর রিভিউ, প্রবন্ধ। প্রবন্ধের বিষয় সাহিত্য, বিশেষ করে তাঁর সময়ে কবিতার মূল ধারা রোম্যান্টিকতাবাদ। জানালেন, রোম্যান্টিসিজম এই সময়ের সৌন্দর্যের প্রতিফলন এবং উনিশ শতকীয় নৈতিকতার গ্রহণযোগ্য রূপান্তর; এ চিরকালের অথচ অনিশ্চল, যা সৌন্দর্যের নানা আকারের মধ্যে বিরাজকরে,  এমনকি, কুৎসিতের মধ্যেও বিদ্যমান। ১৮৪৭ এ বোদল্যের ‘লা ফাঁফারলো’ নামে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লেখেন।  এই সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় আর এক সুন্দরী অভিনেত্রী মারি দোব্র্যুন-এর।  বোদল্যের তাঁর উৎকৃষ্ট কবিতা, যেমন ‘অ্যাঁভিতাসিয়ঁ ও ভোইয়াজ’ ও ‘পোয়াসঁ’, এইসময় রচনা করেছেন। এ বছরই তিনি এডগার পো-র রচনার সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর মুগ্ধ পাঠক হয়েই থাকেননি, শুধু, পো-র রচনা ফরাসিতে অনুবাদের কাজও শুরু করেছেন।

 এবার বোদল্যের রচনা করতে শুরু করেছেন ‘Spleen’-এর কবিতা এবং তাঁর অন্য ৩৬টি কবিতাকে Les Limbes নামে আলাদা করেছেন।  Le Vin de l’assassin ( খুনির মদ) নামের কবিতা মুদ্রিত হয়েছে ‘লেকো দে মারশাঁদ দ্য ভ্যাঁ’ (মদ ব্যবসায়ীর কণ্ঠধ্বনি)-র মধ্যে, দুটি কবিতার আবির্ভাব ঘটেছে ‘ল্য মাগাস্যাঁ দে ফামিল’  (ফ্যামিলিশপ)-এ। ১৮৫১ সালে মাদাম সাবাতিয়ে-র খ্যাতনামা সালঁতে বোদল্যেরকে স্বাগত জানানো হয়। জান এবং মারি-র তুলনায় মাদাম সাবাতিয়ে বহু বেশি শুধু সুন্দরী আর  শিক্ষিতও। কিন্তু এত যে সুন্দরী মহিলাদের সংস্পর্শে এসেছেন বোদল্যের, তাতে তাঁর কবিসত্তা সন্তুষ্ট হয়েছে, কবিতার উপাদান খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে, কিন্তু কারও সঙ্গে কোনো প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়নি।  জান-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যর্থ হয়েছে, মারি তাঁকে ছেড়ে পছন্দ করেছেন আর এক লেখক তেয়োদর দ্য বাঁভিলকে। এইসব ঘটনার পর মাদাম সাবাতিয়ে-র কাছাকাছি আসতে চেয়েছেন বোদল্যের। অন্য নামে আবেগপূর্ণ কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে এবং  নিজের সৃষ্টিশীলতায় অত্যন্ত সক্রিয় থেকেছেন বোদল্যের। তাঁর গদ্য Du vin et du haschisch (ওয়াইন ও হাসিস) ল্য মেসাজের দ্য আসেমব্লে’তে প্রকাশিত হয়েছে।  আর যে প্রবন্ধগুলো লিখেছেন এইসময় সে সব সংকলিত করেছেন  L’Art romantique শিরোনামে। এডগার পো-র অনুবাদের কাজও একই সঙ্গে চলতে থাকে,  অনুবাদ্গুলো প্রকাশিত হত নানা পত্রিকায়। বোদল্যের-এর মৃত্যুর অনেক পরে, ১৮৭৫ সালে, এসব অনুবাদ গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।

এরপর রচিত হয়েছে ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’(Les Fleurs du mal    )-এর কবিতাগুলো। প্রথম ১৮টি কবিতা ছাপা হয়েছে ‘লা রভ্যু দে দো মঁদ’ পত্রিকায়। প্রকাশ হওয়ামাত্র কবিতার অনুরাগী ও গুণিজনেরা প্রশংসা করেছেন। কিন্তু প্রকাশক পেতে অসুবিধে হওয়ায় এগিয়ে এসেছেন বন্ধু পুলে-মালাসি, আর্থিক সমস্যা সত্ত্বেও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করার ঝুঁকি নিয়েছেন। প্রকাশকাল ১৮৫৭। মাদাম সাবাতিয়ের অনামা কবির কাছ থেকে যে কবিতাদুটি পেয়েছিলেন সে’দুটি এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত দেখে বুঝতে পারলেন, তাঁর সেই গুণগ্রাহী প্রেমিক আর কেউ নন, বোদল্যের। তিনি সরাসরি কবির প্রেমে নিজেকে ধরা দিতে চাইলেন। বোদল্যের মাদামের করুণা ও অনুরাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েও প্রেমের সম্পর্ক এড়াতে চাইলেন। বোদল্যের-এর কাছ এ অপ্রত্যাশিত ছিল না। প্রেমের প্রতি সংশয় বোদল্যের-এর প্রকৃতিগত। মাদাম সাবাতিয়ের-এর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হল। এর সুফল  পেলেন বোদল্যের। ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ অনৈতিকতা ও অশোভনতার দায়ে অভিযুক্ত হলে মাদাম সাবাতিয়ে তাঁর সামাজিক প্রতিপত্তির প্রভাবে বোদল্যেরকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। তবু শেষরক্ষা হল না। ১০১টি কবিতার মধ্যে ৬টি কবিতা-- Au Lecteur, Lesbos, Femmes damnées ইত্যাদি—অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হল এবং বোদল্যের-কে তিনশো ফ্রাঁ জরিমানা করা হল। পরে জরিমানা কমিয়ে ৫০ ফ্রাঁ করা হয়। 

১৮৬০ এ প্রকাশিত হয়েছে বোদল্যের-এর ‘লে পারাদি আর্টিফিসিয়েল’ (Paradis artificiels), আফিম ও হাসিস বিষয়ে দুটি প্রবন্ধ। দুটি শুকনো নেশার বস্তুতেই একসময় বোদল্যের-এর আসক্তি ছিল এবং পরে তিনি নিজেই বলেছেন-- Les chercheurs de paradis font leur enfer (যারা এভাবে স্বর্গের সন্ধান করে তার নিজেদের নরক তৈরি করে)। পরের বছর, ১৮৬১ সালে, বেরিয়েছে ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’-এর নতুন সংস্করণ, যেখানে বোদল্যের তখনও নিষিদ্ধ ৬টি কবিতা বাদ দিলেন, পাশাপাশি কয়েকটি কবিতা সংশোধিত করলেন। এ গ্রন্থের কবিতার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৩। ১৮৬৩ সালে বেলজিয়ামে বোদল্যের; আর সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে অত্যন্ত সমাদৃত হল তাঁর কবিতা। বেলজিয়ামে থাকতেই, ১৮৬৬ সালে প্রকাশ করেছেন কাব্যগ্রন্থ Les Epaves, যাতে নিষিদ্ধ ৬টি কবিতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন তাঁর নতুন কবিতা। অর্থাভাবে পড়ে এই গ্রন্থের স্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছেন সামান্য টাকায়। বিধ্বস্ত, শারীরিকভাবে রুগ্ন বোদল্যের ফিরে এসেছেন প্যারিসে, বরং বলা যায় তাঁর ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক বছর পর    , ১৮৬৭-র ৩১ অগস্ট রু দ্য দোম-এর স্যানাটোরিয়ামে তাঁর মায়ের দু’বাহুর মধ্যে বদ্ধ অবস্থায় প্রাণত্যাগ করলেন ৪৬ বছরের শার্ল বোদল্যের।

THE-VAMPIRE-and-L'horloge-BY-CHARLES-BAUDELAIRE.png
দ্য ভ্যাম্পিরর ।

মৃত্যুর অনেক আগেই বোদল্যের প্রভাবিত করতে পেরেছেন কবিতার নতুন প্রবাহকে। পার্নাসিয়ান ও প্রতীকবাদী, বিশেষ করে ভেরলেন ও র‍্যাঁবো, শ্রদ্ধা করেছেন এই কবি ও তাঁর কবিতাকে। আর সবার আগে সেই সময়ের প্রখ্যাত কবি ও লেখক ভিকতর য়্যুগো বোদল্যেরকে বিখ্যাত ফরাসি কবিদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। শিল্পগত বা নীতিগত কিংবা মনস্তত্ত্বগত, যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বোদল্যর এক কৌতূহল-সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব তাঁর ব্যক্তিত্বে জটিলতাও কম ছিল না। এই কারণে তাঁর কবিতার যে কোনো পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তাঁকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার। ফরাসি কবিতায় বোদল্যের এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ।  সাহিত্যের কোনো স্কুলেই তিনি খাপ খান না। পারনাসিয়ান হয়েও পারনাসিয়ানদের থেকে আলাদা। তাঁদের আদর্শ—l’art pour l’art- এ তাঁর বিশ্বাস ছিল না। তিনি রোম্যান্টিক অবশ্যই, কিন্তু রোম্যান্টিকদের মত কল্পনায় ভর করে বাস্তব থেকে দূরে গিয়ে কোনো কল্পরাজ্যের বাসিন্দা হতে চাননি। 

তাঁর স্বপ্নরাজ্যের সন্ধান মেলে তাঁর আত্মমগ্নতার ভিতরে। ডুব দিয়েছেন নিজের গভীরে। একসময় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হলেও রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত সমস্ত বিষয় থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত করেছেন। ১৮৪৮ সালের পর প্রগতির ধারণাই ছিল তাঁর কাছে উদ্ভট ব্যাপার, মনে হয়েছে এ এক অবক্ষয়ের চিহ্নমাত্র, কিংবা তিনি যেমন বলেছেন—‘une lantern qui jette des ténèbres sur tous les objets de la connaissance’,  ‘এমন একটা লণ্ঠন যা জ্ঞানবস্তুকে অন্ধকারে ছেয়ে দেয়’। ১৮৩০ সালের রোম্যান্টিকতাবাদীদের এই অনাগ্রহ ছিল, বোদল্যের তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর আক্ষেপ, ‘রোম্যান্টিকতার সূর্যালোকে নিদ্রার পর’ (‘le coucher du soleil romantique’) সময় হয়ে উঠেছে প্রধানত উপযোগবাদী। তাঁর সময়ের অন্য কবিদের মতো তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন ‘la critique et l’art bourgeois’, বুর্জোয়া সমালোচনা ও শিল্পের। তাঁর সমালোচক হয়ে ওঠার মূলেও কাজ করেছে এই ধারণা। এক অনমনীয় জেদ নিয়েই স্বকীয়তার দিকে যাত্রা তাঁর। তার জন্য জনরুচিকে আঘাত করতেও পিছু হটেননি। স্বকীয়তা ধরা পড়েছে অস্বস্তিকর যা-কিছু তার প্রতি ঝোঁক থেকে। তিনি নিজেই লিখেছেন Le voyage কবিতার শেষ দুই পঙক্তিতে--


    Nous voulons, tant ce feu nous brûle le cerveau,
    Plonger au fond du gouffre, Enfer ou Ciel, qu'importe?
    Au fond de l'Inconnu pour trouver du nouveau !
    
    (আমরা বেশি করে চাই এই আগুন পুড়িয়ে দিক মস্তিষ্ককে
    ঝাঁপ দাও শূন্যের গভীরে, স্বর্গ বা নরক, কীবা এসে যায়?
    অচেনা গভীরে যাও নতুনের খোঁজে!)

তার জন্য অদ্ভুত ভীতি, হ্যালুসিনেশন, উচ্চ সংবেদনা ইত্যাদি মনোভাব যা শক্তিশালী কল্পনায় উঠে আসে, সবই কাব্যিক প্রকাশের উপযোগী হয়েছিল। 

বোদল্যের যদিও বলেছেন কবিতা তাঁর কাছে un enthousiasme, un enlèvement de l’ âme, এক উৎসাহব্যঞ্জক অনুভূতি, আত্মার উচ্ছ্বাস, প্রথম কবিতাগুলো লিখেছেন গদ্যে এবং ক্রমাগত সংশোধন করে গেছেন যতক্ষণ না তাঁর কাঙ্ক্ষিত আবেগ ও ধ্বনিগাম্ভীর্যে তিনি পৌঁছোতে পারছেন। কবিতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়, এমনকি, যতির প্রয়োগকেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি পাঠকের উৎসাহের কাছে পৌঁছোবার লক্ষ্যে। বোদল্যের-এর কবিঁতা সম্পর্কে বক্তব্যে স্ববিরোধিতাজনিত বিভ্রান্তি লক্ষ করলেও একথা স্পষ্ট যে রোম্যান্টিকদের শুদ্ধ কবিতায় তাঁর বিশ্বাস ছিল, আবার রোম্যান্টিকদের ‘প্যান্থেইজম’ অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঈশ্বরের হাতের স্পর্শ অনুভব করাকে মনে করেছেন অতিভাবালুতা। লামার্তিন প্রমুখ রোম্যান্টিকদের প্রকৃতিমুগ্ধতা ছিল না বোদল্যের-এর। আধুনিক প্যারিস শহরের রূপ-রস-গন্ধ তাঁকে আনন্দ দিয়েছে। এই শহরই জুগিয়েছে তাঁর কবিতার উপকরণ। শোনা যায় যে প্রাচ্যদেশ ভ্রমণের সময় কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যই তাঁকে আকর্ষণ করেনি, তিনি নাকি বালজাকের রচনা পড়েই সময় কাটিয়েছিলেন। প্রাচ্যদেশের স্মৃতিতে আছে তাঁর নিশ্চেষ্ট বিশ্রাম ও অবসাদের কথা। ‘ল্য ভি অ্যাঁতেরিয়র’ (পূর্বজন্ম)  নামক সনেটে লিখেছেন—


    C’est la que j’ai vécu dans ls voluptés calmes,
    Au milieu de l’azur, des vagues , des splendeurs 
    esclaves nus, tout imprégnés  d’odeurs,

    Qui me rafraaichissaient le front avec des palmes,
    Et don’t l’unique soin était d’approfondir
    Le secret douloureux qui me faisait languir.
    
    (যেখানে পেয়েছি আমি ইন্দ্রিয়জ প্রশান্তি অপার,
    নীলাকাশ পরিবেশে প্রবাহ ও আড়ম্বর ছি্ল
    ছিল নগ্ন দাসীরা, তাদের শরীরের গন্ধসহ,
    
    পাখার হাওয়া দিয়ে উদ্দীপ্ত করেছে তারা আমার ললাট,
    সেই যত্ন একমাত্র গভীরে পৌঁছেছে
    গোপন দুঃখের, আর অবসন্ন করেছে আমাকে।)

সৌন্দর্য ও মৌলিকতা শুধু নয়, তাঁর আগ্রহ ছিল অ-দৃশ্য পৃথিবীর প্রতি। প্রকৃতি নয়, তাঁর আস্থা মানুষের সভ্যতায়, সৃষ্টিতে, নগর জীবনে, কারণ শহরই আধুনিকতার নিদর্শন। এই নির্মাণ-- সমগ্র জীবনকেই নির্মাণ করতে চেয়েছেন তিনি-- শিল্পের বিষয় হিসেবে। ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট আত্মার স্বীকারোক্তি। প্রকাশ পেয়েছে অসঙ্গতি, অসুস্থতা, বিকৃতির প্রতি কবির আকর্ষণ। বোদল্যের-এর কাছে বিদঘুটে ও কিম্ভুত প্রকৃতির বিষয় জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, শিল্প সত্য, সে কখনও অনৈতিক হতে পারে না, সত্যিকার সৌন্দর্যের কাছে পৌঁছনোর সঙ্গে অনৈতিকতার বিরোধ আছে। 


একদিকে সৌন্দর্য, অন্যদিকে যন্ত্রণা এই দুইয়ের টানাপোড়েন ধরে রেখেছে বোদল্যের-এর কবিতা। এই মিশ্রণ বা তজ্জনিত বিষণ্ণতা নিশ্চয় মেটাফিজিক্যাল, প্রকাশ করছে সময়ের বহুমুখী দ্বন্দ্বের অভিঘাত। বোদল্যের এমন এক সময়ের কথা বলছেন যেখানে বর্তমান শুধুই অপচয়মাত্র, আর ভবিষ্যৎ অবশ্যম্ভাবীরূপে বর্ণহীন। দুরারোগ্য নিস্পৃহতা, ক্লান্তি, দমবন্ধ-করা আবহ, সামর্থ্যহীনতা ও স্তব্ধতা থেকে মুক্তির আশায় কবি পৌঁছোতে চেয়েছেন এক চিত্রময় স্নিগ্ধ জগতে, কিন্তু বাস্তব নির্মম বলে সে জগৎ অধরা থেকে যায় এবং এই অবস্থা আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে—ভয়াবহ চিন্তা ও হ্যালুসিনেশন পাগলামির পর্যায়ে চলে যায়। বোদল্যের-এর ভাবনা, শিল্প সৌন্দর্যের জগৎ সব প্রতিবন্ধ দূর করে নির্মাণ করে এক স্বপ্নের পৃথিবী। এই স্বপ্নের পৃথিবী রোম্যান্টিকদের আরাধ্য, কিন্তু বোদল্যের লামার্তিন বা ভিকতর য়্যুগোর মতো কল্পনাকে প্রশ্রয় দিতে চান না। তিনি উন্মুক্ত করে দেন অধপতিত পৃথিবীর এক অধপতিত আত্মাকে। বোদল্যের জানেন যে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হলেও নৈতিকতা ও মানবিকতা তেমনভাবে বিকশিত হতে পারেনি। তাঁর ধারণা হয়েছে এই পৃথিবীতে সুখী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের জীবনের আনন্দে বিষবাষ্প মিশিয়ে দেয় মৃত্যু, এই মৃত্যু তাই এক যাত্রা যা সত্যিই নতুনত্ব ও আশা জাগিয়ে তুলতে পারে। সম্ভবত এই ভাবনাই প্রতিফলিত হতে দেখি ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’-এর কবিতাগুলোতে। La Mort des Pauvre (দরিদ্রের মৃত্যু) কবিতায় তিনি লিখেছেন---


    C’est la Mort qui console, helas ! et qui fait vivre;
    C’est le but la vie, et c’est le seul espoir
    Qui, comme un élixir, nous monte et nous envire,
    Et nous donne le Coeur de marcher jusqu’au soir;
    
    (মৃত্যুই সান্ত্বনা দেয়, হায়! সে-ই দেয় এ জীবন;
    জীবনেরও লক্ষ্য এই, আর এই একমাত্র আশা
    অমৃতের মতো শক্তি দেয় দাঁড়ানোর, ঈর্ষা করে,
    হৃদয়ে সামর্থ্য পায় হেঁটে যেতে সন্ধ্যা অবধি।)


এই পর্যায়েরই একটি দীর্ঘ কবিতা Le Voyage (যাত্রা)।  এ যাত্রা যেন তমসার অতল সাগরে—সঙ্গে তরুণ পথিকের মতো উৎফুল্ল হৃদয়--


    Nous nous embarquerons sur la mer des Ténèbres
     Avec le cœur joyeux d;un jeune passage.
    
এর মধ্যেই কবি শুনতে আহ্বান করেন শবযাত্রীদের বিষাদ সংগীত; তাদের কেউ যেন ডাকছে, ‘এসো এদিকে যারা খেতে চাও সুগন্ধি কমল।‘ এই কবিতার বক্তব্যে জড়িয়ে আছে তীব্র ও নির্দয় বাস্তববোধ, এক সত্য রূপ, যা বস্তুতপক্ষে অ-রূপ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র বেদনার অনুভূতি। এই নির্মম বাস্তবকে সহ্য করতে না পেরে কবি ডাকছেন মৃত্যুকে। মৃত্যু যেন এক প্রাচীন ক্যাপটেন—তার নৌকা এসে ভঙ্গুর পৃথিবী থেকে বাঁচাবে কবিকে--

    Ô Mort, vieux capitaine, il est temps! Levons l’ancre!
    Ce pays nous ennuie, Ô Mort! Appareillions!

    ( হে মৃত্যু, প্রাচীন ক্যাপটেন! সময় হয়েছে এই নোঙর তোলার
    আমাদের এই দেশ, হে মৃত্যু, নির্বেদময়! যাত্রা শুরু করো! 
    

বাস্তব পৃথিবী হতাশ করে সর্বদাই। বোদল্যের সন্ধান করেছেন আদর্শের, শেষ অবধি নিক্ষিপ্ত হয়েছেন নির্বেদ ও বিতৃষ্ণায়। এই আদর্শ ও বিতৃষ্ণা, বাস্তব ও স্বপ্ন পুনঃপুন বোদল্যের-এর কবিতার বিষয় হয়েছে। এই বিষয়ই ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’-কে প্রভাবিত করেছে। ফরাসি ভাষায় ‘মাল’ শব্দটির অর্থ খারাপ বা মন্দ, কিন্তু যন্ত্রণা, দুর্ভোগ, ক্ষতি, কদর্যতা ইত্যাদিরও ইঙ্গিত করে। আর বোদল্যের ঠিক এই সব থেকেই খুঁটে তুলে আনতে চান সৌন্দর্য। বোদল্যের এমন একজন কবি যিনি কবিতায়  অলীক কল্পনার স্বর্গ ও তার সৌন্দর্য চিত্রিত করেননি। যে সাধনার বলে অমঙ্গল বিস্বরূপ ধারণ করে তাই হল বোদল্যের-এর কবিতার ভিত্তি। কুৎসিত, বীভৎস, বিকট, ভয়াবহ, মর্মান্তিক, কদর্য বিষয়সমূহ তাঁর কবিতায় নিপুণ শিল্পীর মতো এঁকেছেন। ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে এক অনন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন বোদল্যের—এই স্থূল জগৎকে অতিক্রম করে আমাদের নিয়ে গেছেন এক অদৃশ্য সুক্ষ্ম জগতে। তাঁর কবিতাই তাঁকে দিয়েছিল এই জাদুমন্ত্র। তমসাচ্ছন্ন রাত্রির পর তিনিই ফুটিয়ে তুলেছেন L’Aube spirituelle, এক আধ্যাত্মিক উষা। 
    কাব্যভাষার সব শৈলীকেই ব্যবহার করেছেন বোদল্যের। তাঁর কবিতার ছন্দ ও ছন্দস্পন্দের ভিতর দিয়ে গম্ভীর এক ধ্বনিময়তার সৃষ্টি করেছেন বোদল্যের। তিনি রোম্যান্টিক, কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতীকবাদী— বিমূর্ততার ভিতর দিয়ে উঠে আসে তাঁর চিত্রকল্প, ব্যক্তিকে পরিণত করেন বিষয়ে এবং বিষয়কে দিয়েছেন প্রাণের মর্যাদা। 
কবিতা রচনার শুরুর দিনগুলোতে ছন্দের ক্ষেত্রে বোদল্যের অনুসরণ করেছেন তেয়োদর বাঁভিল ও রোম্যান্টিকদের। সে সময় কবিতার অন্ত্যমিল অবশ্যম্ভাবী ছিল। এই অন্ত্যমিলকে বোদল্যের সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর কাব্যের মধ্যে দিয়ে। বিষয়ভাবনার সঙ্গে উপযুক্ত অন্ত্যমিলের ব্যবহার বোদল্যের-এর কবিতাকে স্বতন্ত্র করেছে। এ সম্পর্কে তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন---


     Je vais m'exercer seul à ma fantasque escrime
    Flairant dans tous les coins les hasards de la rime.


তিনি একাই সুন্দর করে বেড়া বাঁধার কাজে অভ্যাস করতে চান, প্রতিটি কোণে কোণে মিলের খোঁজে গন্ধ শুঁকতে থাকবেন। এও এক স্বাতন্ত্রের সন্ধান তাঁর।   তিনি এমন এক কাব্যশৈলীর সন্ধান করেছেন যেখানে তিনি পাবেন গদ্যের স্বাধীনতা এবং সেই সঙ্গে শুদ্ধ কবিতার সৌন্দর্য। তাঁর ছোটো গদ্য-কবিতাগুলো এই উদ্দেশ্যই সাধন করেছে। 

[এই রচনায় ব্যবহৃত সব ফরাসি উদ্ধৃতি ও কবিতা পঙক্তির অনুবাদ লেখকের]

 

Sat 17 Oct 2020 16:18 IST | সৈয়দ কওসর জামাল