শৈশব স্মৃতিতে

গ্রাম আর শহর মিলে আছে তাঁর কবিতা যাপনের চাঞ্চল্য, সজল ও সুদূঢ় উচ্চারণে।

Nirmalendu-Gun-Poet

 

 


বি  স  র্জ  নে  র  ♦  উ ৎ  স ব


 

►স্মৃ | তি | ক | থা

বাংলাভাষার অন্যতম সেরা আর প্রবল জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে পাঠকের আগ্রহ কী বিশাল। দেশ ছাড়িয়ে, বিদেশের নানা-প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তাঁকে নিয়ে ডজন ডজন গল্প। একমাত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর সঙ্গে এ জায়গায় মিল তাঁর অসামান্য। শক্তি নাগরিক কবি। বনজঙ্গলে, গ্রামের পথে পথে ছড়ানো থাকত তাঁর অগোছালো, প্রাণবন্ত দিনযাপন। কিন্তু গ্রামীণজনের, প্রান্তজনের, পাশাপাশি নাগরিকজনের শ্বাসপ্রশ্বাস আর দীর্ঘশ্বাস কি সেরকম ছুঁয়ে থাকত তাঁর দৈনিকতাকে? গুণ কবি, এখানেই আলাদা। গ্রাম আর শহর মিলে আছে তাঁর কবিতা যাপনের চাঞ্চল্য, সজল ও সুদূঢ় উচ্চারণে। নির্মলেন্দুর শৈশব, তাঁর হয়ে ওঠা, এক হাতে বন্দুক আর অন্য হাতে কলম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর মরণপণ লড়াইয়ের অঙ্গীকার, জানে বাংলাদেশ। কতটা জানি আমরা, এ পারের আত্মতুষ্ট বাঙালি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই উঠে আসে তাঁরই আত্মবর্ণিত শৈশব প্রসঙ্গ —


আমার ছেলেবেলা


| নির্মলেন্দু গুণ | 

 

মা বিছানায় শুয়ে পশ্চিম দিকে শিয়র দিয়ে। তাঁর শীর্ণ দীর্ঘ শরীরটা একটা নক্সী কাঁথা দিয়ে জড়ানো। একটু আগেই বালতির জল দিয়ে বাবা তাঁর মাথা ধুইয়ে দিয়েছেন। অয়েলক্লথে ঢাকা বালিশের উপরে ছড়ানো তাঁর কালো চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে বালতিতে। অনেকদিন পর মায়ের জ্বর একটু কমতির দিকে। থার্মোমিটার দিয়ে বাবা মায়ের গায়ের উত্তাপ পরীক্ষা করলেন, তারপর নিজের হাতের রান্না শুকতো নিয়ে বসলেন মায়ের শিয়রে। মায়ের অসুখের সময় বাবা নিজেই রান্না করে আমাদের খাওয়াতেন। বাবা মাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। মা খেতে চাচ্ছেন না। তাঁর মুখে রুচি নেই। একটা ছোট মলা মাছ চিবুতে চিবুতে তিনি তাকালেন আমার দিকে। আমি টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে তোরঙ্গে তুলে রাখা একটা ছোট রাবারের বল পেড়ে সবে মাত্র মাটিতে লাফিয়ে পড়েছি; নিঃশব্দে, বিড়ালের মতো মায়ের দৃষ্টি এড়িয়ে যাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারি। কিছুক্ষণের জন্য আড় চোখে আমি মাকে দেখছিলাম, তখনই মায়ের চোখ পড়ল আমার চোখে।রক্তশূন্য, রুগ্ন-পান্ডুর দু'টি চোখ। মা কথা বলতে পারেন না। তিনি বাবার সাহায্য নিলেন চোখের ইঙ্গিতে। বাবা মায়ের চোখের ভাষা বুঝতেন। তিনি আমাকে ডাকলেন।

'এদিকে আয়, তোর মায়ের কাছে একটু বোস।'

আমি মাকে দেখছিলাম, বাবার ডাকে প্রথমে বাবার দিকে, পরে মায়ের দিকে তাকালাম। বাবা বুঝলেন, এই তাকানোর অর্থ হচ্ছে চলে যাবার অনুমতি প্রার্থনা। মা'র বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বাবা বললেন: 'যা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। তোর মায়ের শরীরটা ভালো নয়।'

মায়ের শরীরটা যে ভালো নয়, তা আমিও বুঝতে পারতাম; কিন্তু তাঁর শরীর যে এতোটাই খারাপ ---তা বুঝবার মতো বয়স আমার হয়নি। সবেমাত্র চার বছরে পা দিয়েছি। মাতৃ-প্রীতির চেয়ে খেলা-ধুলার প্রতিই আমার আকর্ষণ বেশি। আমার ধারণা, খেলার সময় চলে যাবে, মা-তো আর চলে যাবে না; একটু খেলে আসি, তার-পর বেশি সময় নিয়ে মায়ের পাশে বসা যাবে। এই ভেবে, কিম্বা এতো-কিছু না ভেবেই দৌঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। 

 

family-pic-of-poet-nirmalendu-gun.png
কবির মা এবং বাবার সঙ্গে বড়ো বোন রূপালী

ওটাই ছিল আমার মায়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। মা-সম্পর্কে আমার আর কোনো স্মৃতি নেই। শুধু ঐ দৃশ্যটাই আমার চোখে স্থির আছে। অন্যেরা যখন তাদের মায়ের স্মৃতি-চারণ করে, আমি তখন মৃত্যুশয্যায়ঁ শায়িতা আমার রুগ্না মাকে কল্পনায় দেখতে পাই। আমার মাকে দাঁড়ানো অবস্থায় আমি কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিকেলের দিকে মা মারা যান। সেদিন ছিল ষোলই ডিসেম্বর, ১৯৪৯।

• • •

আমার বড়ভাই পূর্ণেন্দু। আমরা তাকে দাদামণি বলে ডাকতাম। তার বয়স তখন দশ। বড়বোন রূপালী ছয় বছরের। বয়সে দুবছরের বড় হলেও তাকে আমি নাম ধরেই ডাকতাম। তার ডাক নাম ছিল রুপু। দাদামণি এবং রূপুর মাঝখানে আমার একটি বড় ভাই ছিল। মহাকবি কালিদাসের সঙ্গে মিলিয়ে বাবা তার নাম রেখেছিলেন কালিদাস। তিন বছর বয়সে কালিদাস ম্যালেরিয়ায় মারা গিয়েছিল। কালিদাসকে আমি দেখি নি, আমার জন্মের আগেই সে মারা যায়। মায়ের মৃত্যুর সময় আমার বয়স চার। আমার ছোটবোন সোনালি দুই বছরের। সোনালির ছোটটি দুলালী, ওর বয়স মাত্র মাস ছয়েকের মতো। আমাদের নিয়ে বাবা অকূলসাগরে ভাসলেন। 

আমার ঠাকুরমা তখনো বেঁচে। তিনি বাবার সঙ্গে থাকতেন না। বছরের অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকতেন ময়মনসিংহ শহরে, আমাদের জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে। গ্রামের বাড়িতে এলে থাকতেন আমার কাকার সঙ্গে। আমার বাবার সঙ্গে ঠাকুরমার সম্পর্ক খুবই খারাপ ছিল। ঠাকুরদাকে আমি দেখি নি, তিনি অনেক আগেই লোকান্তরিত; ঠাকুরদার অবর্তমানে ঠাকুরমাই ছিলেন সংসারের কর্ত্রী। পারিবারিক সম্পদ বাটোয়ারার প্রশ্নে আমাদের পরিবারে তখন প্রায় প্রতিদিনই কলহ লেগে থাকত। আমার ঠাকুরমার সুস্পষ্ট পক্ষপাত ছিল তাঁর বড় ও ছোট ছেলের প্রতি। আমাদের বাড়ির বড় ঘরগুলি এবং অস্থাবর সম্পদের প্রায় সবই কাকার হেফাজতে। আমরা যে ঘরটিতে থাকতাম, সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট। ঘরটি আমাদের প্রকান্ড বাড়ির সঙ্গে একেবারেই মানানসই ছিল না। ঠাকুরমা বিশাল আকৃতির বড় ঘরের বারান্দায় বসে, শীতের সকালের রোদে গা গরম করতেন। কাজের মেয়েরা তাঁর হাতে পায়ে তেল মাখিয়ে দিতো। বারান্দাটি খুবই উঁচু ছিল। আমি কৌতূহলী চোখ মেলে ঠাকুরমাকে দেখতাম। তাঁর পাশে যাবার ইচ্ছে থাকলেও যাহস পেতাম না---তিনিও ভয় ভাঙিয়ে কখনো আমাকে কাছে ডাকতেন বলে মনে পড়ে না। নিজেকে ঠাকুরমার করুণা প্রত্যাশী এক অনাথ ভিখিরির মতো মনে হতো। আমাদের কাকাতো ভাইবোনরা আমাদের ঘরে আসতো না, আমরাও ওদের ঘরে যেতাম না। আমরা খেলতে যেতাম পাশের বাড়িতে। নিজেদের বাড়িতে আমাদের অবস্থানটা ছিল অনেকটাই শরণার্থীর মতো। 

nirmalendu-gun.png

আমার বাবা আমাদের নিয়ে, বিশেষ করে আমার ছমাসের ছোট বোনটিকে নিয়ে অত্যন্ত বিপদের মধ্যে পড়লেন। তাঁকে ঐ বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য আমার ঠাকুরমা, আমার কাকীমা কিম্বা আমার জ্যেঠিমা ---কেউই এগিয়ে আসেন নি। আমার দাদু ও দিদিমা মায়ের বিয়ের আগেই লোকান্তরিত হয়েছিলেন। দুই মামা ছিলেন তাঁরাও ভারতে চলে গেছেন। আমার মায়ের একমাত্র বড় বোন, আমার মাসিমা থাকতেন পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে। তিনি আজও বেঁচে আছেন, তাঁর বয়স এখন নব্বুইপ্রায়। তাঁর বড়ছেলে নামজাদা ইতিহাসবিদ ডক্টর অসীম রায়। বাবা মাসিমাকে অনুরোধ করে চিঠি লিখলেন, যাতে ছেলেমেয়েদের দু'একজনের লালনপালনের দায়িত্ব তিনি নেন। মাসিমা ছিলেন সত্যিকারের সংসার অভিজ্ঞ মানুষ, তিনি বাবাকে পুনরায় বিয়ে করার পরামর্শ দিয়ে চিঠি লেখেন। ঐ পরিস্থিতিতে ওটাই ছিল যথার্থ সিদ্ধান্ত; কিন্তু ঐ সিদ্ধান্ত কার্যকর করাটা খুব সহজ ছিল না। ব্যাপারটা ছিল সময় ও সুযোগ সাপেক্ষ। পাঁচ-পাঁচটি সন্তানের মাতূত্ব গ্রহণের জন্য কোনো মহিয়সী নারী তৈরি হয়ে বসেছিলেন না, যে খুব সহজেই তাঁর সন্ধান মিলবে। অকল্পনীয় ধৈর্য, দৃঢ়  মনোবল এবং অন্তহীন  অপত্য স্নেহের জোরেই বাবা তাঁর জীবনের দুঃসহ দিনগুলো একা-একা পাড়ি  দিতে থাকলেন। বাবার পাশে দাঁড়াবার মতো আপনজন কেউ নেই। তিনি একা। তাঁকে ঘিরে আমার পাঁচ-পাঁচটি ছোট ছোট ভাইবোন---একটি একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু— অনাদরে, অবহেলায় এবং অপুষ্টিতে অসুস্থ।  বাবার তখনকার মানসিক অবস্থার কথা কল্পনা করে আমি আজও শিউরে উঠি, কিন্তু বাবার মুখে আমি কোনোদিন তাঁর দুঃখদীর্ণ দিনগুলোর কথা শুনি নি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা স্বভাবের মানুষ; প্রচন্ড আত্মসম্মানবোধ এবং জেদের সমন্বয় ঘটেছিল বাবার মধ্যে। দুঃখের গল্পগুলো না শুনিয়ে তিনি আমাদের শুধু তাঁর জীবনের আনন্দের গল্পগুলোই বলতেন। 

আপনজনদের কাছ থেকে কোনরকম সাহায্যের আশ্বাস না পেয়ে বাধ্য হয়েই বাবা তখন রক্তসূত্রে আপন নয় এমনসব মানুষের সন্ধানে বেরুলেন। আমাদের গ্রামের উত্তরপ্রান্তে, সেনপাড়ায় ঘতু সেনের নিঃসন্তান এক বিধবা পত্নী ছিলেন; তিনিই বাবার সাহায্যে এগিয়ে এলেন। লালনপালনের জন্য আমার ছোট বোন দুলালীকে তাঁর হাতেই তুলে দেয়া হলো। রাঙা পুতুলের মতো আমার ঐ ছোট্ট বোনটির কথা আমার বেশ মনে আছে। বাবা প্রায় প্রতিদিনই সকালের দিকে দুলালীকে দেখতে সেন বাড়িতে যেতেন। আমিও বাবার সঙ্গে যেতাম। আমরা দুলালীর জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধ দিয়ে আসতাম। আমি বাবাকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতাম: 'বাবা, এই মেয়েটি কে?' 

বাবা বলতেন: 'এই মেয়েটি তোর বোন, দুলালী।'

সেনবাড়িতেই দুলালীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমার অন্য ছোট বোন, সোনালিকে আমি চিনতাম, কিন্তু দুলালীকে নিজেদের ঘরে দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। আমি দুলালীর সঙ্গে খেলা করতাম, কিন্তু সেই খেলা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না; বাবা আমাকে ফেরার জন্য তাড়া দিতেন। বাবা বলতেন: ' ও আরও একটু বড়ো হোক, তারপর ওকে বাড়িতে নিয়ে যাবো।' বাড়িতে যে মা নেই, একথা আমার মনেই পড়তো না। দুলালীকে রেখে সেনবাড়ি থেকে চলে আসার সময় আমার মনে খুব কষ্ট হতো। বাড়ি ফিরে বাবা আমাদের জন্য রান্না চড়াতেন। ক্ষুধার জ্বালায় দুলালীর কথা আর মনে থাকতো না। 

• • •

আমার মামার বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে। মা ছিলেন অষ্টগ্রামের দত্ত পরিবারের মেয়ে। আমি ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে একটি বই দেখেছিলাম, বইটির নাম 'অষ্টগ্রামের দত্তবংশ'। ঐ চটি বইটি বাবার টেবিলের একপাশে থাকতো। বাবা প্রায়ই ঐ বইয়ের পাতা উল্টাতেন। গ্রামে মামাদের প্রকান্ড বাড়ি ও প্রচুর জমিজমা থাকলেও তাঁরা গ্রামের বাড়িতে থাকতেন না। ময়মনসিংহ শহরে তাঁদের বাড়ি ছিল, ওখানেই তাঁরা থাকতেন। দেশভাগের পরই তাঁরা ভারতে চলে যান। বড়মামা মাধ্যমিক বোর্ডের চাকরি নিয়ে চলে যান দিল্লীতে, ছোটমামা কলকাতায় ব্যাংকের চাকরি পান। ঈশ্বরগঞ্জের রায় পরিবারে আমার মাসিমার বিয়ে হয়েছিল। মেশোমশায় ছিলেন উকিল। ওঁরাও ঈশ্বরগঞ্জের বাড়ি-জমি পেলে রেখেই পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে চলে গিয়েছিলেন। অষ্টগ্রামে আমি কোনদিন যাই নি। বলা যায় আমাদের মামাবাড়ি থেকেও ছিল না। মামা-মাসির সঙ্গে বাবার পত্র-যোগাযোগ  ছিল, এইটুকুই। আমাদের দুই মামা এবং মাসিমাকে আমরা দাদু এবং দিদিমাকে আমি হারিয়েছিলাম আমার জন্মের অনেক আগেই। আমি যখন গোর্কির ছেলেবেলা পাঠ কর, তখন গোর্কির দিদিমার প্রতি আমার খুব ঈর্ষা হয়।

মাসিমার কাথ থেকে শুনেছি অষ্ট্রগ্রামের দত্তদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মনসামঙ্গলের আদি কবি কানাহারি দত্ত। আমার মা না থাকায়, মা সম্পর্কে আমার জানার কোনো অবকাশই ছিল না। বাবাও মা সম্পর্কে কিছুই বলতেন না। 'কে আর হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে'।---জীবনানন্দের এই পঙক্তিটি বাবার বেলায় ছিল খুবই প্রযোজ্য। ১৯৭১-এ কলকাতায় আমার মাসিমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। মাসিমার কাছেই আমি আমার মা এবং আমার মাতৃকুল সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। মাসিমা ঠাকুরঘরে বসে চন্ডীদাসের পদাবলী আবৃত্তি করতেন, তখনই আমি মাসিমার কাছে জানতে চাই, আমার মায়েরও কাব্য সম্পর্কিত কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা। মাসিমা তখন আমাকে জানান যে, আমার মায়ের কাব্যপ্রীতি ছিল তাঁর চেয়েও বেশি---আমার মা নাকি মনসামঙ্গলকাব্য পুরোটাই মুখস্থ বলতে পারতেন। শুনে আমি অবাক হই। মাসিমা তখন একটু গর্বের সঙ্গেই দাবি করেন যে, তাঁরা কানাহারি দত্তের বংশ। মনসামঙ্গলের আদি রচয়িতা সম্পর্কে ডঃ অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় যে সংশয় প্রকাশ করেছেন, সেই সংশয় নিরসনকল্পে অষ্টগ্রাম তদন্ত করা যেতে পারে। মনে হয় আমার মাতৃকুলসূত্রেই আমি কিছুটা কবিত্ব লাভ করেছিলাম। মা'র নাম ছিল বীণাপাণি। অনেক অনুসন্ধান করেও আমার পিতৃকুলে আমি কোনো কবির সন্ধান পাই নি। পিতৃকুলে সম্ভবত আমিই প্রথম। 

• • •

আমার ঠাকুরদা নাম রামসুন্দর গুণ। এনট্রান্স পাশ করে তিনি ময়মনসিংহের জজকোর্টে চাকরি পেয়েচিলেন। তিনি ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান। চাকুরিসূত্রেই তিনি পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করেন। তাঁর বড় ভাই নবকিশোর গ্রামে থাকতেন, ঠাকুরদা শহর থেকে চাকরির বেতন গ্রামে পাঠাতেন এবং জমিজমা ক্রয় করতেন। একপর্যায়ে গৌরীপুরের জমিদারদের কাছ থেকে তিনি একটি তালুকদারিস্বত্ব ক্রয় করেন, ঐ তালুক ক্রয়ের সূত্রে আমাদের পদবী দীর্ঘ হয়; গুণের সঙ্গে যুক্ত হয় চৌধুরী। আমি পরে আমার পদবী থেকে চৌধুরীকে ছেটে বাদ দেই, অবশ্য আমার লেখক জীবনের শুরুতে আমি নামের সঙ্গে চৌধুরী ব্যবহার করতাম। 

আমার ঠাকুরদা, তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর  পর, পার্শ্ববর্তী ডেমুরা গ্রামের হরিষচন্দ্র  দত্তের কন্যা কামিনীসুন্দরীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর গর্ভে ছিল তিন পুত্র। ঐ তিনপুত্রের মধ্যমপুত্র বাসুদেব, আমার জনক। বাবার বৈমাত্রেয় দুই ভাইয়ের একজন, ঠাকুরদার দ্বিতীয়পুত্র গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আর পরিবারে ফিরে আসেন নি। আমরা দীর্ঘদিন আমাদের  ঐ সন্ন্যাসী হয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া জ্যাঠামশাইর অপেক্ষায় থেকেছি। গৌরবর্ণ ও উন্নতানাসাবিশিষ্ট সুঠামদেহী যে-কোনো সন্ন্যাসীকেই আমরা আমাদের জ্যাঠামশাই বলে ভ্রম করতে ভালোবাসতাম। ছোটবেলায় দেখেছি, জ্যাঠামশাই সন্দেহে যে-কোনো সন্ন্যাসীকেই আমাদের বাড়িতে সযত্নে খাওয়ানো হতো। আমরা মনে করতাম উনিই নানারকমের ছদ্মবেশ ধরে আমাদের দেখা দিতে এবং দেখে যেতে আসছেন। একসময় আমিও ভাবতাম বড় হয়ে সন্ন্যাসী হবো, যদি জ্যাঠামশাইর দেখা পাই। কল্পনায় এখনও আমার সন্ন্যাসী জ্যাঠামশাইকে আমি খুঁজে বেড়াই। তিনি কেন সন্ন্যাসী হয়ে সংসারত্যাগী হয়েছিলেন, সে-কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করতো, এখনও করে। তিনি কি আজও বেঁচে আছেন? থাকতেও তো পারেন, হিসেবমতো তাঁর বয়স এখন একশ'র ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেত; একজন সন্ন্যাসীর জন্য এরকম বিস্তূত আয়ু কি বিস্ময়কর?' 

আমার বড় জ্যাঠামশাই, বড়দাসুন্দর গুণ এনট্রান্স পাশ করে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আমাদের বাড়ির লাইব্রেরীতে যেসব বই ছিল, সেগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যেই তাঁর চমৎকার স্বাক্ষর দেখেছি। তিনি ইংরেজ কবিদের ভক্ত ছিলেন, তখন অবশ্য পাঠ্যসূচীতে সর্বত্র ইংরেজ কবিদেরই প্রধান্য ছিল। শেক্সপিয়ার শেলী, বায়রন, মিল্টন— এঁদের কবিতার বই তাঁর সংগ্রহে ছিল। বিভিন্ন কবিতার, পাশে তিনি নানারকমের মন্তব্য লিখতেন। সম্ভবত তিনি একজন নীরব কবি ছিলেন। আমার জন্মের পরও তিনি বেঁচে ছিলেন, কিন্তু আমি তাঁকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর চমৎকার ইংরেজী হস্তলিপি আজও আমার চোখে লেগে আছে।

ঠাকুরদার হাতের লেখাও সুন্দর ছিল। তাঁর প্রিয়-গানের একটি স্বহস্তলিখিত পান্ডুলিপি এখনও আমাদের বাড়িতে আছে। শতবর্ষের ধকল সইবার পরও তাঁর ঐ হস্তলিখিত গানগুলি অনায়াসে পাঠ করা যায়। তাঁর প্রিয়-গানের অধিকাংশই ছিল রামপ্রসাদী। তাঁর হস্তাক্ষর কিছুটা নজরুলের মতো মনে হয়। একই খাতায় তিনি আমাদের বংশলিপিও লিখে রেখে গেছেন। তালপাতায় তাঁর হস্তলিখিত কিছু বেদমন্ত্রও আমি দেখেছি। ঠাকুরদা কর্তৃক লিপিবদ্ধ বংশলিপিটি নিম্নরূপ:


পিতা— রামকিশোর গুণ
পিতামহ— বিষ্ণুরাম গুণ। পিতামহী— চন্ডিকা
প্রপিতামহ— মুক্তারাম গুণ। প্রপিতামহী— মাধবী
বৃদ্ধপ্রপিতামহ— রাঘবগোবিন্দ গুণ।
বৃদ্ধপ্রপিতামহী— প্রভাবতী
জ্যেষ্ঠ-পিতামহ— দুর্গারাম গুণ। তৎপত্নী— মহামায়া
খুল্লপ্রপিতামহ— কৃষ্ণরাম গুণ। তৎপত্নী— রুক্মিণী
খুল্লপ্রপিতামহ— রূপরাম গুণ। তৎপত্নী— সুদক্ষিণী

• মাতামহকুল

মাতামহ— আনন্দীরাম হোড় 
প্রমাতামহ— হরিবল্লভ
বৃদ্ধপ্রমাতামহ— মরোত্তম
মাতামহী— সাবিত্রা
প্রমাতামহী— যমুনা
বৃদ্ধপ্রমাতামহী— চন্ডিকা

• মাসিগণ

অভয়া
বিজয়া
বিদ্যা
কিন্বরীও
পরমেশ্বরী।

• মৃতা তিথি

পিতা— অগ্রহায়ণের শুক্লাপঞ্চমী
মাতা— চৈত্রের শুক্লাসপ্তমী
পিতামহ— মাঘের শুক্লাত্রয়োদশী
পিতামহী— কার্তিকের শুক্লাঅষ্টমী।

 

 

   

Tue 20 Jul 2021 17:12 IST | নির্মলেন্দু গুণ