ভয় জয়ের হিসেব-নিকেশ

বাস্তব আর চিন্তার মধ্যে যখন "লাইনচ্যুতি" ঘটবে,তখনই সেই চিন্তা উদ্ভট,অস্বাভাবিক, মনোরোগ। কিন্তু কে বলল ভূতপেতনি অবাস্তব? যদি সত্যিই থাকে তারা? প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন অনেকটা ডিম আর মুরগির গপ্পোর মতো!

/interpretation_of_phobia_anxiety_07092019

খন দুদিন অন্তর লোডশেডিং হতো আমাদের পাড়ায় । আমরা থাকতাম কলকাতা শহরের বুকের মধ্যে ধুকপুক করতে থাকা মফসসলে। ভাড়া ড্যাম্পধরা বাড়ি । ছোট ঘর। মাঝরাতে পড়াশোনা করছি। দুপ করে আলো নিভে গেল। তখন একবার কারেন্ট গেলে কখন আসবে বলতে পারতেন একমাত্র জ্যেতিষসম্রাটরা। তাই হাতড়ে হাতড়ে মোমবাতি আর দেশলাই পাকড়াও করলাম। পরদিন মাধ্যমিক । ইতিহাস পরীক্ষা । মোম জ্বালাতেই হাড় হিম হয়ে গেল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মহম্মদি বেগ। বাম কপাল থেকে ডান গাল অবধি বিস্তৃত শুকিয়ে যাওয়া পুরনো কাটা দাগ যা সিরাজ সভাকক্ষে কাপুরুষতার শাস্তি হিসেবে দিয়েছিল, চোখে হীম হয়ে যাওয়া আবেগহীন চাহনি আর ঠোঁটের পাশে ছিটেছিটে রক্তের ফোঁটা তখনও লেখে। যেন এই একটু আগেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজৌদ্দলাকে কুচিকুচি করে কোতল করে এল সে। বেশ হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল আমার । মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসবে। খানিক আগেই পড়েছি পলাশীর যুদ্ধ । ১৭৫৭ যে এইভাবে প্রেতাত্মা হয়ে ১৯৯৭ তে হানা দেবে কে জানতো! বেশ ভয়ালু হয়ে উঠছিল পরিবেশটা। ঠিক তখনই পুরো  রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিয়ে কারেন্ট চলে এল। আর আমি দেখলাম, মহম্মদি বেগ নয়, আয়নায় আমার প্রতিফলন মোমবাতির আলোআঁধারিতে ওইরকম ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল।

সেইদিন একটা কথা বুঝেছিলাম,ভূতকে আমরা যতোই ভয় পাই আর এড়িয়ে চলি না কেন, মনেমনে কিন্তু আমরা ভূতের ভক্ত । অনেকটা মনোবিশারদ গিরীন্দ্রশেখর বসুর "বিপরীত ইচ্ছাতত্ত্ব" মানলে, ভূতের প্রতি আমাদের ততোটাই ঘৃণা, যতোটা তার প্রতি ভালোবাসা। অবশ্য আয়নায় আত্মপ্রতিকৃতি দেখে চমকে ওঠাটা ঠিক "ভূতের ভয়" হিসেবে ধরা হয় না। ভূতের ভয়কে মনোবিজ্ঞানে "ফাজমোফোবিয়া" বলা হয়। অর আয়না দেখে চমকে ওঠাকে "স্পেক্ট্রোফোবিয়া"। যেকোনো বিষয়ে "ভয়" জাড়িত হলেই আমরা সেই বিষয়ের নামের পিছনে "ফোবিয়া" জুড়ে দিই (প্রাচীন গ্রীক শব্দ 'ফোবোস'এর অর্থ 'ভয়')। উঁচু জায়গায় ভয় হলে তা "অ্যাক্রোফোবিয়া"('অ্যাক্রো' অর্থাৎ উচ্চতা),মৃত্যুর ভয় হলো "থ্যানাটোফোবিয়া"('থ্যানাটস' মানে মৃত) প্রভৃতি। প্রতি ভয়ের জন্যই মনোগবেষকরা প্রতিকারের পরিকল্পনা করেছেন,ভূতের ভয় ছাড়া । কেন এমনটা হলো? দেখা যাক।

প্রথমত বলতে হয়, ভূতে ভয় যে আদৌ অস্বাভাবিক, এটা মানতেই অনেকে নারাজ। বিভিন্ন ধর্মে "ভূত প্রেত" ইতিমধ্যেই তাদের জায়গা পাকা করে ফেলেছে। পুনর্জন্ম থাকুক আর নাই থাকুক,মৃত্যুপরবর্তী জীবন যে আছেই, সে কথা কম বেশি সব ধর্মের মানুষই মেনে নেন। এমন একটি জীবন যখন আছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, তখন তার গতিপ্রকৃতি নিয়ে কৌতূহলের জন্ম হওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক । তাই কখনো প্ল্যানচেট,কখনো আবার তন্ত্রসাধনা দিয়ে তাকে জাগ্রত করার চেষ্টায় আমি অন্তত কোনও অস্বাভাবিকতা দেখি না। পারলৌকিক জন্ম যখন আছে,তখন পারলৌকিক আত্মাও থাকবেই, আর সকলেই "গুড বয়" হবে না। এইখান থেকেই ভূতপেত্নির জন্ম। আর এই কারণেই তা রোগের আয়ত্তে না এনে রোমাঞ্চের আয়ত্তে রাখতে পছন্দ করেছে মানুষ।

তবে একেবারেই যে মনোবিদরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন,এমন ভাবার কারণ নেই। পারলৌকিক আত্মা কি আদৌ আছে,না তা মানুষের মনগড়া, এই বিষয়ে ভাবতে ভাবতে মনোবিজ্ঞানে তৈরি হয়েছে "প্যারাসাইকোলজি"। কিন্তু প্রমাণ আর সমীক্ষার অভাবে তাকে বিজ্ঞানের আওতায় ফেলতে নারাজ অনেকেই। কেউকেউ আবার ভূতের ভয়কে মনে করেন "জাদুচিন্তা"র অংশ। মনোবৈজ্ঞানিকভাবে যাকে "ম্যাজিকাল থিংকিং" বলেন অনেকে। এই ধরনের চিন্তা  নিছক দুশ্চিন্তা ছাড়াও আরও অনেক ভয়ঙ্কর মনোরোগের দোসর হতে পারে। স্কিৎজোফ্রেনিয়া বা অ্যাকিউট সাইকোসিস হতে পারে। বিশেষজ্ঞর যুক্তি, বাস্তব আর চিন্তার মধ্যে যখন "লাইনচ্যুতি" ঘটবে,তখনই সেই চিন্তা উদ্ভট,অস্বাভাবিক, মনোরোগ। কিন্তু কে বলল ভূতপেতনি অবাস্তব? যদি সত্যিই থাকে তারা? প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন অনেকটা ডিম আর মুরগির গপ্পোর মতো!

          fearমনোগবেষকদের কাছে সব ভয়ের প্রতিকার আছে, বাদ                 পড়ছে কেবল ভূত। কেন?

বাস্তব হোক বা অবাস্তব,বাইশ বছর বাদে আমার মনজুড়ে একটাই প্রশ্ন। কেন মহম্মদি বেগই এলো সেইদিন?অন্য কেউও তো আসতে পারতো। মোটে পাঁচনম্বর প্রশ্নের উত্তরে শুধু নাম হয়ে থাকা একটা খলনায়ক কেন এত গুরুত্ব নিয়ে আমাকে দর্শন দিয়ে যাবেন? বেশ। তলিয়ে দেখা যাক। পলাশীর যুদ্ধে যুদ্ধপরবর্তী বর্ণনা বেশ ভয়ঙ্কর । যেভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করা হবে সিরাজৌদ্দলাকে, তা স্কটল্যান্ডের বাজারে ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ডের আদেশে বিদ্রোহী স্যার উইলিয়াম ওয়ালেসের কাটা হাত ঝুলিয়ে দেবার থেকে একবিন্দুও কম রোমহর্ষক নয়। সিরাজৌদ্দলাকে পড়তে পড়তে তার প্রতি মমতা বা অনুভাবনা একধরনের একত্বিকরণের প্রক্রিয়া তৈরি করছিল হয়তো মনেমনে। তারই অকালপ্রয়াণ ঘটালেন মহম্মদি বেগ। এই সম্ভাবনা কি তবে নিজস্ব অস্তিত্বভাবনাকেও খানিকটা তলিয়ে দিল? অস্তিত্বসংকট থেকেই তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভীতির সৃষ্টি। তবে কি সেই অবচেতনের কারুশিল্পে তৈরি করলো সেইদিনের প্রেতাত্মাকে?

জিনপরি,বেম্বদত্যি,ডিমনদের আমরা ছেলেবেলা থেকেই গল্পের বইতে পড়ি,ঠাকুমাদাদুর কাছে শুনি  দখিনরায়ের গল্প।  কখনো কি তা ভয়ের জন্ম দেয় না?আর দিলে তা প্রকাশিত না হয়ে যদি অবচেতনে থেকে যায়? তাহলে আসল ভূতভূতুম কোথায়?বাইরে?না আমাদের মনের ভিতর!

যে কথোপকথনে এই ব্যবচ্ছেদ সম্ভব,তার নাম "কগনিটিভ টক থেরাপি"। অবচেতনের ভয়ের কারণ খুঁজে বের করা। কখনো তা শৈশবের যৌনলাঞ্ছনা,কখনো তা মৃত্যুভয়,কখনো বা মাদকাসক্তি,কখনো বা অপরাধবোধ। এই ভয়ের সঙ্গে সঙ্গত করতে গেলে শিখতে হবে যুতসই মোকাবিলার কৌশল। অন্য রকমভাবে ভাববার চেষ্টা। এই মোকাবিলার কৌশলের নাম "কোপিং স্কিল"। যার এই ক্ষমতা যতো বেশি,সে ততো সহজে মোকাবিলা করতে পারবে সংকটের। আরও একটি উপায় আছে। যেমন অবচেতন তৈরি করে দৃশ্যের। তেমনই প্রযুক্তি দিয়ে দৃশ্য তৈরি করা। পার্থক্য এটাই,যে এখানে প্রকাশের সুযোগ থাকবে,থাকবে বর্ণনার সুযোগ। আর থাকবে উত্তরণের পথ। মনোবিজ্ঞানে এর নাম "গাইডেড ইমেজারি"। কিন্তু এতোকিছু আলোচনার পরেও মনে ধুকপুক করতে থাকে। আবার মহম্মদি বেগ এসে আমাকে শাসিয়ে যাবে না তো?অবচেতনের দস্যুদানোরা ছড়িয়ে পড়বে না তো আশপাশে?পড়লে পড়ুক। ভালোই তো। বেশ শীতের গা ছমছমে রাতে পড়ে ফেলা যাবে ভুষুন্ডির মাঠ!মন্দ কী?যতোদিন অবচেতনের মানচিত্র অধরা থেকে যাচ্ছে, ভূতভূতমরা থাকুক না,কে মানা করেছে!

Sat 7 Sep 2019 12:58 IST | শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী