নেহরুর হিরো, মধুর প্রেমিক

জনতার হৃদয়ের মহান নায়ক দিলীপ কুমারের মৃত্যুতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল দুই তৃষিত প্রাণের আর্তি ছোঁয়া দিবা-রাত্রির গল্প আর মর্মান্তিক বেদনার বৃত্তান্ত। যা সত্যের চেয়েও বড়ো সত্য। সত্য হয়েও বাস্তব থেকে দূরে পড়ে রইল।  দিলীপ সাহেবের মৃত্যুতে শোকাহত গোটা বিশ্ব। খন্ডিত ভারত একাসনে বসে পড়ল তাঁর স্মরণে, তাঁর শেষকৃত্যে

neheru_dilip.png

♦ বি | শে | ষ |  প্র | ব | ন্ধ

শা ন্ত নু  চ ক্র ব র্তী

 

ভারতের স্বাধীনতা তখন সদ্য কৈশোরে, আমাদের সাহিত্যে, চিত্রকর্মে, সংগীতে বইছে নেহরু জমানার স্বপ্নস্রোত, চলচ্চিত্রেও নির্মিত হচ্ছে একই ঘরানার খোয়াবনামা। কাহিনি তৈরিতে, নায়ক-নায়িকার ভাব প্রকাশে দীপ্ত গান্ধিজির ভাবাদর্শ আর জওহরলালের ভারত নির্মাণের ইঙ্গিত। তখনই, দেশভাগের দুর্বিষহ ট্র‌্যাজেডিকে, তীব্র  বেদনাবোধকে অতিক্রম করে পেশোয়ার-সন্তান ইউসূফ খান ওরফে দিলীপকুমার স্বপ্নময় নেহরুর, ভারতীয় বহুত্বের রোল মডেল এবং জনশক্তি কাঙ্ক্ষিত নায়ক হয়ে উঠলেন। আত্মত্যাগ, জেদ, পৌরুষˆ তাঁর ব্যক্তিত্বের শোভা। সহঅভিনেত্রী পাঠানকন্যা মধুবালাও দিলীপের আদর্শ সঙ্গী। চলতে চলতে দুটি রাহ, দুটি পথ অভিন্ন হয়ে উঠল। একসময় শুরু হল একান্ত আলাপ আর পারস্পরিক সঙ্গ উদযাপন। কিন্তু মধুবালার দাপুটে বাবা আতাউল্লাহ খানের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপে কি থমকে গেল ওই নিবিড় সম্পর্ক? মুগল-এ-আজম-এর সেলিম কি অবাস্তব থেকে বাস্তব হয়ে উঠলেন মধু-দিলীপের অকথিত বন্ধুত্বের অন্তিম পর্বে?  
 
জনতার হৃদয়ের মহান নায়ক দিলীপ কুমারের মৃত্যুতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল দুই তৃষিত প্রাণের আর্তি ছোঁয়া দিবা-রাত্রির গল্প আর মর্মান্তিক বেদনার বৃত্তান্ত। যা সত্যের চেয়েও বড়ো সত্য। সত্য হয়েও বাস্তব থেকে দূরে পড়ে রইল। 
দিলীপ সাহেবের মৃত্যুতে শোকাহত গোটা বিশ্ব। খন্ডিত ভারত একাসনে বসে পড়ল তাঁর স্মরণে, তাঁর শেষকূত্যে। তার মানে প্রতিভা দেশ-কাল মানে না। মানে না দেশভাগ। মানে না হৃদয়ের ভাগাভাগি।

 
   
হৃদয়পুরের মহানায়ক

রাজেশ খান্নার মৃত্যুর পর তাঁর স্টার ইমেজের গহন রসায়ন, সাফল্যের গোপন রহস্য নিয়ে চারদিকে নানা মতামতের ঝড় বয়ে গেছে। নধর নরম-কমনীয় কান্তি, করুণ-কোমল-মায়াবী দুটি চোখ, উদাসী-বিরহী ট্র‌্যাজিক রোমান্টিকতা, এমনকি ঘাড় হেলানো-হাত দোলানো ম্যানারিজম পেরিয়ে পর্দায় ফুটে ওঠা অসহায়-ভঙ্গুর প্রেমিক রূপ – এই সব কিছুকেই তাঁর সুপারস্টার ইমেজ-এর ইউ এস পি। তবে শুধুই আবেগের ফেনিল উচছ্বাস নয়। গম্ভীর-সিরিয়াস সম্পাদকীয় কলমে সত্তর দশকের গোড়ায় এই ভারত-ভাসানো ‘রাজেশ ফেনোমেনন’-এর কিছু কিছু সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও ভেসে উঠেছে। এইসব  লেখায় রাজেশ হলেন উত্তর- নেহরু জমানার ভারতবর্ষেˆর হৃদয়পুরের মহানায়ক। কী করে তিনি এই জায়গাটায় এসে পৌঁছোলেন, কোথায় কীভাবে তথাকথিত নেহরু জমানার নায়কদের ছাপিয়ে গেলেন, সে ব্যাপারে অবশ্য খুব যুক্তিগ্রাহ্য সমাজ বিশ্লেষণ চোখে পড়েনি। তবে একটা মত খুব আলতো করে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পণ্ডিত নেহরুর মৃত্যুর পর ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে যেহেতু ভক্তি করার, ভরসা করার, অনুসরণ করার মতো ‘সর্বজনীন’ নেতা পাওয়া গেল না, তাই দেশের মানুষ সেলুলয়েডের ছায়াপুরুষকেই মহানায়ক বানিয়ে তাঁদের আইকন-এর অভাব পূরণ করল।

রাজেশ খান্নার ‘সুপারস্টারত্ব’-র রান্নাঘর যেমনই হোক, এইসব আলোচনা থেকে অন্তত একটা কথা উঠে আসছে–হিন্দি সিনেমায় ‘নেহরু জমানা’ বলে কিছু একটা ছিল। বলিউডে দুই মহাযুগের মাঝখানে হাইফেন-এর মতো কোথাও থেকেছেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। হাইফেন-এর পরে যে যুগটা’৬০-এর দশকের শেষˆ থেকে শুরু হয়েছিল, তার পয়লা ভাগের অবিসংবাদী ‘যুগপুরুষˆ’ যদি ‘রোমান্সের রাজা’ রাজেশ হন, দ্বিতীয় অর্ধে ‘যুগাবতার’ তাহলে অনিবার্যভাবেই ‘ক্রোধের সম্রাট’ অমিতাভ বচ্চন।

কিন্তু স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা যাঁরা লেখেন, তাঁরা ভারতীয় অর্থনীতিতে নেহরু যুগের অবসানের কালসীমা ধরেন মোটামুটি ১৯৯১-কে। ওই বছরেই সেকেলে, প্যাঁচালো সংশয়ী সমাজতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার জট থেকে এদেশের অর্থনীতির ‘মুক্তি’ ঘটেছিল এমনটা মনে করা হয়। প্রস্তুতি পর্বের সময়টুকু ধরলে ব্যাপারটাকে বড়োজোর ৫-৭ বছর পিছোনো যায়। মানে ওই’৮০-র দশকের মাঝামাঝি। সিনেমার সমাজতাত্ত্বিকরা কেউ কেউ বলেন, অর্থনীতির ওই ‘খোলা হাওয়া’-ই ভারতীয় রাজনীতি থেকে আদর্শবাদের শেষˆ কুটোটুকুও উড়িয়ে নিয়ে যায়। 

 

জ্বালা দো এ দুনিয়া

’৬০-এর দশকে মাঝামাঝি নয়া ভারত নির্মাণের টাটকা আশা-স্বপ্ন যখন একটু বাসি হয়েছে, ভারতের গণতন্ত্র- প্রগতি-উন্নয়ন-আন্তর্জাতিকতার জীবন্ত আইকন জওহরলাল নেহরুর শারীরিক উপস্থিতিও আর নেই– হিন্দি ছবিতে তখন থেকেই খাও-পিও-জিও-র এক ভরপুর মস্তি বা ফুর্তির দর্শন জাঁকিয়ে বসে। চকচকে বিদেশি গাড়ি, ঝলমলে বিদেশি লোকেশন। ’৫০-এর দশকের বলিউডি সিনেমার সেই দুঃখ-দারিদ্র‌্য-ত্যাগের দর্শন পাততাড়ি গোটাল। ব্যর্থ-হতাশ বিপ্লবী কবিকে তার সাজানো স্মরণসভার জলসায় এসে আর চিত্কার করে বলতে হয় না– ‘জ্বালা দো এ দুনিয়া...!’
বরং হাসিখুশি, ছটফটে, সুখী, তৃপ্ত নায়ক পাহাড়ের মাথা থেকে ‘ইয়াহু...’ বলে উচছ্বসিত হাঁক পাড়ে।
নতুন দশকের হিন্দি ছরি নাম আর ‘ফুটপাথ’ বা ‘বুট পালিশ’ হয় না। রং ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’ বা ‘লভ ইন টোকিও’ -য় নতুন যুগের ভারতীয় নায়ক-নায়িকারা বিদেশি আউটডোরে দেশি রোমান্সের নন্দনকানন রচনা করেন। সেই স্বর্গে আমেরিকার গম সরবরাহের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকা ক্ষুধার্ত ভারতবর্ষˆ তার দিন-গুজরানের তেল-কালি, নোংরা-ঝুল সুদ্ধ ঘেঁষতেই পায় না, সুপারস্টার রাজেশ আসলে এই দশকেরই প্রোডাক্ট।

 

বলিউডের ত্রিমূর্তি

কিন্তু এতক্ষণ যে আলোচনাটা করছিলাম, সেটা তো বলিউডের ধারাবাহিক কিন্তু অনিবার্য নেহরুবর্জন নিয়ে। অথচ খুঁজতে বেরিয়েছিলাম বলিউডের নেহরুকাল, সেই যুগের প্রত্নচিহ্ণ, সেকালের নায়ক-আইকনদের! নেহরুহীন ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা রোল মডেলের অভাব। যেজন্য দেশসুদ্ধ লোক রাজেশ-অমিতাভের চুলের ছাঁট, শার্টের ঝুল, পাঞ্জাবির কলার, এসব নকল করত। নেহরু যুগে আবার উলটোটাই সমস্যা ছিল। স্বাধীনতার তখনও কিশোরবেলা। দেশের জন্য আত্মত্যাগের নস্টালজিয়া, আবার নতুন-ভারতের স্বপ্ন, দুই-ই তখন সমান তাজা। পাড়ায়-পাড়ায় অলিতে-গলিতে একটু খুঁজলেই ইংরেজ আমলে জেলে গেছেন, বা নিদেনপক্ষে গান্ধিজির ‘সিপাহি’ হয়ে ব্রিটিশ-পুলিশের লাঠি খেয়েছেন, এমন লোক পাওয়া যেত। 

রোল মডেল হিসেবে গান্ধি-সুভাষ-নেহরু-আজাদ-ভগত সিং-এর নাম ঝট্ করে যে-কোনো সময় পেড়ে আনা যায়। নেতাজি নিখোঁজ, কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্বের ‘মিথ’ তখনও ভীষণ টাটকা। এদিকে বলিউডও তখন দাঙ্গা-দেশভাগ-গান্ধিহত্যা-আইপিটিএ-র কমিউনিস্ট বিপ্লবের স্বপ্ন, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পরিকল্পিত অর্থনীতি, স্টুডিও ব্যবস্থার অবসান, তারকাপ্রথার উদয় ইত্যাদি হরেক বাখরা সামলে-সুমলে নতুন দিশা খুঁজছে। বলিউডের এই দিক-সন্ধানের কাল, এই থিতু হওয়ার সময়টাই হল নেহরু যুগ। ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ সাল অবধি এই যুগের বিস্তার। যদিও নেহরু ১৯৬৪ সাল অবধি বেঁচেছিলেন। কিন্তু ১৯৬২-র চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পর রাষ্ট্র‌ব্যবস্থায় নেহরুর আগেকার কর্তৃত্ব ছিল না।

এই সময়ে আমাদের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতির দুনিয়ায় ছোটো-বড়ো-মাঝারি রোল মডেলদের পাশাপাশি বলিউডে চলছিল ত্রিমূর্তি বা ত্রিদেবের নায়ক-রাজ। এই তিনজন হলেন– রাজ কাপুর, দেব আনন্দ আর দিলীপকুমার। এই তিনমূর্তির তারকা-জীবনে কিছু কিছু মৌলিক মিল আছে। যেমন আজকের বলিউডের ৩ খানের মতোই এঁরা তিন জনও প্রায় সমবয়সি। প্রত্যেকেরই ফিল্মি কেরিয়ারের শুরু মোটামুটি ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি। দিলীপকুমার হয়ত একটু আগে শুরু করেছিলেন, বাকি দুজন বছর দুয়েক বাদে। তিন জনেরই পৈতৃক বাড়ি পাকিস্তানে। রাজ আর দেবের পাঞ্জাবে, দিলীপকুমারের পেশোয়ারে। সেদিক থেকে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর সীমান্তের এধারে স্বাধীন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে গণ-সংস্কৃতি ও জন পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে যে বদলটা ঘটে, বলিউডের এই তিন নায়ককে সেই ‘পরিবর্তনের মুখ’ বলা যেতে পারে। পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ থেকে সেই সময়েই যে বিপুল গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন মানুষের ঢল এসেছিল, ‘দেশ’-হারানো শিকড়-খোয়ানো সেইসব জনতার কাছে দেব আনন্দ, রাজ কাপুর, দিলীপকুমার হয়ে উঠেছিলেন একই বেরাদরির ভাই-বন্ধু। এদের সঙ্গে যেন ফেলে-আসা লাহৌর, করাচি বা পেশোয়ারের গপ্পো করা যায়– স্মৃতি বিনিময় চলে! পাশাপাশি সদ্য সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা, রক্তস্রোত পেরিয়ে আসা মানুষজন রাজ কাপুরের হিন্দু পাঞ্জাবি আইডেনটিটি বা ইউসূফ দিলীপকুমারের পাঠানি পরিচয় নিয়েও অন্য একটা ভাগাভাগি হয়ত শুরু করে দিয়েছিল। সম্প্রদায়ে অচেতনে কোথাও হয়ত শিবিরি বিভাজনের গোপন খেলাটা চলছিল, কিন্তু সে প্রসঙ্গ পরে। তার আগে আমরা দেখে নেব, বলিউডের তথাকথিত নেহরু-যুগের এই ৩ নায়কের ‘রীল’ ও ‘রিয়েল’ জীবনে পণ্ডিত নেহরু তাঁর স্বদেশ ও আধুনিকতার চিন্তা-চেতনা নিয়ে কোথায়, কীভাবে, কতটা ছিলেন।

উজ্জ্বল অথচ নিঃসঙ্গ

পর্দার বাইরে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই তিন নায়কের সম্পর্কটা সহজ, স্বাভাবিক, সৌজন্যমূলক ছিল। সরকারের তরফে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দিলীপ-রাজ-দেবরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সাড়া দিয়েছেন। পুরোনো কাগজের ফাইলে পত্র-পত্রিকায় নেহরুর সঙ্গে তিন তারকার নানা মুডের ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার একাধিক ছবি দেখা যায়। নেহরুর ডাকে সাড়া দিয়ে তিন জন একসঙ্গে, আলাদাভাবে দিল্লি এসেছেন বা নিজেদের উদ্যোগে বলিউডের নানান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। নেহরু আমলে বলিউডের এই ত্রিদেব, ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক হিসেবেই গণ্য হতেন। পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেব আনন্দ এং দিলীপকুমারের সঙ্গে সরকার বা শাসকদলের সম্পর্কটা সহজ-মসৃণ থাকেনি। জরুরি অবস্থার সময়ে ইন্দিরা গান্ধি, নেহরু-জমানার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর যে আঘাত-আক্রমণ নামিয়ে এনেছিলেন, দেব আনন্দ তার প্রতিবাদ করেছিলেন। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণ করার পর দিলীপকুমারের ‘দেশপ্রেম’ নিয়ে পশ্ন উঠেছিল। এবং সে গুঞ্জনে যে শুধু সংঘ পরিারের ক্রুদ্ধ সুরই শোনা গিয়েছিল তা নয়, সেকুলার ফিশফাশও কিছু কম ছিল না।

কিন্তু সেসব তো ‘ডি-নেহরুনাইজেশন’ আমলের ব্যাপার! ভরা নেহরু-যুগে, প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন এই তিন তারার সিনেমায় তাঁর আদর্শ ও ভাবনাচিন্তার ছাপছোপ কেমন পড়ছিল? কেমনভাবে তাদের সিনেমায় প্রভাব ফেলছিল ‘চাচা’ নেহরুর নয়া ভারতনির্মাণ? দিলীপ-রাজ-দেবের জনপ্রিয় ছবিগুলো যে সময়টায় তৈরি হচেছ, সেই সময়টায় নতুন ভারতের অবিসংবাদী নেতা হিসেবে নেহরুর ভাবমূর্তিতেও একটা ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হচেছ। আন্তর্জাতিক আঙিনায় তিনি তখনো জোট-নিরপেক্ষ, শান্তিবাদী তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল, প্রগতিশীল মুখ। কিন্তু দেশে, নিজের দলের মধ্যেই এই সময়টায় তিনি ক্রমশই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছিলেন। সংসদে তিনি যে দলের নেতা, দেশের শাসক সেই কংগ্রেসের আগাপাশতলা রক্ষণশীল নেতায় ভর্তি। হিন্দু সিভিল কোড বিল থেকে শুরু করে সমাজ-সংসারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেহরুর বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে তাঁদের মত মেলেনি। কংগ্রেসের বাইরে আমেরিকা-ঘেঁষা দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ নেহরুর সমাজতন্ত্র ঘেঁষা বিদেশনীতি, উন্নয়নে সোভিয়েত মডেল নিয়ে বেজায় আপত্তি ছিল। উলটোদিকে আবার কমিউনিস্টরা মনে করতেন তিনি যথেষ্ট ‘বিপ্লবী’ নন। কংগ্রেসের ভিতরে-বাইরে দক্ষিণপন্থী আক্রমণ থেকে নেহরুকে বাঁচাতে তাঁরাও সেভাবে এগিয়ে আসেননি। তাঁর প্রগতি কর্মসূচিতে পাশে পাননি জননেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকেও। সব মিলিয়ে নেহরু তখন ভারতীয় রাজনীতির ক্লান্ত, বৃদ্ধ ‘হ্যামলেট’---দেশশুদ্ধ লোক যাঁকে ভুল বুঝেছে। অথচ অভিমানে সরে যাওয়ার জায়গাও তাঁর নেই। যাঁরা তাঁকে পছন্দ করেন, ধস্ত-আক্রান্ত নেহরুকে দেখে তাঁদের কষ্ট হচিছল। তাঁরাও ভাবতেন, নেহরু সৎ-রোমান্টিক-প্রগতিবাদী-কিন্তু সিস্টেমে কোথাও একটা বড়ো রকম গলদ আছে। রাজ কাপুর বা দেব আনন্দের সিনেমায় আমরা এই রকম নায়কদের খুঁজে পাচিছলাম, যাঁরা প্রিয় নেহরুর নেশন-নির্মাণের পক্রিয়ায় যুক্ত হতে চান-কিন্তু ‘সিস্টেম’ তাঁদের বাধা দিচেছ। তাঁদের হতাশ, বিভ্রান্ত, এমনকি বিপথগামীও (‘শ্রী ৪২০’ ছবিতে রাজ প্রতারণায় জড়িয়ে যাচেছ) করছে। এই ‘সিস্টেম’ যে সসময়ই সরাসরি রাষ্ট্র‌ব্যবস্থা তা নয়। বলিউডি সিনেমার সমাজতাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন রাজকাপুরের ছবিতে এই অনড়, জগদ্দল ‘সিস্টেম’ হল, জেদি-গোঁয়ার রক্ষণশীল পিতৃতন্ত্র। সমাজ-পরিবারের স্বঘোষিˆত অভিভাকদের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া, গা-জোয়ারি স্বৈরতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার বাঁধ দিয়ে নেহরুর স্বপ্নের নেশন-নির্মাণের যৌনজলধিতরঙ্গকে রুখে দিয়েছিল! টগবগে যৌবন যদি পারিবারিক কর্তৃত্ববাদের বাহারি টবে শুকিযে মরে, তাহলে তারুণ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কারা?

নার্গিসের হাত আর কল্পভূমির সাধন

রাজকাপুর তাই ঘরছাড়া, অভিমানী, ভবঘুরে– বড়ো শহর যাকে বৈশ্যতন্ত্রের পাঠ দেয়, টাকার মন্ত্রে তার মগজ ধোলাই করে, তাকে ‘ধনবাদী’ পাপের পথে ঠেলে দেয়। বলিউডি ‘নতুন যৌবনের দূত’ দেব আনন্দ আবার নেহরুবাদের ব্যর্থতা খুঁজে পাচেছন, রাজনীতি-প্রশাসনের অন্দরমহলের আকণ্ঠ দুর্নীতিতে, নেতা আমলাদের ধান্দাবাজ দ্বিচারিতায়, সিস্টেম-এর চূড়ান্ত অপদার্থতায়। নেহরুর ‘সমাজতান্ত্রিক’ দুর্নীতিমুক্ত ভারতের প্রতিশ্রুতিতে ছিল, কালোবাজারি-মজুতদারদের ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানো হবে। যথারীতি কালোবাজারিরা বহাল তবিয়তেই স্বাধীন ভারতে রাজ করেছে। ফাঁসি দূরে থাকুক, নেহরু তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়ারও ব্যবস্থা করেননি। দেব আনন্দের ‘কালাবাজার’ বা ‘সিআইডি’-তে নেহরু জমানার উজ্জ্বল আলোর নিচে আঁধার রাজত্বের দাবি উঠে এসেছে। তবে রাজকাপুরের আপনভোলা ‘ট্র‌্যাম্প’ যে ‘শ্রী ৪২০’-র শেষেˆ তাঁর প্রেমিকা নার্গিসের হাত ধরে, পাপ ও বিলাসের আঁধারনগরী ছেড়ে, কোনো সমাজতান্ত্রিক ইউটোপিয়ার কল্পভূমির খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। নাগরিক-যুবার দেব আনন্দ কিন্তু ‘জরা হটকে, জরা বচকে’ বলেও ‘বোম্বাই’ নগরীতে শিকড় গেড়েই নেহরুর নেশন নির্মাণ প্রকল্পের শরীর থেকে জঞ্জাল সরাতে লেগে যান। তাঁর  ছবিগুলো যেন নেহরু-জমানার প্রতি একটা চেতাবনি– সতর্কবার্তা। যেন তিনি নেহরুকে বলছেন– আপনার রাজত্বে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে না! দেশকে প্রগতি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে আর একটু সাহস, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব দরকার– ‘সি আই ডি’ ছরি গোয়েন্দা অফিসার শেখর-এর মতো।

ভারত নির্মাণের সঙ্গী

রাজ কাপুরের ‘রাজ’ যখন বড়ো শহরে এসে ধনতান্ত্রিক উন্নয়নের নানান রকমসকম, ফন্দিফিকির দেখে বিভ্রান্ত-সন্ত্রস্ত্র-হতাশ, দেব আনন্দের ‘শেখর’ যখন চাইছে নব-ভারতের নতুন ‘নেশন নির্মাণ’ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির উদ্যোগ এবং বিকাশ আরো বেশি গুরুত্ব পাচেছ, তখন দিলীপকুমারের চরিত্ররা ‘মেট্রো’ শহর থেকে অনেক দূরে ভারতের গ্রাম-মফস্সলে বসে নেশন-নির্মাণের অন্য এক গল্প শোনাচেছন। দিলীপকুমার তাঁর গোটা কেরিয়ারে কটা ছবিতে শহুরে নায়ক সেজেছেন, সেটা বোধহয় হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়। নূরজাহানের সঙ্গে ১৯৪৭-এর ছবি ‘জুগনু’-তে তিনি ছিলেন শহুরে কলেজ ছাত্র। ছবির বিষয় সেই সময়ের ক্যাম্পাস প্রেম। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এহেন খুল্লমখুল্লা ঢলাঢলি, ‘দুঃসাহসী নির্লজ্জ’ রোমান্স দেখে সুশীলসমাজ খেপে লাল! দিলীপকুমার-নূরজাহান যদি পর্দায় অমন করেন, দেশে-পরিবারে আর ‘ডিসিপ্লিন’ বলে কিছু থাকবে? কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কায় বিপন্ন অভিভাবককুল সেই সময়ের বোম্বাই প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের কাছে হত্যে দিয়ে পড়লেন। গণরুচি ‘কলুষিত’, পরিবার তথা রাষ্ট্রকে ‘কলঙ্কিত’ করার দায়ে মন্ত্রীমশাই মুম্বই প্রদেশে ‘জুগনু’-র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে দিলেন। স্বাধীন ভারতে রাষ্ট্রের পেশিশক্তির সঙ্গে দিলীপকুমারের সেই প্রথম পরিচয়। ঘটনাচক্রে, কংগেসের ভেতরে যে চরম দক্ষিণপন্থী, রক্ষণশীল, মৌলবাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন গোষ্ঠীটার সঙ্গে নেহরুকে মতাদর্শের লড়াইটা শুরু করতে হয়েছিল, মোরারজিভাই তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করতেন!

১৯৪৮-এর ছবি ‘শহিদ’-এ দিলীপকুমার যে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার শৈশব-কৈশোরের ‘আইডল’ ছিলেন কংগেসের নেতা, স্বাধীনতার যোদ্ধা পণ্ডিত নেহরু। সে বড়ো হয়ে জওহরলালের মতো নেতা হতে চাইত। আর তার বাল্যসঙ্গিনী নিজেকে ভারত কমলা নেহরু। সেদিক থেকে নেহরু যেন এ ছবিতে রাম-কৃষ্ণের মতোই পুরাণ কথার নায়ক কিংবা রূপকথার রাজকুমার। কিন্তু এ ছবির নেহরুভক্ত গায়ক কিন্তু বড়ো হয়ে গান্ধি-নেহরুর অহিংস আন্দোলনের রাস্তা ছেড়ে সন্ত্রাসবাদী সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেয়। এ ছবির পটভূমি ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন। কিন্তু ছবির থিম সং ‘ওয়াতন কি রাহ মে’-র ভিস্যুয়ালে বিপ্লবী রাম-এর নেতৃত্বে সাঁজোয়া গাড়ি ও সামরিক উর্দি-পরা রাইফেলধারী স্বেচছাসেকদের নিয়ে মার্চপাস্টের দৃশ্য রং নেহরুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাজি। সুভাষের আজাদ হিন্দ বাহিনীর কথা মনে পড়িয়ে দেয়। তবে রাম অহিংসার পথ ছেড়ে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকলেও ছবির আগাগোড়াই গান্ধিবাদী বিবেকে হিসেবে থেকে যান এক কমিটেড কংগেস কর্মী গোপাল ভাইয়া। রাম-এর সঙ্গে তার সারাক্ষণই অহিংসা বনাম সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ডিসকাস চলে। ছবির শেষেও হনন-মৃত্যু-রক্তপাতের সিলসিলা, দিশাহীন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের অর্থহীনতা, জীবনের অপচয়কেই তুলে ধরে।

আসলে ব্যক্তি দিলীপকুমারও আশৈশব গান্ধিভক্ত ছিলেন। গান্ধিজি অনশনে বসেছেন শুনলে পেশোয়ারি পাঠান ফল ব্যবসায়ী পরিবারের বালক-পুত্রটি নিজেও খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিতেন। ইউসূফ দিলীপকুমারের জীবনে ও সিনেমায় অদৃশ্য ‘নায়ক’ হিসেবে থেকেই গেছেন মহাত্মা গান্ধি। দিলীপকুমারের ছবির পর ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্র যখন নানাভাবে নেহরুর নেশন-নির্মাণ পক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছে-তখনো উইংসের ধারে তাদের ‘মেন্টর’ হিসেবে, জাতির জাগ্রত বিবেক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ-ক্ষুদ্র ছায়াটুকু মেলে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, ‘জাতির জনক’! আর এখানেই দেব আনন্দ বা রাজ কাপুরের সঙ্গে তফাৎ হয়ে যাচেছ দিলীপ কুমারের। রাজকাপুরের পৃথ্বীরাজ কাপুর ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সদস্য। প্রায় কিশোরবেলা থেকেই আইপিটিএ-র লোকজনের সঙ্গে রাজের ওঠাবসা। তাঁর কাহিনি-চিত্রনাট্যকার খাজা আহমেদ আব্বাস ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য এং বামপথী সংস্কৃতিক আন্দোলনের কেষ্টবিষ্টু। স্বাভাকিভাবেই নেহরুবাদী সমাজতন্ত্র সম্পর্কে সিপিআই ও বাম বুদ্ধিজীবীদের যে সংশয় ও অবিশ্বাস ছিল; আব্বাস রচিত রাজ কাপুরের চরিত্রগুলোর ভাবনাবৃত্তেও নেহরুবাদ সম্পর্কে সেইরকমই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সমালোচনা ছিল।
নাগরিক যৌবনের প্রতিনিধি দেব আনন্দের মধ্যে এই দোলাচলটা ছিল না। তবে আইপিটিএ আন্দোলনের অগ্রণী নেতা চেতন আনন্দের ভাই দেবও নাগরিক নায়কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নেহরুবাদের সমালোচক ছিলেন, তিনিও নেহরুকে পুরো ক্লিনচিট দিতে পারছেন না, কিন্তু দিলীপকুমারের ছবিতে তাঁর ‘ভয়েস অফ ডিসকনটেন্ট’ বা মতভেদের সুরটা অন্যরকম। সেই স্বাদে গ্রাম-ভারতে হেটো-মেঠো, চড়া-মোটা, গলার আওয়াজ মিশে যায়! সেই কণ্ঠস্বরে নেহরুর সদিচ্ছা, উন্নয়ন-ভাবনা নিয়ে কোথাও অনাস্থা বা অবিশ্বাস নেই। সেই আওয়াজ শুধু আধুনিক ভারতের রূপকারকে মনে করিয়ে দিতে চায়– নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আধুনিকীকরণের কর্মসূচি যেন ‘গান্ধিবুড়ো’, ‘গান্ধিবাবা’, ‘গান্ধি মহারাজ’-এর গ্রাম ভারতকে ভুলে না যায়। যন্ত্রায়ণ প্রগতির গতি যেন এত বেশি না হয়, গ্রামের মানুষˆ তাল রাখতে না পেরে, পিছিয়ে পড়ে– নিজেদের পরাজিত, অপাঙক্তেয়, বঞ্চিত ভাবতে শুরু না করে! ‘নয়া দৌর’-এ গাঁয়ে টাঙ্গাওয়ালা শঙ্করও শহর থেকে আসা অটোমেশন – যন্ত্রায়ণের ধ্বজাধারী মিল মালিক বাবুটিকে এই কথাই বলেছিল।
আমরা এখানে ‘দাগ’ ছবিটার কথা বলতে পারি। ১৯৫২ সালের এই ছবি আসলে একটি মদ্যপান বিরোধী ক্যাম্পেন। ‘নয়া দৌর’-এর মতো এখানেও দিলীপকুমারের নাম শঙ্কর। এই গাম্য যুবক চমত্কার মূর্তি বানায়। কিন্তু মদের নেশায় তার গোটা জীবনটাই তছনছ হয়ে যায়। এই ছেলেটি, যার সঙ্গে পৃথিবীর কারুর শত্রুতা নেই– নিজের দারিদ্র‌্য নিয়ে যার রাষ্ট্র, সমাজব্যবস্থা কারোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই– এই সৎ-সরল-প্রফুল্ল যুবকটি যে তার বৃদ্ধা-অসুস্থ মা-কে, প্রেমিকাকে অসম্ভব ভালোবাসে, নেশা কীভাবে তাকে দায়িত্ব, কর্তব্য, মমতা সব ভুলিয়ে  দেয়, ‘দাগ’ সেই কাহিনিই তুলে ধরেছে। শঙ্করের চরিত্রায়ণে দিলীপকুমারের অভিনয়ে সারল্য, আবেগ, অসহায়তা, সংদেনশীলতা এমন পরতে পরতে মাখামাখি হয়েছে যে দর্শকের এই চরিত্রটার প্রতি সহানুভূতি উথলে উঠেই, একই সঙ্গে এ ছবির মূল ভিলেন মদ্যপানের নেসার বিরুদ্ধে তৈরি হবে তীব্র জনমত। মনে রাখতে হবে, যে যখন ‘দাগ’ ছবি মুক্তি পাচেছ, সেই ১৯৫২-তেই ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হচেছ, কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন প্রদেশে তৈরি হচেছ কংগ্রেসি সরকার এবং তাদের অনেকেই নিজেদের রাজ্যে ‘প্রোহিবিশিন’ বা মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু করার কথা ভাবছে। সেক্ষেত্রে দিলীপকুমারের মতো তারকা অভিনীত এই ছবিটা তাদের হাতিয়ার হতেই পারত। সে সময়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক বাবুরাও প্যাটেলও ‘দাগ’-এর সমালোচনা করতে গিয়ে এরকমই একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। গান্ধিজিকে মৌলাবাদীদের ঘৃণার বুলেট থেকে রক্ষা করতে না পারলেও কংগেস-এর দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব, মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু করে গান্ধির স্মৃতি ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিলেন! ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’র লেখক, ভারতের বহুত্বাদী সংস্কৃতির প্রতি মর্যাদা দেখিয়ে সেই ‘অনৈতিহাসিক’ আবদারে সাড়া দেননি। দাগ ছবিতে দিলীপকুমারের দুর্দান্ত অভিনয়ে অ্যালকোহল-আসক্ত শঙ্করের ব্যক্তিগিত ট্র‌্যাজেডি থেকে একটা প্রতিরোধের শক্তি তৈরি হয়, নতুন জীবনে ফেরার একটা আশাবাদের জয় হয়। নেহরুর ভারত তো দুঃখজয়ী শরীরে-মনে সবল এই নতুন মানুষেরই সন্ধান করে। সেদিক থেকে ‘দাগ’-এও গান্ধির মদ্যপান নিবারণী আন্দোলনকে নেহরুর নেশন-নির্মাণের স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেন দিলীপ। এই ভারসাম্য ভিন্ন দুটি পথকে একটা সমন্বয়ের জায়গা নিয়ে আসা, দিলীপকুমারের ছবিতে যেটা বারবারই ঘটেছে। দিলীপকুমার যখন পর্দায় ‘বাগি’ ডাকাত তখনো তিনি রাষ্ট্রবিরোধী নন। স্থানীয় সাহুকার-জমিদারের শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধেই তাঁর যত প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের আইন ভাঙলে সাজা পেতে হত, এটাও তিনি মেনে নেন। ‘গঙ্গা যমুনা’-য় অনেক আবেগ, চোখের জলের নদী-সাগর পেরিয়ে পুলিশ-ভাই যমুনার সার্ভিস রিভলভার রাষ্ট্রীয় সরকারি বুলেট ডাকু গঙ্গা ওরফে দিলীপকুমারের শরীরে বেঁধে (প্রায় দেড় দশক পরে অমিতাভ বচ্চনের ‘দিওয়ার’ ছবিতে এই ঘটনাই রি-ওয়াইন্ড হয়ে আসে।পটভূমিটা শুধু গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে!)

রাষ্ট্রের প্রতি, ব্যবস্থার প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ আস্থা আনুগত্য নিয়েই গঙ্গা চোখ বোজে। ‘গঙ্গা যমুনা’-র কয়েক বছর আগের ছবি ‘আজাদ’-এও দিলীপকুমার ডাকু হয়ে আসলে আইন ও রাষ্ট্রেরই সহযোগী। তিনি আসলি ডাকুদের লুঠের মাল বেছে নিয়ে নিরাপদ  লকারে রাখেন এবং যথাসময়ে রাষ্ট্রেরই ব্যবস্থাপনায় সেটা মালিকদের কাছে ফেরৎ দেওয়ার বন্দোবস্তও করেন। তবে আজাদ-এর নামের মতোই ডাকাতের আইডেনটিটিটাও নকল, বানানো– তাই প্রেমিকা মীনাকুমারীর মতোই রাষ্ট্রের পুলিশের সঙ্গে কিছু রঙ্গ-রসিকতা করলেও, আইনের কাছে আত্মসমর্পণের কোনো প্রশ্নই এখানে থাকে না। আসল অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে হাজতে যায়– দেশে আইনের শাসন পতিষ্ঠিত হয়। ‘আজাদ’ ওরফে ‘খান সাহেব’ ওরফে ‘কুমার’ দিলীপকুমার যে-কোনো সাধারণ নাগরিকের মতো সুখে ঘরকন্না করতে থাকেন।

‘নয়া দৌর’-এ বিবেকহীন, অমানবিক যন্ত্রায়ণ তথা আধুনিকতার বিরুদ্ধে লড়তে নেমেও রাষ্ট্র বা ‘সিস্টেম’ সম্পর্কে আস্থা হারায়নি শঙ্করও। দিলীপকুমারের ছবিতে এর আগে কখনো গান্ধিজির গ্রামসমাজ আর নেহরুর আধুনিক ভারতের ধারণা এভাবে মুখোমুখি সংঘাতে আসেনি। এই ছবিটা শুরুই হচেছ গান্ধিজির মস্ত একটা উদ্ধৃতি দিয়ে যেখানে তিনি পরিষ্কার বলছেন– ‘প্রণহীন মেশিন’ যেন ভারতবর্ষের ‘সাত লক্ষ গ্রামে’ ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ‘জীবন্ত যন্ত্রের শ্রম ও রুজি’ ছিনিয়ে না নেয়। আবার শহর থেকে আসা নতুন মিল-মালিক মনে করছেন ‘অটোমেশন’ ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। এই মালিকের বাবা, গ্রামের সহৃদয়-শ্রমিকদরদী ‘শেঠজি’ বিশ্বাস করতেন– মালিকের পুঁজি ও শ্রমিকের মেহনত ‘বরাবর কি হিস্সেদার’। ফলে শ্রমিক-অশান্তি, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের কোনো জায়গাই ছিল না। কিন্তু শেঠজি তীর্থে গেলে, নতুন মালিক এসেই করাতকলের মেশিন বসিয়ে কাঠ-চেরাই শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দিলেন! টাঙ্গাওয়ালা শঙ্কর তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে গেলে মূলত তাকে জব্দ করতে স্টেশন থেকে গ্রাম অবধি বাস-সার্ভিস চালু করে ফেললেন। ফলে টাঙ্গাচালকদের জীবিকাও বিপন্ন হল। এই অবস্থায় শঙ্করের সঙ্গে মালিকের একটা চুক্ত হয়, শঙ্করের টাঙ্গা যদি মালিকের বাসকে দৌড়ে হারিয়ে দিতে পারে, তাহলে মালিক বাস সার্ভিস তুলে নেবে (অনেকটাই ‘লাগান’ ছবির শর্তের মতো)। টাঙ্গাকে বাসের সঙ্গে রেস দিতে গেলে নতুন রাস্তা চাই। আর গ্রামের লোকের স্বেচছাশ্রমে এই নতুন রাস্তা তৈরির উদ্যোগকে ঘিরেই গ্রামে শুরু হয় নতুন এক জীবনভাবনা, যা গান্ধিজির গ্রাম সমবায়, হিন্দ স্বরাজ ও নেহরুর স্বদেশি সমাজতন্ত্রের ধারণাকে একাকার করে দেয়।

হৃদয়ের নায়ক

গ্রামবাসীর হৃদয়ের শ্রম দিয়ে বানানো রাস্তায় ছুটে শঙ্করের টাঙ্গা মালিকের বাসকে হারিয়ে দেয়। কিন্তু তার পরেও শ্রেণি-সংঘাতের বদলে শঙ্কর মালিকের দিকে সহযোগিতার হাত এগিয়ে দেয়। মালিকও উপলব্ধি করে, গরিবের পেটে লাথি মেরে নয়, উন্নয়ন-আধুনিকীকরণ করতে হবে গরিবকে সঙ্গে নিয়েই। ১৯৫৭-র এই ছবি কিন্তু মিল মালিককে নয়---দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিˆকী পরিকল্পনা শুরুর বছরে, কেন্দ্রীয় ভারতকেও প্রান্তিক ভারত কণ্ঠস্বর শোনায়---আমাদের ভুলে যেও না, আমাদের দূরে ঠেলো না, আমাদের বাদ দিও না, আমাদের সঙ্গে নাও। ‘নয়া দৌর’-এর ‘সাথী হাত বঢ়ানা’ গানটির পিকচারাইজেশন তো বিশ-তিরিশ দশকের সেভিয়েত সিনেমাকে মনে করিয়ে দেয়।

শ্রমিক নারী-পুরুষ, পাশাপাশি কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে নতুন দেশ গড়ার কাজ করছে। ‘এক অকেলা থাক যায়েগা / মিল কর বোঝ্ উঠানা’-র মতো লাইন তো নতুন ভারতের পান্তিক মানুষেˆর কমিউনিটি জীবনের দৃপ্ত শ্লোগান। এই মানুষেˆরা, রাজকাপুরের হতাশ-দিকভ্রান্ত বামপন্থী রাজ বা দেব আনন্দের আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক ইন্ডিভিজুয়াল নয়। এরা নেহরুর মানুষˆ। দিলীপকুমার এদের নেতা, নায়ক, আইকন। এই দিলীপকুমার ভিলেনের মার খাওয়া ট্র‌্যাজিক-হিরো নন এই দিলীপকুমার  নয়া আধুনিক ভারতের নতুন আত্মশ্বিাসী গ্রামীণ যুবক– সংদেনশীল কিন্তু বলিষ্ঠ, আবেপ্রবণ কিন্তু ধীমান। এই দিলীপকুমার পর্দা কিংবা পর্দার বাইরে নিজেকে জানেন, নিজের পাবলিককেও চেনেন। এই দিলীপকুমার একজন সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ, যিনি অনেক লড়াই করে হিন্দু-শাসিত বলিউডে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। নেহরুর গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষˆ বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিল।

দিলীপকুমার ‘মুঘল-এ-আজম’-এর সেলিম ছাড়া কোনোদিন কোনো মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করেননি– ভারতীয় উপমহাদেশের জনতা তাঁকে চিরদিনের প্রাণের নায়ক মনে করে এসেছে। প্রবাসী পাকিস্তানি জিয়াউদ্দিন সর্দার ও অনাবাসী ভারতীয় লর্ড মেঘনাদ দেশাই– দুজনেই ইংল্যান্ডে বসে দিলীপকুমারকে নিয়ে তাঁদের মুগ্ধতার উচ্ছ্বাস বইয়ের চেহারায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তাঁর দেশপ্রেম, ভারতীয়ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কাদা ছেটান একদল ছিদ্রান্বেষী। – কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতবাসী এসব প্রলাপে কান দেয় না। তাঁদের কাছে দিলীপকুমার সেই সেকুলার-দেশপ্রেমিক ভারতীয় যাঁর হৃদয়ে আছেন মহাত্মা গান্ধি আর মননে-চেতনায় নেহরু কিন্তু তার পরেও একটা পশ্ন থেকে যায়। নেহরু তাত্ত্বিকভাবে বহুস্বরের ঐকতান বা বহু বৈচিত্র‌্যের মধ্যে ঐক্যের কথা বললেও ভারতবর্ষেরর জন্য তিনি যে ‘ঐক্যের’ স্বপ্ন দেখতেন, তার চেহারাটা আসলে হোমোজেনাস। বিরোধ বা সঙ্ঘাতের বিশেষ জায়গা সেখানে নেই। অথচ দিলীপকুমার তাঁর ছবির পর ছবিতে যে প্রান্তিক গ্রাম-ভারতের গল্প বলেছেন, সেখানে তো গরিব-বড়লোক ছাড়াও জাতপাতের অনেক ভাগাভাগি। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নানা চক্কর। ওদিকে নেহরুর আবার এ ব্যাপারটায় ভীষণ আপত্তি। সাধারণ নির্বাচনের সময় বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে কংগেস প্রার্থীদের যে তালিকা আসত, তাতে নামের পাশে জাতপাতের উল্লেখ থাকলেই নেহরু সাঙ্ঘাতিক রি-অ্যাক্ট করতেন। প্রায় খেপে যেতেন।

কী মধুর বিরহের ভার

এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে দিলীপকুমার অভিনীত গ্রামীণ নায়কেরা কী করে ব্যাপারটা সামলাতেন? এমনিতে জাতের নামে বজ্জাতি। ছোঁয়াছুঁয়ির বিষয় তো থেকেই বলিউডে উঠে এসেছে। অশোককুমার-দেবিকা রানির ‘অছুত কন্যা’ তো বলিউডের চিরকালের অন্যতম ক্লাসিক ছবি। স্বাধীনতার আগে বলিউডের আরো কয়েকটি ছবিতেও এই ধরনের সমস্যা উঠে এসেছে। কিন্তু স্বাধীন ভারতে নতুন নেশন নির্মাণের অভিনেতা কি এই সামাজিক ইস্যুগুলো এড়িয়ে যাবেন? নায়ক দিলীপ এখানে নেহরুকেই অনুসরণ করেছেন। তিনি গ্রামসমাজের এই ভাঙন, ভাগাভাগি-বিচ্ছিন্নতায় কাহিনি খোঁজেননি। বরং এই বিচ্ছিন্নতা-দূরত্বগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছেন। মেহবুব খানের ছবি ‘অমর’-এ দিলীপকুমার এক উদীয়মান আইনজীবী। উচ্চবর্ণের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। জজ সাহেবের মেয়ে মধুবালার সঙ্গে তার বিয়ের কথাও পাকা। ওদিকে গ্রামের নিম্নবর্ণের রূপসী মেয়ে লিম্মি মনে মনে দিলীপকে ভালোবাসে। অনগ্রসর জাতির মেয়েটির  রূপের চটক-চমক দিলীপের চোখে পড়লেও লিম্মির প্রতি তার কোনো দুর্বলতা ছিল না। কিন্তু এক ঝড়জলের রাতে ক্ষণিকের ‘ভুলে’ নায়ক মেয়েটিকে ধর্ষণ করে, বিবেকের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে মধুবালার কাছে তার অন্যায়ের  কথা, ‘পাপের’ কথা খুলে বলতে চায়। কিন্তু সুযোগ পায়না, ওদিকে লিম্মি তার লাঞ্ছিত শরীর, হৃত নারীত্ব নিয়ে একলা সব যন্ত্রণা সহ্য করে কিন্তু দিলীপের নাম কোথাও বলে না। শেষ অবধি দিলীপকে বাঁচাতেই মেয়েটি যখন মিথ্যে খুনের মামলায় দণ্ডিত হতে যাচেছ, তখন দিলীপ ভরা আদালতে পাপের স্বীকারোক্তি করে। এবং মধুাবালা নয়, নীচু জাতির মেয়ে লিম্মিকেই তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে।

গ্রামের মন্দিরে বিগ্রহ ও পুরোহিতকে সাক্ষী রেখে গ্রামীণ সংসার প্রথা আর লৌকিক ধর্মবিশ্বাসকে মর্যাদা দেখিয়ে পুরো কাজটা সম্পন্ন হয়। সামাজিক সঙ্ঘাত ও টেনশনের পরিস্থিতি এখানে মিলনের আবহে বদলে নেওয়া সম্ভব হয়। আর প্রিয়তামকে হারানোর ব্যক্তিগত দুঃখ লুকিয়ে উচ্চবর্ণীয়, উদার এলিট সমাজের তরফে এই সামাজিক ‘ন্যায়’ বা জাস্টিস প্রদানের কাজটা তদারক করে জজ সাহেবের মেয়ে মধুবালা। প্রসঙ্গত, ইতিহাসের এক করুণ কটাক্ষের কথা খানিকটা বলা প্রয়োজন। অসামান্য সুন্দরী, তেজস্বী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী মধুবালার সঙ্গে, বাস্তব জীবনেও শুভ মনোহর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে দিলীপকুমারের। আর তার অন্তিম বিষাদমগ্ন পরিণতি নির্মিত হয় মধুর বাবা আতাউল্লাহ খানের অপত্যাশিত হস্তক্ষেপে। যা মেনে নিতে পারেননি দিলীপকুমার। আবার তাঁরই আপসহীন পৌরষ দেখেও বাবার রায়-ই মানতে বাধ্য হয়েছিলেন মধুবালা। মেহবুব খানের ‘অমর’ ছায়াছবির নায়ক দিলীপ আর আম জনতার প্রিয় অভিনেতা দিলীপকুমারের চরিত্রের মধ্যে সাদৃশ্য ছিল না কোথাও। কিন্তু প্রেমের দৃশ্যে আগে তাড়িত অভিনয়ে মধুমেয় সংলাপে তাঁরা বারবার ছুঁয়ে গেছেন একে অন্যের আর্তিকে। পারিবারিক বাধ্যবাধকতা আর জেদের কাছে পরাজিত হয়ে অমর হয়ে আছে চলচ্চিত্র জগতের অন্দরমহলের এই প্রেম কাহিনি। দিলীপকুমার ভুলতে পারেননি তাঁর মধুকে। নিঃশব্দ উচ্চারণে, তাঁর স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসে মধুবালা। জীবন আর চিত্রকাহিনির বাস্তবতা– আনন্দ আর বিচেছদ ছুঁয়ে রইল দুজনকে। এ এক অবিশ্বাস্য সম্ভব। ‘মুঘল এ আজম’ এর সেলিম চরিত্রে দিলীপকুমারের অভিনয়ে উচ্চতা –আনারকলির ভূমিকায় মধুবালার প্রতিটি সরল উচ্চারণ স্মরণ করিয়ে দেয়, পারস্পরিক সমস্ত দূরত্ব অতিক্রম করে কী দুঃসাহসে, কী নিবিড়ি বন্ধনকে বরণ করেছেন এই দুই পাঠান সন্তান। এতো নিছক অভিনয় নয়, প্রেমের, বিরহের চিরজাগ্রত অভ্যিব্যক্তি।

বলিউডের নেহরু-যুগে হিন্দি ছবিতে একটা ছক তৈরি হয়েছিল। সেখানে সমাজ ভুল করতে পারে, তার ভুল শোধরানোর জন্য সমাজের বিরুদ্ধেও যাওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্র, ঈশ্বর ও ধর্ম তো ভুলভ্রান্তির ঊর্দ্ধে। তাদের কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা করা যায না। নেহরু যেহেতু তাঁর সেকুলার গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে ভীষণ স্পর্শকাতর ছিলেন, তাই তাঁর আমলে, অন্তত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নেশন-ঈশ্বর-ধর্ম এক্কবারে একাকার হয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু সমাজের ভারে, রাষ্ট্রবাসীর ভাবনায়, তারা একাকারই ছিল। এটা ঈশ্বরকে যেমন মান্যতা দিয়েছিল, রাষ্ট্রকেও তেমনি দিয়েছিল স্থিতি। নেহরুর ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস যেমনই হোক, আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্ততান্ত্রিক মগজে তাঁর গণতান্ত্রিক সমাজবাদের ভাবনাকে গাঁথতে গেলে এই স্থিতাবস্থার দরকার ছিল। এই ছকেই দিলীপকুমার অভিনীত ছবি গ্রাম্য পুকুরেও সামাজিক টেনশনের শ্যাওলা জমাতে পারেনি। নেহরুর স্বপ্নের মতোই দিলীপকুমারের ছবিতে গ্রামের ঐক্যের চেহারাটা হোমোজেনাস।

অবশ্য রাষ্ট্র এখানে বহিরাগতই। কিন্তু সে তো ঈশ্বরতুল্য। তার শাসন করার অধিকার স্বতঃসিদ্ধ। ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের ক্ষমতা অপার। ‘গঙ্গা যমুনা’-য় রাষ্ট্র তাই জমিদারের শ্যালককে লক-আপে ঢুকিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। তারপর গঙ্গার অনিবার্য শাস্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কর্তব্যপালন শেষ হয়। গান্ধিজি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক চেহারায় বিশ্বাস করতেন। আবার নেহরু মনে করতেন, রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকটা পরিবারের অভিভাকের মতো। দেশের নাগরিক তার সন্তানতুল্য। ‘গঙ্গা যমুনা’-তে গঙ্গার বাগী ডাকাত হয়ে যাওয়া আর ‘মুঘল-এ-আজম’-এ বাদশাহ আকবরের বিরুদ্ধে শাহজাদা সেলিমের বিদ্রোহে একইরকম গ্রাম্য, সরল, নাছোড় অভিমান দেখা যায়। আর রাষ্ট্র অভিভাক-পিতার রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে তার মোকাবিলা করে। ঘটনাচক্রে ‘মুঘল-এ-আজম’ আর ‘গঙ্গা যমুনা’– এই দুটি ছবিই ষাটের দশকের গোড়ার দিকের। বলিউডের নেহরু-যুগ তখন প্রায় গোধূলি লগ্নে। ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নেহরুর নেশন নির্মাণের পক্রিয়া ততদিনে প্রশ্নের মুখে। রাষ্ট্র ও সন্তানতুল্য নাগরিকও সেলিম আর আকবর বাদশাহর মতোই মুখোমুখি যুযুধান এসে দাঁড়িযেছে। নেহরুর হিরো দিলীপকুমার কিন্তু সেই পরিস্থিতির দিকে পেছন ফিরে থাকতে পারছেন না।

 

 

Wed 7 Jul 2021 17:16 IST | আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক