নির্বাক

Story_nirbak_td-sarkar.png

|গল্প|

৩১ মার্চ ইনটার্নশিপ শেষ হবে। তারপরেই মিলবে ডাক্তারের লাইসেন্স। সুব্রত গোড়াতেই, ঠিক করে রেখেছিল, এরপর আর উচ্চশিক্ষার পেছনে ছুটবে না, সরকারি  বা কর্পোরেট হাসপাতালে চাকরি করবে না। এমবিবিএস ডিগ্রিটা মূলধন করে প্রাইভেট প্রাক্টিস করবে। 

মিস্টার সত্যব্রত রায় অর্থাৎ সুব্রতর বাবা একজন ঘ্যাম লোক। নামজাদা ব্যারিস্টার, দুর্দান্ত পেশার পসার, সঙ্গে রাজনৈতির প্রতিপত্তি। শাসকদলের অন্দরমহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত। অহঙ্কার তাঁর অলঙ্কার। ঘরে বাইরে সর্বত্র আরোপিত ব্যক্তিত্বের মুখোশ পরে থাকেন। মামুলি পারাবারিক কথাও স্বাভাবিক ভাবে বলেন না। একদিন নৈশভোজের সময় জলদগম্ভীর কন্ঠে সুব্রতকে জিজ্ঞেস করলেন --- তোমার ইনটার্নশিপ তো শেষ হতে চলেছে। তারপর কি করবে, ঠিক করেছ ?

প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করব। চেম্বারের ব্যবস্থা করে রেখেছি। নম্র অথচ দৃঢ় স্বরে বাবার প্রশ্নের জবাব দিল সুব্রত। 

এখনই পয়সা রোজগারের তাড়া পড়ে গেল কেন? সংসারে কি টানাটানি চলছে? আমি যা বলছি শোন--- লন্ডন চলে যাও। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে এসো। সমাজে আলাদা কদর পাবে। তারপর প্র্যাক্টিস করো। আমার আপত্তি নেই। বরং খুশিই হব। আমাদের বংশে কেউ চাকুরে ছিলেন না। সবাই সফল পেশাদার। কাজটা কঠিন । নামের পাশে বিদেশি ডিগ্রি থাকলে পথ খানিকটা মসৃণ হয়। আমিও আইন পাস করে, বছর দুই গায়ে কালো কোট চাপিয়ে হাইকোর্টে একজন বড় উকিলের পেছন পেছন ঘোরাঘুরি করেছি।কিছুই হয়নি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ট বাবা আমাকে লন্ডন পাঠিয়ে দিলেন। চার পাঁচ বছর কাটিয়ে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে এলাম। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

সুব্রত আগের মতোই উত্তর দিল---বিদেশে যাব না। যা ঠিক করেছি, তাই করব। 

ছেলের ঔদ্ধত্যে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন বাবা। আমার কথা যখন শুনবে না পাড়ার ডাক্তার হয়েই থাক। উইশ ইউ গুডলাক।

কথাগুলি বলে উঠে গেলেন সত্যব্রত। পাত ছেড়ে উঠে যাওয়া, রাগ দেখানোর তার একটা বিশেষ কায়দা। কখনও মায়ের ওপর কখনও তার ওপর রাগ করার এই দৃশ্য ছোটোবেলা থেকে অনেক দেখেছে সুব্রত। পুরোটাই ইগোর ব্যাপার। তাঁর মনমতো কিছু না হলেই বিগড়ে যান। এটা বাড়ির কথা, অফিস কাছারিতে কী করেন জানে না সুব্রত। তবে পাড়ার লোক যে বাবাকে পছন্দ করে না, এটা তার অজানা নয়।

বছর দু-এক আগে হঠাৎ একদিন একজন প্রমোটার জাল নথি এবং গুন্ডা নিয়ে হাজির হলেন পাড়ার একরত্তি শিশু উদ্যানটার দখল করতে।পাড়ার লোক বাধা দিলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।মামলা গড়ায় আদালতে।এলাকার বেশ কিছু বাসিন্দা এসে আইনি সাহায্য চাইলেন সত্যব্রতর কাছে।  

উকিল বাবু বিশেষ আমল দিলেন না তাঁদের। তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন---আমার প্রত্যেক অ্যাপিয়ারেন্স-এর জন্য এক লাখ টাকা করে দিতে পারবেন? ভাবনা-চিন্তা করে আসুন। তারপর না হয় কথা হবে। শেষ পর্যন্ত মামলাটা লড়েছিলেন তিনি। তবে পাড়ার লোকের পক্ষে নয়, প্রমোটরের পক্ষে। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে যায়। মামলাটাও হারতে হয়। বাবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।পাড়ায় মুখ দেখাতে লজ্জা পেত সুব্রতর। ছোটোবেলা থেকে সে পাড়ায় সব কিছুতে জড়িয়ে বড়ো হয়েছে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, লক্ষ্মী-সরস্বতী পুজো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলো সবতেই থাকে সে। সুব্রতকে পাড়ার লোক খুব ভালোবাসে। পাড়ার আশপাশে চেম্বার খুলবে শুনে অনেকেই তাকে স্বাগত জানিয়েছে। উৎসাহ দিয়েছে। ডাক্তারি পড়ার সময় থেকে চিকিৎসা বিষয়ে পাড়ার মানুষগুলোকে সাহায্য করে আসছে। হাসপাতালে ভর্তি, উপযুক্ত ডাক্তারের নম্বর, জরুরি ওষুধ জোগাড়, খুচখাচ আরও অনেক কিছু।

চেম্বারের জন্য উপযুক্ত জায়গার খোঁজ তার সঙ্গে আরও অনেকেই করছিল। হঠাৎ করে অশীতিপর বৃদ্ধ হেমাঙ্গ চক্রবর্তী এসে হাজির। হাত ধরে বললেন, শুনলাম চেম্বারের জন্য জায়গা খুঁজছ। আমার চেম্বারে বস। পুরো পরিকাঠামো তৈরি। যত্ন নিয়ে সাজিয়েছিলাম। যদি প্রয়োজন বোধ করো তাহলে নিজের মনে করে অদল-বদল করে নিও। ভাড়া লাগবে না, তবে একটা অনুরোধ, গরিব মানুষগুলোকে দেখো। হেমাঙ্গ চক্রবর্তী প্রাক্তন আমলা।বিপত্নিক । একমাত্র পুত্র বিদেশে। গরিবদের সুস্বাস্থ্যের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে হোমিওপ্যাথি করতেন। এখন বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ। সজ্জন বৃদ্ধের অনুরোধ ফেলতে পারেন নি সুব্রত। তাঁর চেম্বার থেকে নিজের ডাক্তারি  শুরু করল সে।

গত দুবছর সত্যব্রত দলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন সত্যব্রত। পার্টি তাঁকে নারকেলবাগান কেন্দ্রে ইলেকশন লড়ার টিকিট দেওয়ার কথা দিয়েও রাখে নি। দলের সভাপতি হঠাৎ ডেকে পাঠালেন কেন? সামনের জুন মাসে দুটো কেন্দ্রে বাই ইলেকশন । তাদের কোন একটায় দাঁড় করাবেন ? মনে মনে ভাবলেন উকিল সাহেব। সময় মত দেখা করতে গেলেন। যা ভেবেছিলেন তা নয়। সভাপতি তাকে অনুরোধ করে বললেন---'সরকার মামলা মোকাদ্দমায় জেরবার'। আমাদের বর্তমান অ্যাডভোকেট জেনারেল গৌরীশঙ্কর বাবুর বয়স হয়েছে, অসুস্থ। চারদিক সামাল দিতে পারছেন না। বারবার অব্যাহতি চাইছেন। আপনি ছাড়া উপযুক্ত আর কাউকে খুঁজে পেলাম না। দায়িত্বটা আপনিই কাঁধে নিন। আর তো মাত্র কয়েকটা বছর। সামনের ইলেকশনে আপনি অবশ্যই দাঁড়াচ্ছেন। মন্ত্রী ও হচ্ছেন। যাচা লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে, রাজি হয়ে গেলেন সত্যব্রত। তার ব্যস্ততা আর গুমর আরও বাড়ল। 

দেখতে দেখতে প্রায়  বছর তিন কেটে গেল। সুব্রতর কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। দুদুটো চেম্বার সঙ্গে কল তো আছেই। দম ফেলার সময় পায় না। সত্যব্রতর ব্যস্ততা সদা তুঙ্গে। ব্যস্ততা না থাকলেও তিনি ব্যস্ত। অ্যাডভোকেট জেনারেল বলে কথা। সকাল আটটায় বেরিয়ে যান, রাত নটায় বাড়ি ফেরেন। কোনও কোনও দিন আরও দেরি হয়। 

কঙ্কনা অনেকদিন ধরে সত্যব্রতকে একটা কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। বলি বলি করেও বলতে পারছিলেন না। সাহস করে বলেই ফেললেন। ছেলেটার এবার বিয়ে দেওয়া উচিত। আঁতকে ওঠার মত বললেন সত্যব্রত ---কী বললে? ছেলের বিয়ে? আগে খোঁজ নাও বউকে খাওয়াতে পারবে কিনা। তাছাড়া সব সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিচ্ছে। বিয়েটাও করে নিতে বল। পাত্রী আমি দেখেই রেখেছিলাম। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এ পিএইচডি করছে। কোন মুখে বলব ডাঃ মুখার্জিকে। তিনি কি সামান্য একজন পাড়ার ডাক্তারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন? আমার প্ল্যান মাফিক বিদেশ থেকে পড়াশুনা করে এলে কোনও সমস্যা ছিল না। সুব্রত তখন চেম্বারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। বাবার কথাগুলো স্পষ্ট কানে গেল তার। 

ডাঃ মুরারি মুখার্জি কলকাতার প্রথম সারির অন্যতম হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও শল্যবিদ। সুব্রতর শিক্ষকও। আদর্শ পুরুষ। থার্ড ইয়ার থেকে স্যারের বাড়িতে যাতায়াত। তাঁর মেয়ে ইশিতার তখন ফার্স্ট ইয়ার। অর্থনীতির মেধাবী ছাত্রী। ছোটোবেলায় মাকে হারিয়েছে। বাবার খুব আদরের। স্যারের বাড়িতে যাতায়াতের সুবাদে সুব্রতর সঙ্গে তার একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল অতি সংগোপনে। তারপর সে চলে যায় লন্ডনে, উচ্চতর বিদ্যার্জনে। পাঠ শেষে ইদানিং ফিরে এসেছে নিজের শহরে। বিশ্ব ব্যাঙ্কে বড় চাকরির অফার পেয়েও করেনি। সুব্রতর জন্যই তার ফিরে আসা।


পাড়ায় ঢুকে দেখলেন বিরোধীদের পোস্টারে দেয়াল ছেয়ে গেছে। রাস্তায় আলো খুব কম। দু-একটা বাতি জ্বলছে, তাও টিম টিম করে। লেখাগুলি পড়া যাচ্ছে না।


 

ঈশিতা দক্ষিণ কলকাতার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে যোগ দিয়েছে। সুব্রতর সন্তোষপুরের চেম্বারের কথা সে জানে। বাড়ি ফেরার পথে মাঝে মাঝে ঢুঁ মারে সেখানে। রোগীর চাপ না থাকলে অনেকক্ষণ কথা বলে দুজন। ভিড় থাকলেও সুব্রত খানিক সময় বের করে নেয়। বিয়ের পরিকল্পনাটাও করে ফেলে তারা।
একদিন চেম্বার বন্ধ করার পর সুব্রতকে নিয়ে বাড়ি ফিরল ঈশিতা। 

ফিরতে এত দেরি হল আজ, জানতে চাইলেন বাবা?

দেখ, কাকে নিয়ে এসেছি। আমরা বিয়ে করতে চাই। মেয়ের কথায় একটু অবাক হলেন ডাক্তার মুখার্জি। প্রাক্তন ছাত্রটির সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের কথা জানা ছিল না তাঁর। বিস্ময় চেপে রেখে হাসিমুখে বললেন, বেশ তো। ভালো ছেলে সুব্রত। শুনেছি আজকাল চুটিয়ে প্রাকটিস করছে। নাম-ডাক হয়েছে। প্রচুর হাত যশ। ওর বাবাকেও চিনি। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল। ভদ্রলোক। অহঙ্কারি, উঁচু নাকবিশিষ্ট। তবু আজই ওঁর সঙ্গে কথা বলব। 

সুব্রত একটু ইতস্তত করে বলল---না স্যার! দয়া করে এ ব্যাপারে বাবার সঙ্গে কোনও কথা বলবেন না। বিয়েটা আমরা গোপনে করতে চাই, রেজিস্ট্রেশন হবে শুধু। কোনও জাকজমক নয়। 

ইশিতাও একমত। ডাঃ মুখার্জি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ---ঠিক আছে তোমাদের কথা মেনে নিলাম। কালই রেজিস্ট্রেশনের জন্য কথা বলব। তোমরা কোনও অন্যায় করছ না, তাহলে এত গোপনীয়তা কেন? রহস্যটা জানতে পারি?

এসব কথা থাক না এখন বাবা। আমি পরে তোমায় সব খুলে বলব, ঈশিতার আদুরে আবদার।

 
কথায় আছে বিয়ে ঠিক করতে নাকি লাখ কথা খরচ করতে হয়। সুব্রতকে তা করতে হল না।বাড়ি ফেরার পথে মায়ের বিষন্ন মুখখানা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। স্বামীকে ছেলের বিয়ে দেওয়ার কথা বলায় তাকে যেভাবে অপমানিত হতে হয়েছে, তারপর হাসিখুশি থাকা সম্ভব নয়। এবার বোধহয় মাকে খুশি করতে পারবে।কিন্ত মনে একটা ধন্দ। মায়ের কানে এখনই কথাটা তুলবে কি না! সোজা-সাপ্টা মানুষ। আবেগের বশে গোপন কথাটি ফাঁস করে দিলেই, সব মাটি। মনে মনে পিছিয়ে এল। এখনই মাকে কিছু বলবে না।

পরের দিনই ডাঃ মুখার্জি ফোন করে বিয়ের দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেন সুব্রতকে। এও জানালেন,  তাঁর কেয়াতলার বাড়িতে বিশেষ কয়েকজনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটা হবে। উপস্থিত থাকবে ওর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, ঈশিতার প্রিয় কয়েকজন বন্ধু। সুব্রতকেও বললেন তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে যেতে। এর দিনকয়েক বাদে সুব্রত সবে চেম্বার খুলেছে, হন্তদন্ত হয়ে ঈশিতার প্রবেশ। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আমাকে কয়েক ঘন্টা সময় দিতে পারবে? 

কেন? কেনাকেটা করতে হবে, তুমি সঙ্গে থাকলে সুবিধে হয়।

ভালই হল। আমারও কয়েকটা জিনিস কেনার আছে একসঙ্গে হয়ে যাবে। সুব্রত চেম্বারে কর্মরত ছেলেটিকে ডেকে কয়েকটি কথা বলে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য সাউথ সিটি মল। 

প্রথমে একটা রেস্তোরায় ঢুকল। সামান্য স্ন্যাকস, আর কফি খেয়ে কেনাকাটায় নামল। নামী গয়নার দোকানে ঢুকে ঈশিতার জন্য হার আর আংটি কিনল। ঈশিতাও আংটি কিনল হবুর আঙুলের মাপে। তারপর ধুতি-পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে অনেক সামগ্রী। শেষে কফি খেয়ে ঈশিতাকে ক্যাবে তুলে দিয়ে চেম্বারে ফিরে আসল।তখন রাত আটটা। বেশ কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছিল।

সেদিন বিকেলে একটা আলাদা স্বাদ খুঁজে পেল ডাক্তার সুব্রত। তারপর মাঝেমধ্যেই এরকম হতে থাকল। চেম্বার বাঙ্ক করে ঘন্টা দুই ঈশিতার সঙ্গে কাটিয়ে, তারপর আবার চেম্বারে ফেরা। দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। রোজকার মত সকালে চেম্বারে বেরিয়ে গেল সুব্রত।আজ বিকেলে বন্ধ থাকবে চেম্বার।

চারটে বেজে গেছে, ছেলেকে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে দেখে মা জানতে চাইল, কিরে সুবু চেম্বারে যাবি না? মাকে ঈশারায় কাছে ডেকে সুব্রত বলল---না মা, আজ চেম্বারে না। 
বিয়ে করতে যাব।
বলা নেই, কওয়া নেই বিয়ে করতে যাবি, এ কী কথা!
কেন? বাবাতো তোমাকে বলেছে 'ছেলেকে বল বিয়েটাও নিজেকে করে নিতে'। ভয় পেয়ো না। আজ রাতটা মুখে কুলুপ এটে রাখ। যেন কিছু জান না। 

বড়ো ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বর-বধূ বেশে কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাতটায় বাড়ি ঢুকল দুজন। সত্যব্রত বসার ঘরে আরাম কেদারায় বসে কাগজ পড়ছিলেন। সুব্রত ঈশিকাকে বলল ---প্রণাম করো উনি আমার বাবা। 
ছেলের কন্ঠস্বর শুনে চোখের সামনে থেকে কাগজটা নামিয়ে অবাক হলেন। 
বাবা,ওর নাম ঈশিতা। ডাঃ মুখার্জির মেয়ে। গতরাতে আমরা রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছি। 
সত্যব্রত মুখের ভুগোলটা পাল্টে গেল। অতিরিক্ত গম্ভীর গলায় বললেন---ওকে নিয়ে এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে নিয়ে যাও। তোমার মা জানে? 
পুত্র উত্তর দিল, না। 
শুনে বাবা গজগজ করে বললেন গুণধর ছেলে।  
সুব্রত নতুন বউকে মায়ের হেফাজতে দিয়ে পোশাক বদলে বেরিয়ে গেল চেম্বারের উদ্দেশে। তার হামবড়ো বাবা ভাবতে বসলেন---ছেলে এভাবে চুপিসারে বিয়েটা করল কেন? ওর বিয়ের কথায়, আমি একটু তুচ্ছ্য-তাচ্ছিল্য করেছিলাম বটে। আমাকে তারই জবাব দিল তবে, এভাবে। 

উকিল মানুষ। ছেলের উদ্দেশ্য বুঝতে দেরি হয়নি। এই নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করলেন না। অন্য একটা মতলব আঁটলেন। সামনে ইলেকশন। মহাজন সংযোগের একটা সুবর্ণ সুযোগ। ছেলের বিয়ের ছুতোয় কলকাতার কোনও বড়ো হোটেলে জম্পেস পার্টি থ্রো করবেন। আমন্ত্রণ জানাবেন সমাজের উচ্চবর্গের কিছু ব্যক্তিত্বকে। তবে এত গরম গরম নয়, কিছুদিন বাদে।

কয়েকমাস কেটে গেল। ব্যারিস্টার সত্যব্রত একদিন কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরলেন অন্য এক মেজাজ নিয়ে। অন্য এক মুখোশ পরে। পোশাক বদল করতে করতে গদগদ কন্ঠে স্ত্রীকে বললেন, আজ রাতে তোমার মেনু কী?
কঙ্কনার উত্তর, চিতল মাছের কালিয়া। 

আহা কতদিন চিতল মাছ খাইনা। সুবু ফিরেছে। বৌমা কোথায়? তার সাড়া শব্দ পাচ্ছি না?
কঙ্কনা বিস্মিত হলেন। প্রায় দুমাস হল নতুন বউ বাড়িতে এসেছে। এ পর্যন্ত একটা কখাও বলেননি। আজ একেবারে বউমা। সুব্রত বাড়ি ফিরল কি ফিরল না খোঁজ নেয় না কোনোদিন? আজ হঠাৎ কেন? লোকটার হল কী? সুস্থ আছেন তো? 

হাতমুখ ধুয়ে টিভির সামনে বসলেন সত্যব্রত। খবর শুনলেন। দশটায় হাজির হলেন ডাইনিং টেবিলে। খানিকবাদে সুব্রতও এসে বসল। খেতে খেতে স্ত্রীকে বললেন, বুঝলে কণা সুবুর বিয়েটা আর গোপন নেই। সহকর্মীদের অনেকেই চিমটি কাটছে। ছেলের বিয়েটা লুকিয়ে দিয়ে দিলেন? রোজ রোজ এসব কথা শুনতে ভাল লাগে না। তাই ভাবছি বড় একটা হোটেলে পার্টি দেব। বাছা বাছা কিছু লোককে ইনভাইট করব। তুমি কী বল?

কঙ্কনা বললেন---তুমি যা ভালো মনে কর তাই করো। আমি আর কী বলব।
সুবু তোর কি মত?
পার্টি তুমি দিতেই পার বাবা। কিন্তু সে পার্টিতে আমি, ঈশিতা থাকব না। 
ছেলের উদ্ধত আচরণে সত্যব্রত নতুন মুখোশটা ভেঙে চৌচির। তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন-তুমি কি আমার মান সম্মানের কথা একবারও ভাববে না? কুসন্তান কোথাকার...
শোন বাবা, বড়ো হোটেলে পার্টি দিয়ে কিছু উঁচুতলার মানুষের মনোরঞ্জন করলেই সম্মান বৃদ্ধিপায় না। সম্মান পেতে হলে...
থাক থাক, তোমাকে নীতি কথা শোনাতে হবে না। পাড়ায় দুদিন ডাক্তারি করে নিজেকে মহাপুরুষ ভাবতে শুরু করেছ।---বিরক্তি প্রকাশ করে খাবার টেবিল ত্যাগ করলেন। 
কঙ্কনা ভাবছিলেন ভাগ্যিস নতুন বউটা বাড়িতে নেই!
এ দৃশ্য দেখলে হয়তো ভয় পেয়ে যেত।

 ৩

পক্ষকাল ধরে ঢাকঢাক-গুড়গুড় চলছিল অবশেষে সাধারণ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন। গোড়াতেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সত্যব্রত। দেখা করলেন দলের সভাপতি আর চিফ মিনিস্টারের সঙ্গে। দুজনেই তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন নারকেল বাগান কেন্দ্রে, দধুচি দলুইকে আর সুযোগ দেওয়া হবে না।

নেতারা যাই বলুক নাম ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত প্রাকাশ্যে আসার বান্দা নন সত্যব্রত। ঠগের বাড়ির নেমন্ত্রণ আঁচলে বিশ্বাস। আগের বারের কথা ভুলে যান নি। চুপচাপ বসে থাকলেন না। দধিচি আর তার সাঙ্গ-পাঙ্গর নামে তোলাবাজি, অন্যের সম্পত্তি জবরদখল মত বেশ কিছু কেস কোর্টে ধামাচাপা দেওয়া আছে। আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়ে মামলাগুলি নতুন করে ভাসিয়ে দিলেন, ওদের ব্যতিব্যস্ত রাখতে। 

দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে সামান্য বিলম্ব হচ্ছিল। মনে মনে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিলেন সত্যব্রত, আবার এ ও ভাবছিলেন, এবারের পরিস্থিতিটা খুবই কঠিন। জেলায় জেলায় দলে বিদ্রোহের আবহ। টিকিট না পেলে সদলবলে পার্টি ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে নেতারা। সবকিছু সামাল দিয়ে তালিকা প্রকাশ করতে দেরি হতেই পারে। যাইহোক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পার্টি ঘোষণা করল ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত ৮টায় সাংবাদিক বৈঠক ডেকে প্রার্থী-তালিকা প্রকাশ করা হবে।

সত্যব্রত আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন সন্ধ্যেবেলায় পার্টি অফিসে যাবেন না। গ্রাম-গঞ্জ থেকে অনেক ক্যান্ডিডেট কাঙালের মতো এসে ভিড় জমাবে। তিনি তাদের সমগোত্রীয় হতে চান না। তাই আর পাঁচটা দিনের মতো সকালে এজলাসে বেরিয়ে গেলেন। মামলা তদারকি করলেন। রোজ যেসময় কোর্ট ছাড়েন সে সময়ই বেরিয়ে সোজা বসন্ত রায় রোডের চেম্বারে ফিরে এলেন। এখানে বসেই নিজের কানে খবরটা শুনবেন। তারপর চেয়ারম্যান আর সিএমকে ফোন করবেন। ধন্যবাদ জানাবেন। গাড়ি থেকে নেমেই ড্রাইভার কাম আর্দালি বনমালির হাতে টাকা দিয়ে বললেন---যা তো সাউথ ইন্ডিয়া রেস্তোরা থেকে কিছু খাবার আর কফি নিয়ে আয়, বড্ড খিদে পেয়েছে।রাত নটা-সাড়ে নটা পর্যন্ত এখানে থাকব।

সত্যব্রত টিভির সুইচ অন করে রিমোট নিয়ে বসে পড়লেন। নিউজচ্যানেল সফর করতে লাগলেন, রিমোটের বোতাম টিপে। কেউ যদি কোনও স্কুপ জোগাড় করতে পারে নিশ্চয় চেপে রাখবে না। একটা চ্যানেল পার্টি অফিসের ছবি দেখাল অনেকক্ষণ। মেন গেটের বাইরে জমাটি ভিড়। হতেই পারে, নেতাদের চেলা-চামুন্ডারা এসে ভিড় করেছে। নিচের প্রতীক্ষা কক্ষের ছবিও দেখাল। জেলাগুলির অনেক প্রার্থী বসে আছে। প্রত্যেকের মুখে উদ্বেগের ছাপ। উদ্বেগ তো থাকবেই। তাঁর নিজেরও কি নেই?

ঘড়ির কাঁটা গড়াচ্ছে। চ্যানেল গুলি বলতে শুরু করল,, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শাসকদল তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। শোনা যাচ্ছে অনেক চমক থাকবে এবারের তালিকায়। আটটা বাজল সাড়ে আটটা বাজল ঘোষণা আর হয় না। প্রায় নটার সময় জানা গেল অনিবার্য কারণে আজ তালিকা প্রকাশ করা হবে না। 
সত্যব্রত উঠে পড়লেন। বনমালিকে ডেকে বললেন-চল, বাড়ি ফিরব। পাড়ায় ঢুকে দেখলেন বিরোধীদের পোস্টারে দেয়াল ছেয়ে গেছে। রাস্তায় আলো খুব কম। দু-একটা বাতি জ্বলছে, তাও টিম টিম করে। লেখাগুলি পড়া যাচ্ছে না। বিরোধীরা এখানে কাকে দাঁড় করিয়েছে তার নামটা জানার ইচ্ছে হল সত্যব্রতর। বনমালিকে গাড়ি থামাতে বললেন। নেমে নর্দমা ডিঙিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে নামটা পড়ে অবাক এবং নির্বাক...

'নারকেল বাগান কেন্দ্রে আমাদের প্রার্থী জন-দরিদ্র, গরিবের বন্ধু পাড়ার ডাক্তার সুব্রত রায়কে ভোট দিন'।       

Sat 4 Jul 2020 23:33 IST | নিতাই চক্রবর্তী