কন্ঠহীনের কন্ঠস্বর

film-maker-noman-robin-creat-history-for-his-movie-3d-jender.jpg (124.8 কিলোবাইট)

নোমান রবিন। বাংলাদেশের তরুণ, প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। সাহিত্য আর ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। মূদুভাষী, দায়বদ্ধ এবং মুক্তিযুদেধের চেতনায় সমূদ্ধ। বলেন কম, শোনেন বেশি। দেশের রক্তাক্ত ইতিহাস, প্রায় পঞ্চাশ বছরের রক্তক্ষরণ, দাহ আর প্রান্তজনের চেনা অচেনা জগত তাঁর ক্যামেরায়, তাঁর গল্প বলার ভহ্গিতে উঠে আসে ভিন্নতর ভঙ্গিতে। স্বপ্ল কথনের আয়তনে। কখনও সীমার ভেতরে, কখনও সীমাকে অতিক্রম করে।

চলচ্চিত্র যাপনের শুরুতেই অভিনব আরম্ভ তৈরি হয় তাঁর দুঃসাহসী অভিযানে।২২ জুন ২০১২ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য হিজড়াদের নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র 'কমন জেন্ডার দ্যা ফিল্ম' । চলচ্চিত্রটির বিষয় ও গল্পবলার ধরন দেশ ও বিদেশে হইহই ফেলে দেয়। প্রদর্শিত হয় ৭১তম গোল্ডেন গ্লোব আওয়ার্ডস সহ পৃথিবীর নানা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিবেকবান জনসমাগমে। ছবিটির মুক্তির ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ২৩ জুন জাতীয় সংসদে হিজড়াদের জাতীয়পরিচয় 'তৃতীয়লিঙ্গ' বিল গৃহীত হয়। পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে হিজরাদের নাম ও জেন্ডার পরিচয় স্থান পায়। 

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নোমান রবিনের নাম উল্লেখ করে তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেছিলেন, আইন প্রণয়ন করে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা যায় না। এ জন্য চাই চলচ্চিত্র। কমন জেন্ডার দ্য ফিল্ম প্রমাণ করল যে চলচ্চিত্র শক্তিশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। পশ্চিমি মিডিয়া নোমান রবিনের প্রশংসা করে বলেছে, 'আ ভয়েজ ফর ভয়েস লেস'।  যাদের কণ্ঠ নেই, যাঁদের কান্না, চিৎকার সরকার তথা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌছায় না, নোমান রবিন তাঁদের কণ্ঠ ধারন করেন, তাঁদের কথা ক্যামেরা বন্দি করেন। জাগিয়ে তোলেন আমাদের।

এই যেমন, ২০১৮ সালে নোমান রবিনের নির্মিত রাজনৈতিক ফিল্ম 'ছাই থেকে ফুল' 'ব্লসমস ফ্রম অ্যাশ'। রোহিঙ্গা জনপদের ইতিহাস  ও প্রকট সমস্যা তুলে ধরে। আরাকান রাজ্যের ১২০০ বছরের ইতিকথা, সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ, অবস্থান, বসবাসহসহ প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ৫২ মিনিটের ভূ-রাজনৈতিক তথ্যচিত্র 'ব্লসমস ফ্রম অ্যাশ'। প্রযোজক একজন মার্কিন তরুণ এলেক্সব্লাম। ডক্যুমেন্টারি ফিল্মের অস্কার খ্যাত 'স্পেশাল জুরি রেমি' আওয়ার্ডে পেয়েছে এই চলচিত্র। এর আগে রেমি আওয়ার্ড পেয়েছেন স্পিল বার্গ, জর্জ লুকাস, জন লি হ্যানকক, অ্যাঙ লি, কুইন ব্রাদার্স প্রমুখ জগত বিখ্যাত নির্মাতারা। এই তালিকায় নোমানই বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বশেষ চিত্র নির্মাতা। 


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইন প্রণয়ন করে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা যায় না। এ জন্য চাই চলচ্চিত্র।


বাংলাদেশ মিডিয়ায় নোমানের যাত্রা শুরু ২০০৫ সালে, থ্রিডি এনিমেটর হিসেবে। স্থানীয় বিজ্ঞাপন ফিল্মে তখন থ্রিডি এনিমেশনের অনেক কদর।  ২০০৬ সালে তিনি প্রযোজক হিসেবে আবির্ভুত হন। ঐতিহাসিক চরিত্র ভিত্তিক পর পর দুটি টিভি সিরিয়াল প্রযোজনা করেন। একটি 'তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা অপরটি মাষ্টার দ্য সূর্য সেন। এর আগে কখনো বাংলাদেশের কোন সরকারী বা বেসরকারি টিভি চ্যনেলে কোনো ঐতিহাসিক গল্প নিয়ে টিভি সিরিয়াল নির্মিত হয়নি। একারণেই নোমান বাংলাদেশে গণমাধ্যমে আলোচ্য হয়ে ওঠেন। নিজের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও কাজের ধরন নিয়ে প্রচার বিমুখ নোমান বলেছেন, 'আিম ও আমার টিম সব সময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। যা কখনো আগে কেউ নির্মাণ করেনি, এমন বিষয়ে আমাদের আগ্রহ সর্বোচ্চ। যেমন ধরুন, দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র অঙ্গনে গল্প কপি করা বা রিমেক করার প্রাকটিস রয়েছে। ২০১১ সালে আমরা চিন্তা করলাম আমরাও একটি গল্প কপি করব এবং এমন একটি  গল্প কপি করব যা এই উপমহাদেশে নির্মিত হয়নি। ব্যস! বাচ্চাদের মত চিন্তা আর কাজ শুরু হল। হলিউডের মাল্টি মিলিয়ন ডলার ফিল্ম পাইরেটস অব ক্যারিবিয়ান ফিল্ম থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়ে স্বল্প বাজেটে নির্মান করলাম বাংলা পাইরেটস অর্থাৎ “পাইরেটস দ্য ব্লাড সিক্রেট”। প্রচণ্ড কষ্ট করে, প্রায় অসম্ভব একটি কাজ সম্ভব হয়ে উঠল । ঢাকার মাল্টি প্লেক্সে মুক্তি পায় এই চলচ্চিত্রটি। দর্শকরা মেতে উঠলেন। 'হলিউডের ফিল্মটিতে বাংলা ডাবিং খুব মানিয়েছে। একদম মিলে গেছে।' 

ততদিনে আমরা বুঝে গেছি, আমাদের দিয়ে সব সম্ভব। শুধু চাই ভাল প্রযোজক ও চলচ্চিত্রের বাজার।বাংলাদেশে চলচ্চিত্র চত্বরে অদৃশ্য কালো ছায়া ভর করেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ঢাকাইয়া প্রযোজক, পরিবেশ ও নির্মাতারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার অভাবে তলিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ভেতরের গল্প বা আসল গল্প অন্যরকম। আঘাত এসে পড়ছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে। আপাতত এর থেকে বেশি বলা যাচ্ছেনা। তবে আমার বিশ্বাস রাজনীতি জনগনের মানসিক ও আত্মিক প্রয়োজনে না হোক, রাজনীতি তার নিজের স্বার্থেই ঢাকার চলচ্চিত্র বাজারকে সংগঠিত আর সুগঠিত করবে বলে আমার বিশ্বাস। 

নোমান আশাবাদী স্রষ্টা। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে অভ্যস্ত, সমালোচকের দূষ্টিতে। তাঁর ধারনা, তাঁর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ 'দ্য অল টাইম হিরো'  ১০০ মিনিটের তথ্য চিত্র। ইংরেজি ভাষায় নির্মিত এই তথ্য চিত্রে ৩০০০ বছর আগের বাংলা থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত গল্প বলা হয়েছে। কেন তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, কীভাবে তার সংগ্রামী জীবন স্বাধীনতার পথে হেঁটে গেল, কেন তিনি বাকশাল গঠন করলেন, সোনার বাংলা গঠনে কী ছিল তাঁর মাষ্টার প্লান, ইত্যাদি নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থান, ঘটনা, চরিত্র, সমসাময়িক বিশ্বের রাজনীতিও বঙ্গবন্ধুর জেল জীবনের পাঞ্জেরি বিশ্লেষিত হয়েছে। 'দ্য অল টাইম হিরো' আমার চিন্তার জায়গাকে অনেক প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করেছে। 

করোনা মহামারির সঙ্কটকালেও বসে থাকেন নি নোমান।  হঠাৎ সেরে ফেললেন একটি অপূর্ন কাজ। গত ১১ জুলাই, ঢাকার সংবেদশীল তরুনী নায়লা বারীর হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করলেন, আমরা একসঙ্গে হাঁটব। কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে কথা বলব। এও এক নাটকীয়, মনোহর পথ চলার সিদ্ধান্ত। স্বামী-স্ত্রী দাম্পত্যের শুরু থেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন মেয়েদের ভেতরের সৌন্দর্যকে তাঁদের নিহিত শক্তিকে বাইরে নিয়ে এসে অন্যরকম নির্মাণে। বর্জিত প্লাস্টিক বোতল, জিন্স, প্যান্ট, মোবাইলওয়াস্ট, ই-ওয়েস্ট দিয়ে হ্যাডিক্রাফট তৈরিতে যুক্ত করে দিলেন সমাজের নানাস্তরের মহিলাদের। ধারাবাহিক টিভি নাটক আর চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে এটিও নোমানের একটি মহৎ মোহনা সৃষ্টির দৃষ্টান্ত। এভাবেই নারীর ভেতরের নারীকে, প্রকৃত নারীকে, মাতৃত্বকে  খুঁজছেন তিনি। এখানে তাঁর সহজসঙ্গী নায়লাবারী। মেয়েদের আত্মশক্তি তার নারীত্বের অন্তরসন্ধানী বঙ্গ কন্যা।

 

 

Mon 5 Apr 2021 17:32 IST | আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক