এক বিস্ময়কর, প্লেটোনিক সংস্পর্শের বৃত্তান্ত

Mira-and-Gandhi.png

১ অক্টোবর, ১৯২৫ ফরাসি লেখক ও চিন্তাবিদ রম্যাঁ রলাঁ ভিলন্যভ, সুইৎজারল্যান্ড থেকে বন্ধু মহাত্মা গান্ধিকে লিখছেন:


আপনি অনুগ্রহ করে যাকে আপনার আশ্রমে স্থান দিতে রাজি হয়েছেন সেই মাডলিন স্লেডকে খুব শীঘ্রই আপনি সবরমতী আশ্রমে স্বাগত জানাবেন। উনি আমার বোন ও আমার প্রিয় বন্ধু; আমি ওকে আমার আধ্যাত্মিক কন্যা হিসেবে দেখি এবং আনন্দিত যে ও আপনার নির্দেশের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে যাচ্ছে। এটা ওর পক্ষে যে কী ভালো হবে তা আমি জানি, এবং আমি নিশ্চিত যে আপনি ওর মধ্যে আপনার সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও অনুগত শিষ্যদের একজনকে দেখতে পাবেন। 


                                         আপনার
                                 রম্যাঁ রলাঁ


 
এই চিঠির উত্তরে ১৩ নভেম্বর, ১৯২৫ গান্ধিজি লিখছেন:

আপনার চিঠি পেয়েছি। মিস স্লেড তার পরপরই এসে পৌঁছেছেন। কী রত্ন আমার কাছে পাঠিয়েছেন আপনি! আমি এই বিশ্বাসের উপযুক্ত হতে চেষ্টা করব। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সেতু হয়ে উঠতে তাঁকে সাহায্য করার জন্য আমি চেষ্টার ত্রুটি করব না। শিষ্যমণ্ডলী গড়ে তোলার পক্ষে আমি তেমন নিখুঁত নই। উনি আমার সঙ্গে  সহ অনুসন্ধানী হবেন এবং বয়সে, ও সেই কারণে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায়, যেহেতু আমি বড়ো, আমি তাই আপনার সঙ্গে পিতৃত্বের সম্মান ভাগ করে নিতে চাই। মিস স্লেড ক্রমশ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেখাচ্ছেন এবং তাঁর সম্পর্কে আমাদের অস্বস্তির ভাব কাটিয়ে দিয়েছেন।     

কে এই মাডলিন স্লেড যিনি ইউরোপীয় হয়েও মহাত্মা গান্ধির সহযোগী হতে চেয়ে সবরমতী আশ্রমে হাজির হয়েছেন? কী সেই প্রেরণা যার ফলে তিনি প্রতীচ্যের বিলাসবহুল জীবনের আকর্ষণ উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় ভারতে এসেছেন কষ্টসাধ্য আশ্রম জীবনকে বেছে নিতে?

     মাডলিন জন্মেছিলেন ১৮৯২ সালে, এক অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন নৌবাহিনীতে। প্রথমে ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল, পরে অ্যাডমিরাল হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার ও রক্ষার কাজে তাঁকে প্রায়ই বিদেশের সমুদ্র উপকূলে কাটাতে হত। এ কারণে মাডলিনের মা শিশুদের নিয়ে তাঁর পিতার গ্রাম মিলটন হিদ-এর বাড়িতে গিয়ে বেশির ভাগ সময় থাকতেন। খুব ছোটো থেকেই মাডলিন ছিলেন কৌতূহলপ্রবণ। প্রকৃতির অজানা আহ্বান শুনতে চাইতেন। তিনি নির্জনে আগ্রহ নিয়ে শুনতে ভালোবাসতেন  পাখির ডাক, বৃক্ষের মধ্যে বয়ে চলা বাতাসের শব্দ। এভাবেই তিনি নিজের অপার আনন্দ খুঁজে পেতেন।

    একবার মাডলিনের বাবা তার জন্য কিনে দিয়েছিলেন একটি পিয়ানো-প্লেয়ার যাকে বলা হত অ্যাঞ্জেলাস পিয়ানোলা, আর এতেই তিনি শোনেন বিঠোফেনের সোনাটা অপাস ৩১ এর দুনম্বর কম্পোজিশন। এটা মাডলিনকে এত মুগ্ধ করে যে তিনি এটি বারবার শুনতে থাকেন। সোনাটার অন্য অংশগুলোও কিনে বাজিয়ে শুনতে থাকেন। নতুন এক অনুভূতির জন্ম হয় তাঁর মনে। এই অনুভূতি ছিল বেদনার। এমন বেদনার মুহূর্তে তিনি নিজেকে নির্জনতার সঙ্গী করতেন এবং ভাবতেন কেন তিনি এক শতক আগে বিঠোফেনের যুগে জন্মাননি। 

    রলাঁ তখন প্যারিসে থাকেন না। সুইজারল্যান্ডের ভিলন্যভে স্বেচ্ছানির্বাসনে বাস করছেন। রলাঁর ডায়েরি থেকে জানা যাচ্ছে যে মাডলিন তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন অক্টোবর, ১৯২৩এ। রলাঁ ডায়েরিতে বেশি কিছু লেখেননি। তবে মাডলিনের আত্মজীবনী থেকে জানা যাচ্ছে রলাঁ তাঁকে মহাত্মা গান্ধির ওপর তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার কথা জানান। তিনি লিখছেন—


    I looked blank. ‘You have not heard about him?’, ha asked. ‘No’, I replied. So he told me and added, ‘He is another Christ’.

এর পরের কথা মাডলিনের কথাতেই শোনা যাক :

রলাঁ যখন বাপু সম্পর্কে তাঁর বইটি ছাপা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন, তখনও, বইটি নিশ্চয় আমি পড়ব-- এর বেশি কোনো উপলব্ধি আমার ছিল না। তারপর বইটি যেদিন প্রকাশিত হল, আমি প্যারিসের লাটিন কোয়ার্টারে প্রকাশকের দোকানে গেছি। আমি তখন ওখানেই থাকতাম। গোটা শপ-উইন্ডোজুড়ে ছোটো বইটি রাখা ছিল, কমলা রঙের প্রচ্ছদের ওপর কালো কালিতে মুদ্রিত ‘মহাত্মা গান্ধি’। আমি একটি কপি কিনে আমার বাসায় নিয়ে এসে পড়তে শুরু করলাম। আর হাত থেকে নামিয়ে রাখতে পারলাম না। আমি পড়েই চললাম, আর যখন পড়ছি, আমার হৃদয়ের মধ্যে এক আলো ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল, এবং যখন পড়া শেষ করেছি, সত্যের সূর্য আমার আত্মার ওপরে কিরণ ঢেলে দিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে আমি জেনেছিলাম আমার জীবন বাপুর প্রতি উৎসর্গীকৃত হয়েছে। আমি যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তা তো এই।
                                                    (ভূমিকা, Bapu’s Letters to Mira, আহমেদাবাদ, ১৯৪৯)

আর দেরি করলেন না মাডলিন—চিঠি লিখলেন মহাত্মা গান্ধিকে। তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করে সবরমতী আশ্রমে বাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পড়তে শুরু করলেন ভারত সম্পর্কে গ্রন্থ। গান্ধিজির লেখা পড়লেন, পড়লেন রবীন্দ্রনাথ, ফরাসি অনুবাদে ভাগবদগীতা, উঁকি মারলেন বেদ ও উপনিষদের পাতায়। উপলব্ধি করলেন প্রাথমিক আবেগের তাড়নাতে ভারতে যাওয়া ঠিক হবে না-- তাঁর আরো প্রস্তুতি দরকার। প্রথমে তিনি আশ্রমের নিয়মনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নিলেন। তারপর নিজের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেন। আস্তে আস্তে সম্পূর্ণভাবে নিরামিষ খাবারে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুললেন। উর্দু ভাষা শেখা শুরু করলেন। সেই সঙ্গে চরকায় সুতো কাটা ও কাপড় বোনার কাজ চলল। সুতোর বদলে তিনি উলের ব্যবহার করলেন। এবার মাডলিন তাঁকে চিঠি লিখে নিজের অনুশীলন-পর্বের কথা জানিয়ে অনুরোধ করলেন:


May I come to your Ashram to study spinning and weaving, to learn to live your ideals and principles in daily life, and indeed to learn in what way I may hope to serve you in future? In order to become a fit servant of your cause I feel the absolute necessity of that training and I will do my very best to be a not too unworthy pupil if you will accept me!


(২৯ মে, ১৯২৫ তারিখের চিঠি)

এই চিঠির সঙ্গে তিনি তাঁর চরকায় বোনা উলের দুটি নমুনাও পাঠান। এই চিঠি পেয়ে খুশি হলেন গান্ধিজি।তিনি লিখলেন:

আপনার চিঠি, যা আমি পেয়েছি, গভীরভাবে আমাকে স্পর্শ করেছে। আপনার পাঠানো উলের নমুনা উৎকৃষ্ট। আপনি যখনই আসতে চাইবেন, তখনই আপনি স্বাগত। যে স্টিমারে আপনি আসবেন জানতে পারলে আপনার জন্যে কেউ অপেক্ষা করবে এবং আপনাকে ট্রেনে করে সবরমতী নিয়ে আসবে। অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন যে আশ্রমজীবন আদৌ সুখের নয়। বরং কষ্টের। এখানে যারা থাকেন তাদের শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। এ দেশের আবহাওয়াও কম বিবেচনার বিষয় নয়। আপনাকে ভয় পাওয়ানোর জন্য এসব উল্লেখ করছি না, আপনাকে সতর্ক করার জন্য বলছি।
                                                                    (কলকাতা থেকে লেখা ২৪ জুলাই, ১৯২৫এর চিঠি)
  
মাডলিনের আশঙ্কা ছিল বাবা-মা তাঁর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারবেন না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁরা কেউ মাডলিনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেন না। ভারতযাত্রার প্রস্তুতি শুরু করলেন মাডলিন। ভিলন্যভে তিনি দেখা করতে গেলেন রম্যাঁ রলাঁ ও তাঁর বোন মাদলেন রলাঁর সঙ্গে। রলাঁ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন :
মাডলিন স্লেড দেখা করে গেল। প্রায় তিরিশ বছরের এই ইংরেজমহিলা ... মহাত্মা গান্ধির আদর্শ গ্রহণ করে নিজেকে তাঁর সেবায় উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই ভারতে গিয়ে আহমেদাবাদের কাছে সবরমতী আশ্রমে প্রবেশ করবে; গান্ধিজি তাকে গ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন।... আমি অজান্তেই তার ভাগ্যের পরিচালক হয়ে গেছি। মাদলিন বলছিল, সবাই বলছে ‘তুমি ওই ভারতীয়দের মধ্যে হারিয়ে যাবে’, আমি বলি যে এই প্রথম আমার জীবনে আমি নিঃসঙ্গ হব না। 

২৫ অক্টোবর, ১৯২৫ মার্সেই বন্দর থেকে পি অ্যান্ড ও স্টিমারে ১২ দিনের যাত্রা শুরু করে বোম্বাই পৌঁছোন মাডলিন। ৭ নভেম্বর তিনি ট্রেনে নেমেছেন আহমেদাবাদ স্টেশনে। সেখানে তাঁর জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল ও মহাদেব দেশাই। পথে যেতে যেতে মাডলিন দুবার জিজ্ঞেস করেছেন, আর কত দূর! একসময় উত্তর পেয়েছেন, ‘ওই যে গাছপালা পেরিয়ে বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে, ওটাই আশ্রম’। গান্ধিজি নিজে এসে গেটে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন।  অনেকদিন পরে মাডলিন, তখন তিনি মীরাবেন, স্মৃতিচারণা করে লিখছেন— I fell on my knees at Bapu’s feet. He lifted me up and taking me in his arms said, “You will be my daughter”. And so has it been from that day।

                    

|দুই|

আশ্রমজীবনে কৃচ্ছসাধনের জন্য মাডলিন নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন অনেক আগে থেকেই। তাই নিজেকে মানিয়ে নিতে দেরি করেননি তিনি। আশ্রমে গান্ধিজির প্রতিটি কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিনি আশ্রমের আর কাউকে চিনতেন না, ফলে আশ্রমজীবনে তাঁর সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন গান্ধিজি। তাঁর সংস্পর্শে থাকাটাই যেন তাঁর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।  আশ্রমে চরকায় সুতো কাটা, রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, হিন্দি শেখা, প্রয়োজনে গান্ধিজির সফরসঙ্গী হওয়া এবং আশ্রমজীবনের নিয়মানুবর্তিতায় দিন কাটানো ছিল তাঁর কাজের অন্তর্গত। ১৯২৬ সালের মে মাস নাগাদ গান্ধিজি তাঁর আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন। গুজরাতিতে তাঁর এই লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন মহাদেব দেশাই এবং ইংরেজি সংশোধনের দায়িত্ব ছিল মীরাবেনের। এই আত্মজীবনী ‘এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’-এর এক একটি অধ্যায় ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’তে প্রকাশিত হতে থাকে।


    মীরাবেন গান্ধিজির দু’ধরনের কার্যধারা লক্ষ করেছেন। এক) সবরমতীর আশ্রম, যেখানে তাঁর উদ্দেশ্য এমন মানুষ গড়ে তোলা যারা তাঁর সত্যের সন্ধান ও অহিংসার আদর্শ রূপায়নে সহায়ক হবে; এবং দুই) ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, যা ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে এবং গান্ধিজির দেখানো পথে অনুসরণ করছে। এই দুটি বিষয়েই মীরাবেন নিজেকে গান্ধিজির শিষ্যা হিসেবে উপযুক্ত করে তুলতে দৃঢপ্রতিজ্ঞ। আশ্রমের জীবনে তিনি শুধু নিজেকে তৈরি করেননি, ভারতের উষ্ণ আবহাওয়াকে জয় করেছেন নিজের অনমনীয় মনোভাবের দ্বারা। আশ্রমে আসার পর থেকেই তিনি সাদা শাড়িতে নিজেকে অভ্যস্ত  করে তুলেছেন, যে শাড়ির পাড়েও রঙের ব্যবহার থাকত না। ছোটো করে চুল ছেঁটেছেন এবং গান্ধিজির উপস্থিতিতে আশ্রমে চিরকুমারীত্বের শপথ নিয়েছেন। 


    আশ্রম ও গান্ধিজির কাজকর্মের সুবিধার জন্য হিন্দিশিক্ষা খুবই প্রয়োজনীয় ছিল মীরাবেনের।  আশ্রমে আসার এক বছর পর গান্ধিজি তাঁকে দিল্লির দরিয়াগঞ্জে অবস্থিত কন্যা গুরুকুলে পাঠালেন হিন্দি শিক্ষার জন্য।  নিজে হিন্দি শেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে অন্যদেরও চরকায় সুতো কাটা শেখাতেন। দিল্লি থেকে মীরাবেন যেতে চেয়েছেন হরিদ্বার। গান্ধিজিকে জানাতেই তিনি লিখলেন—ইচ্ছে হলেই তুমি হরিদ্বার যেতে পারো। হিন্দির উন্নতি না হলে শুধু চরকায় সুতো কাটা শেখানোর জন্য ওখানে থাকার দরকার নেই।‘ হরিদ্বারে কাংড়ি গুরুকুল তখন ছিল গঙ্গার বাম তীরে। আশ্রমজীবন থেকে দূরে থাকার জন্য মীরাবেন দুঃখপ্রকাশ করলে গান্ধিজি খুব সুন্দর জবাব দিয়েছেন—‘আশ্রম শেষ পর্যন্ত সবরমতীতে নেই, আছে তোমার মধ্যেই’। 


    দিল্লি গুরুকুল থেকে মীরা গেছেন গুরুকুল কাংড়ি। চিঠির ঠিকানায় লেখা হয়েছে, জেলা বিজনোর। এখানকার জুবিলি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমন্ত্রিত হয়েছেন গান্ধিজি। তিনি করেকদিন এখানে কাটিয়ে যান। মীরা সেই দিনগুলোতে বাপুর সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল বাপু তাঁকে সঙ্গে করেই সবরমতী ফিরবেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি গান্ধিজির অন্য কর্মসূচির জন্য। বাপু বরং তাঁকে পাঠান হিন্দুস্তানি শিক্ষার জন্য রেওয়ারিতে অবস্থিত ভগবদভক্তি আশ্রমে। এভাবেই মীরাকে নিজের মতো করে শিক্ষিত করতে চাইছিলেন গান্ধিজি। মীরা বাপুকে ছেড়ে যেতে কষ্ট পাচ্ছিলেন তা বাপুর চোখ এড়ায়নি। ট্রেনে যেতে যেতে তিনি মীরাকে লিখছেন—
আজকের বিদায় দুঃখজনক, কারণ আমি লক্ষ করেছি আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। এবং তা অবশ্যম্ভাবী ছিল। আমি চাই নারী হিসেবে তুমি নিখুঁত হয়ে ওঠো। আমি চাই তুমি স্বভাবের কৌণিকতাগুলো কাটিয়ে ওঠো। 
ভগবদভক্তি আশ্রম ত্যাগ করার পর মীরা কিছুদিন সবরমতীতে কাটিয়েছেন এবং তারপর ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে অসুস্থ বাপুর সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু মীরার ট্রেনিং-এর তখনও বাকি। বাপু তাঁকে পাঠালেন ওয়ারধায় বিনোবা ভাবের আশ্রমে। এই আশ্রমে গান্ধিজি নিয়মিত যেতেন, বিশেষ করে কংগ্রেস অধিবেশনের আগে। এখানেও তাঁর হিন্দুস্তানি শিক্ষা জারি থেকেছে। হিন্দি শিক্ষা সম্পর্কে গান্ধিজির ভাবনা ছিল এই যে এই ভাষা খুব ভালোভাবে না জানলে মীরার পক্ষে ভারতীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করা খুবই অসুবিধের হবে। খাদির কাজ ও মহিলা-শিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় কথ্য হিন্দি জানা খুবই জরুরি। ভারতে আসার অনেক বছর পরও তাই গান্ধিজি চিঠিতে খোঁজ নিচ্ছেন, মীরা নিশ্চয় যতদূর সম্ভব হিন্দিতে কথা বলছেন।

 
    ভারতীয় সাহিত্য সম্পর্কে মীরার পড়াশুনার দিকেও গান্ধিজির দৃষ্টি ছিল। প্রথমে তিনি মীরাকে সিসটার নিবেদিতার লেখা বই,  গ্রিফিথের রামায়ণের অনুবাদ, দত্ত-র ছন্দোবদ্ধ সংক্ষিপ্ত অনুবাদে মহাভারত এবং আরনল্ডের ইন্ডিয়ান  ইডিলস ও পার্ল অফ ফেইথ সংগ্রহ করে পড়তে বলেছেন। তারপর প্রধান উপনিষদগুলো (চিঠি ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২)। মীরা গান্ধিজিকে রামায়ণ ভালো লাগার কথা জানালে তিনি বলেছেন, মহাভারতও নিশ্চয় ভালো লাগবে। মহাভারত পড়ে ওঠা বেশ পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু  সে পরিশ্রমে আনন্দ আছে। এরপর তাঁকে পড়তে হবে বেদ ও উপনিষদ। প্রধান উপনিষদগুলো পড়লেই হবে। এগুলো পড়ার মধ্যে দিয়ে হিন্দু চিন্তাধারার সঙ্গে মীরার পরিচয় ঘটবে বলে গান্ধিজির বিশ্বাস। একই সঙ্গে সমতা রাখার কথাও বলেছেন তিনি। এই কারণে মীরার পড়া উচিত পিকথলের অনুবাদে কোরান ও আমির আলির স্পিরিট অফ ইসলাম গ্রন্থটি (চিঠি ৭ অগস্ট, ১৯৩২)। পরের এক চিঠিতে লিখেছেন—‘প্রফেট-এর জীবন সম্পর্কে  অনেক বই আছে। প্রথমেই নাম করব আমির আলির ‘স্পিরিট অফ ইসলাম’, তারপর আছে ওয়াশিংটন আরউইং-এর ‘মোহামেদ অ্যান্ড হিজ সাকসেসারস’, খুব ভালো  বই। কার্লাইলের ‘মোহামেদ অ্যাজ হিরো’ বইটিও পড়া যেতে পারে।‘ (৩ নভেম্বর, ১৯৩২)। শুধু চিঠিতে লিখেই দায়িত্ব শেষ করেননি বাপু। আমির আলির বইটি মীরাকে ডাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর পাঠিয়েছেন বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে সদ্য প্রকাশিত একটি গ্রন্থ।

|তিন|

১৯২৫ সালে ভারতে আসার পর থেকে গান্ধিজির ঘটনাবহুল জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন মীরাবেন। সবরমতী আশ্রমের পক্ষ থেকে খাদির প্রচার ও প্রসারের কাজে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেছেন। ১৯২৭এর সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯২৯এ পূর্ণ স্বরাজের ঘোষণা, ১৯৩০ থেকে ৩১ এর ডান্ডি পদযাত্রা ও আইন অমান্য আন্দোলন, ১৯৩১ এর গান্ধি-আরউইন চুক্তি ও লন্ডনে গান্ধিজির গোল টেবিল বৈঠকে যোগদান, পুনঃপুন গান্ধিজির গ্রেফতার ও জেলবাস-- একের পর এক ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন তিনি। গোল টেবিল বৈঠকে থেকেছেন গান্ধিজির সহযোগী হিসেবে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থেকেও জেল খেটেছেন। সেবাগ্রাম গান্ধি আশ্রম নির্মাণের দায়িত্বও সামলিয়েছেন।  ১৯৪২এর গোড়ায় উড়িষ্যায়  জাপানি আক্রমণের বিরুদ্ধে সেখানকার মানুষকে অহিংস পথে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। আবারও তাঁকে গ্রেফতার করে গান্ধিজির সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছে পুণার আগা খাঁ প্যালেসে। এখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখেছেন কস্তুরবা গান্ধী ও মহাদেব দেশাইকে। গান্ধিজির দূত হয়ে দেখা করেছেন ভাইসরয়ের সচিবের সঙ্গে। দেখা করেছেন কংগ্রেস সভাপতি ও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের সঙ্গে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা সফর করে ভারতের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেছেন বিশ্বের কাছে।

Gandhi-&-Mira-Ben-in-england_0.png
১৯৩১। ইংল্যান্ডে গান্ধিজির সঙ্গে মীরাবেন

 ১৯৩০ সালে মহিলা সংগঠনের কাজে মীরা মাদ্রাজ, কয়েম্বটুর ও কলকাতা ভ্রমণ করেছেন। মীরার ‘নানা ধরনের অভিজ্ঞতা’ হচ্ছে জেনে গান্ধিজি খুশি হয়ে তা প্রকাশ করছেন। তিনি বলছেন—‘সত্যানুসন্ধানীদের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকেই নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে হবে’। মীরা কলকাতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এবং তা থেকে আমরা জানতে পারি যে হাওড়া স্টেশনে তাঁর জন্য অনেক মহিলা অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ট্রেন থেকে নামতেই ভিড় ঠেলে একজন পুলিস অফিসার তাঁকে একটি আদেশের চিঠি ধরান এবং জানান যে তাঁর  জন্য যে মহিলা মিছিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তিনি তাতে যোগ দিতে পারবেন না। মীরা সে আদেশ মানবেন না জানালে পুলিস অফিসার জানান তাহলে লাঠিচার্জ করা হতে পারে। মীরা আদেশ না মেনে মিছিলে যোগ দিলে পুলিস তাঁকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার করে তাঁকে পুলিস কমিশনার স্যর চার্লস টেগার্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আধ ঘন্টা কথা বলার পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। মীরা শুনতে পান যে এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই শহরে কর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য শুরু হয়েছিল। 

মীরা বোম্বাইয়েও মহিলাদের মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। ৫ অক্টোবর, ১৯৩০ পুণার জেল থেকে চিঠিতে গান্ধিজি লিখছেন: 
এইমাত্র ‘টাইমস ইলাসট্রেটেড উইকলি’-তে একটি দলের সঙ্গে তোমার ছবি দেখলাম—তুমি তকলিতে সুতো বুনছ। তারপর ‘বোম্বে ক্রনিকল’-এর কলামে লিখেছে তুমি মহিলাদের মিছিলে হেঁটেছ এবং তাদের সভায় বক্তৃতা করেছ।

১৯৩১ সালের জানুয়ারির শেষে গান্ধিজি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এরপর পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর মৃত্যু হয়েছে, গান্ধি-আরুইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং করাচি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে। করাচি কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে মীরা চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। ফলে তিনি পুরো সময় অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এ বছরই গান্ধিজির গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য ইংল্যান্ড যাওয়ার কথা। লন্ডনের উদ্দেশে গান্ধিজির সঙ্গে জাহাজে উঠেছেন মীরা, মহাদেব ও প্যারেলাল। লন্ডনের গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে গান্ধিজির সঙ্গে মীরাও সুইৎজারল্যান্ডে রম্যাঁ রলাঁর কাছে গেছেন। ১৯২৫ এর পর আবার তাঁদের দেখা হয়েছে। আর যে বিঠোভেনকে কেন্দ্র করে মীরা ও রলাঁর মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল, সেই বিঠোভেনের সংগীত পিয়ানোয় বাজিয়ে গান্ধিজিকে শুনিয়েছেন রলাঁ। মীরা, রলাঁ ও গান্ধিজির মধ্যে একটা বৃত্ত এভাবেই সম্পূর্ণ হয়েছে।
    

   ১৯৩২এর আইন অমান্য আন্দোলন সম্পর্কে যথাযথ খবরের সাপ্তাহিক বুলেটিন প্রকাশ করে বিদেশে পাঠানোর দায়িত্ব ছিল মীরাবেনের। এই কাজ তিনি বোম্বাই থেকে করতেন। একদিন তাঁর বোম্বাই ছেড়ে যাওয়ার নোটিস এল সরকারের কাছ থেকে। তিনি এই আদেশ মানলেন না। অনিবার্যভাবে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বিচার শেষ হলে তাঁকে তিন মাসের কারাদন্ড দেওয়া হয়। তাঁকে রাখা হয় বোম্বাইএর আর্থার রোড মহিলা জেলে। তিন মাস পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মীরা পুণা যান গান্ধিজিকে সেখানকার জেলে দেখতে। কিন্তু তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। খবর পেয়ে গান্ধিজি মীরাকে লিখলেন:


    তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে না দেখে আমি বিপন্ন বোধ করেছি। প্রথম যে চিন্তা মাথায় এসেছিল তা হল আমি     তোমার সঙ্গে দেখা করতে না পারলে কারোর সঙ্গেই দেখা করব না। তারপর নিজেকে সংযত করেছি এবং দেখা      করেছি। আমি সরকারের কাছে লিখেছি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে। ওরা যদি না করে তবে অন্যদের         সঙ্গে দেখা করব না। (১৮ মে, ১৯৩২)


সরকার তাদের সিদ্ধান্ত বদল করতে রাজি হয়নি। গান্ধিজিকে জানানো হয় যে মীরাবেন জেলে যাওয়ার আগে সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। গান্ধিজি সে কথা মানতে রাজি ছিলেন না, কারণ তাঁর নির্দেশ ছিল মীরাবেন গান্ধিজির ডাকা আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবেন না; তিনি শুধু খাদির কাজে নিজেকে আবদ্ধ রাখবেন এবং সেই সংক্রান্ত কাজের প্রতিবেদন পাঠাবেন।

     ১৯৩২ সালের অগস্টে মীরা বোম্বাই পৌঁছোলে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে নামামাত্র গ্রেফতার হন। এবারও তাঁর বোম্বাই যাওয়ার নিষেধ ছিল, মীরা মানেননি। এক সপ্তাহের বিচার শেষে তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁকে পুনরায় রাখা হয় সেই আর্থার রোড জেলে। গান্ধিজিও তখন পুণা জেলে। তিনি মীরার কারাদণ্ডের কথা শুনে মজা করে লিখলেন—‘তুমি আবার তোমার আস্তানায় ফিরে এসেছ’।  তিনি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন হৃতস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, চরকায় সুতো বোনা ও সহজে সম্ভব এমন পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে (১৯ অগস্ট, ১৯৩২ এর চিঠি)। 


    ব্রটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাগডোনাল্ডের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গান্ধিজি জেলে বসেই আমরণ অনশনের ঘোষণা করেন। এই অনশন তিনি শুরু করেছিলেন ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২। তার আগেই তাঁর অনশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন মীরাকে। এটা শুধু কর্তব্যই নয় তাঁর কাছে এ এক সুযোগ। 
অনশনের মধ্যেই রোজ চিঠি লিখে আস্বস্ত করেছেন মীরাকে। জানিয়েছেন তিনি ভালো আছেন। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। অবশেষে খবর পেয়েছেন মীরা যে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ও সদর্থক চিঠি পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছেন বাপু এবং অনশন ভঙ্গ করেছেন। 

    ১৯৩৪ এ মীরা  সিদ্ধান্ত নেন ইংল্যান্ডে যাবেন এবং সেখানে গান্ধিজি ও তাঁর কথা, বিশেষ করে এ দেশের শ্রমিক শ্রেণির কথা সেখানে তুলে ধরবেন। গান্ধিজি তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই মীরা ইউরোপের দিকে যাত্রা করেন। ইংল্যান্ডে তিনি দেখা করেছেন লয়েড জর্জ, লর্ড হ্যালিফ্যাক্স, জেনারেল স্মার্টস, স্যর স্যামুয়েল হোর ও উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে এবং ভারতের কথা জানান ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধিদের সঙ্গে। সেখান থেকে যান আমেরিকা; একই উদ্দেশ্যে  ভ্রমণ করেন নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ওয়েস্ট চেস্টার, বস্টন, হার্ভার্ড ও ওয়াশিংটন। এই পরিক্রমা থেকে গান্ধিজি যে খুব বেশি আশা করেছিলেন তা মনে হয় না, তবে মীরা তাঁর অন্তরের ডাকে সাড়া দিয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাকে সম্মান জানিয়েছিলেন। ১২ জুলাইয়ের চিঠিতে তিনি মীরাকে লিখছেন:

তোমার স্বাস্থ্য ঠিক রেখো। জেনো যে তোমার ইংল্যান্ড ভ্রমণ থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য ফলের দেখা না পেলেও আমার মনে করার কিছু নেই। যে অভিজ্ঞতা তুমি অর্জন করছ তাই আমার কাছে যথেষ্ট ফলাফল। সুতরাং তুমি নিজের প্রতি বা পরিপার্শ্বের প্রতি অধৈর্য হয়ো না।


    ইউরোপ থেকে ফেরার পর মীরা বাপুর সঙ্গে দেখা করেন ওয়ারধা আশ্রমে। কিছুদিন পর গান্ধিজি মগনওয়ারিতে থাকতে শুরু করেন, সেখানে ভিলেজ ইনডাস্ট্রিজ অরগ্যানাইজেশন সদ্য কাজ শুরু করেছে। মীরা সেখানেই থেকে যান; আর বাপু যান বোম্বাইয়ের বরসাদে। মগনওয়াদিতে গ্রাম সংস্কার ও স্বাস্থ্য সচেতনতার কাজে হাত লাগান মীরা।  সেখানে থাকতেই মীরা প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে টাইফয়েডে ভুগে কষ্ট পান খুব। গান্ধিজি তাঁকে ওয়ারধার কাছে সেগাঁওতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। গান্ধিজির সেবায় অবশেষে রোগমুক্তি ঘতে মীরার। বাপুই তাঁকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ডালহৌসিতে পাঠান। এরপর তিনি কাংড়া উপত্যকার পালামপুরে ওয়েল আশ্রমে যান, সেখানে আশ্রমিকদের কাছে মাটির বাড়ি তৈরির পদ্ধতি শেখেন এবং আশ্রমেই নিজের জন্য ছোটো একটি কুটির নির্মাণ করে থাকতে শুরু করেন। সেবাগ্রাম তৈরির জন্য গান্ধিজিই  মীরাকে জমির সন্ধান করতে বলেন। যেখানে জমি কেনা হয় সেই ওয়ারধা জেলার সেই অঞ্চলটিতে ছিল খুবই দরিদ্র মানুষের বাস এবং তাদের তিন-চতুর্থাংশই ছিল তথাকথিত অস্পৃশ্যশ্রেণির। গান্ধিজি জানুয়ারি ১৯৩৬ সালেই এখানে এসেছিলেন। তিনিই আশ্রমের নাম দিয়েছিলেন সেবাগ্রাম। মীরাবেনের পরিকল্পনামতো মাটির কুটির তৈরি করা হয় গান্ধিজির জন্য। তারপর একে একে সবাই আসেন এবং চারপাশে অনেক মাটির ঘর গড়ে ওঠে। এখানে আর এক সবরমতী আশ্রম তৈরি হয়ে যায়।

     ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ইলাহাবাদ অধিবেশনের আগে তিনি গান্ধিজির অনুমতি চাইলেন অধিবেশনে যোগ দিয়ে জাপানি আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দেবেন। গান্ধিজি সম্মত হলেন, কিন্তু তাঁর হাতে দু’পাতার টাইপকরা লেখা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যদি সম্মত হও, ইলাহাবাদে নিয়ে যাও এক ঘন্টা ধরে আমার মনের যে অবস্থার কথা বলব, তা ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে বলবে।’ মীরার হাতে যে দু’পাতা টাইপ-করা কাগজ গান্ধিজি দিয়েছিলেন, তা-ই ছিল ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মূল খসড়া প্রস্তাব। গান্ধিজি মীরার হাতে দুটি চিঠিও পাঠান—একটি জওহরলাল নেহরু ও অন্যটি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের জন্য। ওয়ার্কিং কমিটিতে গান্ধিজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের খসড়া প্রস্তাব সামান্য সংশোধনসহ গৃহীত হলে মীরা রাজেন্দ্রলাল, ডক্টর প্রফুল্ল ঘোষ ও শংকররাও দেও-এর সঙ্গে সেবাগ্রামে গান্ধিজির কাছে যান। গান্ধিজিকে গৃহীত ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গৃহীত প্রস্তাব দেখান এবং আন্দোলন শুরু করার আদেশ চান। গান্ধিজি তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেন। তিনি মীরাকে পাঠান ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোর কাছে। তাঁর উদ্দেশ্য, ভাইসরয়ের কাছে গান্ধিজির চিন্তাধারা ব্যাখ্যা করে উপস্থাপিত করা। ভাইসরয় মীরার সঙ্গে দেখা করলেন না, কিন্ত তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর সচিব লেদওয়েটের সঙ্গে এক ঘন্টা ধরে কথা বলেন মীরা। এই সাক্ষাৎকারে ভাইসরয়ের উদ্দেশে যে কথাগুলো মীরা বলে এসেছিলেন, তা তাঁর জবানিতেই আমরা শুনতে পাই--      
    
    I want at the last to put before you the most vital, the most terrible thing of all. Gandhiji is in deadly earnest. This time it will be impossible for you to hold him. No jail will contain him, no crushing will silence him. The more you crush the more his power will spread. You are faced with two alternatives; one to declare India’s Independence, and the other to kill Gandhiji, and once you kill him you kill for ever all hope for friendship between India and England.

                          (The Spirit’s Pilgrimage)


    দিল্লি থেকে মীরা বোম্বাই পৌঁছেছেন অগস্টের প্রথমে। গান্ধিজির সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁর। ৯ অগস্ট বিকেলে বিড়লা হাউস থেকে গান্ধিজির সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছেন মীরা ও মহাদেব। শুধু এই তিনজন নয়, কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সব সদস্যসহ বোম্বাইয়ের প্রধান প্রধান কংগ্রেস কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তারপর তাঁদের বিশেষ ট্রেনে তোলা হয়। বেশিরভাগ কর্মীকেই  আহমেদনগর ফোর্টে  নিয়ে যাওয়া হয়। শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু ছাড়া সব ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যকে পুণার কাছে একটা ছোটো স্টেশনের আটকে রাখা হয়। আর গান্ধিজি, শ্রীমতী নাইডু, মহাদেব দেশাই ও মীরাবেনকে গাড়ি করে আগা খাঁর প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু কর্মীকে বন্দি করে রাখা হয় ইয়েরাভদা জেলে। তৃতীয় দিনে কস্তুরবা গান্ধী ও সুশীলা নায়ারকে গ্রেফতার করে আগা খাঁ প্যালেসে আনা হয়। পঞ্চম দিনে মহাদেব দেশাইএর মৃত্যু হয়। তারপর সেখানে গ্রেফতার করে আনা হয় গান্ধিজির সচিব প্যারেলালকে। ছ’মাস পর গান্ধিজি একুশ দিনের অনশন শুরু করেন। এই অনশনে গান্ধিজি প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যান। গান্ধিজির অনশন শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই শ্রীমতী নাইডু অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং খুব জটিল শারীরিক অবস্থায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৪৪এর গোড়ায় কস্তুরবা মারা যান। গান্ধিজিও ম্যালেরিয়ায় ভুগে কষ্ট পেতে থাকেন। অবশেষে ১৯৪৪এর জুন মাসে তাঁদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়।


    আগা খাঁ ফোর্টে বন্দি থাকার সময় মীরাবেন বাপুর কাছে ইউনাইটেড প্রভিন্সের উত্তর-পশ্চিমে নিজের আশ্রম নির্মাণ করে  আলাদাভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বাপু তাতে সম্মতি দেন। জেল থেকে বেরিয়ে ইউপির মুলদাসপুরে জমি কিনে কিষাণ আশ্রমের কাজ শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিমতো বেশ কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউনাইটেড প্রভিন্সে পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্তের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হয়। সরকারের আগ্রহ ছিল কীভাবে রাজ্যের উন্নয়ন, বিশেষ করে কৃষিজাত ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায় এবং কৃষিজমির পরিসর বাড়ানো হয়। তাঁর আশ্রমের মাধ্যমে সেই কাজে নিজেকে যুক্ত করতে চাইলেন মীরা। তিনি বাপুর সঙ্গে দেখা করে এই সম্পর্কে আলোচনা করেন। গান্ধিজি মীরার এই ইচ্ছার কথা গোবিন্দ বল্লভকে জানালে তিনি মীরাকে ইউনাইটেড প্রভিন্স সরকারের অবৈতনিক বিশেষ উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল ‘অধিক ফসল ফলাও’ প্রচারকে আন্দোলনের পর্যায়ে উন্নীত করা। পরের বছর মীরা ঋষিকেশের কাছে জঙ্গলে গো-পালন ও উন্নয়নের জন্য গঙ্গার তীরে নির্মাণ করেন পশুলোক আশ্রম এবং বসবাসের জন্য তৈরি করেন বাপুগ্রাম। এই আশ্রম তৈরি করেই মীরা নিজের কাজ শুরু করেন। ইচ্ছা প্রকাশ করেও গান্ধিজি এই আশ্রমে আসার সুযোগ করে উঠতে পারেননি। এই সময় দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গান্ধিজি পূর্ব বাংলার নোয়াখালি ছুটে যান। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে গান্ধিজি দিল্লিতে থাকার সময় কয়েকদিন তাঁর সঙ্গে কাটিয়ে মীরা ঋষিকেশে ফিরে যান। বাপুর সঙ্গে তাঁর সেই ছিল শেষ সাক্ষাৎ। 


    গান্ধিজির মৃত্যুর পর আদর্শ রূপয়নের কাজেই মনোযোগ দিয়েছেন মীরাবেন। ১৯৫২ সালে ভিলাঙ্গনাতে প্রতিষ্ঠা করেছেন গোপাল আশ্রম। অন্যসময় ব্যস্ত থেকেছেন পশুলোক আশ্রমে গো-প্রজননের নানা পরীক্ষানিরীক্ষায়। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে গান্ধিজির আদর্শ থেকে বিচ্যুতি যখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, তখন কর্মব্যস্ততার মধ্যেও মনের গভীরে কোথাও নির্লিপ্তির ছায়া এসে পড়েছে। গান্ধিজি বা তাঁর আদর্শের অনুপস্থিতিতে ভারতবর্ষ তাঁর কাছে আর আকর্ষণের কেন্দ্র থাকেনি। জীবনের প্রথম ৩২ বছর কেটেছিল তাঁর নিজের দেশ ইংল্যান্ডে, তারপর তাঁর তীর্থযাত্রা ছিল গান্ধিজির কাছে ভারতবর্ষে, জীবনের পরবর্তী ৩৪ বছর এখানে কাটিয়ে আর এক যাত্রাপথে গেলেন তিনি। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি গেলেন ইংল্যান্ডে, কিন্তু এই ইংল্যান্ড আর তাঁর চেনা ছিল না, ফলে মানিয়ে নিতে পারলেন না; তিনি গেলেন ভিয়েনায়—বিঠোফেনের দেশে, যে বিঠোফেনের সংগীত ছিল তাঁর প্রথম জীবনের আশ্রয়। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জীবনের শেষ ২৩ বছর সেখানেই কাটিয়েছেন মীরাবেন। 

 

|চার|

    ১৯২৫ থেকে ১৯৪৮ সাল, গান্ধিজির মৃত্যু পর্যন্ত, ২৩ বছর তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন মীরাবেন। এই সান্নিধ্য শুধু সবরমতী আশ্রমে থাকার জন্য নয়, আর গান্ধিজিও সেখানে কম সময়ই থাকতে পেরেছেন। সারা ভারত ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। তবু তিনি যেখানেই গেছেন বা থেকেছেন, মীরা চিঠি লিখেছেন তাঁকে, আর গান্ধিজিও চিঠি লিখেছেন মীরাকে। গান্ধিজির চিঠির সংখ্যা প্রায় ৫০০ এবং এই চিঠি থেকে ৩৫০টি চিঠির একটি সংকলন মীরা নিজেই সম্পাদনা করেছিলেন গান্ধিজির মৃত্যুর বছর। আর মীরাবেনের চিঠির সংকলনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। মীরারও প্রায় ৩৫০টির মতো চিঠি এই সংকলনে সংযুক্ত হয়েছে। তাঁদের চিঠির সূত্র ধরে তাঁদের সম্পর্কের জটিলতা খুঁজতে চেয়েছেন কেউ কেউ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে গান্ধিজি সম্পর্কে রম্যাঁ রলাঁর ছোটো গ্রন্থটি পাঠ করেই মাডলিন স্লেড  গান্ধিজির কাছে ভারতে এসেছিলেন। স্বভাবতই তখন গান্ধিজি ভিন্ন অন্য কারও অস্তিত্ব ছিল না তাঁর কাছে। গান্ধিজি তাঁকে কন্যা হিসেবে গ্রহণ করায় মীরার সমস্ত আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছেন তাঁর বাপু। এই কারণে গান্ধিজি দূরে থাকলে নিজেকে বিপন্ন মনে করেছেন মীরা। বাপুর সংস্পর্শ থেকে এই বিচ্ছেদ মীরাকে অস্থির করেছে-- ‘এটা আমার যন্ত্রনার কারণ হয়েছে’, বলেছেন মীরা। গান্ধিজি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন—‘ তুমি সবসময় আমার চিন্তার মধ্যে আছো’।

    আমেরিকান লেখক ল্যুই ফিশার তাঁর ‘The Life of Mahatma Gandhi’ গ্রন্থে গান্ধিজি ও মীরাবেনের সম্পর্ককে “remarkable platonic association of our age” বলে বর্ণনা করেছেন। গান্ধিজিকে নিয়ে ফিল্ম করার সময় গান্ধিজি ও মীরাবেনের সম্পর্কের ওপর আলাদাভাবে আলোকপাত করেননি স্যর রিচার্ড অ্যাটেনবরো, কিন্তু তাঁর ধারণার কথা জানিয়েছেন এইভাবে—“What I did realize was that Gandhi was an enormously strong and tough man, and this is a quality they had in common. I sensed in her an equally enormous toughness”; তিনি গান্ধিজি ও মীরার সম্পর্ককে ‘entirely unique’ বলে মনে করেছেন।

    মৃত্যুর কয়েকদিন আগে মীরাবেন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন—”আমার জীবন উৎসর্গ করেছি এমন দুই মহান আত্মার সেবায় যাঁরা উচ্চ আদর্শ নিয়ে জন্মেছিলেন—একজন নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারে নিরন্তর কর্মের মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছেন এবং অন্যজন সংগীতের মধ্যে দিয়ে আসা এক আধ্যাত্মিক কণ্ঠস্বরের নিরন্তর প্রকাশ।”  তাঁদের একজন মহাত্মা গান্ধী আর অন্যজন বিঠোফেন।  
 

Fri 3 Jul 2020 12:03 IST | সৈয়দ কওসর জামাল