মুখের কাছে মুখ রেখে বলা

painting-dhiraj-chowdhury.png

চিত্র: ধীরাজ চৌধুরী

►গল্প

|নাফিসা খান|


ঘন্টা দুয়েক কেটে গিয়েছে সূর্যাস্তের পর, অদিতি এখনও ঘর অন্ধকার করে বসে আছে। কয়েকদিন ধরেই তার মাথাটা পুরো ঘেঁটে গেছে। অদিতির স্বামী নিলয় অনেক চেষ্টা করেও  তাকে বোঝাতে ব্যর্থ।
অদিতি নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়তে রাজি নয়।
নিলয় নিঃসন্তান হওয়ার দুঃখ স্বীকার করে নিলেও দত্তকের  ঘোর বিরোধী। তবে সে কিংবা তার পরিবারের তরফ থেকে অতিদির উপর কোনদিনই কোন ধরণের চাপ সৃষ্টি  করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে  প্রতিবেশীদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যাকুলতা ও অকারণ উৎকণ্ঠা, অদিতির মেন্টাল ট্রমার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম দিকে সে এসব কথায় বিশেষে গুরুত্ব না দিলেও ইদানীং পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। কেউ কিছু বললেই তার প্রতিক্রিয়া অনেকক্ষণ ঘিরে থাকে।
শিলা টেবিল সাজিয়ে  অনেকবার ডাকল, বৌদি, বৌদি, বৌদি ........... চা খাবে এসো, ও বৌদি এসো।
-কোনও সাড়া শব্দ নেই!
বেশ কয়েক বছর ধরেই শিলা এ বাড়িতে কাজ করছে, অদিতি ও নিলয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আর মালিক ও পরিচারিকার জায়গায় নেই। বাড়ির অধিকাংশ কাজই তার মতামত ও উপস্থিতি ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। 
শিলা আগে কখনও অদিতিকে এরকম আচরণ করতে দেখিনি। সে কিছুটা বিরক্ত হয়েই গজগজ করতে করতে বলল, সব দায় বুঝি আমার! আমার কথার তো কোন দাম নেই!
অগত্যা চায়ের পাত্রে চা ঢেলে সে অদিতির ঘরে নিয়ে যায়, বৌদি চা।
-রেখে দাও।
-রেখে তো দেব, তবে আমি কিন্তু খালি কাপ নিয়ে যেতে চাই।
নিলয় সি.এ.ফার্মের অ্যাকাউন্টেন্ট। মাসিক উর্পাজন নেহাত কম নয়। চাকুরী সূত্রে সে শহরের বাড়িতে থাকে। বাবা-মা ভিটার টানে দেশের বাড়িতে পড়ে আছে। আচার-অনুষ্ঠানে যাওয়া-আসা হয়।
নিলয় বাড়ি আসার পর শিলা তাকে বলল, দাদা বৌদিকে আর একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে পড়ছে। চা আর বিস্কুট যে ভাবে দিয়ে এসেছিলাম, তেমনি পড়ে আছে,ভাতও....
তার কথার মাঝখানেই নিলয় বলল,
-কেন? আজ আবার কী হয়েছে?
-কী আর হবে, সকালে চঞ্চলের মা এসে বলল, একটা বাচ্চা থাকলে বাড়িটা মাথায় করে রাখত, ব্যস সেই যে ঘরে ঢুকল, তারপর...
-যদি কিছু মনে না করো, তাহলে একটা কথা বলতুম।
-বলো।
-আমার বাপের বাড়ি এলাকায় একটা ভালো অনাথ আশ্রম আছে। বাচ্চার সংখ্যাও নেহাত কম নয়, অনেককেই দেখেছি দত্তক নিতে... আমি বলছিলাম যদি তোমার কোনও আপত্তি না থাকে...
নিলয় তার কথায় কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে অদিতির ঘরের দিকে চলে যায় ।
অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেনি অদিতির, নিলয় লাইটের সুইচটা অন করতেই সে ধীর গতিতে বলে, আলোটা বন্ধ করো। 
নিলয় বিরক্তির সুরে বলল, এসব কী হচ্ছে বলতো, তোমার কাছ থেকে এরকম আশা করা যায় না, নর্মাল বিহেভ করো।
-কীভাবে ?
-আশা করি তোমার অজানা নয়।
-হয়তো!
-যেটা চাইছো সেটা সম্ভব নয়।
-আমাকে আমার মত থাকতে দাও। তুমি তোমার সো কল্ড রেপুটেশন নিয়ে থাকো।
-তুমি রাস্তার লোক নও।
-তর্কে যেতে চাই না।
নিলয় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে চিন্তা করে, বিষয়টি গম্ভীর রূপ ধারণ করার আগে সমাধান দরকার। তাছাড়া, অদিতিকে এভাবে ছেড়ে দেওয়াটা বোধ  হয় ঠিক হবে না।
এরপর, অনুমতির জন্য বাবা-মাকে কল করলেও লাভ কিছু হয় না, তাঁরা কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নন।
পরিশেষে, অদিতির পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সে নিজেই উদ্যোগ নেয়। 
তবে তার এই দত্তক প্রক্তিয়া থেকে শিলার মতামতও বাদ যায় না। বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নেওয়ার পর সে শিলাকেই বলে অদিতিকে মহেষপুরে নিয়ে যেতে।
দাদাবাবু যে প্রতিবারের মতো এবারও তার মতামতের অসম্মান করেনি, শিলা  তা ভেবে নিজেকে ধন্য মনে করতে থাকে।

♦♦♦


-ম্যাডাম, আমাদের কিছু রুলস এবং রেগুলেশন আছে। সমস্ত ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করলে আপনার আবেদন মঞ্জুর করা হবে। 
-আই থিঙ্ক অভিযোগের কোন সুযোগ আসবে না। যদি আপনার আপত্তি না থাকে তাহলে আমি বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
-আপত্তি থাকবে কেন, চলুন।
-শিলা ড্রাইভারকে বলো গাড়ি খুলে গিফ্ট গুলো নিয়ে আসতে।
দশটা থেকে চারটে স্কুল টাইম, অধিকাংশ বাচ্চা ক্লাস রুমে আছে। 
-বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।
-তার দরকার হবে না, এখানে প্রায়ই ভিজিটর আসেন।
স্কুলের বাচ্চাদের দেখার পর অদিতি কোনও  প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। ফেরার পথে চোখে পড়ে টিচার্স রুমের বাইরে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা একটি বাচ্চা মেয়ের দিকে। অদিতিকে সেদিকে বারবার তাকাতে দেখে সুপার বললেন, 
-মেয়েটি নতুন, বেশিদিন হয়নি অ্যাডমিট হয়েছে।
-যদি কোন অসুবিধা না থাকে, আমি কী ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি?
-অসুবিধা কেন থাকবে... চলুন!
অদিতিকে দেখে  বাচ্চাটি লজ্জায় বেঞ্চের গায়ে আরও সেঁটে বসে, সামান্য ঝুঁকে অদিতি জিজ্ঞাসা করে, 
-ভয় পাচ্ছো কেন?
সে মাথা উঁচু করে অদিতির মুখের দিকে তাকাতে, অদিতি  জানতে চায়,
-নাম কী তোমার?
মৃদু সুরে উত্তর আসে, 
-তানিয়া।
-আচ্ছা, তানিয়াও বুঝি অন্য বাচ্চাদের মত চকলেট ভক্ত।
সে অতি সূক্ষ্ম হাসির মাধ্যমে সম্মতি জানাতেই অদিতি ব্যাগ থেকে চকলেট বার করে তার হাতে দেয়।
-থ্যাঙ্ক ইউ।
-ইউ আর ওয়েলকাম।
কিন্তু, ভিজিটিং টাইম শেষ হয়ে যাবার কারণে অনচ্ছিাকৃতভাবেই অদিতিকে ইতি টানতে হয়। যদিও আর একটু সময় তানিয়ার সঙ্গে কাটাতে ইচ্ছা করছিল তার।
এরপর, সুপার জানতে চান, 
-বলুন ম্যাডাম।
-তানিয়া।
-বেশ! ইনিশিয়াল কিছু ফরম্যালিটি আছে , সেগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর আপনাকে আমাদের ডিসিশন জানানো হবে।
- অপেক্ষায় থাকবো।
অনেকদিন বাদে অদিতির মুখে হাসি ফিরেছে। এক্সাইটেড হয়ে সে নিলয়কে তানিয়ার কথা বলে। কিন্তু নিলয় বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। গতানুগতিক ভাবে সে বলে, তোমার খুশিতেই  আমার  আনন্দ।
সদিচ্ছার ঘাটতি থাকলেও সমস্ত আইনি প্রক্রিয়ায় নিলয় অদিতির সাথে ও পাশেই থাকে।
মেয়ে বাড়িতে আসছে, খুশির মহল, ভোজের  আয়োজনও কম নয়। অদিতি নিজে হাতে সকলের জন্য পায়েস, কেক ও  লাড্ডু বানিয়েছে। আত্মীয় স্বজনেরা সকলেই আমন্ত্রণ পেয়ে  হাজির।
শ্বশুর-শাশুড়ি সন্মান রক্ষার্থে উপস্থিত থাকলেও অনুষ্ঠানের আনন্দ থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলেন।
অদিতির বাবা-মা ও ছোট বোন একই শহরে থাকে। তাদের আসতে দেরি হওয়ার কারণে খাওয়া-দাওয়া রাত করেই শুরু হয়।
অদিতি রান্না ঘরে থেকে সবকিছুর তদাকরি করছিল, সেখান থেকেই সে লক্ষ্য করে তার ছোট বোন দীপ্তিকে নিলয়ের রুমের দিকে যেতে। অদিতি জানতে চায়,
-কোথায় যাচ্ছিস?
-জামাইবাবুর সাথে দেখা করতে, প্রাইমিরীর ব্যাপারটা কতদূর গড়ালো একটু জানতে পারলে ভালো হত।
-আচ্ছা।
পাঁচ কাটা জায়গার উপর বেশ প্লান করেই তৈরি অদিতিদের দ্বিতল বাড়ি। উপর-নীচে মিলে সাতটা রুম, নীচে বড়ো ডাইনিং ও রান্না ঘর, উপর-নীচে বাথরুম। বেশ পরিপাটি  আধুনিক মডেলের বাড়ি। অদিতি ও নিলয় নীচের ঘরেই থাকে এবং রান্না ঘরের পাশের রুমে রাত কাটায় শিলা।
কিছুক্ষণ বাদে ছাদের উপর থেকে দীপ্তির চিৎকার শোনা যায়। নিলয় সাথে সাথে  উপস্থিত হলেও শেষ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। অদিতি দীপ্তির মাথা ছাড়া দেহটাকে দেখে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাটা মাথাটা জলের ট্যাঙ্কের পাশে পড়ে আছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে খুনি হিসাবে নিলয়কে সন্দেহ করা হলেও, সি.সি.টিভি. ফুটেজে পরিস্কার হয়ে যায় ঘটনার সময় সে হলেই ছিল।
পুলিশি তদন্তের পরও খুনির হদিস পাওয়া সম্ভব হল না।
অদিতির শাশুড়ি সেকেলে মানুষ, তিনি অকপটে বলে বসেন, 
-মেয়েটির লক্ষণ শুভ নয়। বাড়িতে পা রাখতেই দুর্ঘটনার সূচনা। আগে তো...
অমিতবাবু তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন,
-ও রমেলা, ব্যাকডেটেড চিন্তা-ধারা ছাড়ো তো।
-দু'চারটে ইংরাজি নোবেল পড়ে তুমি দেখচ্ছি বড়ো দিগ্গজ হয়েছো।
-'নোবেল' নয় 'নোভেল'।
-ওই হল। তবে, নিলয়ের বাবা তুমি বিশ্বাস না করলেও ....আমার সন্দেহ কিন্তু এক জায়গায় স্থির।
খুনের তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সকলকে শহর ছাড়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ।
হঠাৎ, শিলার মায়ের শরীরিক অবস্থার দ্রুত পতন সকলকেই ভাবিয়ে তুলল। মৃত্যু শয্যায় অন্তিম বার মেয়েকে দেখার ইচ্ছায় বাধা দেওয়া উচিত হবে না।  অদিতি তাকে বলে, কাউকে কিছু জানানোর দরকার নেই, তুমি কাল দুপুরের গাড়ি ধরে চলে যাও। 
-কিন্তু বৌদিমণি পুলিশ যদি জানতে পারে।
-সে চিন্তা আমার উপর ছেড়ে দাও। উকিলবাবুর সাথে কথা বললাম, আইনি প্রক্রিয়ায় মিনিমাম চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে।
-কিন্তু!
-আর কিন্তু কিন্তু করো না। যাও, তৈরি হও।


কলেজ ছাত্রী অদিতি এক অ্যাকাউন্ট্যান্টের প্রেমে পড়ে। অসাধানতার কারণে বিয়ের আগেই সে গর্ভবতী হয়। তড়িঘড়ি তাদের বিয়ে হলেও, নতুন দাম্পত্যে বাচ্চাটির জায়গা হয় না।


বাসস্ট্যান্ড  থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাঁটা পথ, তারপর মাঠ পার করে শিলাদের বাড়ি। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বাতি ও মানুষ দুটোরই বড়ো অমিল, দুপাশে ধানক্ষেত ও মাঝ রবাবর সরু সুরকির রাস্তা।
শিলা বেলাবেলি বার হলেও রাস্তায় বাসের চাকা লিক হয়ে যাওয়ায় পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও ভ্যান, রিকশা বা পরিচিত কারুর দেখা না মেলায় সে পায়ে হেঁটে এগোতে থাকে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে, আকাশে আধ ফালি চাঁদের মৃদু আলোয় নির্জন রাস্তা, অনেকদিন বিরতির পর ব্যস্ত শহর ছেড়ে, গ্রামের অন্ধকার রাস্তায় তার গা'টা কেমন ভার ভার করে ওঠে। হঠাৎ, তার মনে হল পিছন পিছন কেউ আসছে। কিছুক্ষণ চলার পর সে ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে,  আবার হাঁটতে শুরু করল।
অকস্মাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে, 
-বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও পিসি!
শিলার বুকের ভিতরটা দপদপ করে ওঠে, সে মনে মনে ভাবে,
-বিনি, এটা তো বিনির গলা (বিনি শিলার দাদার মেয়ে)।
-ও এখানে কীভাবে এল। না...না...আমি বোধ হয় ভুল শুনছি। মা ছোটবেলায় বলতেন তেনারা রাতে এভাবেই পিছন থেকে ডেকে নিয়ে যান!
-রাম নাম জপ করতে করতে যাই। আর কিছুটা গেলেই মাঠ। তারপর...
কয়েক পা হাঁটতেই আবারও সে বিনির আর্তনাদ শুনতে পায়... 
-পিসি যেও না, আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
শিলা আবার দাঁড়ায় ,তারপর সে লক্ষ্য করে রাস্তার ওপার থেকে সাদা ফ্রক পরা বাচ্চা একটি মেয়ে বাঁকা বাঁকা হাত দুটো সামনে ঝুলিয়ে লম্বা লম্বা ধাপ ফেলে শিলার দিকেই এগিয়ে আসছে। বড়ো বড়ো চুল দিয়ে তার সমগ্র মুখটা ঢাকা, ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার সাদাটে চোখ ও রক্ত ঝরা মুখ।
শিলা পালানোর চেষ্টা করে। পরেরদিন খবরের কাগজের তৃতীয় পাতায় বড়ো বড়ো হরফে ছাপা হয়,পরিচারিকার গলা কাটা দেহ উদ্ধার।
বলাবহুল্য, এই ঘটনার তদন্তে আরও বিভ্রান্তি তৈরি করে। সন্দেহের তীর ঘুরেফিরে নিলয়ের উপর আসে।
যদিও বাকিদের মত ছিল তানিয়ার কারণেই এসবের  উৎপত্তি। কিন্তু অদিতি মানতে নারাজ। পরপর খুনের ঘটনায় যখন সারা বাড়ি স্তম্বিত, অদিতি নিলয়ের সাথে আর্গুমেন্ট শুরু করে। উদ্দেশ্যে একটাই, তানিয়ার উপর থেকে অপবাদ দূর করা।
এরপর সে তানিয়াকে নিয়ে পাশের ঘরে শোওয়ার জন্য যায়।
অদিতির ঘুম আসছিল না। কারণ, মানুষের চিরাচরিত স্বভাব তর্কে হার না মানলেও, একান্তে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে সিধান্তে গ্রহণ।
সে তানিয়াকে নিরীক্ষণের চেষ্টা করে, তার চোখে কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়ে না।
চোখটা যৎসামান্য জোড়া লাগতেই ঘুমের মধ্যেই সে অনুভব করে, তানিয়াকে বিছানা ছেড়ে উঠে যাচ্ছে। অদিতি প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর বাথরুমে গিয়ে নক করে।
সাড়া না পেয়ে, সে দরজায় ধাক্কা লাগায়।
তানিয়া সেখানে ছিল না।
ড্রইং রুমে গিয়েও তাকে খুঁজে পায় না। ইতিমধ্যে, ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার কারণে তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। কয়েকদিন যাবৎ যা কিছু ঘটছে তাতে দুশ্চিন্তা হওয়াটা অস্বাভাবিক  কিছু নয়।
হঠাৎ শাশুড়ির রুম থেকে চিৎকার ভেসে আসে, ভূত... ভূত... ভূত।
অমিতবাবু তড়িঘড়ি উঠে বলেন, 
-কী হল রমেলা? তুমি কি এখনও ভূত নিয়ে পড়ে আছো!
-সত্যি বলছি, স্পষ্ট দেখেছি সাদা ফ্রক পরে একটি বাচ্চা মেয়ে মশারির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, বীভৎস একটা চেহারা, ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো।
-তোমার কল্পনা।
অদিতি পড়িমরি করে অন্ধকারেই ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করে,
-কী হয়েছে মা?
-কী আবার হবে, তোমার আর কী।
তারপর, তিনি দোতালা থেকেই চিৎকার শুরু করেন,
-খোকা... খোকা... খোকা...
নিলয় আসার পর তিনি বললেন,
-খোকা কালই আমাদের টিকিটটা করে দিস, আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাই না।
-কিন্তু, মা।
-বৌমা, তুমি আসতে পারো।
অদিতি মাথা নত করে রুমে এসে দেখে তানিয়া বিছানাতেই শুয়ে আছে। অদিতি  জিজ্ঞাসা  করে,
-তানিয়া তুমি কোথায় ছিলে?
-উপরের বাথরুমে।
-উপরের বাথরুমে? কিন্তু...
-কিন্তু কী মা?
-না, কিছু না, ঘুমাও। এই প্রথম অদিতির মনে হয় মেয়েটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
পরের দিন নিলয় অফিসে বার হওয়ার পর সংসারের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে, শ্বশুর-শাশুড়িকে ননদের বাড়ি পাঠিয়ে, অদিতি মহেষপুর অনাথালয়ে যায়।
-বলুন ম্যাডাম ।
-আমি সুপারের সাথে দেখা করতে চাই।
-হ্যাঁ, বলুন।
-কিন্তু, সুপার! আগে যিনি ছিলেন!
-গত পাঁচ বছর ধরে আমিই আছি এখানে। আপনি ঠিক কত দিন আগের কথা বলছেন!
-তিন সপ্তাহ হবে। কিন্তু,আপনি যদি সুপার হন সেদিন এই চেয়ারে কে ছিলেন?
-কী হয়েছে যদি বিস্তারিত বলেন, তাহলে সাহায্য করতে পারি।
অদিতির মুখে সবকিছু শোনার পর তিনি বললেন, 
-প্রিয়া।
-মানে?
-বছর সাতেক আগের কথা, প্রিয়াকে কল্যাণীর এক নিঃসন্তান দম্পতি দত্তক নেয়। ওর মতের বিরুদ্ধেই ওকে জোর করে পাঠানো হয়। আমি তখন শিক্ষক পদে সবে চাকুরিতে জয়েন করেছি। সুপারকে অনেক অনুরোধ করলাম সবাই মিলে। শুনলেন না। সেদিন সুপারের উদাসীনতার কারণেই মেয়েটিকে বাঁচাতে পারিনি।
-কী হয়েছিল?
-সাহাবাবু অর্থাৎ তার পালক পিতা প্রায়ই যৌন হেনস্থা করত। খবরও পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের কোন পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই প্রিয়া আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এমন অভিযোগ আগেও এসেছে। কিন্তু, ম্যাডাম সকল ক্ষেত্রে নিগ্রহ কমন ফ্যাক্টর।
-যদি তাই হয়। তবে সমাধান সূত্র তো মিলছে না!
-যাইহোক, একটা অ্যাড্রেস দিচ্ছি। ভদ্রলোক প্যারা সায়েন্টিস্ট। আশা করি উনি আপনাকে এই বিষয়ে  সাহায্য  করতে পারবেন...
-ধন্যবাদ। ভদ্রলোকের নাম?
-মানিক বসাক। মানিকদা নামে এলাকায় বেশ পরিচিত।
অদিতি মানিকবাবুর অফিসে গিয়ে তাকে আদ্যপান্ত সব খুলে বলল। অনেক অনুরোধের পর অদিতির কথায় কনভিন্স হয়ে তিনি তার সাথে আসতে রাজি হন।
নিলয়, অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কাউকে খুঁজে পেল না।
সে বাড়িতে প্রবেশ করার পর সদরের দরজাটা সটান বন্ধ হয়ে যেতে বিপদ বুঝে সেটা খোলার চেষ্টা করে।
ঠিক সেই সময় তানিয়াকে সিঁড়ি থেকে নামতে দেখে নিলয় জিজ্ঞাসা করে,
-মা কোথায়?
সে  উত্তর দেয় না। মুহূর্তেই, তার চেহারা বদলে যায় । তার বীভৎস রূপ দেখে নিলয় ভয় না পেয়ে বলে,
-তুমি এসব কী করছ?
তানিয়া পুরো বডিকে উল্টে দুই হাত ও পা দিয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে আসে।
নিলয়ের আর বুঝতে অসুবিধা হয় না। সে দেরী না করে বন্দুক বের করে তার উপর গুলি চালায়। নিলয় পালানোর চেষ্টা করে, তানিয়া তার সামনে সোফা, চেয়ার ইত্যাদি দিয়ে গার্ড করে রাখে। তারপর, খিল খিল করে হাসতে হাসতে গান গায়,
-চাঁদমামা, চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা,
-আমার কপালের রক্ত মেখে যা।
তারপর,নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-বাবা... বাবা... বাবা আজ তোমার শেষ দিন?
এমন সময় অদিতি মানিকবাবুকে নিয়ে হাজির হয়। সে তানিয়াকে ডাকে,
-প্রিয়া, প্রিয়া..
অদিতির মুখ থেকে নিজের নাম শোনার পর সে শান্ত হয়ে যায়। তারপর, আবেগের সুরে ডাকে,
-মা!
-আমি তোমার মা নই। দয়া করে আমার স্বামীকে ছেড়ে দাও, আর চলে যাও। এখান থেকে চলে যাও।

তানিয়া গম্ভীর হয়ে অদিতির কাছে উড়ে এসে তার মুখের কাছে মুখ এনে বলে,
-মা... মা... মা... তুমিও তোমার আদরের মেয়েকে চলে যেতে বলছো!

অদিতির তার  চেহারার দিকে তাকানোর সাহস হল না, সে চোখ দুটি নীচু করে রাখে।

প্রিয়া একটু দূরে সরে গিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলে, 
-এগারো বছর আগের কথা। কলেজ ছাত্রী অদিতি এক অ্যাকাউন্ট্যান্টের প্রেমে পড়ে। অসাধানতার কারণে বিয়ের আগেই সে গর্ভবতী হয়। তারপরে তড়িঘড়ি তাদের বিয়ে হলেও, নতুন দাম্পত্যে বাচ্চাটির জায়গা হয় না। অদিতিকে বলা হয়, বাচ্চা গর্ভবস্থাতেই মারা গিয়েছে।
আর সেই মেয়েটির ঠাঁই হয় অনাথ আশ্রমে। তারপর... তারপর...

রাগে, অভিমানে, দুঃখে অদিতি নিলয়ের দিকে তাকায়।  বলে, 
-বিশ্বাস করো আমার কিছু করার ছিল না।
-তুমি গোপন করে গিয়েছো। সারাজীবন নিজেকে ব্যর্থ ভেবেছি। কই একবারও তো বলোনি।
-আমাকে ক্ষমা কর। আমি নিজে হাতে কিছুই করিনি। শিলাই ওকে রেখে এসেছিল।

তানিয়া নিলয়ের দিকে এগিয়ে যেতেই অদিতি তাকে বলে, 
-তানিয়া উনি তোমার বাবা।
-কিন্তু, মা!
-আমি যদি ক্ষমা ভিক্ষা করতে পারি, তোমারও উচিত।

মানিকবাবু সব কিছু  শুনে বললেন, 
-আমার মনে হয় এখানে আমার আর কোন প্রয়োজন নেই। এবার অনুমতি দিন।

অদিতি মৃদু হেসে বলে,
-আপনার ফিজ্!
-ডিউ থাকলো।

 

Sat 31 Jul 2021 17:26 IST | নাফিসা খান