শিশু দিবস যায়, আসে। কিন্তু আমরা জানতে কী চাই কেমন আছে ওরা

child-labour.png

ঘটা করে নানানভাবে আমরা শিশুদিবস পালন করলাম ।কিন্তু একবারের জন্যও কি ভেবেছি?কেমন আছে আমার দেশের বেশির ভাগ শিশু?এই কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল জাহানারার কথা।তখন আমি ছাত্র।(এখনও অবশ্য)তবে তখন পেশা ছিল না।পড়ে থাকতাম কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে ।সেখানে মাঝেমাঝে ভর্তি হতো জাহানারা।তার শরীরে থ্যালাসেমিয়ার ত্রুটি।বারবার রক্ত নিতে নিতে তার শরীরে জমা হচ্ছিল লোহা।ডাক্তারদের ভাষায় এই অসুখের নাম "হিমোসিডেরোসিস"।সেই লোহা ছাড়াতেই আমাদের ওয়ার্ডে ভর্তি হতো জাহানারা।তখন তার বয়স পনেরো।একদিন দেখলাম তার একটা পা নেই।আঁতকে উঠলাম।জিজ্ঞেস করতে বলল,পার্কসার্কাসে রেললাইনের পাশে বসে ঝুড়ি বানাতে বানাতে হঠাৎ অসাবধানতাবশত রেলের চাকায় তার পা চলে গেছে।জাহানারার মতো এই দেশে পনেরো থেকে সতেরোর বাচ্চাদের কাজ করতে করতে অঙ্গহানি যে নতুন নয়,তা ইউনিসেফের ২০১১ র সমীক্ষা জানাচ্ছে ।২০০৮ র এই একই সংস্থার আরেকটি সমীক্ষায় আসি।এখানে দেখা যাবে আমাদের দেশের এক তৃতীয়াংশ শিশু অর্থাভাবে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় চতুর্থ শ্রেণী পার করবার আগেই।তাদের অধিকাংশই শিশুশ্রমিকে পরিণত হয়।দেহব্যবসাতেও নামানো হয় জোর করে।
     
কেমন আছে আমার দেশের এই খুদে শ্রমিকদের মন?তারা তো লেনিন ট্রটস্কি বোঝে না।তাদের কারো কারো খুদে হাতের জোরে মাতাল বাবার মদের খরচা আসে,মায়ের অসুখের ওষুধ আর দুবেলার অন্ন।অবসাদ আসবেই।স্বাভাবিক ।কিন্তু তার থেকেও ভয়ানক কিছু?সমীক্ষা জানাচ্ছে এই বয়স ব্যক্তিত্ব তৈরির বয়স।এই সময়ের অসুস্থ মানসিক পরিবেশ পরবর্তীতে নানান জটিল মনোসংকটের সৃষ্টি করে।তৈরি হয় সমাজবিরোধী মনোভাবেরও।কখনো কখনো অসময়ে কড়া নেড়ে যায় মৃত্যু ।আত্মহনন।

প্রতিকার।সহমর্মী হন।পাবে সন্ধ্যা না কাটিয়ে ফুটপাতে বা কোনও শিশুশ্রমিকদের বস্তিতে একটা সন্ধ্যা কাটান।একটা করেও যদি স্কুল কেনেন,আর তার দাম হয় দেড়শো টাকা,তাহলে এক পাইটের ভালো বোতলের দামে অন্তত দশটা শিশুর প্রদীপ জ্বালাতে পারবেন আপনি।এই নেশার হ্যাংওভার ওই পাইটের থেকে অনেক বেশি।ওদের সঙ্গে নিজের শিক্ষা শেয়ার করুন।এতে আপনার ঝালাই হবে নিজের জানা অজানার।আর ওরা শিখবে।পরবর্তীতে ওরাই সমাজকে পরিবর্তন করতে আপনাকে সাহায্য করবে।

  • সিস্টেমকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন।মনে রাখবেন।আপনিই সিস্টেম।আপনার মতো অসংখ্য মাইক্রোসিস্টেম একটা বড় সিস্টেম তৈরি করে।
  • ওদের মনের কথা পড়তে শিখুন।ওদেরকে বকা না দিয়ে আর কিছু না পারলে ঘেন্না করা বন্ধ করুন।একটু সোহাগ হলে তবেই কিন্তু শাসনের অধিকার।
  • যে দেশলাই দিয়ে আপনি খাবার চুল্লি জ্বালান,বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই দেশলাই একজন শিশুশ্রমিকের তৈরি।
  • যে চামচ দিয়ে আপনি আপনার আদরের ছোট্টর মুখে আইসক্রিম তুলে দেন,সেটাও অনেক সময়তেই ওদের তৈরি।
  • যে ধূপে আপনি পুজো দেন,সেটাও বেশির ভাগ সময় ওরা তৈরি করে।
  • ওদের পাশে থাকুন।ওরাও আগামী দিনগুলোতে আপনার পাশে থাকবে।

Sat 16 Nov 2019 13:39 IST | শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী