গন কেশ ও তারপর

কাশিম খালো-র প্রথম ছবি ”গন কেশ” কিন্তু কেবল নতুন বিষয় নিয়ে একক সচেতন সৃষ্টি হয়ে রইল না। এক বিরল সমাপতনে এই বছরেই পর পর আরও পাঁচটি চলচ্চিত্র জন্ম নিল একই সমস্যার হাত ধরে। দ্বিতীয়টি এক কন্নড় ছবি,তৃতীয় তার রিমেক “উজড়া চমন”,চতুর্থ “বালা” এবং শেষে বাংলা ছবি” টেকো”। সংবাদ-মাধ্যম তাই এর কারণ খোঁজায় ব্যস্ত। ছবিটি ফিরে দেখা যাক ।

director qasim khallow_0.png
গন কেশ এর পরিচালক কাশিম খালো

সবুজ তরাইয়ের গায়ে পাহাড়ঘেরা শিলিগুড়িতে বাবা মায়ের কাছে দিব্যি ছিল এনাক্ষী(শ্বেতা ত্রিপাঠী)। স্নানের পরে চুল আঁচড়াতে গিয়ে রোজ জঙ্গল হয়ে ওঠে চিরুনি। ফাঁকা হতে থাকে মাথা।বাবা প্রথমে না-মানলেও মা-মেয়ে আশংকায় নানা চেষ্টা করে চলে। ডাক্তারের সাথে দ্রুত বদলাতে থাকে ওষুধ ও বিচিত্র সব পথ্য। তবু সর্বনাশ(!) ঘনিয়ে আসে,স্কুল থেকে পাড়ার চোখে পড়ে । তামাশার চোটে আত্মবিশ্বাসে তমসা নামে । শপিং মলে সৌন্দর্যের পশরা বেচা মেয়ে প্রচলিত সুললিত রূপ ফেরাতে পরচুলা পড়ে। তবে বারংবার বিয়ে নাকচ হলেও, সে প্রথম লড়াই জেতে প্রেম নিবেদন করা সুজয়(জিতেন্দ্র কুমার)কে টাক দেখিয়ে দিয়ে। শেষে সে মলে নাচের প্রতিযোগিতায় নামতে চাওয়ায় তাকে কাজ ছাড়তে হয়। মঞ্চে ওঠার আগে পরচুলা পড়ে গেলে সে টাক-মাথাতেই নাচবে ঠিক করে। ভয়,হতাশা পড়ে থাকে পরচুলার সাথে।

ছোট মাঝারি ঘটনা দিয়ে চারপাশের মানুষ কেমন পণ্যসভ্যতার দাস হয়ে সুন্দরের মাপকাঠির ফাঁদে বন্দী, তা দেখানো হয়েছে। গ্ল্যামার আর সৌন্দর্যের অধিকার সবার! কোনক্রমে তা না-থাকলে ঠোকরাবে এই সব ছাঁচে ঢালা রোবটের দল। ক্রমশ বেড়ে চলা সংকটে তার মা(দীপিকা আমিন) ও বাবা(বিপিন শর্মা)স্নেহের আড়াল ও চিকিৎসা দিয়ে রক্ষা করতে চায়। বাবা শিলিগুড়ির হংকং-বাজারে ঘড়ি বেচার ফাঁকে বউয়ের তাজমহল দেখার সিকি-শতাব্দী পুরনো স্বপ্নপূরণে বারংবার বিমানবিহারী হবার কথা বলতে লোকে মজা পায়। বিমান থেকে মলমূত্র কী ভাবে পড়ে তা নিয়ে গবেষণা হয়। নানা ফিলমি উল্লেখ, ডাক্তারদের মূর্খামি এবংসুজয়ের  ওংকার ওয়াই-এ এনাক্ষীকে খাওয়ানোর সরলতা ইত্যাদিতে সরস রেহাই মিললেও মানসিক যন্ত্রনা চরমে উঠলে তার বাবা ভ্রমণের জন্য জমানো সমস্ত টাকা দিয়ে চিকিৎসা করায়। তাতে তাজমহলের স্বপ্ন ভাঙার বদলে পরিবারের সৌধ মজবুততর হয়।যে বাবা আগে মেয়ের টাক-পড়া অংশে স্কেচপেনের কালি দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিল,তাকে সর্বস্ব ব্যয় করতে দেখে এনাক্ষী ভরসা পায় ও ক্রমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

টাক-মাথা হাসির খোরাক(সিনেমাগুলোর নাম লক্ষণীয়),তাতে এমন কী অভিনবত্ব যে এতজন পরিচালককে টানে ! আদতে হাসির পর্দা ঠেলে ভুক্তভোগীর যন্ত্রণার বাস্তব চেহারা তাঁরা ধরতে চান।চিত্রনাট্যে তাই কিছু বদল করে এই সব উপহাস,তা থেকে জন্ম নেওয়া বিচ্ছিন্নতাবোধ, পণ্যসমাজের নির্দয়তা আর নানা অসংগতির উলটোদিকে তৈরি হওয়া পারিবারিক বাঁধন,সহমর্মিতার জোরে আত্মবিশ্বাস ফেরানোর কথা বলতে চান। চারপাশের চেনা চরিত্র, ছোট শহরের বাস্তব চেহারা,রোজকার সংলাপ তাদের গল্পকে জীবন দেয়। দর্শক সহজেই একাত্ম হতে পারে।সেখানে লুকিয়ে আছে এমন সমস্যাকে বারংবার নাড়াচাড়া করে দেখার ইচ্ছে,যা আপাতভাবে নিরীহ সমস্যা হলেও তুচ্ছ নানা কারণে মানুষকে লজ্জিত ও অসহায় করে তোলে। ঠিক সেই ফাঁক দিয়ে শ্বাপদের মতো ঢোকে মিথ্যাচারী পণ্যনির্মাতার আপদ।অনেকটা চ্যাপলিনের কায়দায় অনেক দিন পরে হাসিঠাট্টার পেঁয়াজ-খোসা ছাড়িয়ে চোখকে সজল করার সুযোগ দিয়েছে এই বিষয়। অথবা বলা যায়, A Short Story About Love সিনেমায় দেখানো টেলিস্কোপটির মুখ ঘুরিয়ে শেষে যে নতুন চোখে সবটা দেখার ইঙ্গিত ছিল,এই সব পরিচালকরা যেন তাকে মান্য করে গ্ল্যামার জগতের শূন্যতা ফুঁড়ে গভীরে গিয়ে দেখাতে চান টাক আর লুকোনোর ব্যাপার নয়।

Thu 14 Nov 2019 13:50 IST | অমিত মুখোপাধ্যায়