ধা | রা | বা | হি | ক: লঙ্কাগড়ের লঙ্কাকান্ড

মিশমিশে কালো গায়ের রঙ।বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারা।ইয়া বড় গোঁফ আর কুঁতকুঁতে দুই চোখ।এক্কেবারে অসুরের মতোই দেখতে।ভুঁড়ি দেখলে মনে হবে বিভীষণ না হয়ে এই লোকটার নাম কুম্ভকর্ণ হওয়া উচিত ছিল

lglk12-1-illastration-td-sarkar.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার নাড়াজোল রাজবংশ। সেই রাজবাড়ির রাজবাড়ির পরিখায় তরবারি হাতে পাহাড়া দিতেন স্বয়ং দেবী জয়দুর্গা। জনশ্রুতি  তাঁর অসির জ্যোতিতে অত্যাচারি ইংরেজরা চোখ ঢাকত। বর্গীরাও এই জনপদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না। সেই দেবী জয়দুর্গার অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর ধারাবাহিক...

 

|| পর্ব বারো ||

সে রাতে রঙ্গীল জয়দুর্গার স্বপ্ন দেখল।মা যেন তাকে কিছু বলতে চাইছেন।সতর্ক করতে চাইছেন।তারপরেই রঙ্গীল দেখতে পেল গ্রহণ ঢেকে দিচ্ছে সূর্যকে।কোথা থেকে যেন শব্দ ভেসে আসছে ধুমধুম।জয়দুর্গার এক হাতে তরবারি, অন্য হাতে ঢাল।তার অনতিদূরে এক প্রকান্ড হাতি।তার পায়ে ঘুঙুর পরানো।আবোলতাবোল স্বপ্ন দেখতে দেখতে কখন যে সকাল হয়ে গেল কে জানে।

   সকালে খাবারটেবিলে বসে রঙ্গীল দেখল সুনন্দাদিদি আর অমূল্যজ্যেঠুর থমথমে মুখ।বাপি আর মাম কথা বলছে না।তার মতোই তিন্নিও যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।কী হয়েছে? জানা গেল সুনন্দাদিদির দুটো পোষা বিড়াল ছিল।তাদের রোজ সকালে মাছ খেতে দিত দিদি।আজ সকালে দুটি বিড়ালই নাকি দাওয়ায় মরে পড়ে আছে।তাদের দেখে বোঝা যায় তারা রক্তবমি করেছে।বিষক্রিয়া নিশ্চিতভাবেই।কিন্তু  কীভাবে? রাজবাড়ির ভিতর এসব কী ঘটছে?রঙ্গীলের হঠাৎ একটা সন্দেহ জাগলো।

– জ্যেঠু।এমন নয়তো যে বিড়াল দুজন গতকাল রাতে সিঁড়িতে পড়ে যাওয়া মিষ্টিগুলো খেয়েছে?

রঙ্গীলের কথা শুনতেই অমূল্যজ্যেঠু সচকিত হয়ে উঠল।সত্যিই তো!তিনি "গোপাল,গোপাল" ডাকতে ডাকতে দৌড়ে নেমে গেলেন।তারপর খানিক পরে ফিরে এলেন থমথমে মুখ নিয়ে। ধপ করে বসে পড়লেন ঘরের এক কোণে রাখা ইজিচেয়ারে।রঙ্গীলের মনে হলো এ যেন তার চেনা অমূল্যজ্যেঠু নয়,এ কোনও যুদ্ধক্লান্ত অধিপতি।সুনন্দাদিদি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,"কী হয়েছে বাপি?"

জানা গেল রঙ্গীলের অনুমান ঠিক।বিড়ালগুলো ওই মিষ্টি খাবার পরেই মরে গেছে।বিড়ালের দেহের খানিক দূরেই মিলেছে আধোখাওয়া মুগজিলাপির টুকরো।এমনকি তাদের রক্তবমির মধ্যেও পাওয়া গেছে মিষ্টির অংশ।জ্যেঠু মাথায় হাত দিয়ে আপন মনে বিড়বিড় করছিলেন,"শেষ পর্যন্ত রামতনু।আমি যে বিশ্বাস করেছিলাম।"

এরই মধ্যে হঠাৎ রঙ্গীলের মাথায় ঝিলিক খেলে গেল।"রঘুপতি দেহ পাইলো কী কেহ"।রঘুপতি মানে রাম।আর 'দেহ' শব্দের সমার্থক 'তনু'।তার মানে সেই ঢিলে বাঁধা চিঠিতে 'রামতনু কাহার'এর উল্লেখ ছিল।বাবাকে এ কথা বলতেই বাবা বলল,"পরের লাইনটাও মিলে যাচ্ছে দেখ।'মধুমেহ' মানে ডায়বিটিস।সে রোগ হয় মিষ্টি খেলে।আর সন্দেহ শব্দটাও।

– তার মানে বাপি,গতকাল ওই মিষ্টিগুলো আমরা খেলে আমাদেরও একই অবস্থা হতো।ওই বিড়ালগুলোর মতো।

– হয়তো তাই।এটা একটা অ্যাটেম্পট।আমাদের থানায় জানানো উচিত। 

– একটা কথা কিন্তু এতক্ষণে পরিষ্কার বাপি।ওই ধাঁধায় লেখা চিঠিগুলো যে লিখছে সে আমাদের বন্ধু।কিন্তু কোনও কারণে সে আমাদের সামনে আসতে চাইছে না।অথচ তার কাছে পৌছোনো আমাদের এখুনি দরকার।

– তুমি ঠিকই বলেছো রঙ্গীল।

তিন্নি বলল,"রাজুভাই এসব দুষ্টমি করেছে।"মাম হেসে বলল,"হতেও পারে।"

অমূল্যজ্যেঠু হলধরকে দিয়ে দাসপুর থানার ওসি বিভীষণ মন্ডলকে একটা চিঠি লিখে পাঠালেন।ততোক্ষণে তাঁর সামনে অবনীকাকু আর গোপালকাকু এসে উপস্থিত হয়েছে।তারা হয়তো এই ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে।অমূল্যজ্যেঠু মাথায় হাত রেখেই মেঝের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,"রামতনু কাহারকে তলব করো।বলো জরুরি দরকার।"

lglk12-2-illastration-debsarkar.png
অলঙ্করণ: দেব সরকার

নীচ থেকে ভেসে আসছে জয়দুর্গা মন্দিরের ঢঙঢঙ শব্দ।সকালের পুজো সারছেন পুরোহিত।থমথমে পরিবেশে সারাটা সকাল কেটে গেল সকলের।দুপুরে ঠিক খাবার সময় পুলিশ গাড়ি নিয়ে দাসপুর থানার ওসি বিভীষণ মন্ডল এসে হাজির।মিশমিশে কালো গায়ের রঙ।বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারা।ইয়া বড় গোঁফ আর কুঁতকুঁতে দুই চোখ।এক্কেবারে অসুরের মতোই দেখতে।ভুঁড়ি দেখলে মনে হবে বিভীষণ না হয়ে এই লোকটার নাম কুম্ভকর্ণ হওয়া উচিত ছিল।তিন্নি তাকে দেখে রঙ্গীলের কানে ফিসফিস করে বলল,"বিচ্ছিরি"।এক কনস্টেবল সমেত তাঁকে দোতলার বারান্দায় নিয়ে আসা হলো।খ্যানখ্যানে গলায় বিভীষণ বললেন,"কিয়ন সময়ে ঘটনা ঘটেইকছে?"

– আজ্ঞে সকালে।অবনীকাকু বলল।

– ওই লোকটা।কী যেন নাম।

– রামতনু কাহার।

– আলিঞ থুড়িথুড়ি আমরা আজ ওকে অ্যারেস্ট করবেক।

রঙ্গীল লক্ষ করলো বিভীষণ মন্ডলের কথা বলবার ধরনে এক অদ্ভুত আদিবাসী টান আছে।তার কথায় মাঝেমাঝেই সেইসব আদিবাসী শব্দ চলে আসছে।আর তখনই সে চোখমুখ কুঁচকে 'থুড়িথুড়ি' বলে নিজেকে সংশোধন করে নিচ্ছে।পুরো ব্যাপারটাই এতো তাড়াতাড়ি ঘটে যাচ্ছে যে যে তাকে দেখছে,তার হাসি পেয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।লালবাজারের সুব্রতকাকুর একদম বিপরীতে রয়েছে এই বিভীষণ মন্ডল।রামতনুর কথা উঠতেই অমূল্যজ্যেঠু বললেন,"ওকে ডাক পাঠানো হয়েছে।এলো বলে।"

বলতে বলতেই রামতনু কাহার 'বাবাগো মাগো' বলে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অমূল্যজ্যেঠুর পায়ে।

– আমি কিছু জানিনা বড়কুমার।আমি নির্দোষ।আমাকে বাঁচান।

বিভীষণ মন্ডল তার বেল্টের ভিতর থেকে লাঠি বের করে এইবার রামতনুর দিকে উঁচিয়ে বললেন,"চেদ চিকায় দা আবীন থুড়িথুড়ি কী করচেনটা কী শুনি?চলুন হাজতে..."

রামতনু কাহারের এইরূপ রঙ্গীলরা সেইদিন দেখেইনি।তার সমস্ত প্রতিপত্তি ব্যস্ততা যেন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।অমূল্যজ্যেঠুর পা ধরে সে বলল,"বড়কুমার।এই রাজবংশের নিমক খেয়েছে আমার পূর্বপুরুষ।এ কাজ আমার নয়।"

– এই মিষ্টি আপনার পাঠানো নয়?লঙ্কাগড়ের সতীশ ময়রা তো বলল আপনিই স্পেশাল হাড়ি অর্ডার করে এই মিষ্টি আনেন।অমূল্যজ্যেঠু বলল।

– এই মিষ্টি আমি পাঠিয়েছি একথা সত্য।কিন্তু মিষ্টিতে বিষ আমি মেশাই নি।মা জয়দুর্গাকে শপথ করে বলছি।

– আমি নিরুপায় রামতনুবাবু।আইন আইনের পথে হাঁটবে।তবে কথা দিচ্ছি যদি আপনি সত্যিই নির্দোষ হন,আপনি আপনাকে থানা থেকে জামিন দিয়ে ছাড়িয়ে আনবো।

বিভীষণ মন্ডল রামতনু কাহারকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তুললেন।কিন্তু রঙ্গীলের মন থেকে খটকা কাটছিল না।কেন যেন তার মনে হচ্ছিল রামতনু সত্যি কথা বলছে।অমন একটা মানুষ আর যাই হোক মিষ্ঠিতে বিষ মিশিয়ে তাদের সকলকে খুন করতে চাইবে না।কিন্তু উপায় নেই।সমস্ত প্রমাণসাবুদ তার বিপক্ষে।তাই আপাতত সে নিরুপায়।বিভীষণ চলে যেতেই অমূল্যজ্যেঠুও তার ঘরে ফিরে গেলেন।তার মন ভালো নেই।বিভীষণ  যাবার আগে রঙ্গীলের সঙ্গেও আলাদা করে কথা বলেছে।কীভাবে যেন তিনি জেনে গেছেন লক্ষ্মণনাথে রঙ্গীলের রহস্যভেদের কথা।

    দুপুরদুপুর একটা বিরাট কাঠের রথ এল রাধাগোবিন্দ জিউ মন্দিরের পাশে।আগামীকাল নাড়াজোলে রথযাত্রা পালিত হবে।তার সামান্য তোড়জোড়।অন্যান্য বার রথ ঘিরে লঙ্কাগড়ে বিরাট মেলা হয়।এবার অতিমারীর জন্য তা হবে না।'নমো নমো' করে সারা হবে সব আয়োজন।ধুস স্কুল খুললে ভালো হয়।না খেলার উপায় আছে,না স্কুলে যাবার।হঠাৎ রঙ্গীলের চন্দনের কথা মনে পড়ে গেল।ওই ছেলেটা তাদের স্কুলে পড়লে বেশ হতো।কিন্তু চন্দনের বাবা কি আর শহরের স্কুলে অতোগুলো টাকা দিয়ে পড়াতে পারবে? যতোই হোক,রঙ্গীলের চন্দনকে বেশ পছন্দ হয়েছে।ছেলেটা হয়তো তার মতো গাড়ি চড়ে ঘুরতে পারছে না বলেই তার ওপর রেগে আছে।গত সন্ধ্যায় চন্দন বলল "রাজুভাই নেই"!কোথায় গেল রাজুভাই?কে এই রাজুভাই!

    দুপুরটাও গুমোট হয়ে কাটলো।গোটা রাজবাড়ি যেন ঝিমিয়ে পড়েছে।ঠিক সন্ধ্যার আগে নীচ থেকে পুরোহিত মশাইয়ের আর্তনাদ শোনা গেল।"বড়কুমার।শিগগিরই নীচে আসুন"।তার চিৎকারে সচকিত হয়ে সকলে নীচে জয়দুর্গা মন্দিরের সামনে নেমে এসে থ বনে গেল।মন্দিরে জয়দুর্গা মূর্তি নেই।চুরি হয়ে গেছে! আরও একবার।

 

ক্রমশ...

 

Sat 12 Jun 2021 19:32 IST | শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী