উদয়ন পাহাড়ের গুহা

poetry-of-abid-hosen-manju.png

চিত্র: বাহারউদ্দিন

►   গুচ্ছ কবিতা

পরাবাস্তব

ওঁর কথা বেশি বলতে নেই। জলসায় নিঃসঙ্গ দীপশিখার মতো জ্বলছেন।স্বাভাবিক স্পর্শ থেকে দূরে । অনেক দূরে ।

ওঁর বাচনভঙ্গিতে শুধু শব্দ নয়, বিস্ময় নয়, ঝলসে উঠছে  দাড়ি কমা প্রশ্নচিহ্ন আর নাতিশীতোষ্ণ উচ্চতা।

পিত্রালয়ে সূর্যমুখী হয়ে ফুটছিলেন। একদিন সংবাদপত্রে জেগে উঠল তাঁর সুতীক্ষ্ণ বিদ্রপ।আর তখনই এক জন্ম-পাগলের সঙ্গে দেখা--- মাথায় তাঁর ঘন কাঁকড়া, গোফ জুড়ে বাগদা চিড়িংর শুঁড় ---পাগল তাঁকে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে ঘনঘন চুম্বন করল নিজেকে,নিষ্পত্র বৃক্ষের ডাল জড়িয়ে একসময় ঝুলতে লাগল, নিঃশব্দে।

এরপর আর ওঁদের দেখা-সাক্ষাৎ নেই । যুদ্ধে, জঙ্গি হামলায় ছিন্নভিন্ন ভুবন । যখন বান ডাকল তাঁর ডানহাতের আঙুল---তালগোল পাকিয়ে আচমকা ফুটবল মাঠে প্রবেশ করলেন উনি। ভাবলেন, একাই একাদশ হয়ে উড়িয়ে দেবেন আর্জিন্টিনাকে ।

প্রতিজ্ঞায় হয়তো ভুল ছিল না কোনো, হয়তো তাঁকে ময়দানের মানচিত্র জরিপের সুযোগ দেয়নি প্রতিদ্বন্দ্বী ছায়ারা---নিছক একটি পুতুল ভেবে দেওয়ালে দাঁড় করিয়ে তাঁর হাইট, তাঁর তলপেট মেপে দেখল অসংখ্য  কাপুরুষ ।

কয়েকহাজার গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তখনও নৈকট্যের গন্ধ শুকছিল ওই পাগল। যেদিন নিজের হৃদপিন্ডে ঘুষি মেরে-নিখোঁজ হয়ে গেলেন ওঁর নিরালম্ব বাবা, তাৎক্ষণিকতায় বোবা তাঁর বিদ্যাদাত্রী জননী।সেদিনই নাছোড়বান্দা খেলাঘরে উনি পরপর প্রসব করলেন দুটি সন্তান।এবার বয়কট শুরু ।

মেনে নিলেন স্বেচ্ছানির্বাসন । তবু আত্মস্থ নন, বাকরুদ্ধও নন। আবার ফিরে গেলেন স্বরবর্ণ পাঠের অভ্যাসে। এও আরেক নিরস্ত্র লড়াই । যেখানে রক্তক্ষরণ অদৃশ্য--- ঝাঁপিয়ে পড়ে না দীর্ঘশ্বাস। নিস্তরঙ্গ ছাদে কিলবিল করে চারাপোনা -আর তারাই ফিবছর বাড়তে থাকে তাঁর জঠরে।

আবার মা হতে চান উনি, তৃতীয় অথবা শতাধিক সন্তানের। 

স্বগত-উক্তিতে গমগম করছে তাঁর একান্ত বাঁক। ভাবলেন, রন্ধনশালার  ধোঁয়ায় আর নয়। প্রথম বর্ষার ইলিশ হয়ে লাফিয়ে উঠবেন মাঝ-দরিয়ায়

হে পৌরুষ তুমি কোথায় ?

২. ০৬.২০১২

 

সঙ্কেত

 

আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন ? আমার পঙ্গু ভাষা, কীট হয়ে শুয়ে থাকা,চারপাশে কেউটের গড়াগড়ি কিছুই বুঝি চোখে পড়ছে না ?

আমি খণ্ডিত ইতিহাস লিখে রাখছি, মাটিতে পুঁতে দিচ্ছি ভাঙ্গা ডালের  বয়স আর দুর্যোগের গৃহচিত্র । 

বৃষ্টিহীন আশ্বিন, গণগণে রোদ, পুড়ে যাওয়া প্রান্তর আর অর্ধদগ্ধ গোলাপের বিলাপ আঁকছি নোখাগ্রে।

উসখুস, কেবল উসখুস।

ইঁদুররে গর্তের খোঁজে বেরিয়ে ফণা উঁচিয়ে রেষারেষি করে প্রাণ হারাল দুটি বাস।বিধ্বস্ত হেলমেটহীন স্কুটার। পার্ক সার্কাসের মোড়ে স্থাপিত গহ্বরে ধোঁয়াটে মানুষ, নাতিদীর্ঘ মানুষ দুষ্পাঠ্য প্রেমিককে শূলে চড়িয়ে মেতে উঠল উৎসবে ।

অনড়। স্তম্ভিব আমি। এই তো দাঁড়িয়ে আছি, এক সেকেন্ড দূরে। 

আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন ? 

নাকি, চোখের ওপর নেমে আসছে না-বালক সন্ধ্যা !

১১.০৬.২০১৯

 

লড়াকু মাস্তুল

হারিয়ে গেল ক্যাবিনের সব কটা লোক।

ডুবন্ত শিশুগুলি কার কথা ভাবছিল, মুখ তুলে বারবার ডাকছিল কাকে, নীল ইশারায়?

নিঃসঙ্গ মাস্তুল আর লড়াকু নাবিক হ্যারিকেনে  চোখ রেখে খুঁচছিল বুঝি নোঙর ফেলার শেষ আশ্রয়।

কী অশেষ মৃত্যুজয়ী প্রেম !

২২.০৭.২০১৯

পলি 

গলির ভেতরে গলি, এইখানে বসবাস নির্মলা শান্তার

এইখানে প্রতিদিন জাহাজে বিমান নামে। স্থিতধী কান্তার

পুলক জাগিয়া ওঠে, দেহ জাগে, রাত জাগে মোনা গাজিপির

পিরের আস্তানা জুড়ে উদাসীন চোখ দুটি কল্পনা বিবির

 

কল্পনার নামেও কল্পনা আছে, আছে মৃদু  মিথ্যার ভাষণ 

কেননা সে কোনদিন মানে নাই, দেখে নাই সত্যের শাসন

বে-সোহাগি বিয়ের প্রথম পাঠ, ভ্রষ্ট নীড়ে সরব ধর্ষণ

ছায়াহীন শৈশবেও জন্মান্ধের ঘণীভূত, অকাল বর্ষণ

 

কল্পনা কল্পিত নয়, তার এই স্নিগ্ধতার দুর্বোধ্য ভাষায় 

লম্পট দুর্বৃত্ত থেকে ভাষাগুরু হরনাথ অপূর্ণ আশায়

নির্বাসন মেনে নিয়ে বারবার ঘাস গুঁজে বাড়ি ফিরেছেন

 

দেহের সীমান্ত আছে---কল্পনা সজাগ, তাই এত আড়াআড়ি

নীরন্ধ্র উত্তাপ কিংবা দেহচাষে কল্পনার মায়াবি নয়ন

জেগে থাকে মগ্নতায়, শিল্পিত স্বভাবগুণে জেনেছে চয়ন

তবুও সে অনিবার্য গলির ভেতরে ব্যস্ত, তস্যতর গলি,

নাকি এক বীর্যহীন  পুরুষের রহস্যের অনর্থক পলি!

২২.০১.২০০৭

হূল

অসুখ ঢালিয়া দেয় অসুখের বাপ

কী করে বরদাস্ত করি এই মহাপাপ

জমিন বিলিয়ে দেব, দেব খেসারত 

এজিদ গড়ুক তবে মিথ্যা এমারত

তাহলে শিল্পই হোক কৃষির নসিব 

হাসানের কবরেও গজিয়ে উঠুক

কৃপণের, সিমারের অনারব ছোরা

আমার মুনিব হোক মতিলাল ভোরা

 

গাজির হুকুম আজ শাখের করাত

কৃষকের, লাঙলের দুষ্পাঠ্য বরাত

বিবির কপালে ভাঁজ, আলথালু চুল

নিকুঞ্জ প্রভাত তবে  বোলতার হূল!

সংযয়ে কাহিল বীর ডোরাকাটা রায়

বদর বদর গাঙে, দুপাড়ে ভাঙন

দুর্বোধ্য পায়ের চিহ্ন ঢেকেছে জোয়ার

প্রত্যাশা ও ভয় তবে ক্ষুরে ক্ষুরে খায় ?

২৩.০১.২০০৭

 

♦⇔♦

 

 

 

Sat 17 Oct 2020 15:08 IST | আদিব হোসেন মঞ্জু