বাঙালির রাজনৈতিক সংজ্ঞা 

নীল-ছোঁওয়া ফাল্গুনি আকাশ। গহণশীল আর গহণযোগ্য বাঙালির চিরায়ত ভাবাবেগের মতো, স্বচছ অনুভূতির মতো উদার অন্তহীন তার বিস্তূতি। যার দিগন্ত নেই, কালের মাত্রা নেই, নেই ভাষিˆক অথবা সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্রতার নির্বোধ মানচিত্রায়ন। সে যেমন বিশেষেˆর, তেমনি নির্বিশেষের। যেমন ব্যষ্টির, তেমনি গোষ্ঠীহীন সমাজের। 

বাঙালির এ আকাশকে, তার ভৌগলিকতা বোধকে, সত্তার বিশিষ্ট রাজনৈতিক সংজ্ঞাকে যারা বিভাজিত, কুলষিত করতে চাইছে, যে-সব বহিরাগত বারবার ভেতরে ঢুকে, রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের  অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে---আমাদের জনশক্তি, জলশক্তি, প্রেমাসক্তি এক হয়ে একস্বরে, তোড়ের মুখে তাদের ভাসিয়ে দেবে। ভস্ম করে দেবে আগুন খেলার রং-ঢং কে । এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। কেননা, আমাদের গিরিশ্রেণী, আমাদের চড়াই-উতরাই ভূখণ্ড, লৌকিক স্বপ্ন, আমাদের রাজনীতির গঠনশীল প্রচেষ্টা আর অঙ্গীকার বিনিদ্র পহরীর মতো জাগ্রত। সুউচ্চারিত। যেখানে দ্বিধা নেই। নেই অহেতুক অভিমানের গাম্ভীর্য বা পরশ্রীবিদ্বেষের মূঢ় লম্ফঝম্ফ।  

 মন্দির নিয়ে মসজিদ নিয়ে আমরা লড়াই করি না, ধর্মস্থানকে রাজনীতির অঙ্গন ভাবি না, রথযাত্রার মতো বর্ণময়, ইতিহাসস্পর্শী উৎসবের আবেগকে জড়িয়ে অন্ধ রাজনীতি, ভণ্ড রাজনীতি, কালিমালিপ্ত রাজনীতিতে সায় দিই না। ধিক, বলে এসব অপকাণ্ডকে উড়িয়ে দিই। আত্মচৈতন্যে মগ্ন হয়ে বলি, সবার উপরে মানুষˆ সত্য, তাহার উপরে নাই। আরোপিত সঙ্কটে তর্জনি উঁচিয়ে বলি ---জাতের নামে বজ্জাতি সব জাতজালিয়াত খেলছ জুয়া। বা, জাত গেল জাত গেল বলে যারা চেঁচায়, তাদের আজব কারখানায় প্রেম আর বিশ্ব মানবের, একমানুষেˆর শাশ্বত অভিব্যক্তি ছড়িয়ে দিতে থাকি। 

এখানেই বাঙালি তার আশেপাশের বহু নৃগোষ্ঠী থেকে আলাদা। এখানেই স্বতন্ত্র তার কর্ম আর মর্ম। এই পথ চলাতেই  যাবতীয় আনন্দ। বাঙালি কখনো বলে না, এই ধরনের বলাবলিকে বিলকুল প্রশ্রয় দেয় না যে, অমুক পাঞ্জাবি, অমুক মারাঠি, অমুক বিহারি, ওড়িয়া, অসমিয়া, ইংরেজ, জার্মান, ফরাসি--- অতএব বঙ্গে তাদের  জায়গা দেব না, তাদের কৃষ্টি ও সংস্কূতি গ্রহণ করব না। বরং বলতে চায় পৃথক সত্তাকে, পৃথকের আচরণকে, সাংস্কূতিক অভ্যাসকে মননে ঠাঁই দিয়ে নিজের গ্রহণশীলতাকেই উঁচু করব। আমাদের চিত্তবূত্তির বূহৎ পরিসরও স্ববিনয়ে  দূঢ়তায়  জানিয়ে  দেয় ---অনিঃশেষের নদী দিয়ে,  মোহনা বেয়ে মহামানবের সাগরতীরে আমরা সবাই জড়ো হব। এভাবেই বাঙালি যুগ যুগ ধরে নিজের স্বতন্ত্র সংস্কূতি আর  ঘোষিˆত অঙ্গীকারের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংজ্ঞা নির্নয় করেছে। আদায় করেছে অভিপ্রেত স্বীকৃতি---হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস্ টু ডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো । 

আমরা সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বিশ্বাস করি--- বাঙালির সম্মেলিত ধর্মবোধ, অন্যমত সহিষ্ণুতা কেবল এ উপমহাদেশকে নয়, বিশ্বের আগামীকে, আগামীর সমস্ত সুন্দরকে ভাবিয়ে তুলবে। উদ্বুদ্ধ করবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং স্বপ্নের নিরন্তর নির্মাণকে; এখানে কর্ম আর মর্মের যৌথ পক্রিয়া যেরকম, ঠিক সেরকম মননের ধারাবাহিক ব্যপ্তিও।  

বাঙালির কবিতা, চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, কথাসাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, সঙ্গীত, রূপচর্চা, তারুণ্যের চর্চা ও চর্যা এবং তার সীমাভাঙার রাজনীতি যে-ভাবে অসংখ্য ভাঙন, রক্তক্ষয় আর রাষ্ট্রবিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাসকে অতিক্রম করে  অতীতের গৌরব আর ঐতিহ্যকে বুকে জড়িয়ে সংহত, সংযত, কখনো প্রতিরোধমুখর চেহারা  খাড়া করছে, তাতে আত্মতৃপ্তির সর্বমগ্নতা নেই, আছে কিছুটা স্বস্তি, কাঙ্খিত প্রত্যাশার ঝলমলে রোদ আর হৃদয়ে উষ্ণতা। আছে প্রাণচঞ্চল, কর্মমুখর নেতৃত্ব আর  অভিজ্ঞ প্রজ্ঞার সুদৃঢ় সম্মতি। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, চারপাশের  কিছু কিছু হুল্লোড়, তীর্যক মন্তব্য, কদর্য ইঙ্গিত আর অঙ্গভঙ্গির ভিড়ে দাঁড়িয়ে আশাবাদিতায় এতটা মুখরিত, এতটা আশ্বস্ত হবার কারণ কী? তাৎক্ষণিকের হুমকি, উল্লাস আর অশালীণ ভাষা কি চোখে পড়ছে না? কানে আসছে না গোপনের ফিসফাস আর ষˆড়যন্ত্র? ইচেছ করেই বুঝি এড়িয়ে যাচিছ  অনুপ্রবিষ্ট, বহিরাগতদের অতিথি সাজার মুখ ও মুখোশ? না, একদম না।

 আমরা সতর্ক। আমরা সংগঠিত। আমরা বীরের মৃত্যুতে কাঁদি না, হামলার আগে, হামলাবাজদের সাজ সাজ রণমূর্তি দেখে  ঘাবড়ে যাই না। ঘরে ঘরে গড়ে তুলি দুর্গ । স্মৃতি আর ইতিহাসের সমূহ  সঞ্চয় নিয়ে আমরি বাংলার তুখোড় উচ্চারণ নিয়ে  সংগঠিত, কবন্ধ সংঘসমূহের বিভ্রান্তি আর ফাটল তৈরির বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। 

আমরা চঞ্চল । আমরা প্রস্তুত। আমাদের একহাতে বাঁশি আর আরেক হাতে রণতুর্য। এসব দুর্বার, উদ্দাম উদ্যমের উৎস কী? লোকায়ত, নাগরিক ঐতিহ্য। বূহত্তর সংস্কূতি আর সহিতের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার---অসংখ্য শহিদের অপ্রতিহত উত্তরাধিকার।
বসন্ত সমাগত । সামনে গণইচ্ছা পূরণের তরণি (নির্বাচন)। শস্যখেতে টগবগে ফসল। নদীনালায় মাছের খলখলে কলরব। যে মাঠে ফলন শেষˆ, যে নদীতে জল এখন তলানিতে, যে সমুদ্রে বর্ষার উত্তালতা নেই, জোয়ার নেই, সেখানেও আমাদের সমবেত প্রচেষ্টা, ঐক্য আর মিলনের সরব প্রয়াস আর সব বয়সির স্ব্প্নের সমাহার ফলদায়ী হয়ে উঠবে। কারণ কী? আমাদের রাজনীতি আর সমাজনীতি একাকার হয়ে--- কোথাও সুভাষˆচন্দ্র বসু, কোথাও চিত্তরঞ্জন দাস, কোথাও উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (কংগেসের প্রতিষ্ঠাতা), কোথাও বিধানচন্দ্র রায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান, মানিক মিঁয়া, মৌলানা ভাসানি, ফজলুক হক, মুজাফফর আহমেদ, জ্যোতিবসু, এরকম-অসংখ্য মনীষীর রাজনৈতিক মননের বিবর্তিত প্রত্যাবর্তন দাবি করছে। দাবি করছে  রাজনৈতিক আকাঙ্খা়র পরিপূর্ণ স্থাপনের  পাশাপাশি আবহমান সংস্কূতির বিকূতিহীন, বিচ্যূতিহীন মুক্তাঙ্গণ । জনমুখের এই ইচছা, আপসহীণ জেদ আর প্রেমময় উচছ্বাস, জলোচছ্বাস আমাদের সকলের ভরসা। প্রান্তিক, অপ্রান্তিকের স্বপ্নপূরণের প্রধান, প্রধানত অবলম্বন।  কেননা এখানে ব্যষ্টি আর সমষ্ঠির পছন্দ বূহৎ মঞ্চে, মাঠে আর ময়দানে, চৌরাস্তার মোড়ে, রাস্তার মিছিলে একত্র হতে চাইছে। 

যাঁরা বলেন--- আমরা রুগ্ন, ভাগ্যহত। আত্মবিস্মূত। আত্মঘাতী আর বিভাজিত--- তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, দেশভাগ, সামাজিক সঙ্ঘর্ষˆ, বর্গীয় গণহত্যা এবং লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত হরণের পরেও বাঙালি ভড়কে যায়নি, লক্ষ্যচ্যূতও  হয়নি। বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কূতি, বাংলার মাটির আমূলকে স্পর্শ ক্রমাগত দেশপ্রেমের মিনার গড়েছে, এখনও নির্মাণ করছে অগ্রগতির সমূহ দূষ্টান্ত।  ‘বিশ্বজয়ের’ মুকুট সবিনয়ে হাতে নিয়ে আমাদের নির্বাচিত নেতৃত্ব  বিস্মিত করে দিচেছ দুনিয়াকে। এসব গৌরব আমাদের সকলের, বঙ্গবিশ্বের সব বাঙালির। আমরা গর্বিত। উজ্জীবিত এবং  আগামী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। যে লড়াই জিততে হবে, যে লড়াই নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জাতিকে, তার রাজনৈতিক সজ্ঞা আর জাতীয় অভিজ্ঞানের পুনর্বিন্যাসকে উদ্ধুদ্ধ করবে। এখানে সরাসরি, নির্দ্ধিধায় বলতে ভালো লাগছে, অন্তরে বাহিরে গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, আর ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার বিশাল জনপদ আজ আাবার ঐক্যবদ্ধ। সে তার উত্তরণ চায়। চায় অসমাপ্ত নির্মাণের পূর্ণতা।            
  


                                    
 

Wed 17 Feb 2021 17:51 IST | বাহার উদ্দিন