বিনোদনের সুখ-অসুখ

Indian-cinema-realising-in-ott.png

এই বিচিত্র বিসুখের আশু বিপদ পাতলা হতে থাকলে দেখা যাবে, জীবনের খুব কম দিক আছে বা থাকবে যেখানে করোনা-র গ্রহণ লেগে কিছু বর্জনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না! মুম্বাইয়ের বড় তারকাখচিত, নামি পরিচালকের দামি চলচ্চিত্র পর্যন্ত বড় পর্দা ছাড়তে বাধ্য হলো। তারা জাঁকিয়ে ঘোষণা করে অনলাইন স্ট্রিমিং-এ আত্মপ্রকাশ করছে। বিরোধিতাও হয়েছে তৎক্ষণাৎ! 

পথপ্রদর্শক হবার দাবি করা বড় কথা নয়, প্রকাণ্ড পর্দার পৃথক প্রভাব, হলের সামনে প্রমত্ত অনুরাগীদলের প্রতাপ, ভেতরের সমবেত প্রথা-দর্শক, হিট হবার প্রচণ্ড প্রত্যাশার সাথে প্রচুর সম্ভাব্য টাকা-  এ সব ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে সাহস লাগে।কিন্তু তার চেয়ে বেশি দরকার হয় বিচক্ষণতা। কারণ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নি। 

লকডাউনের মুখোমুখি আত্মপ্রকাশ করা ও ইরফান খানের মতো শক্তিশালী অভিনেতার শেষ কাজের ট্যাগ পাওয়া সিনেমার ফাঁকা প্রদর্শন ও ক্ষতি সামলাতে প্রযোজকের তড়িঘড়ি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত ছোট এক কারণ হতে পারে এমন পদক্ষেপ নেবার পেছনে। "গুলাবো সিতাবো"-র ঠিক পরের দিনই বিদ্যা বালন অভিনীত বায়োপিক "শকুন্তলা দেবী" একই ভাবে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়। আরও অনেকের যোগ দেওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। প্ল্যাটফর্মই তখন আস্ত স্টেশন হয়ে উঠবে। 

এমন বিকল্প পটভূমি নিজের গতিতে প্রযুক্তির হাত ধরে বেশ কিছু দিন ধরেই তৈরি হয়েছে। প্রথম দিকে যে সব সম্ভাবনা দেখা গেছে, তার মধ্যে ইউ টিউব চমক লাগিয়ে নিজের গুণ জানান দেয়। ছায়াছবির প্রেক্ষাগৃহ, কেবল্ টিভি, ডিভিডি ইত্যাদির একচেটিয়া সাম্রাজ্য থেকে তা নীরব নাটকীয়তায় গণতান্ত্রিক পরিসর এনে দেয়। দু'হাজার পাঁচ সাল তাই নতুন যুগের সূচনা, বিনোদনের জগতে "এজেন্ট বিনোদ", যা ভাবা গেছিল তার চেয়ে বড় ষড়যন্ত্র লুকিয়ে রাখে নিজের মাঝে। 

তার পরের এক দশকে  ইউ টিউব অতি শান্ত ভাবে চোখের আড়ালে টিউব রেলের মতো দ্রুতগামী ও দূষণহীন মাধ্যম হিসেবে পছন্দের হয়ে ওঠে। তার আন্তর্জাতিক অর্জন অনেক জমা হয়। হাজার হাজার ভিডিও নানা উদ্দেশ্যসাধক হওয়া শুধু নয়, অভাবী চিত্রগ্রাহকের নতুন চিন্তা, নতুনদের চমকে দেওয়া সৃষ্টি নিমেষে নিখরচায় পৌঁছে দেয় আক্ষরিক ভাবে অসংখ্য দর্শকের কাছে। কিন্তু ঠিক দশ বছরের মাথায় বাংলা ছবির বিনোদনে দু'হাজার পনের-তে ফলক হয়ে ওঠে সুজয় ঘোষের "অহল্যা"। অতি কম পয়সায়, মাত্র দু'দিনের চিত্রগ্রহণে,কম সংলাপ, কম আবহশব্দ নিয়ে ঠাসা বুনোটের সৃজন বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সর্বভারতীয় ঘটনা হয়। হাতের মুঠোয় ধরা ছোট পর্দার জন্যই কিন্তু সে ছবি তৈরি হয়ে সবার ভালোবাসা পায়। 

সেরকম আরও কিছু নির্মাণ ক্রমশ আজকের দিন এনে দিয়েছে। ওদিকে ওভার দি টপ(ও,টি,টি) তার কিছু আগেই,দু'হাজার দশ-এগারো সাল নাগাদ,আরও চুপিসাড়ে সেই পথ অনুসরণ করে এসেছে। এবং আন্তর্জালের মাধ্যমে কেনা তথ্যের বিনিময়ে সরাসরি দর্শকের কাছে সেবা পৌঁছতে শুরু করেছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কম্পিউটারে, অ্যাপ নিয়ে বড়-চলভাষে, ডিজিটাল মিডিয়া প্লেয়ারে বা ইন্টিগ্রেটেড স্মার্ট টিভি প্ল্যাটফর্মে লোকের কাছে ক্রমশ তা জনপ্রিয় হতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে তারা নিজস্ব প্রযোজনার বিষয়ও দিতে থাকে। 

♦ভারতে ওটিটি-র চাহিদার লেখচিত্র দ্রুত চড়ছে। সব পক্ষই তাই নিরাপদে, পক্ষপাতিত্ব ও একচেটিয়াপনা ছাড়াই দর্শকের কাছে যেতে চায়। স্বাধীন পরিচালককে অসহায় হয়ে এর তার কাছে দৌড়তে হবে না। এমনকি ওটিটি-র সমস্যা হলে তাঁরা "পে অ্যান্ড ওয়াচ" ফরম্যাটে আন্তর্জালে ছবি দিয়ে দিতে পারবেন।♦ 

তবু এসব প্রধানত কিছু আধুনিক প্রযুক্তিসচেতন বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল বলে পি.ভি.আর. বা আইনক্সের মতো একাধিক-পর্দার দাদারা চিন্তার কোনও কারণ দেখে নি। তাদের টাটকা টগবগে ব্যবসার ছবির মতো জীবন্ত স্পন্দন আর কে দেবে! তার সাথে ঠাণ্ডা মনোরম বিলাসের আবহে হাজার কেনাকাটা ও খাদ্য-পানীয়র প্রলোভন! কিন্তু করোনা-র কামড় যেন কামারের এক ঘায়ে সমঝে দেয় তাদের। যারা একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিনকে লাটে ওঠাবার সময় প্রযুক্তির যুক্তিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসেছিল, আজ প্রথম গুলাবো-তে তাদের গোলাপি আভা ম্লান দেখায়। প্রোডিউসার্স গিল্ড অফ ইণ্ডিয়াকে পাল্টা মনে করাতে হয় যে তৈরি দামি সেট ভাঙা, শ্যুটিং বন্ধ হওয়া এবং ব্যাঙ্কের সুদের হারের কারণে তারা নাচার। যেটা তারা বলে নি, তা হলো, ভারতে ওটিটি-র চাহিদার লেখচিত্র দ্রুত চড়ছে। সব পক্ষই তাই নিরাপদে, পক্ষপাতিত্ব ও একচেটিয়াপনা ছাড়াই দর্শকের কাছে যেতে চায়। স্বাধীন পরিচালককে অসহায় হয়ে এর তার কাছে দৌড়তে হবে না। এমনকি ওটিটি-র সমস্যা হলে তাঁরা "পে অ্যান্ড ওয়াচ" ফরম্যাটে আন্তর্জালে ছবি দিয়ে দিতে পারবেন। 

কার্নিভাল সিনেমা যদিও এটাকে এখনি ট্রেণ্ড বলে মানতে রাজি নয়, কিন্ত বড় পর্দার লিখন দুর্দিনের দেওয়ালে বড়ই স্পষ্ট, পুঁজির নতুন সংকটও পরিষ্কার। ব্যবসার এই লড়াই নানা দিকে নানা ভাবে চেহারা বদলাবে অতিমারির ঘায়ে। যারা শিল্পের কিছু বোঝে না,  তবু গুণমান, চাহিদা, প্রতিযোগিতার দোহাই দিতে থাকে নিজেদের সুবিধেমতো, তারাই আটকে পড়লে মানবতার কাঁদন জুড়ে দিতে দেরি তো করেই না, উল্টে তাতে চতুর ভাবে হুমকি পর্যন্ত মিশিয়ে দেয়। 

তাই পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য  ফেসবুক-দেওয়ালে লিখেছেন যে  "রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত" মুক্তি পাবার সময়ের কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছে।কিছুতে তাকে শো দেওয়া হচ্ছিল না! পরে করুণা করে কিছু বেমক্কা সময়ে দেওয়া হয়, তা-ও অন্যায় শর্ত আরোপ করে! বলা হয়, প্রথম কয়েক দিনে ভালো পরিমাণে দর্শক না পেলে ছবি উঠিয়ে দেওয়া হবে। সেসময় শুধু ফেসবুক নয়, কাগজে পর্যন্ত সরাসরি দর্শকের কাছে তাঁর আবেদনের কথা আলোচিত হয়। সুজিত সরকার স্পষ্ট বলছেন অমিতাভকে নিয়েই করা  Shoebite মুক্তি না-পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে ছিল। বলছেন ভারতীয় বিনোদন জগতে ঊষাকাল এসেছে, তাঁর হাল্কা চালের,জমাটি ও বিচিত্র এই Dramedy বিশ্ব-দরবারে প্রদর্শিত হবে বলে তিনি খুশি। যদিও দু'শো-র বেশি দেশে বাঙালি পরিচালকের হিন্দি ছবির বিহার তাৎপর্যপূর্ণ, তবু একে সুজিতের দাবি মতো, "পরীক্ষা" বলা যায় না। কারণ এ ছবি বড় পর্দার জন্যই তৈরি হয়েছিল, এবং "অহল্যা"-র মতো ছোট পর্দার উপযোগী করার উদ্দেশ্যে বিশেষ কারিকুরি কিছু করা হয় নি আদপেই! 

"এ ছবির বিষয় ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রমী", চলচ্চিত্রজীবনের একান্ন বছরে পা দেওয়া অমিতাভের এই উপলব্ধির যুক্তিও অন্য আরও কিছু ছবির ক্ষেত্রে খাটে, তবু তারা অনলাইনে যায় নি।আদতকথা হলো, সামনে ঘন মেঘ, লগ্নি ফেলে রাখা যাবে না! টাকা এলে পোস্ট প্রোডাকসনের কাজ সেরে আরও কিছু প্রায়-তৈরি ছবি বাজারে আনা যাবে, সংশ্লিষ্ট সব শিল্পী ও কলাকুশলীদের পেটে কিছু যাবে। তা সত্বেও, এখনি মুক্তি না-দিয়ে জুনের বারো-তে প্রকাশের দিন ঠিক করা মানে আলোচনা, বিতর্ক, প্রচার মিলে আগ্রহ বাড়িয়ে চাহিদা তৈরি করা। অমিতাভ তাই অগ্রিম বুকিং নিয়ে মজা করে বলছেন। সুজিত বলছেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারিগরি মান নিয়ে নিশ্চিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন!

বাংলা ছবিও এ বাস্তবতা এড়াতে পারে না, এমনকি তাদের কাছে প্রস্তাব পৌঁছে গেছে বলে খবর। হল বাঁচানোর বড় কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা জানেন, তাঁদের নিম্নমানের বাংলা ছবিতে স্ট্রিমিং জায়ান্টরা আগ্রহী নয়। হলের মজা বেশি, একথা ঠিক হলেও, তাকে বারংবার জীবাণুমুক্ত করা, ঢোকার সময় পরীক্ষা করা, বিধিমতে দূরত্ব রাখা বা অজানা ভয়ের সামগ্রিকতা  কাটানো সহজ নয়। দর্শকের মূল অভ্যেসই বদলে যেতে পারে। 

এর মাঝে প্রধানত বাংলা ধারাবাহিক ও অন্যান্য অভিনেতা এবং কলাকুশলীদের দুর্দশার কথা প্রকাশিত হচ্ছে। মুম্বাইয়ের মতো কোন দাতা কর্ণ বা রঘু ডাকাতের বদান্যতা এখানে সম্ভব নয়। সামান্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবস্থাটা বোঝা যায় রুদ্রনীল ঘোষের মতো মানুষের ফেসবুক বক্তব্য থেকে। "মুখে কেউ কিছু বলছি না। কিন্তু আমরা আর কত দিন টানতে পারব জানি না।" বলছেন তাঁরাও দিন আনি, দিন খাই গোত্রের। সিনেমা চালু না হলে, শ্যুটিং না হলে প্রযোজক না নামলে তাঁরা ততদিন বেকার! বলছেন, " এদিকে টেলিভিশন চলে প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে। কারখানা বন্ধ, শ্রমিক বেকার,তাই বিজ্ঞাপন থেকে রোজগার বন্ধ টিভি চ্যানেলের। .. ... অর্থাৎ টিভির লক্ষ লক্ষ শিল্পী আর কলাকুশলীও বেকার! আরো বাড়বে। কি হবে কেউ জানিনা।"

তিনি বলেছেন তাদের মধ্যে জেলার লোকের কথা, যারা " বিপদে বাড়িও ফিরতে পারে নি। মুড়ি জল খেয়ে ভাড়াবাড়িতে আটকে আছে। 

বকেয়া টাকা চাইতে গেলে লোকজন পরিস্থিতির দোহাই দিচ্ছে বা ইন্ডাস্ট্রি খুললে পাবে বলছে!" শেষে এমনও অনুরোধ করেছেন, " যদি আপনাদের বাড়িতে বা পাড়ায় এরা ভাড়া থাকেন, সাধ্যমত একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন, তাড়িয়ে দেবেন না!"

আরও অনেকে আর্তস্বর তুলেছেন, ভিডিও পোস্ট করে একই ধরণের যন্ত্রণার কথা বলেছেন অভিনেতা জিতু কামাল ও অন্যান্যরা। আর্টিস্ট ফোরামের অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন ত্রাণের ভাঁড়ারে টান পড়ার কথা। তা ছাড়া দূরদর্শনে কিছু শোয়ের  প্রদর্শন বন্ধ করা ও পুনর্দর্শনের জেরে শিল্পীদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দিয়েছে এর মাঝেই। 

এসব থেকে বোঝা যায় করোনা-র বিনোদন-ক্রন্দন কোথায় পৌঁছেছে  এবং পরিযায়ী সমস্যা এখানেও অন্য ভাবে লুকিয়ে আছে। সত্যি বলতে আরও কিছু পেশাতে এমন ধরণের সমস্যা মাথা ঢেকে রেখেছে নানা কারণে। এক দিকে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি সমর্থ ক্রেতার কাছে যাবে, অন্য দিকে পুরনো পদ্ধতির বিপণন মুখ বুজে মার খাবে। বাকি ক্রেতা, মাঝের যত কর্মী, অনুসারী শিল্প, দোকানদার ইত্যাদি অসংখ্য মানুষের যা হয় হোক। 

কৌতূহলের বিষয় এই, এবার যে শক্তি ঘা খেয়েছে, সে মুখ বুজে থাকার পাত্র নয়। যেখানে রাষ্ট্র এমনকি তার বৃদ্ধ নাগরিকের ব্যাঙ্কের সুদ, কর্মীর পেশা, বাজারের জোগান, মজুরদের দুর্দশা না দেখে ব্যাঙ্কসংযুক্তি, বেসরকারীকরণ,অস্ত্র আমদানি, ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু করা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে দাপুটে প্রদর্শক পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হবার শোকগাথা ছড়িয়ে দেয়! শাসানি দেয় যে সব স্বাভাবিক হয়ে গেলে ছোট, মাঝারি ছবি ছেড়ে তাদের নাকি বড় ছবিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে! 

আসলে এমন দিন বিনোদনের জগতে আসাটা সময়ের অপেক্ষা ছিল, করোনা তাকে রাতারাতি বাস্তব করে দিয়েছে। যেখানে যেটুকু এগিয়ে আছে প্রযুক্তি,তার সুযোগ ক্ষমতাবান নেবেই। প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ ফের কতটুকু কী হারাবে নতুন করে, কীই বা পাবে! 

এই সব বিরোধ তার আংশিক স্বরমাত্র হয়ে উঠে সন্ধিকালের খানিক ইঙ্গিত দেয়, এটুকুই তার গুরুত্ব।

Fri 22 May 2020 17:44 IST | অমিত মুখোপাধ্যায়