বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় গুরুত্ব বাড়ল ভারতের

harsh-vardhan-in-who-executive-board.png

করোনা তদন্ত ইস্যুতে প্রবল চাপের মুখে যখন রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েছে চিন, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) একজিকিউটিভ কমিটির সদস্য হিসাবে যে ১০ দেশকে মনোনীত করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ভারতও। শুধু তাই নয়, হু-র একজিকিউটিভ বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসতে চলেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন। ১৯৪ সদস্য বিশিষ্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজিকিউটিভ বোর্ডের চেয়ারম্যান পদের মেয়াদ এক বছর। হর্ষ বর্ধন বোর্ড প্রধানের পদে জাপানের এইট নাটাকানির স্থলাভিষিক্ত হবেন। হু-র নীতিনির্ধারক বডি ওয়ার্ল্ড হেল্থ  অ্যাসেম্বলির দু'দিনব্যাপী ভিডিও বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে অংশ নেন হর্ষ বর্ধন। তাঁর আগে ২০১৬ সালে হু-র একজিকিউটিভ বোর্ড চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী জেপি নাড্ডা।

অন্যদিকে, করোনার উৎস সন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে শতাধিক দেশের প্রস্তাবে কার্যত সিলমোহর দিয়ে দিল বিশ্ব স্বাস্থ্য  অ্যাসেম্বলির  (ডব্লুএইচএ) বৈঠক। চিনের উহানই এই মহা সর্বনাশের উৎস। বিশ্বজুড়ে করোনা অতিমারির তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর থেকেই এই অভিযোগ উঠছিল। এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস ঠিক কোথা থেকে, কীভাবে ছড়াল তা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি বিশ্বজুড়ে ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠায় অস্বস্তিতে আছে বেজিং।

ভারত সহ গোটা পৃথিবীর মোট ১১৬ টি সদস্য দেশ এই দাবি সংবলিত খসড়ায় স্বাক্ষর করেছে বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ সংস্থা এবিসি নিউজ। সোমবার ডব্লুএইচও-র নীতি নির্ধারক ওয়ার্ল্ড হেল্থ অ্যাসেম্ব্লির বৈঠকে এই দাবি ওঠে। সংবাদ সংস্থার খবর, গড়িমসি করেও শেষ পর্যন্ত চাপে পড়ে কোভিড নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে চিন। তবে বেজিং চায়, বিশ্বজুড়ে এই অতিমারির প্রকোপ প্রতিরোধ করার পরই যেন এই লক্ষ্যে এগোনো হয়। প্রস্তাবিত তদন্ত প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই এটা চিনের এই অবস্থান বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।

সারা বিশ্বে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ লক্ষ পার করে গেছে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা আমেরিকার। আক্রান্ত ১৫ লক্ষ, মৃত্যুর সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। প্রথম থেকেই এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগের তর্জনী তুলেছেন চিনের দিকে। প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা নিয়েও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় মার্কিন অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু চিনের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ পৃথিবীর শতাধিক দেশের বিরূপ অবস্থান। করোনা তদন্তের প্রস্তাবে সরাসরি চিনের নাম উল্লেখ করা না হলেও সন্দেহের তিরটা যে কোনদিকে, তার না বোঝার কথা নয় বেজিংয়ের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ স্বাক্ষর করেছে অস্ট্রেলিয়ার আনা এই প্রস্তাবে। ভারত ছাড়াও এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ব্রিটেন, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও রাশিয়ার মতো দেশ। শুধু কোভিড ইস্যু নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈঠকে তাইওয়ানকে পর্যবেক্ষক দেশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার ইস্যুটিও চিনের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদ সংস্থার খবর, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দেশের দাবি উপেক্ষা করতে না পেরে অবশেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রস আধানম গেব্রেয়েসাস বলেছেন, 'যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত সময়ে' বিষয়টি 'নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হবে'। অর্থাৎ কোভিডের উৎস সন্ধানে তদন্তের দাবি নিয়ে চিনের আপত্তি ধোপে টিকল না অবশিষ্ট বিশ্বের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে। শুধু করোনা ভাইরাসের উৎস সন্ধানই নয়, সেইসঙ্গে এই অতি মারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকাও 'নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বিস্তারিত' খতিয়ে দেখার জন্য বৈঠকে আনুষ্ঠানিক ভাবে দাবি তোলে ৬১ টি সদস্য দেশ। উল্লেখ্য, চিনের উহানে কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কাঙ্ক্ষিত দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। আমেরিকা সরাসরি বলেছে, চিনের কথায় অন্ধের মতো বিশ্বাস করে গোটা বিশ্বকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছে ডব্লুএইচও। ১১ মার্চ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। 

অন্যদিকে, চিন বরাবরই বিশ্বজুড়ে এই ভয়ঙ্কর অতিমারির নেপথ্যে নিজেদের ভূমিকা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কখনও ভাইরাস ছড়ানোর দায়ে পাল্টা আমেরিকার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, কখনও তদন্তের দাবি তোলার জন্য অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে বেজিং দায় এড়াতে চেয়েছে। কিন্তু ইউরোপ, আফ্রিকা সহ বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবার পরোক্ষে বেজিংকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল। আমেরিকা একদিকে যেমন এই অতিমারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'ব্যর্থতা'কে দায়ী করেছে, তেমনি অন্যদিকে বিঁধেছে চিনকে। মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা দফতরের সচিব অ্যালেক্স অ্যাজার চিনের নাম না করেই বলেছেন, 'ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি প্রচ্ছন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে একটি সদস্য দেশ তাদের স্বচ্ছতার দায়বদ্ধতাকে কার্যত পরিহাসে রূপান্তরিত করেছে। যার মারাত্মক মূল্য চুকিয়ে দিতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে।' 

Fri 22 May 2020 11:18 IST | ওয়েব ডেস্ক