গঙ্গাজল দূষিত, ইলিশ ছুটছে পদ্মায় 

ইলিশের চড়া দাম, ইলিশ নিয়ে সমাজের নানা স্তরে দুর্নীতি এবং বিদেশে পাচার কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ইলিশ দস্যুদের বৃত্তান্ত জানিয়ে চমকে দিলেন সমাজবিজ্ঞানী— মোহম্মদ ফখরুল ইসলাম

ইলিশপ্রিয় মানুষের কথা ভাবছি। যারা ইলিশের মৌসুম এলে খুশি হয়ে মাছবাজারের খোঁজ নেন প্রতি বছর। ইলিশভক্ত সগোত্রীয়রাও বর্ষার শেষের এই সময়টাতে একে অপরের সঙ্গে এ বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করে থাকেন। বাজারে ইলিশের দাম কমলে সে খবর দ্রুত চাউর হয়ে যায় তাদের মধ্যে। কেনা হয় অনেক। ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রেখে নিজে খাওয়া হয়, কাছের মনুষকে উপহার দেওয়া হয়; কিন্তু এবছর কোনো ভালো খবর হচ্ছে না। ভালো খবরের প্রধান প্রতিপাদ্য হল ইলিশ ধরা পড়ার পরিমাণ বেশি, বাজারে মাছের আমদানি বেশি এবং হঠাৎ দাম কমে যাওয়া; কিন্তু না। এসবের কোনোটাই এবারে হচ্ছে না বিশেষ কারণে।

একজন ইলিশ ভোজনরসিক করোনার ভীতি উপেক্ষা করে বড় বাজারে গিয়ে প্রতিদিন একবার করে ঢু মারেন মাছের গলিতে। ডালি ডালি বরফের মধ্যে সাজানো-ঢেকে রাখা বড় বড় ইলিশ দেখে তার কিনতে ইচ্ছে করে। অনেক জায়গার, অনেক নদীর, নানা আকৃতির ইলিশ মাছে ডালি সাজানো। কেউ হাঁকেন এটা পদ্মার ইলিশ, কেউ মেঘনার, কেউ পাথরঘাটার, কেউ চাঁদপুরের, কেউবা সাগরের ইলিশ বলে চিত্কার করে মনোযোগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন ক্রেতাদের। কিন্তু দূর থেকে অন্য ক্রেতাদের মধ্যে দোকানির দাম নিয়ে দর কষাকষি শুনে তিনি পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যান। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের ইলিশের দাম হাজার টাকা কেজি এবং এক কেজি সাইজের একটি ইলিশের দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা। আমাদের মর্যাদার প্রতীক জাতীয় মাছের এত দাম কেন হবে? অনেক দিন এভাবে যাচাই করেও দাম বেশি জানতে পেরে এখন আর মাছের বাজারের গলিতে পা মাড়াতে তার মন চায় না।

অক্টোবরে ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ

ইলিশের ভরা মৌসুমে কেন এমন হচ্ছে? এবছর ফেরিওয়ালারা একদিনও ইলিশ মাছ নিয়ে বাড়ির সামনে এসে হাঁকডাক দিল না। সাধারণ মাছওয়ালারা জানালো ভিন্ন কথা। একজন জানালো, এবছর ইলিশ কমদামে পাবেন না স্যার। নদী-সমুদ্র থেকে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই ইলিশ পাচার হয়ে যায় বিদেশে! পাচার প্রতি বছর হয়; কিন্তু এবছর খুব বেশি চাহিদা। অনেক বেশি দাম দিয়ে হলেও পাচারকারীরা তত্পর। এজন্য ঘাটে ঘাটে ঘুষ আগেই দেওয়া আছে। এবার তাই কাউকে ধরা হচ্ছে না।

ইলিশের বেলায়ও ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপকতার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল মনি সাহেবের। চোরাচালানি দেশটারে খায়া ফেলাইছে স্যার। করোনাও ঢুকেছে চোরাচালানি পণ্যের মাধ্যমে। ডেঙ্গুও ছড়াচ্ছে চোরাচালানিদের সংক্রমিত দেহ এবং বাস, ট্রাক, ট্রেন থেকে। দেশে এখন এত চুরি-জালিয়াতি চলছে। ই-কমার্সের জালিয়াতিতে বেকার যুবকরা আরো বেকার হয়ে সর্বস্বান্ত । একবার মারল ডেসটিনি না কি যেন! এরপর মারল এক এনজিও। এখন মারছে ইভ্যালি, ধামাকা না কী এরকম নব্য লুটেরারা। আমাদের গরিবের মরণ। আমার মাছের ব্যবসা এবার হলো না স্যার !

ভারতে রপ্তানির অনুমতি

দেশীয় ব্যবসায়ীরা ইলিশ কিনে সংরক্ষণ করছেন হোটেল ও পহেলা বৈশাখের জন্য। সেগুলো বড় লোকেরা কিনে খাবে। স্বল্প আয়ের মানুষ খেতে পারবে না। নিম্ন আয়ের দরিদ্ররা ইলিশের আকালের খবর শুনে ঠোঁট-মুখ চেটে ইলিশের স্বাদ সিলভার কার্প ও সরপুঁটি দিয়ে মিটাবে স্যার।
মজা করে বললাম, পুকুরে ইলিশের চাষ হচ্ছে। গবেষণা করে পুকুরে ইলিশের চাষ হলে আর এত দাম দিয়ে কিনতে হবে না। পাচারের জন্য আক্ষেপ থাকবে না। ইলিশ দস্যুদের দিন ফুরিয়ে যাবে। একথা শুনে সে একগাল হেসে দিল।

পুকুরে হয়তো বড় বড় ইলিশ জন্ম নেবে। ফিড খাবে ব্রয়লার মুরগি বা মাগুর মাছের মতো পেট ভরে। তখন পুকুরের ইলিশের কি সেই স্বাদ থাকবে স্যার? আর ইলিশের আসল স্বাদ ও গন্ধ না পেলে মানুষ সে ইলিশ কিনতে যাবে কেন? এখন কি কেউ পাঙাশ, পাবদা, মাগুরের স্বাদ পায়? চাষ করা রুই, কাতলা, কালবাউস কোনোটারই স্বাদ নেই।

রূপালি শস্য চেনার সহজ উপায়  

একবার আমার এক আত্মীয় গোটা পরিবার নিয়ে আমাদের বাসায় বেড়াতে এলো। ওর বেইলি রোডে বিখ্যাত খাবারের দোকান আছে। মজাদার নানা খাবার সেখানে হরদম বিক্রি হয়। সব মাছের স্বাদ সম্পর্কে তার অগাধ অভিজ্ঞতা। তবু বললাম, আজ তোমরা আমাদের বাসায় খেয়ে যাও। নদীর ইলিশ দিয়ে সাদা ভাত খাবে শুধু। ওরা রাজি হয়ে গেল। খেতে খেতে আরো মাছ আছে কি না, জানতে চাইল। ফ্রিজে কাঁচা মাছ আছে কি না, দেখতে চাইল। আমি কেন জিজ্ঞ্যেস করাতে বলল—আমি এত ইলিশ কিনি কিন্তু এত বেশি স্বাদের ইলিশ কখনো খেয়েছি বলে মনে হয় না। কোথায় পেলেন আপনি এই ইলিশ মাছ? আমার আত্মীয় আমার পরিচিত মাছওয়ালার ফোন নম্বরটা নিল নিজের ব্যবসার সুনাম বাড়ানোর জন্য।

আমাদের নদী-সাগরের স্বাদযুক্ত বড় ইলিশ ধরার আগেই চুক্তি করে বিদেশে পাচার করার জন্য। সীমান্তে গরু পার করতে গিয়ে আমাদের লোকেরা গুলিতে প্রাণ হারালেও আমাদের নৌ-পুলিশ, কোস্ট গার্ড কখনো এইরূপ কোনো পাচারকারীকে গুলি করে মেরেছে কি না—জানি না। কারণ,  অসাধুরা ইলিশ পাচারের সুবিধা দিতে আগাম যোগাযোগ করে রাখে। অথচ আগাম চুক্তি করে টিকার জন্য অগ্রিম টাকা পরিশোধ করেও আমরা করোনার টিকা না পেয়ে মারা যাই; কিন্তু ইলিশ, চামড়া, পাট, প্রভৃতি পাচার করে দিই ঘুষের বিনিময়ে। এ কোন ধরনের ঘৃণ্য মানসিকতা আমাদের মধ্যে কাজ করে?
দুর্নীতি আমাদের ক্রণিক ব্যাপার। আমাদের অস্থিমজ্জায় ঘুষ-দুর্নীতি, জালিয়াতি মিশে গেছে। আমরা অনেকে যে পরিমাণ বৈধ আয় করি তার চেয়ে ১০ গুণ ব্যয় করি। এত অবৈধ টাকা কোন ভূতে যোগান দেয়? আমরা একদিকে ঘুষ নিয়ে সংসার চালাই, অন্যদিকে কেউ কেউ নিজেকে সাধু মনে করে মানুষকে সৎ হওয়ার পরামর্শের বাণী শোনাই। তাই দেশ থেকে ঘুষ-দুর্নীতি ও অসততা যতদিন উত্পাটিত না হবে ততদিন নদী-সমুদ্র থেকেই ইলিশ পাচার ও উধাও হয়ে যেতে থাকবে। আর ইলিশের ভরা মৌসুমেও আমরা চড়া দাম শুনে মন খারাপ করে ঠোঁট-মুখ চেটে ক্ষুণ্ন মনে পাঙাশ-পুঁটি দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমাতে যাব বইকি?


সৌজন্য: দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা । 

 

Thu 23 Sep 2021 12:35 IST | প্রফেসর ড. মোহম্মদ ফখরুল ইসলাম