করোনাকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ ।

করোনা পূর্বকালে, মূলত গত এক দশক সময়ে, বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশের উন্নতির অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পথ অনেক বাকি। অর্জিত সব অগ্রগতি সুসংহত করে সমূহ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার কাজে এ বছরই হাত দেওয়ার কথা ছিল। সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। সরকারি উদ্যোগ এবং জনপ্রচেষ্টার সংযোগে কাজ এগোচ্ছিল। নিজেদের অবস্থার অগ্রগতি হওয়ায় বা অগ্রগতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বহু দেশে গৃহীত গ্যালপ জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি আশাবাদী। তা থেকে এটা পরিষ্কার যে, নীতি ও প্রণোদনার বিরাজমান অনুকূল পরিবেশে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে এবং তারা সৃষ্ট সুযোগ গ্রহণ করতে পরিশ্রম করতে থাকেন। কৃষক, কৃষিশ্রমিক, অন্যান্য শ্রমিক, উদ্যোক্তা (অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড়) এবং অন্যান্য খাতে নিয়োজিত ও আগ্রহী—সবার মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে থাকে। কাজেই ক্ষেত্র তৈরি হয়ে আসছিল দ্রুত এগিয়ে যাবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব পথের নিশানা ও অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

চলমান অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা চলমান থাকে এবং কিছু সমস্যা নতুনভাবে সময় সময় দেখা দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা ২০১৮ সালে আওয়ামি লিগের নির্বাচনি ইশতেহারে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়, যেমন—ক্যাসিনো ব্যবসার প্রতিরোধ এবং নদী ও নদীর তীর দখলমুক্ত করার সুদূঢ় প্রচেষ্টা । অন্যান্য ক্ষেত্রেও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছিল; কিন্তু ২০২০ এর মার্চে, করোনার প্রাদুর্ভাব এসব পদক্ষেপকে থমকে  দেয় ।   প্রথমে দেশের মানুষকে জীবনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা এবং সে আলোকে আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড স্থিমিত ও অনেক ক্ষেত্রে স্থগিত রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের পরিবারগুলোর গড় আয় মার্চ মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে ২০ শতাংশের মতো কমে যায়। এক কোটি দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা সংকট দেখা দেয়। এজন্য করোনা আক্রান্ত মানুষের শনাক্তকরণ, চিকিত্সাব্যবস্থা সমৃদ্ধকরণ এবং খাদ্যসঙ্কটে দিশেহারা অসংখ্য মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করতে বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়ে।

গত ১৩ এপ্রিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগের  ঘোষিত কিছু ব্যবস্থাসহ ৯৬ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার একটি সহায়তা ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। সব পদক্ষেপ যুক্ত করলে মোট প্যাকেজ দাঁড়ায় ১ লাখ কোটি টাকার অধিক (জাতীয় উৎপাদনের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ) । যে যে খাতে সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া জরুরি, এরকম সব খাতকেই সংযুক্ত করা হয়।

৬৬ দিন লকডাউনের পর অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে খুলে দেওয়া শুরু হয়।জরুরি পদক্ষেপ। অন্যথায় মানুষের দুর্দশা আরও বাড়তে থাকত। জীবনের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হল কেননা সংক্রমণ বাড়ছিল। এজন্য যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে চলাচল ও কাজ করতে বলা হয়। এক্ষেত্রে অনেক মানুষ গাফিলতি করতে থাকে এবং তা এখনও বিদ্যমান। মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের তারাও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তাসত্ত্বেও সংক্রমণের হার কমেছে । কিন্তু পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে । দ্বিতীয় ধাক্কার আশঙ্কা আছে। অনেক দেশেই এরকম ঘটছে।

তবে বর্তমান প্রতিকূল অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রশ্নে  আশাবাদ ব্যক্ত করা ভিত্তিহীন নয়। জীবন রক্ষার সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্তদের জীবিকার পুনর্বাসন, পুনর্জাগরণের কাজ চলছে। বোরো ধান ভালো হওয়ায় দেশে সার্বিকভাবে খাদ্যসংকট নেই। আউশ ভালো হয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে—বন্যাসমস্যা থাকা সত্ত্বেও আমনও হবে ভালো।

সরকারিভাবে বলা হয়েছে—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আমন ফসলের অবস্থা সতর্ক নজরদারিতে রয়েছে, প্রয়োজনে চাল আমদানি করার প্রস্তুতিও নেওয়া হবে। শাকসবজি, মাছ, হাঁস-মুরগি, ডিম, দুধ ও গরু-ছাগলের উত্পাদনও ভালো। সরকারি প্রণোদনা ও রপ্তানিতে---বিশেষ করে পোশাক খাতের রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আরো কয়েক মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে, তবে উন্নতির লক্ষণ পরিস্কার। আমদানিকারী দেশগুলো করোনা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের গতির ওপর বাংলাদেশের রপ্তানিখাতের অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করবে। এসব দেশের অর্থনীতি বর্তমানে হোঁচট খাচ্ছে বটে, তবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

রেমিট্যান্সে ব্যাপক ধস নামবে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আমিও সে দলে ছিলাম; কিন্তু রেমিট্যান্স প্রাপ্তি এ পর্যন্ত শুধু ভালোই না বরং আগের থেকেও ভালো। তবে তা অব্যাহত রাখতে হলে বিদেশে কর্মরত যাঁরা দেশে ছুটিতে এসে আটকা পড়েছিলেন তাঁরা যেন সময়মতো ফির যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দিকে তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। সৌদি আরব থেকে ছুটিতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের  ফিরে যাবার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, তার দ্রুত সমাধান জরুরি। নতুনদের বিদেশযাত্রার নিয়ম-কানুনকে  যেন সহজ হয় এবং তাঁরা যেন দালালদের খপ্পরে না পড়েন, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দালালরা আগেও ছিল, বর্তমানেও তৎপর। আরো একটি বিষয়, দক্ষ কর্মী পশ্চিমের কাজে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাপান এবং পশ্চিমের অনেক দেশে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন বাড়বে। সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। অদক্ষ জনবলের চাহিদা আর বেশি দিন কোথাও থাকবে না।

গ্রামীণ অকৃষি খাতও জেগে উঠছে। এক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা পৌঁছিয়ে দেওয়ায় ঘাটতি রয়েছে। অতিক্ষুদ্র উদ্যোগসমূহ এ পর্যন্ত প্রণোদনা সামান্যই পেয়েছে অথবা পায়নি। দ্রুত এই ঘাটতি দূর করলে এ খাত ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতও ক্রমশ অচলাবস্থা কাটিয়ে সচল হচ্ছে। সার্বিক বিবেচণায় বহু দেশের তুলনায় করোনা মহামারির আর্থসামাজিক অভিঘাত থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের গতি অনেক ভালো । এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে,  মহামারির আগে সারা বিশ্বে যেমন, তেমনি বাংলাদেশে আর্থসামাজিক বৈষম্য বাড়ছিল। করোনা পরবর্তী পুনরুদ্ধার-পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। দেশের বিধ্বস্ত অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ যেগুলো গ্রামাঞ্চলে এবং শহুরে অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে অবস্থিত যাঁরা সরকারি সাহায্য এখনও সামান্য পাচ্ছেন বা পাচ্ছেন না, তাঁদের সঙ্কটবিদ্ধির আশঙ্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেন; তবু বিভিন্ন খাতের অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঘোষিত সহজ শর্তে ঋণসহায়তা পাননি। কাজেই তাদের পুনর্বাসন ও পুনর্জাগরণে সমস্যা থেকে যাচ্ছে এবং বৈষম্য বাড়ছে। 

শিক্ষাখাতও ব্যতিক্রম নয় । স্কুলকলেজ বন্ধ থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বন্ধ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যে ক্লাস নিতে হচ্ছে, তাতে গ্রামে এবং শহরের দরিদ্র শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারছে না। আর্থসামাজিকভাবে সমর্থ পরিবারসমূহের ছেলেমেয়েরা এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের সব শিক্ষার্থী কমবেশি ভুক্তভোগী হলেও, বৈষম্য যে বাড়ছে তা বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের ।

ক্রমবর্ধমান  আর্থসামাজিক বৈষম্য টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত করবে, যদি না দ্রুত বৈষম্যবৃদ্ধি রাশ টেনে ধরা হয়। কাজেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতসমূহের উদ্যোগ,  কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার ও পুনর্জাগরণে গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজনে সহায়তা বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সাত মাস কেটে গেছে । গাফিলতি কখনই গ্রহণযোগ্য নয়, আর করোনা-যুদ্ধকালে তো নয়ই।

এবার আসি দুর্বৃত্তায়নের কথায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করা এবং সে আঙ্গিকে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও করোনাকালের ত্রাণ চুরি, প্রকল্পের অর্থ চুরি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ-সম্পদ আত্মসাত্ করা; বিদেশে লোক পাঠানোর নামে ভুয়া এজেন্টদের ধোকাবাজি-ধান্দাবাজি  শুধু সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে না বরং অর্জিত অগ্রগতিতে কালিমা লেপে দিচ্ছে।উদ্বেগের বিষয়, নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। লক্ষণীয়, অপরাধীদের আটক করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সমস্যা তৈরি করছে । দোষিরা  জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে । এসব দোষী নরপশুর দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে,  যাতে অন্যদের মধ্যে এরকম অপরাধে জড়িত হওয়ার আগে ভীতি সৃষ্টি হয়। অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি বিধান মানবাধিকারের অমোঘ দাবি,  একথা মনে রাখা দরকার । 

দুর্নীতি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে শুধু আইনের প্রয়োগ পর্যাপ্ত নয়, যদিও তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক-মানবিক মূল্যবোধ সবার মধ্যে প্রোথিত ও সুদৃঢ় করতে হবে।মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ে সমাজ জর্জরিত। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব ছাড়াও পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসমূহ, সামাজিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দায় রয়েছে। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে, তবেই সমাজে মূল্যবোধের উদ্বোধন সম্ভব।


 

Mon 12 Oct 2020 16:38 IST | কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ