উনিশের চেতনার বিবর্তন ও বর্তমান প্রজন্ম

ভাষা তো আসলে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই ডাক-হরকরা। কিন্তু আজকের এই বিশ্বায়িত পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত এক সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের উত্তেজক দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। তাতে হেরে যাচ্ছে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জিতে যাচ্ছে বাজার-সংস্কৃতি যার রক্তে মাদকতা, শিরায় শিরায় লাস্য আর সম্ভোগের ইশারা

Bengali.png

►বিশেষ প্রবন্ধ

 

| অমিতাভ দেব চৌধুরী |


উনিশে মে বরাক উপত্যকার ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। উনিশকে যদি কেবলমাত্র বরাক উপত্যকার চৌহদ্দিতে আটকে রাখি, তাহলে, তার অনুষঙ্গে কেবল বাংলাভাষার কথাই মনে পড়ে। এভাবে ভাবলে, উনিশ অবধারিতভাবে হয়ে ওঠে বরাক-ভূখণ্ডে বাংলাভাষার আত্মঘোষণার দিবস। উনিশের সঙ্গে অমোঘভাবে আমাদের মনের প্রান্তরে বাউলের সুরে এক পিছুটানেরও জন্ম হয়— সে টানের নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু মুশকিলটা এই যে এভাবে ভাবলে উনিশ শেষপর্যন্ত আমাদের নিয়ে যায় এমন এক রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে যার নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদ। একুশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আমাদের অবধারিতভাবে মনে হয় যে একুশের যেখানে সাফল্য, উনিশের সেখানেই ব্যর্থতা। একুশের গর্ভেই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ; আর উনিশ? তার ব্যর্থতা তা এখানেই যে এত এত রক্তক্ষয়ের পরও তা বরাক উপত্যকাকে আসাম নামক প্রদেশটি থেকে আলাদা করতে পারল না।

এভাবে ভাবলে, উনিশে মে হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক ধ্রুবক। উনিশের চেতনার বিবর্তন এবং বর্তমান প্রজন্মের ভূমিকা সেক্ষেত্রে ক্রমাগতই এক নেতিবাচক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায় আমাদের। কেননা, এই নিরিখে দেখলে আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী উনিশের উত্তরাধিকারকে ক্রমশই ধূলায় বিলীন হয়ে যেতে দেখি। উনিশের বিবর্তন ক্রমশই হয়ে ওঠে বাংলা ভাষার বিপন্নতার আর বাংলামাধ্যম স্কুলগুলির ইংরিজি মাধ্যম ও হিন্দি মাধ্যমের কাছে হেরে-যাবার কাহিনি। বিশ্বায়িত পৃথিবীর পণ্যমনস্কতা যে কাহিনিতে সংযোজিত করে চড়াদাগের এক ক্লাইম্যাক্স।

এক্ষেত্রে আবার, নিজেদের শ্রেণীসুলভ সুরক্ষাপ্রবণতাকে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটুকুই বা অভিযুক্ত করতে পারি আমরা? এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় আমাদের নেই যে বাঙালির ছেলেমেয়ের মুখের ভাষা যা, তা কখনও তার পেটের ভাষা হয়নি। পেটের ভাষার দাবি মেটাতে তাদের, সুতরাং,ইংরিজি-হিন্দির সুরক্ষিত বীথিপথ ধরে এগোতেই হয়েছে। এর কোনও গত্যন্তর তাদের নেই, নেই এমনকী অসমিয়াভাষী কিংবা মণিপুরিভাষী ছেলেমেয়েদেরও। তাছাড়া ভাষা শিক্ষা যে যুগে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে বিরাজ করত, সেই যুগটাকেই আমরা খুইয়ে বসেছি। আজকে আমাদের ছেলেমেয়েরা এমনকী বিজাতীয় ইংরিজি ভাষাও যেভাবে শেখে, সেই শেখায় কোনও প্রাণের স্পর্শ নেই। নতুনযুগের শিক্ষাব্যবস্থা নতুনযুগের ইংরিজিশিক্ষাকেও ফাংশনাল বা কেজো চেহারায় পরিণত করেছে তার স্ট্রাকচারাল দিক বা কাঠামোর দিকে অতিরিক্ত ঝোক দেওয়ায় আজকের ইংরিজি শিক্ষাও হয়ে উঠেছে প্রাণহীন আর যান্ত্রিক। সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্করহিত হয়ে শিখলে যে কোনও ভাষা যা হতে বাধ্য। মোদ্দা কথা এই যে আজকের শিক্ষাব্যবস্থা কোনওভাবেই আর ভাষামনস্ক নয়।

এই সবকিছুকে গোপনে চালিত করছে সারা পৃথিবী জুড়ে জেগে-ওঠা এক নতুন সভ্যতা। যার নাম বিশ্বায়ন। বিশ্বায়নের বাজারমনস্কতা থাবা বসিয়ে চলেছে আমাদের ভাষার চেয়েও বড় যা— তাতে। অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতিতে। যে সংস্কৃতি আমাদের ধর্ম, আদব-কায়দা, আচার-আচরণ, যাবতীয় সংস্কার, আমাদের মনের ধর্ম কিংবা প্রবণতা, আমাদের ভাবার স্বভাব সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোত লিপ্ত হয়ে আছে। আমাদের মুখের ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা হয়ে ওঠে এই সংস্কৃতিরই গুণে। আমাদের ভাষা তো আসলে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই ডাক-হরকরা। কিন্তু আজকের এই বিশ্বায়িত পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত এক সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের উত্তেজক দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। তাতে হেরে যাচ্ছে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জিতে যাচ্ছে বাজার-সংস্কৃতি যার রক্তে মাদকতা, শিরায় শিরায় লাস্য আর সম্ভোগের ইশারা। এর বিরুদ্ধে আমাদের একমাত্র জবাব হতে পারে, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাওয়া। প্রতিনিয়ত নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করে যাওয়া। প্রতিনিয়ত আশা করে যাওয়া, আমাদের মধ্যে যারা শহুরে নয়, সুরক্ষাবলয়ের কেন্দ্রে নয়- তাদের বেঁচে থাকার স্পন্দনেই বেঁচে উঠবে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। কিন্তু তারাও যে এই বিশ্বায়িত পৃথিবীরই মানুষ। আমাদের লড়াই, তার মানে, হয়ে উঠছে আরও কঠিন। এ লড়াই তাদের নেতৃত্ব দেবার লড়াই নয়। এ লড়াই নিজেরা নষ্ট না-হবার লড়াই। যাতে করে, তাদের ভুবন থেকে জেগে-ওঠা সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানগুলিকে সযত্নে গ্রহণ করে, আমরা আবার প্রয়োজনে তাদের হাতেই যথাসময়ে ফিরিয়ে দিতে পারি।

কিন্তু এ তো গেল উনিশকে কেবলমাত্র ভাষাকেন্দ্রিক দিক থেকে দেখার পরিণাম। উনিশকে যদি বাঙালির ভুবনের বাইরে এনে বৃহত্তর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাস্তবতার নিরিখে বিচার করি, তাহলে তার অর্থ আর বাণীর অনেকটাই যে পাল্টে যায়। পাল্টে যায় তার মূল সুরও। তার বিবর্তনপথও।

মনে রাখতে হবে বরাকের উনিশে মে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রেক্ষাপটে নাগাল্যান্ডের স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে জন্মানোর (নাগাল্যান্ড রাজ্য আইন, ১৯৬২; ১ডিসেম্বর ১৯৬৩-তে রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ) আর মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা লালডেঙ্গার উত্থানের (১৯৬১) প্রায় সমসাময়িক। মনে রাখতে হবে, উনিশের অবদান চিরদিন অনুল্লিখিত থাকলেও, এই উনিশের পথ দিয়েই একে একে নাগাল্যান্ড (১৯৬৩), মেঘালয় (১৯৭২), মিজোরাম (১৯৮৭), অরুণাচল প্রদেশ (১৯৮৭) স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে নিজেদের সত্তা খুঁজে নিয়েছে। উনিশের ভেতরের মূল স্পন্দন ছিল এই আত্মঘাষোণার স্পন্দন- নিজেদের স্বাধীন, স্বতন্ত্র, সাংস্কৃতিক সত্তা ও ঐতিহ্যকে ফিরে পাবার স্পন্দন। কিন্তু কার কাছ থেকে? অসমিয়া-সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে? হা, কিন্তু সম্পূর্ণ হ্যা নয়। আমরা এই স্পন্দন ফিরে পেতে চেয়েছি এক আগ্রাসী ঔপনিবেশিক কাঠামো কিংবা প্রকল্প থেকে। একটি ঔপনিবেশিক ভুলের হাত থেকে। যে ঔপনিবেশিকতাবাদ কেবলমাত্র প্রশাসনিক স্বার্থে আমাদের এর ঘাড়ে ওকে, এর কাঁধে কিংবা মাথায় ওকে জুড়ে দিয়েছিল, সেই ঔপনিবেশিক প্রকল্প কিংবা চুক্তির হাত থেকে মুক্তির সাধনাই নিহিত ছিল আমাদের ওই উনিশে মে-র লড়াইয়ে। আপন হতে একটু বাহির হয়ে ভাবলেই আমরা বুঝতে পারব, যে-অসমিয়া ভাষিক আগ্রাসনকে আমরা উনিশের পেছনের খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি, সেই অসমিয়া ভাষিক আগ্রাসনবাদও কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ছিল ওই ঔপনিবেশিক প্রকল্পেরই ক্রীড়নক। ওই ঔপনিবেশিক প্রকল্প কি এর আগে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় চল্লিশটি বছর ধরে (১৮৩৬-১৮৭২) বাংলাভাষাকে আসামের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে অসমিয়া-বাঙালির ভাষিক বিভেদের রাস্তা উন্মুক্ত করে দেয়নি? কারণ অসমিয়ারাও তো একই ছকেরই বোড়ে—তারা নিজেরাও তো ফিরে পেতে চাইছিলেন তাদের জাতিসত্তা, তাদের স্বকীয়তা। নিজেদের ফিরে পেতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ যুদ্ধে এক বিশাল ভুল করে ফেলেছিলেন, বাঙালির ভাষাকেই তাদের আসল শত্রু বানিয়ে ফেলেছিলেন।

এভাবে ভাবলে, উনিশের চেতনা অনেক অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে—ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি ভাষিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর স্বকীয়তা অর্জনের লড়াইয়ের ভেতরও। ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির মধ্যেও যুযুধান দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্তরে। এটা তো কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না, দেশভাগ-উত্তর এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি, মন কষাকষি, মনোমালিন্য হয়েছে—কিন্তু তাদের মধ্যে একটিও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়নি। বাঙালি হিন্দুকে যে এককালে শেখানো হয়েছিল, বাংলা কেবলমাত্র হিন্দুরই ভাষা, আজ যে সেই ঔপনিবেশিক ভাবনার দিন অস্তে গেছে— একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের উত্থানের সূত্র ধরে এবং বাংলাদেশের ভুবনমোহন, চিরকালীন কিছু সাহিত্যকর্মের সূত্র ধরে বাংলা যে বাঙালি মুসলমানের কেবল মুখের কথা নয়, প্রাণেরও ভাষা—এ সত্য আজ বাঙালি হিন্দু কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবেন না। বাঙালির শুচিবায়ুগ্রস্ত হিন্দুরাও কিছুতেই আর বলতে পারবেন না যে মুসলমানের হাতে পড়ে বাংলাভাষার জাত গেছে। তাকে মেনে নিতেই হবে যে মুসলমানের হাতে পড়ে বাংলাভাষা আরও জাতে উঠেছে। এর মধ্যে উনিশের কোনও বিবর্তন হয়তো সরাসরি নিহিত নেই, কিন্তু উনিশকে এভাবে পড়লে, দেখব—উনিশ ঔপনিবেশিকতাবাদের প্রভাবে আক্রান্ত নাকউঁচু এলিট বাঙালিকে সহিষ্ণুতার পথ দেখিয়েছে। অর্থাৎ উনিশকে উত্তর-পূর্বের বিস্তৃত ভূগোলের প্রেক্ষাপটে দেখলে তার চেতনার বিবর্তন কেবলই নৈরাশ্যময় হয়ে ফুটে ওঠে না আমাদের চোখে। সবচেয়ে বড় কথা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনও কোনও কবি-সাহিত্যিক যে আজ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা সাহিত্য নামক একটি জিনিস নিয়ে কথা বলছেন যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নিজেদের ভূগোল ও ইতিহাসচেতনার পাশাপাশি প্রতিবেশী-চেতনার এক আশ্চর্য ধারা— তারা যে আজকের পশ্চিমবঙ্গকে বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোত বলে মানতে অস্বীকার করছেন, এর পেছনে কি একেবারেই জেগে নেই উনিশের অনুপস্থিত উপস্থিতি?

উনিশ এক কেন্দ্রিকতার বিরোধিতার পরিণাম। উনিশ একটি প্রান্তের আত্মসচেতনতার পরিণাম। উনিশের চেতনার বিবর্তন সেই আত্মসচেতনতারই বিবর্তন।

 

Sun 19 Sep 2021 13:30 IST | অমিতাভ দেব চৌধুরী