মহামানিকের সত্য দর্শন

Satyajit_Ray_birth_centenary.png

সত্যজিৎ রায়, তাঁর সিনেমার পরিভাষায় নিও-রিয়ালিজমের যে সূত্রপাত করেছিলেন, চলচিত্রনির্মানের গোড়া থেকেই, সেটি ভীষণ ভাবে স্পষ্ট তার প্রতিটা কাজে। প্রায় দুই শতক ধরে, ইউরোপীয় চিন্তাশৈলীর, এক ধরণের উর্বর ও নবতম আত্মপ্রকাশ যদি নিও-রিয়ালিজম হয়ে থাকে, তবে তার বাস্তবিক চিন্তার বীক্ষণে সমাজ, রাজনীতি, শ্রেণী বৈষম্য ও বিশেষ করে ধর্ম ও রাজনীতির দ্বন্দ্ববাদ স্বাভাবিক। ধর্মের সংঘাত, জীবনবোধের বিরুদ্ধে, বারংবার ধরা পড়েছে সিনেমার ফ্রেমে।পাসোলিনি, বুনুয়েল বা ওশিমা র মতো, সত্যজিতের ছবিতেও উঠে এসেছে ধর্মীয় অন্ধ সংস্কারের সাথে যুক্তিবোধের দ্বান্ধিক লড়াই। অন্যতম দুটি ছবি "কাপুরুষ ও মহাপুরুষ" এবং "গণশত্রু "।

১৯৬৫-র ৭ই মে, রাজশেখর বসুর "বিরিঞ্চি বাবা" মূল কাহিনী অবলম্বনে, সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য ও নির্দেশনায়  "মহাপুরুষ" ছবিটি মুক্তি পায়।শ্রী চারুপ্রকাশ ঘোষ ও শ্রী রবি ঘোষের অভিনয় দখ্যতার জোরে বিরিঞ্চি বাবা এবং তার সহকারীর চরিত্র, কোথাও যেন একটা স্পষ্ট সামাজিক অবস্থানের প্রমুখ হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে ধর্মের  প্রগতি বিরুদ্ধ, সংস্কার-অন্ধ প্রতিচ্ছবিটা ধরা পড়ে সত্যজিতের চিত্রনাট্যে, বিশেষ করে, শ্রী চারুপ্রকাশের অভিব্যক্তি ও সংলাপে।  কোথাও চরিত্রটি নিজে যেন ভন্ড হয়েও নিজের ভণ্ডামি কে ক্রমাগত কটাক্ষ করে চলেছে; সোশ্যাল "satire" এর প্রতিভূ হয়ে। কেন সোশ্যাল satire?  এখানে সেই টানাপোড়েনের শিকার একটা ভ্রষ্ট মূল্যবোধ, ধর্মের মোড়কে মিথ্যে আশ্রয় নেওয়ার হিড়িক, মধ্যবিত্ত ধর্মভীরু সমাজ, যার ওপর নির্ভর করে বাঁচে; আজও বাঁচতে চায়। কিন্তু যুক্তি দিয়ে তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা? হ্যাঁ, যৌক্তিক প্রতিবাদ নিয়ে হাজির হয় সত্য ও নিবারন, কিন্তু সেখানেও সত্যজিৎ কোনো সস্তার নায়কোচিত আচরণের আশ্রয় নেননি বা গিমিকাল হননি। সোমেন বোসের সূক্ষ্য কৌতুক, নিবারনের ভূমিকায় কোথাও যেন প্রতিপক্ষের সাথে সমতা বজায় রাখে. ঠিক যেমন, হেরবার্ট স্পেন্সর এর উক্তিতে "The necessity of A Confrontation between the Sacred and the profane". কোথাও, সত্যজিৎ একটা নিঃশব্দ ইঙ্গিত রাখে, ক্রমশ কুসংস্কার পরিণত হতে চলেছে এক সামাজিক প্রক্রিয়ায় দ্রুততর। সেই ইঙ্গিতের স্পষ্ট নির্দেশ কি তাহলে "গণশত্রু" তে আমরা লক্ষ্য করি?  ধর্মের আড়ালে চৌর্যবৃত্তি, ক্রমশ বদলে অপরাধের চেহারা নেয়  কৌতুক বা satire এর পরিবর্তে ঔধ্যত্ব তথা "deviance"। ১৯৯০ তে মুক্তি পায়  "গণশত্রু".  "NFDC" (ন্যাশনাল  ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) এর প্রযোজনায়।  পুরস্কৃত হয় জাতীয় পুরস্কার ও ইন্ডিয়ান পানোরামায়। মনে রাখতে হবে, এমন একটি সময়ের সিনেমা হিসেবে যদি "গণশত্রু" কে তুলে ধরা হয়, যখন ধর্ম, আমাদের দেশ ও পার্শবর্তী দেশগুলোয় একটা হিংস্র সংকটের আবহ তৈরি করতে সক্ষম; ধর্ম সরাসরি রাজনীতির কালোবাজারী পুঁজি হয়ে হাত বদল করে চলেছে। এমনই সময় সত্যজিতের চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বিরিঞ্চি বাবার সুচতুর মুখোশটি অচিরে পাল্টে ফেলে হাজির হয় নিশীথ গুপ্ত, তার স্বভাবসুলভ ঔদ্ধত্য নিয়ে, কোথাও একফোটা পিছুপা হতে নারাজ, প্রয়োজনে অপরাধের সহায়তাও কাম্য। কারণ ত্রিপুরেশ্বরের চরণামৃত, এই ক্ষেত্রে যেন সিনেমা এবং সিনেমার বাইরে ও এক  ভয়ানক মেটাফর, যে মেটাফোর আদপে বাস্তবিক, তৎকালীন বাস্তবের ফসল, সত্যজিতের চিত্রনাট্যে যেন এই মেটাফরই কোথাও কাহিনীর  "Predicate " হয়ে ওঠে।  ত্রিপুরেশ্বরের চরণামৃত কোথাও যেন একই সাথে সেই দ্বৈত সত্ত্বা, এক মৃত গণতন্ত্রে, মিথ্যে জনমত গঠনের সঞ্জীবনী সুধা আর একই সাথে, কোথাও যেন সোজাসুজি বুঝিয়ে দেয়, যে ওই জলের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যাকটেরিয়া, আসলে, এই সমাজের, ভেঙে পড়া মনোন বা নির্বোধ-এক অবস্থান। পুকুরের জল যেন প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা,  এক নতুন সর্বনাশের জ্বালানী,  যখন জমির বর্গ মাইল থেকে শুরু করে আণবিক বোমার অনু থেকে, মনুষত্বের পরমাণু অবধি বৃহৎ পুঁজির অংশ। নিশীথ, ভার্গব বা হরিদাস বাগচীরা আর সেখানে ব্যক্তি বিশেষে কালপ্রিট নয়,  নিমিত্ত মাত্র;  আরেকদিক থেকে দেখলে,  হয়তো যা, জ্যাঁ পল সার্ত্রে অভিহিত করেছেন "Parlance of time" বলে;  এমন এক সংক্রমণ, যার সামনে আপাত ভাবে পরাজয় মেনে নিতেই হয় বিজ্ঞান মনস্ক, নাস্তিক অশোক গুপ্ত কে। কিন্তু এখানেও, সত্যজিতের নিজেস্ব সূক্ষ্য - "satire". সময়ের ওপর বিশ্বাস রেখে তরুণ শিক্ষিত প্রজন্মের মধ্যেই অশোক গুপ্ত খুঁজে পান গণশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অস্ত্র, একাধিক সত্য ও নিবারন কে;  চিত্রনাট্যের timeline এর পরিসীমার মধ্যেই সত্যজিৎ কোনোক্রমে একটা  উত্তর খুঁজতে চাননি, বরং এক অসমাপ্ত সূত্র ছেড়ে গেছেন পঁয়তিরিশ মিলিমিটারের বাইরেও।

Fri 22 May 2020 19:11 IST | অর্জুন চক্রবর্তী