গ | ল্প►আলোর ভেলায়

নাপিতকে ভদ্রচিত ভাষায় নরসুন্দর বলে, নর’কে সুন্দর করে বলেই তো নরসুন্দর। ছবিদ হাসে আর বলে, ভদ্রলোকেদের কতো কিছু বিলাস-বাসন, ও ’নাম দিলেই বা কি, আর না দিলেই বা কি, সেই তো নাপিত, ওই নাপিতই

alor-velay-illastration-td-sarkar.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 

আ শ রা ফ  উ দ্দী ন  আ হ ম দ

নতুন খালপাড় বাজারের একেবারে শেষ দিকে, পিঁয়াজ-আলু-রসুনের আড়তের পেছনে, ছবিদ এখানেই বসে প্রতিদিন, আরো অনেকেই আছে। ওর একটা নিজের জন্য টুল আরেকটা সামনের টুলে বসে খদ্দের, খুব ঘনিষ্ট হয়ে বসে, এটাই ছবিদের ব্যবসা, জীবনযাপনের রুজি। নাপিতকে ভদ্রচিত ভাষায় নরসুন্দর বলে, নর’কে সুন্দর করে বলেই তো নরসুন্দর। ছবিদ হাসে আর বলে, ভদ্রলোকেদের কতো কিছু বিলাস-বাসন, ও ’নাম দিলেই বা কি, আর না দিলেই বা কি, সেই তো নাপিত, ওই নাপিতই, মানুষকে সুন্দর বা অসুন্দর করা বলে কোনো কথা নেই, কথা হচ্ছে পেটের ধান্ধা, বেঁচে থাকার লড়াই।

ছবিদের সঙ্গে আমার কথা হয় অনেক কারণে অকারণে, ওর পথ আর আমার পথ এক না হলেও কোথায় যেন বা একটা মিল রয়েছে, তা হলো পেটের ধান্ধা, ছবিদ যা করে তা যেমন ব্যবসা আর আমি যা করি তাও তো ব্যবসা, দিন আনা দিন গোনা লোকের তো মিল ওই জায়গায়, সে যাই হোক, মূল কথায় আসা যাক,কাশেমপুর বাজারে ওর একটা সেলুন ছিলো, বেশ সাজানো-গোছানো, ফকরুদ্দী-ময়েনুদ্দী সরকারের সময় সরকারী জমি পূর্নদখল করতেই,ওর সেলুন ভেঙে দিলো রাতারাতি। তারপর আর দোকান নয়, টুল পেতে বসে গেলো যত্রতত্র, এখন দিনশেষে যা হয়, ওর ভাষায়, চালিয়ে দেয় ওপরওয়ালা। রাখে আল্লা  তো মারে কে, মারবে আর কে, গতর খাটা মানুষের আবার  লবন-ভাতের অভাব, চালিয়ে দেয় ওই পাগলা ওপরওয়ালা ! কথাটা বেশ সুন্দর, নিজে নিজেই তৈরী করে ফেলেছে মানুষ। মানুষ যে কতো কিছু তৈরী করে ফেলে ভাবা যায় না। 
খালপাড়ের সবচেয়ে বয়স্ক ওই অশ্মথগাছটা হলো এ’ অঞ্চলের একটা পরিচয়। অনেক কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে গাছটাকে ঘিরে, কারো কথায় ফেলে দেওয়ার নয়, তবে সবাই বলে বেশ নিজের মতো করে । অনেকটা গল্পের মতো মনে হয়। ছবিদ জানায়, বয়স আনুমানিক তিন-সাড়ে তিন শত বছর হবে,হয়তো তার চেয়েও বেশি হতে পারে। কবে কে যে এর পত্তন করেছে কেউই বলতে পারে না । হয়তো এমনি-এমনিই বেড়ে উঠেছে, যেভাবে আদর-যত্ন ছাড়া বড় হয় আর কি, তবে এ’ অশ্মথগাছ কিন্তু যেমন-তেমন নয়, এর আলাদা মোজেজা নিশ্চয় আছে।  এখানে প্রতিদিন মানুষ আসে, মানত করে, সিন্নি দেয়, তাছাড়া একটা লালসালু দেওয়া কবরও আছে, মানুষ বিশ্বাসে আসে, কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মানুষের ভালোবাসা আর দান-খয়রাতে দিনকে দিন কেমন জৌলুশ ফিরে আসছে এলাকাটা, সবাই কিছু না কিছু পাওয়ার আসায় আসছে, কেউই তো খালি হাতে যাচ্ছে না, হাতভর্তি করেই মানুষ নিয়ে যাচ্ছে যার যা খুশি। আমি একদিন মুখ ফসকে বলেই ফেললাম, ব্যবসাটা কিন্তু মন্দ নয়, তুমি কেনো ছেড়ে দিলে...

ছবিদ জানাই, নাহ্ যার যা ভাগ্যে আছে করে খাচ্ছে, আমি না হয় আমার মতো খেটে-হেঁটে খাই !
ওর কথা শুনে কিছুক্ষণ থেমে গেলাম, মানুষ সত্যিই চমৎকার। এবং চমৎকার বলেই কেউ কারো মতো নয়, যার যার অবস্থান ভিন্ন, পথও ভিন্ন, আর এই ভিন্ন বলেই মানুষ একাই একশো...
কথাটার মধ্যে হয়তো কিছু যুক্তি আছে অথবা সবই মেকি, আজকাল তো মেকির ওপররেই চলছে দেশটা, সব কিছুতেই একটা রঙ, সেই রঙের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে আমাদের ভূত-ভবিষ্যত!
খালপাড় বাজার আজ উঠে বসেছে, দিনরাত মানুষ আর মানুষ, কে বলবে অঁজপাড়াগাঁ ! ছবিদ জানাই, অনেককাল আগে আমারই পুর্বপুরুষদের এদিকে বসত ছিলো, এককালে এ’ অঞ্চলে শত-সহস্র বাঘের বসত ছিলো, তখন থেকেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় বাঘমারা, হয়তো কেউ বাঘ-টাঘ মেরে টেরে থাকতে পারে, তবে বাঘ ছিলো তা কিন্তু আমার বাপেও দেখেছে, এখন মাঝেসাঁঝে শিয়াল-বনবিড়াল দেখতে পাওয়া যায়, আর বেঁজি তো আছেই। 

আমার অবশ্যই এদিকে অনেককাল ধরে যাওয়া-আসা, রাত্রিযাপন করেছি অনেক-অনেক,এই অঞ্চলের মানুষজন সত্যিই সাদামাঠা, বন্ধুত্বপরায়ণ হলেও বেশ ভীতু প্রকৃতির, কিছুটা অলশ তারপরও কেউই আর ঘরে বসে থাকে না, কাজের ধান্ধায় এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়, লেখাপড়ার চেয়েও কায়েকপরিশ্রম করতেই বেশি পছন্দ করে, হাঁটুতে একটু বড় হলেই বিয়ে এবং দিনমজুরের কাজ, স্বপ্ন জিনিসটা যে কি, তাও কেউ জানে না, জানবার কারো ইচ্ছেও নেই। শরীর খাটাও পয়সা রোজগার করো তারপর শরীরের গরম মেটাতে একটা বিয়ে করা না হলে আর চলে বা কি করে !
বাজারটা ছোট হলেও বেশ ছিমছাম, কয়েকটা গ্রামের মোড় বলা যায়, মানুষজনের ভিড়ে বেশ পরিপূর্ণই থাকে, আগে নদী পথে অনেক অনেক দূরে যাওয়া আসা যেতো, আজ তো সবখানে খরা, পানির বড় অভাব, শুখা মাটি, শুখা বাতাস, সবই কেমন খাপছাড়া, সবাই বলে মরণ ওই ফারাক্কা বাঁধে কারণে মাটির তলায় পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, টিউবলেও পানি উঠছে না, নদীপথের স্বপ্ন মানুষ ভুলে গেছে, ব্যাপারিরা ওই নছিমন-ভটভটি ভরেই মালপত্র আনা-নেওয়া করে, ছবিদ কিন্তু ওসবে ধারধারে না, পায়ে হেঁটেই সে দূর-দুরান্তে পাড়ি দিতে পারে, খবর পেলেই হলো, টাকা যাতে আসে সেই চেষ্টায় ওর সর্বক্ষণ মাথায় ঘোরে।

সেদিন ছবিদ আমাকে জানালো, বিদিরপুরে নতুন একটা জুট মিল বসচ্ছে, খবর পেয়ে গেলাম একদিন..
– তারপর কি হলো?
– তার আবার পর...বলে কিনা চাকুরি দেবে, সিকিউরিটি দিতে হবে পঞ্চাশ হাজার টাকা, বেতন শুনে আক্কেলগুম।
– টাকা থাকলে করতে নিশ্চয়!
– কি বলেন ভাই, অতো টাকা দেবো কেনো পাগল না-কি ! দিনকাল পালটে গেছে, টাকায় এখন টাকা আনে, রবিশস্য ঘরে রাখলে টাকায় টাকা...
– তোমার বুদ্ধি তো বেশ ভালো।
– কেনো লেখাপড়া শিখিনি বলে কি বুদ্ধি থাকতে নেই।
– না তা অবশ্যই বলছি না।
– বলছেন না কিন্তু না বলা একটা কথা তো আমি বুঝে গেলাম।
– বুঝতে পারছি, তুমি বেশ চালাক।

তারপর অনেকদিন আর দেখা পাইনি ওর, অবশ্যই আমিও ওদিকে যাওয়াটা অনেক কমিয়ে এনেছিলাম, আগে যেভাবে কথায়-কথায় গ্রামের দিকে যাওয়া হতো, এখন গ্রামের কথা শুনলেই মনটা চাঙ্গা হলেও শহরের বিলাসীতা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। অনেকের মুখে শুনেছি শহরের সুখ আর গ্রামের সুখের মধ্যে অনেক পার্থক্য, তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, আমি তাদের বলি, তোমাদের কথা মেনে নিলাম, কিন্তু তোমরা নাহয় চাকুরী-ব্যবসার কাজে শহরে আছো বা এসেছো, একটাসময় মানে অবসরে, কেনো সেই গ্রামে ফিরে যাও না, তখন তাদের অন্যরকম উত্তর শুনে বড় করুণা হয়, চোখে খানিক লজ্জা আর ঠোঁটে মিহি হাসিটুকু মিলিয়ে যায়। আমি তখন শহরের ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যায়।

কাকতালীয়ভাবে সেবার যেতে হলো কি একটা কাজে বাঘমারার দিকে,আমার জন্য নির্ধারিত বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা তো আছেই, তো বিকেলের দিকে গেলাম খালপাড়ের বাজারে, ছবিদ একটা পাকা ঘর তুলে বেশ বড় একটা সাইনর্বোড পর্যন্ত লাগিয়েছে, অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম দোকানের বাইরের পরিবেশ, বাজারটা এখন অনেক বড় হয়েছে ,ব্যস্ততা বেড়েছে সবার, কারো দিকে কারো তাকানো ফুরসত নেই যেন, দোকানে ঢুকতেই ছবিদের সঙ্গে দেখা, হেসে বললো, অনেকদিন পরে এদিকে আসলেন, আপনার কথা ভাবি মাঝেমধ্যে, শরীর ভালো তো!

একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে মুছে দিলো তারপর। ভালো করেছো তো দোকানটাকে...
– হ্যাঁ ব্যবসা যখন করতে বসেছি, জায়গাটুকু কিনে পাকা ঘর তুলে ফেললাম, মানুষজন এখন টুলে বসে আর কাটতে চায়, শহরের মতো আর কি!

কথাটা শেষ করেই হাসতে থাকলো, ছবিদের হাসি দেখে মনে বড় তৃপ্তি পেলাম, মানুষ সত্যিই মানুষ হতে চায়, আশেপাশের পরিবেশ দেখে কেউ শেখে কেউ বা এমনি-এমনিই শিখে যায়, ছবিদ কিন্তু মানুষ হওয়ার যে প্রেরণা পেয়েছে তার কোনো তুলনা হয় না। আমি এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে, তা তুমি মিয়া এতো চমৎকার একখানা দোকান দিলে আমাকে জানালে না, শহরে তো তোমার গ্রামের অনেক মানুষ যায় দিনরাত্রি, আমার বাড়িও তারা চেনে এবং যায়ও...

ছবিদ খানিক লজ্জা পেলো মনে হলো। এরপর আর বেশি লজ্জা দিতে মন চাইলো না। কিন্তু কথা হলো অনেকটা সময় ধরে। একসময় ছবিদ জানালো, আগের বউটাকে বললাম বাপের বাড়ি থেকে হাজার পঞ্চাশেক টাকা আনতে, কিন্তু সে আনলো না, বলে কিনা বাপ আমার শয্যগত কুষ্ঠুরোগী কোথায় পাবে টাকা...

– তারপর কি করলে তুমি!
– দিলাম তাড়িয়ে, যা বাপের বাড়ি, কুষ্ঠুরোগীর মেয়েকে নিয়ে কি করবো, বিয়ে করলাম তারপর নগদ সত্তর হাজার টাকা সঙ্গে দিলো ঘরের এটা/সেটা...

কথা থেমে যায় আমার, কি বলবো ভাবতে পারছি না। মানুষ সত্যিই অনেক পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে দিনকেদিন। পরিবর্তন হতে-হতে মানুষ কি আবার বানরে রূপান্তরিত হবে, হয়তো হতে পারে, নয়তো মানুষ ডাইনাসার হবে, টিকটিকি হবে, আড়শোলা হবে, মানুষ কিন্তু একদিন মানুষ থেকে হারিয়ে যাবে। সেদিন কি মানবতা থাকবে, হয়তো সভ্যতা থাকবে, সুন্দরের প্রতীক কবিতা থাকবে, ষোড়শী-অষ্ঠাদশীর হাসি থাকবে, নদীতে জোয়ারভাটার খেলা থাকবে, পাখিদের গান থাকবে কিন্তু সবই হবে অন্য রকম। আবার প্রশ্ন করি, সেই টাকা দিয়ে তাহলে তুমি দোকানটা দিলে?

– দোকান আর হলো কোথায় দেখছেন, এরপর এলে দেখবেন আমার দোকানে এসি থাকবে। তখন আপনি আমার কাছে চুল কাটবেন, দাড়ি-গোঁফ সেইভ করবেন বলে রাখছি।
– তাহলে ভালোই তোমার ইনকাম বলতেই হয়।
– তা কেনো বলছেন, এই দোকান দেখে রক্ষিতপাড়ার সবেদালী ঘটক বললো, হাতে একটা মেয়ে আছে করবে নাকি, মোটা অংকের টাকা পাইয়ে দেবো।
– তুমি কি বললে ঘটককে...
– হাতের লক্ষী পায়ে ঠেলে, বলে দিলাম পাকা কথা, তুমি যদি লাখখানিক বাগাতে পারো তো তোমাকে দেবো দশের ওপর আর যাওয়া-আসার খরচ-খরচা, কি ভালো বলিনি, আমি আবার কাউকে না দিয়ে একা-একা ভোগ করি না জানেন তো ভাই...
– এবারের মেয়ের বাড়িখানা কোথায়...
– তা কি বলতে পারি, শুভকাজের আগে ওসব ফিরিস্তি জানানো নিষেধ, শুধুমাত্র আপনি আমার নিজের লোক মনে করে বললাম, গ্রামের লোকে কেউই জানে না এসব তথ্য।
– বিয়ের পর তো জানবে।
– জানবে তখন, আকাশে চাঁদ উঠলে তো সবাই দেখে, না কি, তবে শুনেছি এই মেয়েটা বড়লোকের মেয়ে হলেও দেখতে অতোটা ভালো না, আরো সংবাদ পেয়েছি, মেয়েটি দুরসম্পর্কের মামা নাকি চাচার সঙ্গে পালিয়ে পেটে বাচ্চাও এনেছিলো, বাপের টাকার জোরে তা আবার খালাস হয়ে গেছে...হে-হে-হে-হে-হে...

ছবিদের হাসি আর আমার সহ্য হলো না। কানে যে কেউ সীসা ঢেলে দিচ্ছে, আমাকে এখন উঠতে হবে, এরপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। রাত্রি নেমে এসেছে অনেক আগে, শিয়ালের চিৎকার ভেসে আসছে সেই সঙ্গে গেরস্থবাড়ির কুকুরের ডাক, কুকুরের ডাক বড় বির্ভষ লাগে, কেমন কেঁদে- কেঁদে ডেকে মরছে দূরে কোথাও, ছবিদের কথাগুলো কানের মধ্যে বারবার ঘুরে ফিরে আসে। দূরের হাটফেরা মানুষগুলো বাড়িমুখো এখন, কার সময় আছে ছবিদকে নিয়ে চিন্তা করার। জোনাকিদের মিটিমিটি আলোর ভেলায় চড়ে আমি হাটছি, গ্রাম এখন শহরের রূপ না পেলেও শহরের পথে হাটছে, শহর কোথায় যাবে, কোথায় গিয়ে মুখ লুকোবে !

 

Sun 12 Sep 2021 22:53 IST | আশরাফ উদদীন আহমদ