গোলাম রসুলের নির্মিত ভুবন

স্বতন্ত্র, অনানুশাসিত প্রকরণ আর ছন্দহীন, অনুপ্রাস হীন বাক্য বিন্যাসে কবি তাঁর ব্যক্তিকতার মতোই স্বয়ংভূ আর স্বশাসিত।

poetry-golam-rasul.png

 

প্র | চ্ছ | দ | র | চ | না

 

 

বিশ শতকের ৮০-দশকে দাপুটে বামপন্থী ছাত্রনেতা, দলের তথাকথিত নিয়ম ভাঙার অভিযোগে সি পি এম থেকে বহিষ্কৃত, বহিষ্কারের তিনদিন পর মিশ্র বিবাহ, রাজনৈতিক ও ব্যাকরণহীন বিবাহের কারণে সমাজে খানিকটা কোনঠাসা, উত্তরবঙ্গে স্বেচ্ছা নির্বাসন—এবং পরের কয়েক দশক জুড়ে সফল বিদ্যাদাতা, প্রধান শিক্ষকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আদর্শ স্কুলনির্মাণ, চারপাশকে তন্ন তন্ন করে দেখার অভ্যাস, কয়েক ডজন বেড়াল আর পোষ্য কুকুরের সঙ্গে নিরন্তর গার্হস্থ্য, গার্হ্যস্থের আড়ালে কবিতার সঙ্গে নিভৃত  বসবাস— এরকম বিচিত্র, পরস্পর বিরোধী কর্মকান্ডের ছায়া-প্রতিচ্ছায়া গোলাম রসুলের নির্মিত ভুবনে ছড়িয়ে আছে কতটা— কীভাবে তাঁর ব্যক্তিকতার নৈর্ব্যক্তিক আয়োজন, নিঃসঙ্গতাবোধ আর সংযত উচ্চারণকে কখনো প্রগাঢ়, কখনো কখনো রীতি ভাঙতে বাধ্য করে এসব—এরকম সহজিয়া প্রশ্ন তুলে তাঁর মেজাজকে সনাক্ত করা কঠিন, খুবই কঠিন। বরং কবিতার গোলাম রসুলকে জানতে হলে ফরাসি রোমান্টিক, নব্য রোমান্টিকদের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। সজল আবেগে, পারিপার্শ্বিক অথবা নভোমন্ডলের সঙ্গে অহরহ কথোপকথনে জীবনানন্দীয় নন তিনি, এক্ষেত্রে সরাসরি বলা জরুরি যে, জীবনানন্দের চরাচর থেকে, বেদনাবোধ থেকে, অশ্রুসিক্ত অভিব্যক্তি থেকে গোলাম রসুলের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যক্তিক কিংবা সামাজিক বিষন্নতার সংকীর্তনে আস্থা নেই তাঁর। একক নির্মাণে, অনুভবের তীক্ষ্ণতায় ইস্পাতের মতো ধারালো এবং ইয়েটস, টি.এস এলিয়ট আর এজরা পাউন্ডের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল তাঁর মনোবিকাশ। এখানে কিছুটা, ফরাসি কবিতার পঙ্কিল নবায়নের দুই অশ্বারোহী র‌্যাবো ও মালার্মের ঘরানায় বিকশিত হতে থাকে তাঁর ঘোলাটে, বিবর্ণ, হয়তো বা অন্তরালের ক্লেদাক্ত, শিল্পিত রান্নাবান্না। নির্মেদ, অলঙ্কারহীন বাকপ্রতিমার চিত্রায়ানে, বাক সংযমে, অনুভূতির তীক্ষ্ণ নিক্ষেপে তিনি যেমন দুঃসাহসী, তেমনি দক্ষ। মনে হয় অজান্তেই, ভারতীয় কবিতার আরেক দিক উন্মোচক নীলমণি ফুকনেরই দূরবর্তী সহচর তিনি। কী করে সম্ভব হল এটা? বুঝি বা সমান্তরাল চিন্তার কল্যাণে। মোদ্দা কথা, স্বতন্ত্র, অনানুশাসিত প্রকরণ আর ছন্দহীন, অনুপ্রাস হীন বাক্য বিন্যাসে গোলাম রসুল তাঁর ব্যক্তিকতার মতোই স্বয়ংভূ আর স্বশাসিত। নিজের শাসনকেই বা কতটা আমল দেন আমাদের কবিতার, আমাদের সময়ের, আমাদের ভাঙনমুখর সমাজের আত্মস্থ এই প্রতিনিধি? 

এমন একজন কবির নির্বাচিত কবিতা—১ বের হচ্ছে জেনে অত্যন্ত আপ্লুত বোধ করছি। আরেকটি কথা, এক অদ্ভুত, সুন্দর বিরাজ করছেন সঙ্কলনটির নামাঙ্কনেও, কে তিনি? মনে হচ্ছে গোলাম রসুল নিজেই

বালকের বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা

বাহারউদ্দিন

 

 

 

|১|

 নামহীন জীবনকে


এমন কোনও নক্ষত্রের কথা জানি না যে আমাকে কিনারায় নিয়ে আসে
আমি বার বার সম্মান করি নামহীন জীবনকে

আমাদের দিনগুলো সমুদ্রের দিকে যায় 
আর আমরা ছড়িয়ে পড়ি 
নদীগুলোর দিকে খুলে দিই হাওয়া
যে ভাবে আমাদের অবতরণ ছিল দিগন্তের মতো

প্রাচীন মেঘকে নিয়ে ক্লান্ত
সন্ধ্যায় সামান্য কিছু লিখছিলাম 
উড়ে এসেছিলেন মেঘ
ঢেকে দিয়েছিলো আত্মীয়স্বজনদের

ভালো মানুষ এক শূন্যতা

ওপারে আলো জ্বলছে একটি অতিথিশালায় 
আর আমি বারবার সম্মান করছি নামহীন জীবনকে

 

 

|২|

শূন্য একটি উপসর্গ


মনে হয় আমি একটি জাহাজের তলায় শুয়ে আছি আর জাহাজটা ভেসে যাচ্ছে
এই সেই আকাশ
যাকে আমরা প্রথম থেকেই অভিবাদন করে আসছি

আমার সারা কামনায় এখন রাত্রি 
অন্ধকার ছেঁদা করে দিচ্ছে শরীর

উপকূলে কে দাঁড়িয়ে 
যখন গভীর রক্তে জাহাজটা ডুবে যাচ্ছে 
প্রকাণ্ড এক নক্ষত্র
পৃথিবী যখন দশগুণ বেড়ে উঠে
নরকের উদ্যানে
টেনে ছিঁড়ে ফেলছি আমার শিরা 
জীবনে একবারও কাঁদিনি
পাথরের কাছে শিখেছি নদীর নীতিমালা

তলিয়ে যাচ্ছে শূন্য
আর শূন্যে একটি উপসর্গ
ঠিক যেমন আমি বেঁচে আছি 

 

|৩|

কবরখানার অহংকার

একটি কবরখানা আর আমি পাশাপাশি যাচ্ছিলাম

সন্ধ্যা হয়েছে 
প্রথম নক্ষত্রটি নির্দেশ করছে রাত্রির

শহরের নিজস্ব আকাশ
আর ওই বিশাল শূন্যতা ছিল আমার ব্যক্তিগত

এর আগে কবরখানার অহংকার কখনও দেখিনি
যতবার এ পথ দিয়ে গেছি সন্ধ্যা এসে ঢেকে দিয়েছে আমাদের বসন্তকাল

ভোর হচ্ছে গলির মুখে
অসময়ের মতো

|৪|

একটি কবরখানার সাক্ষাৎকার


এমন অদ্ভুত রাত্রি আগে কখনো দেখিনি
একটি কবর খানার সাক্ষাৎকার চলছে
আর কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ করতে হবে পৃথিবীর, যত কাজ
 
আকাশে বাতি জ্বলছে একটি গাছের গোড়ায়
আলো এসে পড়ছে মুখে
আর শরীরের বাদ্যযন্ত্র গুলো বেজে উঠছে

মধ্যযুগের হাওয়া 
তাদের উত্তরাধিকারীদের খুঁজছে
টেবিলে মেঘের সরজ্ঞাম
সারা কবরখানা মেঘে ঢাকা

ফিরে যাচ্ছে দিন সপ্তাহ বছর
এখন শরৎকাল এক ভবঘুরে আস্তানার মতো 

বৃষ্টি হয়ে গেছে 
রাস্তায় জমা জলে ভেসে রয়েছে দু একটি প্রতিষ্ঠান 

কালো অন্ধকারে তালা দেওয়া 

আমি দেখছিলাম উদ্দেশ্যহীন কারা গান গাইছে
আর হাততালিতে উড়িয়ে দিচ্ছে পালক

 

Sat 31 Jul 2021 20:06 IST | আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক