►গল্প : খাঁচা 

story-khanca-by-abdulrazak-gurnah.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার


abdulrazak-gurnah-2.png
চিত্র: দেব সরকার

কৈশোর কাটতেই দেশ হারিয়ে ছিলেন তিনি। ১৮ বছর বয়সে তাঞ্জানিয়া ছেড়ে আশ্রয় নেন ইংল্যান্ডে। কৈশোরে মাতৃভূমি হারানোর করুণ স্মৃতিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির মূল আধার। প্রান্তিক সমাজ আর শরনার্থীদের দৈনন্দিন সংগ্রামই ভাষা পায় তাঁর গল্প আর উপন্যাসে। 

১৯৯৪ সালে রচিত, আব্দুর রাজাক গুরনাহর চতুর্থ উপন্যাস প্যারাডাইস-এ মোহিত হয় বিশ্ব। এই রচনা মনোনীত হয় বুকার পুরস্কারের জন্যও। বিশ্বব্যাপী, ভূমিহারা শরণার্থীদের নিয়ে তাঁর অসামান্য সৃষ্টিকে এবার স্বীকৃতি জানাল রয়েল সুইডিশ একাডেমি। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকের লেখা গল্প খাঁচা প্রকাশ করে আমরা আনন্দিত। 


 

 

| আব্দুর রাজাক গুরনাহ |

ভাষান্তর: রতন শিকদার 


 

হামিদের প্রায়ই মনে হয় সে সবসময় দোকানটাতেই আছে আর জীবন সেখানেই শেষ হবে। তার আর খারাপ লাগত না, আর সে কখনও গভীর রাতে গোপন ফিসফিসানি শুনতে পেত যা একসময় তার মনটাকে ভয়ে শূন্য করে দিত। এখন সে জেনে গেছে ওটা আসত মরশুমি জলাটা থেকে, যা শহর থেকে জীবনে সম্পৃক্ত  উপনগরটাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। দোকানটা ভালো জায়গায়, শহরতলির একটা বড়ো চকে। সে ওটা খুলত ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে যখন ভোরের শ্রমিকরা যাতায়াত করত, আর বন্ধ করত যতক্ষণ না পথভোলা শেষ লোকটা বাড়ি ফিরে যেত। সে বলতে পছন্দ করত যে তার ওই ঘাঁটিতে বসে জীবনের সমস্ত দিক সে দেখে । খুব ভিড়ের সময় তাকে সবসময় দাঁড়িয়েই থাকতে হত, খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলতে হত আর হাসিঠাট্টা করতে হত, তাদের খুশি করার পাশাপাশি নিজেকে আর মালপত্রকে সামলে সে মজা পেত। পরে পরিশ্রান্ত হয়ে গদিআঁটা চেয়ারে বসে আরাম করত। 

একদিন একটু রাতের দিকে যখন সে দোকানটা বন্ধ করবে বলে ভাবছিল, তখনই মেয়েটা হাজির হল। দুবার মাথা নেড়ে সে নিজের কাছে নিজেই ধরা পড়ে গেল, দুর্দান্ত সময়ে ওটা ছিল এক ভয়ংকর কায়দা। দ্বিতীয়বার এক ঝটকায় সে জেগে উঠল, তার মনে হল একটা বিরাট হাত তার গলা চেপে ধরে মাটি থেকে উঁচুতে তুলে ধরছে। মেয়েটা, চোখেমুখে বিরক্তি ভাব নিয়ে, তার সামনে অপেক্ষা করছিল। 

মেয়েটা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করবার পর বলল, 'ঘি। এক শিলিং।' কথাটা বলেই সে খানিকটা ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে, তাকানোটা বিরক্তিকর। তার শরীরে এক খণ্ড কাপড় জড়ানো আর সেটা বগলের নিচে গোঁজা। নরম কাপড়টা তার শরীরে লেগে আছে। তার সুন্দর দেহের আকারটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর কাঁধদুটো আলগা আর আধো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিস। হামিদ তার হাত থেকে পাত্রটা নিল আর ঘিয়ের টিনের সামনে নিচু হয়ে গেল। কামনায় আর হঠাৎ বেদনায় তার মন ভরে গেল। পাত্রটা তাকে ফেরত দেবার সময়, মেয়েটা তার দিকে অস্পষ্টভাবে তাকাল, তার দৃষ্টি অনেক দূরে আর তাতে ক্লান্তির ছাপ। সে লক্ষ করল মেয়েটা অল্পবয়সি, ছোটো গোল মুখ আর শীর্ণ ঘাড়। একটাও কথা না বলে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে ফিরে গেল। রাস্তা আর ফুটপাথের কংক্রিটের গর্তটা লম্বা লাফ দিয়ে পেরিয়ে গেল। হামিদ তার ফিরে যাওয়াটা লক্ষ করল আর তার ইচ্ছা করল চিৎকার করে সে তাকে সাবধান করে দেয়। সে কী করে জানবে যে অন্ধকারে কিছু নেই? শুধুমাত্র একটা দুর্বল শব্দ তার গলা থেকে বেরিয়ে এল আর তাকে ডাকার তাড়নায় তার গলাটা বন্ধ হয়ে গেল। সে অপেক্ষা করল তার চিৎকার শুনতে পাবে বলে, কিন্তু শুনল শুধু আস্তে আস্তে পিছিয়ে যাওয়া তার চটির শব্দ । সে আরও গভীর রাতের ভেতরে ডুবে গেল।  

মেয়েটা আকর্ষণীয়, সে কোনো কারণে তার কথা ভাবতে ভাবতে রাতে সে একটা গর্ত দেখতে পেল যার ভেতরে মেয়েটা হারিয়ে গেল। সে নিজের ওপর বিরক্ত হল। তার প্রতি অবজ্ঞার চাউনি দিয়ে মেয়েটা ঠিকই করেছে। তার শরীর আর মুখটা বাসী মনে হতে লাগল। একদিন অন্তর একদিন বেশি পরিষ্কার হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। বিছানা থেকে দোকানে পৌঁছতে লাগল এক মিনিটের মতো, আর সে কখনও অন্য কোথাও যেত না। পরিষ্কার করার আছেটা কী? ঠিকঠাক ব্যায়াম না করার ফলে তার পাগুলো কদাকার। সে বন্দিদশায় দিন কাটিয়েছে। মাস, বছর কেটে গেছে ওভাবে, একটা বোকা লোক সারাটা জীবন একটা খাঁচায় আটকে গেছে। ক্লান্ত অবস্থায় সে দোকান বন্ধ করল এটা জেনে যে রাতের বেলা সে তার নোংরা স্বভাবকেই প্রশ্রয় দেবে।

পরদিন সন্ধেবেলায় মেয়েটা আবার দোকানে এল। হামিদ এক নিয়মিত খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলছিল। মনসুর নামের লোকটা তার চাইতে বয়সে বড়ো, কাছাকাছিই থাকত আর মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় তার সঙ্গে কথা বলতে আসত। চোখে ছানি পড়ার জন্য লোকটা প্রায় অন্ধ, বাকিরা তার দুর্দশা নিয়ে টোন-টিটকারি দিত, তার সঙ্গে নির্দয়ভাবে হাসিঠাট্টা করত। কেউ কেউ বলত মনসুর অন্ধ হয়ে যাবে কারণ ওর দৃষ্টি  অস্বচ্ছ। সে অল্পবয়সি ছেলেদের থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারত না। হামিদ মাঝেমাঝে ভাবত মনসুর বুঝি দোকানে ঘুরঘুর করে তার পিছনে পড়ার জন্য। কিন্তু এটা বোধহয় শুধু আক্রোশ থেকে বা পরচর্চার জন্য। মেয়েটা এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনসুর কথা বলা বন্ধ করে দিল, তারপর কষ্ট করে চোখ কুঁচকে অল্প আলোয় তাকে চেনার চেষ্টা করল।মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, ‘জুতো-পালিশ আছে? কালো?’

হামিদ বলল, ‘হ্যাঁ' ওর গলাটা জমাট বেঁধে গেছে, সুতরাং সে গলাটা পরিষ্কার করে আবার বলল, হ্যাঁ । মেয়েটা  হেসে ফেলল। 
মনসুর জিজ্ঞেস করল, আরে আজ কেমন আছো ? তার বলার ধরনটাˆ এতটাই জোরে আর ভারী গমগমে যে হামিদ ভাবল এটা ঠাট্টা হচ্ছে। তোমার গন্ধ কী চমৎকার, এমন গন্ধও হয়! গলার স্বর অপ্সরার আর শরীরটা একেবারে হরিণের মতো। বলো, আজ রাতে তুমি কখন সময় দিতে পারবে? আমার পিঠটা মালিশ করার জন্য একজনকে চাই যে।

মেয়েটা তাকে পাত্তা দিল না। তাদের দিকে পেছন ফিরে মনসুর মেয়েটার সঙ্গে বকবক করে চলল, খোলাখুলি তার প্রশংসা করতে করতে তার সঙ্গে সাক্ষাতের একটা সময় ঠিক করতে চাইল। ধন্দে পড়ে হামিদ পালিশের কৌটো খুঁজে পেল না । শেষˆ পর্যন্ত সে যখন ওটা নিয়ে ফিরে এল ভাবল মেয়েটা এতক্ষণ তাকে লক্ষ করছিল, আর সে এতটাই রেগে গেছে দেখে মজা পাচ্ছিল। হামিদ হেসে ফেলল আর মেয়েটা ভুরু কুঁচকে দামটা মিটিয়ে দিল । মনসুর তার পাশে কথা বলছিল, হাসিঠাট্টা করছিল আর ওকে জপাচ্ছিল, পকেটের খুচরোগুলো নিয়ে খনখন শব্দ করছিল। কিন্তু মেয়েটা ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা কথাও না বলে চলে গেল।

মেয়েটাকে দেখো, সূর্য নিজেও যেন ওর ওপর আলো ফেলতে সাহস পাচ্ছে না। এতাটই অহংকার! কিন্তু সত্যিটা হল ওকে সহজেই পটানো যায়। মনসুর কথাটা বলল, তার শরীরটা ধীরে ধীরে চাপা হাসিতে কাঁপতে থাকল। খুব শিগ্গিরই আমি একে কব্জা করব। ও কত নেবে বলে মনে হয়, তোমার? ওরা এরকমই করে, এইসব মেয়েরা, এইসব হাবভাব আর বিরক্তিকর চাউনি...কিন্তু একবার বিছানায় নিয়ে ফেলতে পারলে একেবারে তাদের ভেতরে ঢুকে পড়বে, তারা তখন গুরুত্ব টের পাবে।

হামিদ দেখল সে হাসছে, শান্তি বজায় রাখছে। তার মনে হয় না মেয়েটাকে পয়সা দিয়ে কেনা যেতে পারে। মেয়েটার চলাফেরা এতটাই নিশ্চিত আর স্বচছন্দ, যে সে বিশ্বাস করতে পারল না মনসুরের ভাবনা মতো মেয়েটা এতটা হীন হতে পারে। বারবার তার মনটা মেয়েটার দিকে ঘুরে যাচ্ছিল, আর যখন সে একা ছিল, কল্পনা করল মেয়েটার সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশছে। রাতে দোকান বন্ধ করে সে বুড়ো ফজিরের পাশে কিছুক্ষণ বসবে বলে গেল। ফজির দোকানের মালিক যে পিছনেই থাকত। সে আর নিজের দেখাশোনা করতে পারত না। একজন মহিলা কাছে থাকত, তার দেখভাল করত আর পরিবর্তে বিনা পয়সায় মুদির দোকানের জিনিসপত্র নিয়ে যেত। রাতের বেলায় অসুস্থ বুড়োটা চাইত হামিদ তার কাছে কিছুক্ষণের জন্য এসে বসে। তারা যখন কথাবার্তা বলত তখন মরণোন্মুখ মানুষˆটার গন্ধ সারাটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ত। বিশেষˆ কিছুই বলার থাকত না, ব্যবসার গতানুগতিক খারাপ অবস্থার কথা আর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য বিলাপী প্রার্থনা ছাড়া। মাঝেমাঝে যেদিন তার মনটা খারাপ থাকত ফজির কেঁদে কেঁদে অপেক্ষমাণ মৃত্যু আর জীনের কথা বলত । 

তখন হামিদ বুড়োটাকে পায়খানায় নিয়ে যেত, আগে নিশ্চিত হত যে তার বেডপ্যানটা পরিষ্কার আর খালি আছে আর তারপর তাকে ছেড়ে চলে যেত । গভীর রাতে ফজির নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলত, কখনো-কখনো তার গলার স্বর শান্তভাবে হামিদকে ডেকে উঠত ।

ভিতরের উঠোনে খোলা জায়গায় হামিদ ঘুমাত, বৃষ্টির দিনে দোকানের ভিতর একটু জায়গা বের করে সেখানেই । তার রাতগুলো একাই কাটত, কখনও বাইরে যেত না। এক বছরের ওপর হয়ে গেল দোকান ছেড়ে বাইরে যায়নি, বুড়োমানুষˆ ফজির শয্যাশায়ী হয়ে পড়ার আগে, তার সাথেই শুধু বাইরে গেছে । ফজির তাকে প্রতি শুক্রবার মসজিদে নিয়ে গিয়েছে, হামিদের মনে আছে মানুষেˆর ভিড়ের কথা আর ফাটা ফুটপাথের ওপর বৃষ্টির জল পড়ে বাষ্প হবার কথা । বাড়ি ফেরার পথে তারা বাজারে গিয়েছিল, বুড়োমানুষˆটা রসালো ফল আর রংচঙে সবজির নাম করেছিল, সেগুলো তুলে নিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গন্ধ শুঁকেছিল। তার অল্প বয়সে হামিদ প্রথম শহরে বাস করতে এসেছিল, তখন থেকে সে বুড়োর জন্য কাজটা করেছে। ফজির তাকে খাবার দেয়, বিনিময়ে দোকানে কাজ করছে। দিনের শেষেˆ রাত কাটায় একা, আর মাঝে মাঝেই তার বাবা-মায়ের কথা আর তার জন্মের শহরের কথা মনে পড়ে। যদিও সে এখন ছোটো ছেলে নয়, স্মৃতিগুলো তাকে কাঁদিয়ে দেয়, অনুভূতিগুলো তাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
মেয়েটা আবার যখন দোকানে এল বিন আর চিনি কিনতে, হামিদ ওজনের ব্যাপারে দরাজ হাত হল। মেয়েটা যেটা লক্ষ করে তার দিকে তাকিয়ে হাসল। হামিদ খুশিতে ঝলমল করে উঠল, যদিও সে জানত ওই হাসিতে মিশে আছে উপহাস । পরের বার সে তাকে কিছু বলল না, শুধু একটু অভিনন্দন জানাল, কথা বলল হাসিখুশি হয়ে। পরে সে তাকে বলল, তার নাম রুকিয়া, সবেমাত্র এ জায়গায় এসেছে তার আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে ।
জিজ্ঞাসা করল, তোমার বাড়ি কোথায়?

হাত তুলে অনেক দূরের পথ দেখিয়ে সে বলল, মুয়েম্বেমারিনেগো । ওখানে যেতে হলে তোমাকে পাহাড় ডিঙোতে হবে ।
মেয়েটার নীল রঙের সুতির পোশাক দেখে সে বুঝতে পারল সে কারও বাড়িতে ঘরের কাজ করে। কোথায় কাজ করে জিজ্ঞেস করলে, মেয়েটা প্রথমে নাক দিয়ে একটু অবজ্ঞার আওয়াজ করল, ভাবখানা যেন প্রশ্নটা অবান্তর। তারপর সে তাকে বলল, যতদিন না ভালো কোনো কাজ পাচ্ছে সে শহরের নতুন হোটেলে পরিচারিকার কাজ করে যাবে।

সে বলল, সবচেয়ে ভালোটা, দি ইকুয়েটর। ওখানে সাঁতার কাটার ব্যবস্থা আছে আর সব জায়গায় কার্পেট বিছানো । এখানে যারা থাকে তারা প্রায় সবাই মজুঙ্গু (শেতাঙ্গ), ইউরোপের লোক। কয়েকজন ভারতীয়ও আছে, এদের কেউ জঙ্গল থেকে আসা মানুষˆ নয়, যাদের চাদর থেকে গন্ধ বেরোয়।

রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করে সে এসে দাঁড়াত পিছনের দিকে তার শোওয়ার ঘরের দরজায়। ওই সময় রাস্তাগুলো সব জনশূন্য আর নীরব, দিনের বেলার ভিড়ে বিপজ্জনক জায়গা নয়। প্রায়ই তার রুকিয়ার কথা মনে পড়ত আর সে তার নাম উচ্চারণ করত, তার কথা মনে পড়তে সে তার একাকিত্ব আর দুর্দশা নিয়ে সচেতন হয়ে পড়ত। তার মনে পড়ে গেল মেয়েটা প্রথমবার কেমনভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল, রাতের অন্ধকারে যে তাকে ছুঁতে চেয়েছিল। সে ভাবল, বছরের পর বছর অন্ধকারে তার এমন হয়েছে, তাই সে এখন বিদেশের শহরের রাস্তার দিকে তাকাল আর কল্পনা করল যে কোনো অচেনা মেয়েকে  ছোঁয়ার অর্থই তার মুক্তি।

এক রাতে সে বাইরে বেরিযে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাস্তায়ে চলে এল। আস্তে আস্তে হেঁটে কাছের বাতিস্তম্ভের কাছে গেল, তারপর পরেরটার কাছে। অবাক হল তার ভয় করছে না। সে কিছু একটা চলাফেরা করছে শুনতে পেল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। যদি সে না-ই জানে সে কোথায় যাচ্ছে তবে আর ভয় পাবার কী আছে, কারণ যা হোক কিছু ঘটতেই পারে। তাতে স্বস্তি বোধ হল। রাস্তার পাশে পর পর দোকান, তার দুটো-একটায় আলো জ্বলছিল। সে ওই রাস্তার এক কোণে ঘুরে দাঁড়াল, তারপর আলোর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সে আরেক দিকে ঘুরে গেল। সে কাউকে দেখতে পেল না--- না কোনো পাহারাদার না কোনো পুলিশ। চকের এক ধারে কাঠের বেঞ্চিতে সে কয়েক মিনিট বসল, ভাবতে লাগল প্রতিটি জিনিসই তার কত পরিচিত। এক কোণে একটা ঘণ্টাঘর, নীরব রাতে সেটা আস্তে আস্তে টিকটিক করছিল । নিরাসক্ত আর নিখুঁত ধাতব স্তম্ভগুলো সার দেওয়া চারধারে। একপান্তে বাসগুলো দাঁড় করানো, আর দূরে সমুদ্রের আওয়াজ সে শুনতে পেল ।

শব্দকে লক্ষ করে সে এগিয়ে গেল, আবিষ্কার করল জলরেখা থেকে সে খুব একটা দূরে নয়। জলের গন্ধ হঠাৎই তার বাড়ির কথা মনে করালো। ওই শহরটাও সমুদ্রের পাড়ে, আর একবার সে অন্য সব বাচ্চাদের মতো সাগরের তটে অগভীর জলে খেলা করছিল। এই জায়গায় যে তার বাড়ি ছিল, এই জায়গায় যে সে ছিল, সে কথা ভাবে, সমুদ্রের গায়ে দেওয়ালের জল আস্তে আস্তে আছড়ে পড়ছিল, সে থেমে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল কংক্রিটের গায়ে ঢেউ ভেঙে সাদা ফেনা তৈরি হচ্ছে। জেটিগুলোর একটাতে তখনও আলো জ্বলছিল আর একটা যান্ত্রিক কাজকর্মের গুনগুন শব্দ হচ্ছিল। মনে হয় না, অত রাতে কেউ কাজ করছে?

খাঁড়ি বরাবর আলো, একটা করে বিচ্ছিন্ন আলো অন্ধকারের ওপরে ঝুলে আছে। ওখানে কে থাকত? সে অবাক হয়ে ভাবল। তার শরীরে ভয়ের একটা শিহরন খেলেˆ গেল। মনে মনে অন্ধকারে বাস করা মানুষˆগুলোর ছবি আঁকার চেষ্টা করল। তার মন তাকে নির্দয় মুখওয়ালা শক্তিশালী মানুষেˆর ছবি দিল, যারা তার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে হেসে উঠল। সে হালকা আলোয় আলোকিত পরিষ্কার জায়গাটা দেখতে পেল যেখানে ছায়াগুলো আগন্তুকের জন্য ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছিল, আর পরে যেখানে পুরুষˆ আর মেয়ে মানুষˆরা দেহটাকে ঘিরে ভিড় করে দাঁড়াল । পুরোনো রীতি অনুযায়ী তাদের পা দাপানোর শব্দ সে শুনতে পেল আর শুনতে পেল তাদের জয়োল্লাস, যখন তাদের শত্রুর রক্ত শক্ত মাটির মধ্যে বয়ে গেল। তাদের থেকে তার শুধু শারীরিক বিপদের আশঙ্কাই ছিল না, সে খাঁড়ি বরাবর অন্ধকারে মানুষˆগুলোকে ভয় পেল। এর কারণ তারা জানত তারা কোথায় ছিল।

সব কিছু সত্ত্বেও, তার যে একটা অনুভূতি হয়েছিল সেটাকে প্রতিরোধ করতে না পেরে, সে দোকানটার দিকে ঘুরে দাঁড়ল । এটা তার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল যে দোকান বন্ধ করার পর ফজিরকে দেখে এসে জলের ধারে একটু হাঁটাহাঁটি করবে। ফজিরের এটা পছন্দ হত না, তাকে একা ফেলে যাওয়া নিয়ে সে অভিযোগ জানাত, কিন্তু হামিদ তার গজগজানিকে পাত্তা দিত না। মাঝেমাঝেই তার লোকজনের সঙ্গে দেখা হত। তারা না তাকিয়ে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যেত। দিনের বেলায়, সে মেয়েটার জন্য চোখ খোলা রাখত। মেয়েটাই এখন তার সময়টা পরিপূর্ণ রাখে। রাতের বেলা সে তার সঙ্গ কল্পনা করত। নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবতে চেষ্টা করত, মেয়েটা তার সঙ্গে আছে, কথা বলছে, হাসছে। মাঝে মাঝে মেয়েটা হাতের তালুটা তার ঘাড়ের ওপর রাখছে। মেয়েটা  যখন দোকানে আসত, সে সবসময়ই তাকে কিছু বেশি দিত। অপেক্ষা করত কখন সে হাসবে। প্রায়ই তাদের মধ্যে কিছু অভিনন্দন বিনিময় বা বন্ধুত্বের কথা হত। কোনো জিনিসের অভাব থাকলে সে তাকে বিশেষˆ খদ্দেরদের জন্য রাখা গোপন ভাণ্ডার থেকে দিয়ে দিত। যখনই তার সাহস হত সে তাকে তার উপস্থিতির জন্য সৌজন্য দেখাত। আর সে তাকেˆ উজ্জ্বল হাসি উপহার দিলে আশা আর দ্বিধায় ভয় পেয়ে যেত। মেয়েটা সম্পর্কে মনসুরের অহংকারের কথা মনে করে হামিদ মনে মনে হেসে উঠত। কয়েক শিলিং দিয়ে  কিনবার মতো মেয়ে সে নয়, তাকে জয় করতে তাকে বাজিয়ে দেখতে হবে, সাহস দেখাতে হবে । আর এরকম কাজের জন্য ছানি পড়া অন্ধ মনসুর বা হামিদ, কারোরই না ছিল কোনো কথা, না ছিল কোনো ধারণা।

একদিন রাতের দিকে রুকিয়া চিনি কিনতে দোকানে এল। তখনও তার পরনে নীল রঙের পোশাক, যার বগলে ঘামের দাগ। আর কোনো খদ্দের ছিল না, তারও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। মেয়েটা আস্তে আস্তে তাকে খেপাতে লাগল এই বলে যে কত কষ্টই সে করে ।
সারাক্ষণ দোকানে কাটিয়ে তুমি নিশ্চয়ই খুব বড়োলোক। টাকা লুকিয়ে রাখার জন্যে উঠোনে কি তুমি গর্ত করে রেখেছ? সবাই জানে দোকানদারদের গোপন ভাণ্ডার থাকে। তুমি কি তোমার নিজের শহরে ফিরে যাবার জন্যে টাকা জমাচ্ছো?
সে প্রতিবাদ করল, আমার কিচ্ছু নেই। এখানকার কিচ্ছু আমার নয়।

সে মুখ টিপে অবিশ্বাসের হাসি হাসল। বলল, যাই হোক, তুমি ভীষˆণ পরিশ্রম করো। তোমার যথেষ্ট মজা করার উপায় নেই। তারপর সে কিছুটা বাড়তি চিনি দিলে মেয়েটা হেসে ফেলল।

প্যাকেটটা নেবার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে মেয়েটা বলল, ধন্যবাদ । যতটা প্রয়োজন তার থেকে কিছুটা বেশি সময় ওভাবে থাকল; তারপর পেছনে ফিরে ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। ‘তুমি সবসময় আমাকে কিছু না কিছু  দাও, আমি জানি বদলে তুমি কিছু চাও। তুমি যখন দেবে তখন এই ছোটোখাটো উপহার থেকে বেশি কিছু দেবে।’

লজ্জায় লাল হয়ে হামিদ কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটা হালকা হেসে চলে গেল। অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে একবার সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে চওড়া হাসি ছড়িয়ে দিল।     

♦—♦—♦

 

Fri 8 Oct 2021 18:12 IST | আব্দুর রাজ্জাক গুরনাহ