মুঘল সম্রাট নুর-উদদিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গির-এর আত্মকথা

বাদশাহ আকবরের দেহ সৌষ্ঠব , অঢেল হীরা-জহরত  আর কনিষ্ঠ ভ্রাতা দানিয়েল-এর সংযমহীন, মদাসক্ত অভ্যাস স্মরণ করেছেন জাহাঙ্গির। বন্দুকের নলে বারুদ মেশানো মদ খেয়ে হৃদয় বিদারক পরিণতি ঘটেছিল শাহজাদার। তা কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে অকপটে জানিয়েছেন মোঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট।  

The-Emperor-Akbar-and-Jahangir-in-Apotheosis,1650.png

মুগল মিনিয়েচারে পিতা, পুত্র।অক্সফোর্ডের বোদেলিয়ান গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত, ১৬৫০ সালে আঁকা এই চিত্র।

►স্মৃতির দস্তাবেজ

 

ভাষান্তর: বাহারউদ্দিন

 

মদে বিষাক্ত বারুদ এবং দানিয়েল-এর মৃত্যু

আমার মহান আব্বা জালাল উদ্দিন আকবরকে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। অনিন্দ্য কান্তির ব্যক্তিময় চেহারা, দীর্ঘাঙ্গ, গায়ের রঙ উজ্জ্বল বাদামি, ঘনকালো জোড়া ভুরু, ভুরুর নীচে চোখের কালো মনি দুটি সবসময় জ্বলজ্বল করত। সুগঠিত দেহে সিংহের শক্তি, বুকের পাটা বিশাল, শক্ত লম্বা বাহু দুটি জানু পর্যন্ত লম্বিত, নাকের ডগায় কালচে তিল, রাজ গণকরা বলতেন, ঐ তিল তাঁর সৌভাগ্যের প্রতীক। তাঁর ভাগ্য আক্ষরিক অর্থেই তাঁর মতোই প্রশস্ত ছিল, তাঁর সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত আরেক প্রান্তে পৌঁছতে পুরো দুবছর লেগে যেত; বীর বিক্রম, অপরাজেয় সম্রাট, দীর্ঘ ৫০ বছর প্রবল প্রতাপ নিয়ে রাজত্ব করে গেছেন। তাঁর বিত্ত অনুমান করা কঠিন। একবার রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ কিলিজ খান নির্দেশ দিলেন, খাজাঞ্চিখানায় সোনাদানা কী আছে হিসেব দাও। কিলিজখান কেবল আগ্রার জহরতের পরিমান বের করতে চারশ দাড়িপাল্লা সংগ্রহ করলেন। পাঁচ মাস জুড়ে সোনা, হিরে ও অন্যান্য পাথর ওজন করেও ধনদৌলতের তল মিলল না, আব্বা এবার অধৈর্য---জবাব চাইলেন আর কতদিন লাগবে! খাজাঞ্চি বললেন, একহাজার লোক একটানা কাজ করছে, ওজন শেষ হয়নি। বাদশাহ খানিকটা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, যা করেছ, তা যথেষ্ট। তার হিসেব মেলাতে হবে না, কোষাগারে তালা ঝুলিয়ে দাও।

এ তো শুধু আগ্রার হিসেব-নিকেশ। দেশের সব শহরেই এরকম সরকারি খাজাঞ্চিখানা ছড়িয়ে আছে। সবটাই অঢেল ধনদৌলতে ভরা। সম্পদের পরিমান দেখা হয়নি কখনও।[ ফিল আরবি শব্দ, মানে হাতি। খানা ফারসি, এর অর্থ গৃহ অথবা বাসস্থান—ফারসিতে এই দুইয়ের মিলনের রূপ দাঁড়ায় পিলখানা—হস্তিশালা।   ভারতীয় শব্দ সম্ভারে এরকম আরবি ফারসির মিশ্রনের অজস্র দৃষ্টান্ত থেকে প্রমাণিত হয়, সাংস্কৃতিক  বৈচিত্রে, আদান-প্রদানে কী প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল মোঘলদের। আরবি ফারসি শব্দকে ভারতীয়বোধের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল তাদের সাধনা।] এরকম  হস্তিশালা অতীতের কোনও রাজা বাদশার ছিল না। ১২ হাজার মদ্দা আর ১২ হাজার মাদি হাতি থাকত এসব হাতিশালে, তাদের জন্য প্রতিদিন খরচ হত চারলাখ টাকা। শৌখিন সম্রাটের শিকারখানায় ছিল ১২ হাজার হরিণ। পাশাপাশি জংলি, ভেড়া, নীল গাই, তেজোদ্দীপ্ত গন্ডার, উট পাখি ও জলহস্তিও ১২ হাজার । আমি এসব জন্তুজানুয়ারকে আটকে রাখিনি, সিংহাসনে আরোহন করার পর  কালক্রমে এদের মুক্ত করে দিয়েছি। প্রমোদ ভ্রমনের জন্য নিজের হেফাজতে রেখেছি গুটি কয়েক পশুকে। 

আমাদের পূর্বপুরুষ, বিশ্ববিজয়ী তৈমুরের এত বিপুল ধন-সম্পদ ছিল না। বাদশাহ আকবরের বিশাল সম্পদের দশভাগের একভাগও হয়তো হবে না। আব্বা যেমন দূরদর্শী, তেমনি উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন, পূর্বপুরুষদের সব কীর্তি, সব মহিমা অতিক্রম করে নজির গড়তে চেয়েছিলেন, এ ব্যাপারে প্রশ্নাতীত তাঁর সাফল্য।


দুঃসাহসী, তেজি, যোদ্ধা ছিল আমার আরেক ভাই, শাহজাদা দানিয়েল। মৃত্যুকেও পরোয়া করত না।


মুরাদ নামে আমার একটি ভাই ছিল। তাঁর জন্ম, ফতেহপুরের পার্বত্য এলাকায়। একারণেই বাদশাহ তাকে পাহাড়ি বলে ডাকতেন। অসম সাহসী যোদ্ধা সে, দাক্ষিণাত্য জয় করতে দিকবিজয়ী আকবর তাঁকে পাঠালেন, পর পর গোরাইল, পয়নালাহসহ কয়েকটি দুর্গ অধিকার করল সে, নর্মদা নদীর দক্ষিণ তীরের ভূখন্ডেও মোঘল আধিপত্য স্থাপন করল; দীর্ঘায়ু ছিল না, অকালে মৃত্যু হয় তার, তিরিশ বছরে। দক্ষিণাঞ্চল বিজয়ের দায়িত বর্তায় এবার আমার আরেক ভাই শাহজাদা দানিয়েলের ওপর, আব্বাও বহরামপুর থেকে দক্ষিণ ভারতের দিকে এগোলেন, তাঁর বিশাল মোঘল বাহিনীও আমির উমরাহরা আগেই ওখানে পৌঁছে যান। আহমদ নগর দুর্গের পতন ঘটল। আব্বা দানিয়েলকে দাক্ষিণাত্যের শাসনভার সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে আগ্রায় ফিরে এলেন। দুঃসাহসী, তেজি, যোদ্ধা ছিল দানিয়েল। মৃত্যুকে পরোয়া করত না। তবে বিলাসিতা আর মদ্যপানে আসক্ত থাকত। মদের নেশাই তাঁর কাল হল, বয়স তিরিশ পেরোনোর আগেই পানের নেশায় প্রাণ হারায়। সে এক ভয়াবহ ঘটনা। 

অল্প বয়স থেকেই মদের নেশা তাকে পেয়ে বসে এবং তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তার উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন আব্বাকে ক্ষুদ্ধ করে তুলল, তিনি হকুম দিলেন, শাহজাদাকে মদ সরবরাহ চলবে না, যে ওকে অন্দরমহলে মদ জোগাবে, কঠোর শাস্তি পাবে। দানিয়ালের সঙ্গে বহরামপুরে থাকতেন তাঁর বিশ্বস্ত আমির খান খানান। আব্বার আদেশ ঠিকঠাক পালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পড়ল তাঁর ওপর। প্রয়োজনে তিনি কঠোর আর নির্দয় কৌশলী হতে জানতেন, দানিয়েলের ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম নন। অন্তঃপুরের সবাইকে গোপনে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, শাহজাদা দানিয়েনকে মদ জোগানো চলবে না। 

মহান বাদশার হুকুম। দানিয়েলের গৃহকর্মী, দাসদাসী অনুগত সঙ্গীরাও ভয় পেয়ে গেলেন। মদ না পেয়ে, নেশায় প্রায় পাগল হয়ে ওঠে দানিয়েল। ভৃত্যরা তাঁকে সকাল-সন্ধ্যা এড়িয়ে থাকে, নিত্য ব্যবহারের বস্তু ছাড়া বাড়তি কিছুই এগিয়ে দেয় না, এভাবে বহুদিন কাটল,  নেশায় তখন আরও কাতর দানিয়েল। যুক্তিহীন, দিশাহীন অবস্থা। সে  তার অনুরক্ত মুরশিদ কুলিকে ডেকে পাঠিয়ে বলল, একটুখানি মদ দাও, আমার হালত তো দেখছ! মুরশিদ কুলি শাহাজাদার অনুনয়ে গলে পড়ল এবং তারই বুদ্ধিতে তারই একটি বন্দুকের নলের ভেতরে মদ ঢুকিয়ে তার কাছে নিয়ে এল, কেউই তা টের পেল না।

বন্দুকটি অত্যন্ত প্রিয় ছিল শাহজাদার। এটি নিয়ে সে বনমোরগ শিকারে যেত। বন্দুকটির নাম দিয়েছিল 'জানাজা'। একদিন এটি যে তারই জানাজার—শেষ কৃত্যের উৎস হয়ে উঠবে— কখনও ভাবে নি। বন্দুকের নলে নিয়ে আসা মদের সঙ্গে বিশাক্ত বারুদ মিশে যাবে—আঁচ করেনি দানিয়েল কিংবা মুরশিদ কুলি। এক ঢকে মদ শেষ, বিষাক্ত মদে শেষ হয়ে গেল আমার প্রিয় ভাই শাহজাদা দানিয়েল। হৃদয় বিদারক ঘটনা। দানিয়েলের মৃত্যু শোক আমরা ভুলতে পারিনি। ভেঙ্গে পড়লেন আব্বা। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছুই বললেন না। আব্বার যে নির্দেশ দানিয়ালকে বাঁচাতে চেয়েছিল, সেটিই তার অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠল। নিয়তির কী নিদারুণ, নিষ্ঠুর খেলা।  

ক্রমশ...

Sun 25 Jul 2021 18:50 IST | বাহার উদ্দিন