আমার ছেলেবেলা

poet_Nimalendu.png

►স্মৃ | তি | ক | থা

 

| নির্মলেন্দু গুণ |

 

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বৃত্তিপরীক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের স্কুল থেকে চারজনকে নির্বাচন করা হয়। বৃত্তির পরিমাণ মাসে আট টাকা এবং স্কুলের বেতন ফ্রি। শিক্ষকরা আমাদের বিশেষ যত্নসহকারে তালিম দিতে শুরু করেন। বাবাও আমার জন্য প্রাইভেট শিক্ষক রেখে দেন। আমি বৃত্তিপরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হওয়াতে তাঁর খুশির অন্ত নেই। আমিও পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য সাধ্যমতো পড়াশোনা করতে থাকি। আমাদের অগ্নিপরীক্ষার দিন দ্রুত ঘনিয়ে আসে। ভালো দিনও লগ্ন দেখে আমরা চারজন মতি, হেলাল, হুসেন আলী এবং আমি গুরুজনদের কাছ থেকে আশীবার্দ নিয়ে ময়মনসিংহগামী ট্রেনে চড়ে বসি। মা আমার পকেটে বিষ্ণুপুজার ফুল-দূর্বা গুঁজে দেন। গার্জিয়ানদের পক্ষ থেকে আমার বাবা ও স্কুলের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে মালেক স্যার আমাদের সঙ্গে যান। 

আমার জ্যাঠতুতো ভাই অনিন্দ্য ময়মনসিংহ শহরের সিটি স্কুল থেকে বৃত্তিপরীক্ষা দিচ্ছিল। বাসায় থাকলে আমার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ প্রদর্শন না করাতে বাবা আমাকে নিয়ে গাঙ্গিনার পাড়ার একটি হোটেলে উঠলেন। ঐ হোটেল থেকে আমাদের বাসার দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের পথ। আমাদের বাসার সামনে দিয়েই জিলা স্কুলে যাতায়াত করতে হতো। মতি হেলাল, হুসেন আলী এবং মালেক স্যার বাবার কাছে বাসায় না থেকে হোটেলে থাকার কারণ জানতে চাইলে বাবা কৌশলে সে-প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যেতেন। আমি বুঝতে পারতাম, নিজের হাতে তৈরি করা বাড়িতে প্রয়োজনের সময় উঠতে না পারার দুঃখটা বাবা বুকের ভিতরে পাথরচাপা দিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন। বৃত্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করে বাবার সেই দুঃখটাকে কিঞ্চিৎ লাঘব করার ইচ্ছেও আমার ছিল, কিন্তু জিলা স্কুলের ঐ লাল ইটের দালানে ঢুকেই আমার মাথা ঘুরে যেতো। এতো বড় স্কুলে, এতোসব অপরিচিত ছাত্র, ততোধিক অপরিচিত রাসগম্ভীর শিক্ষকদের দৃষ্টির সামনে বসে লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপতো। জানা উত্তর লিখতেও ভুল করে ফেলতাম। অসহায় মুহূর্তে আমার মন ছুটে যেতো বাইরে অপেক্ষামাণ শত শত উন্মুখ অভিভাবকের ভিড়ে, যেখানে আমার বাবা আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরিয়ে এলেই ভিড়ের ভিতর থেকে বাবা আমাকে দ্রুত খুঁজে বের করতেন। কখনো তাঁর হাতে থাকতো সদ্যকাটা একটা কচি সবুজ ডাব, কখনো কমলা, কখনো আপেল। পরীক্ষা কেমন হয়েছে, সে প্রশ্ন করে বাবা আমাকে বিব্রত করতেন না। আমি পরীক্ষা যতটা ভালো হয়েছে তার চেয়ে অনেক বাড়িয়ে বলতাম। বাবা বুঝতে পারতেন আমি বাড়িয়ে বলছি। তিনি আমাকে অভয় দিয়ে বলতেন : 'ঠিক আছে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।  মোটামুটি ভালো হলেই হলো '। বাবাকে তখন আমার দারুণ ভালো লাগতো। বাবা কী করে যে আমার মনের কথা জানতে পারতো। বাবা হলে বোধহয় এসব জানা যায়।


বড় স্কুলে, অপরিচিত ছাত্র, রাসগম্ভীর শিক্ষকদের দৃষ্টির সামনে বসে লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপতো।


বিকেলের দিকে বাবা আমাদের নিয়ে শহর দেখতে বেরুতেন; এইটুকুন শহর ময়মনসিংহ—তখন কী বিরাট বড় বলেই না মনে হতো। মনে হতো বাবা সঙ্গে না থাকলে আমি নির্ঘাৎ হারিয়ে যেতাম। গাঙ্গিনার পাড়ের চৌরাস্তার মোড়ে উঁচু জলের ট্যাংকটার পাশ দিয়ে যাবার সময় ভয়ে আমার বুক কাঁপতো—কেবলই মনে হতো, যদি ওটা ভেঙে পড়ে। এরকম একটা ভয়ঙ্কর জিনিস কেন যে রাস্তার পাশে তৈরী করেছে, ভেবে পেতাম না। ঐ জলের ট্যাংকটা দেখেই আমার মনে হয়েছিল শহরে নিশ্চয়ই বোকামানুষও আছে। 

ব্রক্ষ্ণপুত্রের পার দিয়ে আমরা হাঁটতাম। ব্রক্ষ্ণপুত্রের জলে স্নান করেই তো পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। অষ্টমী স্নানের সময় হাজার হাজার হিন্দু দূরদূরান্ত থেকে এসে পুণ্যস্নান করে এর জলে। নদীর তীর ধরে আমরা চলে যেতাম ভেটারনারি স্কুলে। পরে ঐ ভেটারনারি স্কুলের বিরাট এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তখন মাত্র কয়েকটি ভবন ছিল। ছিল খাসের বিরাট খামারবিপুল আকৃতির ষাঁড় এবং গাইগুলো দেখে আমার তো চোখ ছানাবড়া—এতো বড় গরুও হয় তাহলে? বাবা বলতেন, এক একটা গাই থেকে ২০-৩০ সের পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। কী আশ্চর্য কথা। এতোটা দুধ ওরা কোথায় যে লুকিয়ে রাখে।

ময়মনসিংহ তখন মেডিক্যাল কলেজ ছিল না, ছিল লিটন মেডিক্যাল স্কুল। জনৈক ইংরেজ সাহেবের নামে নাম। ওখানে একটা রুমে ছিল অনেকগুলো নরকংকাল -নারীকংকালও হতে পারে, কিন্তু আমরা সেই কংকালগুলি দেখলাম। মানুষের এই পরিণতি দেখে মানুষের জন্য আমার খুব মায়া হয়েছিল-ভয়ও পেয়েছিলাম খুব। বাবা আমার ভয় ভাঙিয়ে দিলেন: 'ছাত্ররা এসব কংকাল নিয়ে পড়াশোনা করে, মানবদেহ সম্পর্কে নানা তথ্য জানে। তবে হাতুড়ে ডাক্তারদের এসব না জানলেও চলে।' বাবা বলতেন: 'বড় হয়ে তুই যদি ডাক্তার হতে চাস, তাহলে এখানেই তোকে পড়তে হবে—এই নরকংকালগুলি তখন খুব কাজে লাগবে।' আমি মনে মনে বলতাম: 'না বাবা, আমি মরা মানুষেক কংকাল আর দেখতে চাই না—এবার চলো ফিরে যাই।' ফেরার সময় আমার বুকের রক্ত ভয়ে হিম হয়ে যেতো, মনে হতো কংকালগুলোও আমাদের পেছনে পেছনে আসছে। তখন ভূতে বিশ্বাস ছিল খুব। পরে ঐ লিটন মেডিক্যাল স্কুলটি চরপাড়ায় স্থাপিত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসে পরিণত হয়। সে অনেক পরের কথা। 

সপ্তাহখানেক ময়মনসিংহে কাটিয়ে, বৃত্তি-পরীক্ষাশেষে যখন গ্রামে ফিরে এলাম, তখন সঙ্গত কারণেই বাড়িতে এবং এলাকায় আমার কদর কিছুটা বৃদ্ধি পেলো। পরীক্ষার ফল বেরুনোর পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। বৃত্তি পরীক্ষার ফল মেট্রিকের মতো ঘটা করে বেরোয় না, কিন্তু নীরবে হলেও একসময় বেরোয়। বিলম্বে হলেও একদিন সেই ফল বেরুল। আমাদের স্কুলের রেক্টর সাহেবের মাধ্যমে আমরা তা জানতেও পারলাম। জানার পর মনে হলো, না জানলেই ভালো ছিল। ঐ পরীক্ষার ফলটা যদি কোনোদিনই না বেরুতো, কী ক্ষতিটা হতো এই পৃথিবীর? না, আমি বৃত্তি পাইনি—আমাদের চার রত্নের মধ্যে মতিই শুধু বৃত্তি পেয়েছে। শুধু বৃত্তি নয় পুরো জেলার মধ্যে মতি হয়েছে ফার্স্ট। এ এক অভাবিত সাফল্য। স্কুলের জন্য এক বিরল গৌরব। স্কুলে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। শিক্ষক-ছাত্র সবাই খুশি।  একজনের আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। শিক্ষক-ছাত্র সবাই খুশি। একজনের আনন্দের বন্যায় আমাদের চারজনের বেদনা খড়কুটোর মতো ভেসে গেলো। স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হলো। ছুটিটা মতির সাফল্যের আনন্দে না আমাদের ব্যর্থতার বেদনায়—তা ঠিক বোঝা গেল না।

Sun 17 Oct 2021 13:35 IST | নির্মলেন্দু গুণ