আমার ছেলেবেলা

dharabahik-memoir-of-poet-nirmalendu-gun-part-10

ছবি: সংগৃহীত

►স্মৃ | তি | ক | থা

 

| নির্মলেন্দু গুণ |


আষাঢ় মাসে রথযাত্রা আর চৈত্রমাসে বারুনীর মেলা বসতো বারহাট্টায়। বারহাট্টা কালীবাড়িতে তখন একটা প্রকাণ্ড কাঠের রথ ছিল। ঐ রথটিকে দেখেই আমি মহাভারতে বর্ণিত রথের কথা ভাবতাম। রথের দিনে বৃষ্টি ছিল অনিবার্য, বৃষ্টি না হসে সবাই অমঙ্গলের আশংকা করতো। বৃষ্টি অবশ্য হতোই—কম আর বেশি। বৃষ্টিকাদায় একাকার হয়ে যাওয়া রথের রশি ধরে টানার সময় শুরু হতো এক হুলুস্থুল কান্ড—কাদার ভিতরে বসে যাওয়া রথের চাকা নড়তেই চায় না, কিন্তু শতশত পালোয়ান-পুণ্যার্থীর ঐক্যবদ্ধ টানে রথ যখন নড়ে উঠতো, তখন কী আনন্দ! কর্দমের মধ্যে পুণ্যার্থীদের পদতলে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে আমি সেই রথের রশি ধরার সাহস পেতাম না।
চৈত্র-সংক্রান্তিতে বসতো বারুনীর মেলা। রথের মেলাটি শুরু হতো সকাল থেকে—চলতো রাত পর্যন্ত। রথের মেলায় বৃষ্টিকাদার জন্যই ভিড়টা কিছু কম হতো—বারুনীর মেলায় বৃষ্টিকাদার উৎপাত না থাকায় মহিলাদের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেতো, ছোটো ছেলেমেয়েরাও বারুনীতে দল বেঁধে আসতো। আমি আমার ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বারুনীর মেলায়  যেতাম। বোনদের মাটির পুতুল, হাতের চুড়ি, কানের দুল, চুল বাঁধার ফিতে কিনে দিতাম, ভাইদের জন্য বেলুন, টমটম আর রাবারের বল। আমার নিজের পছন্দ ছিল রঙ-বেরঙের ঘুড়ি আর বাঁশি। বাঁশি বাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণ রাধাকে পাগল করে দিয়েছিলেন—বাঁশি কেনার সময় ঐ গল্পটা আমার মনে পড়তো। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর কষাকষির কল-কোলাহলের সঙ্গে বেসুরো বাঁশির আওয়াজ মিলেমিশে এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হতো। তার উপরে ছিল বড়দের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের আর্ত চিৎকার। ঐ ছোট্ট মেলাটাকেই তখন মেলায় উন্মত্ত পুরো পৃথিবী বলে ভ্রম হতো। বড়দের প্রণাম করে পরবী হিসেবে পাওয়া পয়সা যেত ফুরিয়ে, কিন্তু আমাদের কিছুই প্রায় কেনা হতো না।  আগামী বছরের মেলায় কিনবো, এই ভেবে কিনতে না -পারা প্রিয় জিনিসগুলির উপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে, সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পথে পা বাড়াতাম। আমার পেছনে আমার ছোট্ট দুটো ভাই আর ছোট্ট দুটো বোন—অনেকগুলো ভাইবোন থাকার কী যে আনন্দ! হঠাৎ করেই মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যেতো আমার দাদামণি, মেলায় আসতে না পারা রূপালির কান্নাভেজা মুখ। 


বাবার চোখে ঘুম নেই—যাঁর পুত্রের পাকস্থলিতে ডজনখানেক স্টেনলেস ব্লেড রয়েছে তাঁর পক্ষে ...



একবার বারুনীর সময় আমি ভাইবোনদের যাদু দেখিয়ে কিছু উপরি পয়সা উপার্জন করেছিলাম। আমাদের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একজন যাদুকর এসেছিলেন, তিনি বিচিত্র সব যাদু দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করেন। ঐ যাদুকরের প্রদর্শিত দুটো যাদু আমি নিজে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিই। একটি ব্লেড ভক্ষণ, অন্যটি হচ্ছে জ্যান্ত কবুতর ভক্ষণ। মধ্যের বাড়ির এক জ্যেঠিমার ঘর থেকে একটি কবুতরের বাচ্চা যাদুকরের জন্য চুরি করে আনা হয়। যাদু প্রদর্শনের স্থান নির্ধারিত হয় পাশের বাড়ির যাদুদার ঘরে। যাদুদা ছিলেন আমাদের জ্যাঠতুতো ভাই, তার বড়ভাই মাধুদা ভারতে চলে গিয়েছিলেন। জ্যাঠামশাই এবং জ্যেঠিমা  পরলোকগত, একমাত্র বোন লীলাদিও বিবাহিত। যাদুদা একা। তার ঘরটা ছিল আমাদের দুষ্টুমির নিরাপদ আশ্রয়। আমার যাদু দেখার জন্য ভাইবোনেরা দুপুরের দিকে ঐ ঘরে জড়ো হয়। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে দেখা ঐ যাদুকরের অনুকরণে আমিও প্রস্তুতি শুরু করি। একজন আমার গায়ে মন্ত্রপড়া জল ছিটিয়ে দেয়, আমি কৃত্রিম রাক্ষস সেজে কবুতরটির জন্য হাত বাড়াই। একজন কবুতরের বাচ্চাটি আমার হাতে দূর থেকে ছুঁড়ে দেয়—এমন ভাব দেখাই যেন কাছে এলে আমি তাকেই খেয়ে ফেলব। কবুতরের পা-দুটো যে শক্ত করে বাঁধা হয় নি, তা আমার একেবারেই খেয়াল ছিল না। কবুতরটি ছিল নিতান্ত বেরসিক এবং নবীন যাদুকরের নিরীহ শিকার হতে অনিচ্ছুক— সে বুঝতে পারলো যে, তার সামনে সমূহ বিপদ। সবেমাত্র আমি তার মস্তক ছিন্ন করে রক্তপান করার উদ্দেশ্যে কবুতরটিকে মুখের কাছে নিয়েছি, অমনি সে পদযুগলে তার সমস্ত শক্তিকে সংহত করে আমার নাকেমুখে এমন খামচা লাগালো যে, আমি তার মস্তক ছিন্ন করলাম বটে কিন্তু একইসঙ্গে সেও আমার নাক এবং গালের চামড়ার কিয়দংশ নখের আঁচড়ে কেটে ফেলে। কবুতরের রক্তপান ও জ্যান্ত মাংস ভক্ষণের পরিবর্তে আমি তখন কবুতরটিকে রান্না করে খাওয়ার কথাই ভাবতে বাধ্য হই। আহত যাদুকরের পরিচর্যার তখন দর্শকদের ব্যস্ত হতে দেখা যায়। 

কিন্তু আমিও দমবার পাত্র নই। কবুতর ভক্ষণে ব্যর্থ হলেও ব্লেডভক্ষণে আমি অভাবিত সাফল্য দেখাতে সামর্থ্য হই। আমি চারপাঁচটা ব্লেড ভক্ষণ করি। ব্যাপারটি অল্পক্ষণের মধ্যে বাবার কানে পৌঁছে এবং তিনি আমাকে যাদুকরের ঘর থেকে গ্রেফতার করে বাড়িতে নিয়ে যান। আমাকে নিয়ে তখন তাঁর মহা দুশ্চিন্তা। আমার পাকস্থলি ভবিষ্যত নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রাত্যহিক প্রাতঃকৃত্যের প্রতি তাঁর উৎকন্ঠা বৃদ্ধি পায়। ঈশ্বর এই যাদুকরের সহায় ছিলেন—আমি রক্ষা পেয়ে যাই। কিন্তু বাবার চোখে ঘুম নেই—যাঁর পুত্রের পাকস্থলিতে ডজনখানেক স্টেনলেস ব্লেড রয়েছে তাঁর পক্ষে নিশ্চিন্ত থাকাটা সম্ভবও নয়। কবিরাজী বই পড়ে। বাবা তখন আমার জন্য একটি চমৎকার ঔষধ আবিষ্কার করেন। ঔষধ না বলে মহৌষধ বলাটাই শ্রেয়। প্রতিদিন সকালে উঠেই আমাকে খালি পেটে এক গ্লাস ষাঁড়ের মূত্র পান। করতে হবে। তাতে কিডনি, লিভার এবং পাকস্থলির দুর্ঘটনা দূর হবে। আমাদের তখন গেরস্থি ছিল—বৎসরভিত্তিক কাজের লোক রাখা হতো জমি চাষ করার জন্য। সেই গেরস্থিসূত্রে আমাদের গোয়ালে গরুর অভাব ছিল না। তাদের মধ্যে একটি ছিল চমৎকার নাদুসনুদুস ষাঁড়। স্থির হলো ঐ ষাঁড়ের সকালবেলার মূত্রটা বালতির মধ্যে সংগ্রহ করা হবে—সংগ্রহ করবে আমাদের কমলা খানবাহাদুর এবং তা পান করব আমি। ঘটনাটি যাতে জানাজানি না হয় সে জন্য বাবা সতর্কতা গ্রহণ করলেন—খানবাহাদুর এবং আমার ছোট ভাইবোনদের  বিশেষভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়। অতঃপর প্রায় পোয়ামাপের গ্লাসভর্তি ষাঁড়ের মূত্র আমি চোখনাক বন্ধ করে পান করতে শুরু করি। বাবার আবিষ্কৃত এই প্রাতঃপথ্যটি আমাকে প্রায় মাসখানেক পান করতে হয়েছিল। মূত্রপানের ব্যাপারটিকে শেষ পর্যন্ত অবশ্য গোপন রাখা সম্ভব হয়নি, ঔষধের আবিষ্কারক বাবা নিজেই তাঁর কবিরাজ বন্ধু  কাছে ঘটনাটি ব্যক্ত করেন। নারায়ণবাবুর ছেলে ছিল আমার ক্লাসমেট—তিনি তাঁর পুত্রকে ষাড়ের মূত্র পানে উৎসাহিত করতে গিয়েই সম্ভবত আমার কথা উল্লেখ করেন। পুলক পরদিন স্কুলে এসেই সে কথা ক্লাসময় রাষ্ট্র করে দেয়। ক্লাসের গন্ডি অতিক্রম করে প্রথমে স্কুলে এবং পরে স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে এই মুখরোচক সাংবাদটি সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন বাবার প্রতি রুষ্ট হলেও, পরে আমি বাবার দূরদৃষ্টির প্রশংসা করতে বাধ্য হই । 

 

Fri 8 Oct 2021 18:36 IST | নির্মলেন্দু গুণ