ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ২৩ |

kpg--illastration-td-sarkar.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার

জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর  ধারাবাহিক কথামালা...

 

| পর্ব ২৩ |

আশাবরী | মুখোমুখি

-‘আমার গাড়িটা সার্ভিসিং দিয়েছি তোমারটা নিয়ে নাও।’ চেয়ারের পেছনে ঝুলানো ব্লেজারটা তুলে নিয়ে হাতে ঝুলিয়ে অভিকে বললেন অমিতাভ। 
-‘ঠিক আছে স্যার।’ বলে উঠে পড়ল অভি।
আজ আশাবরীর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে মিটিং। অমিতাভদা চাইছেন অন্তত মোটামুটিভাবে সব টার্মস কন্ডিশনগুলো ফিক্স করে নিতে। কন্ট্রাক্ট যদি সই হয়ে যায় তবে আরও ভালো। কিন্তু প্রথম দেখার দিনই সেটা হবে বলে মনে হয় না।
যখন কেবিনে ডেকে অভিকে এত বড় একটা অ্যাকাউন্টের দায়িত্ব দিয়েছিলেন  অমিতাভদা, অভির প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। অনেক বেশি অভিজ্ঞতা এবং সিনিওরিটি নিয়ে বসে আছে অনেকে অফিসে। বিশেষ করে অরিন্দম। এত বড় একটা অ্যাকাউন্ট ওকেই দেওয়া হবে ভেবেছিল অভি। আশা ছিল সঙ্গে সাহায্য করার দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। অমিতাভদা ডেকে পাঠানোর পর কেবিনে ঢুকে অরিন্দমকে দেখে ধারনাটা আরও জোরাল হয়েছিল অভির। কিন্তু অবাক হয়েছিল অমিতাভদার প্রথম কথায়ই। 
-‘অভি, আশাবরির একাউন্টের সব খুঁটিনাটিগুলো অরিন্দমের কাছ থেকে বুঝে নাও। ওটা তুমি হ্যান্ডেল করবে। কাল মিটিং আছে ওদের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে। তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’ এক মুহূর্তের জন্য অরিন্দমের দিকে তাকালো অভি। 
-‘আচ্ছা স্যার।’ খুশির চেয়ে ওর অবাক হওয়াটা বেশি সেটা কি বোঝা যাচ্ছে? অন্তত অরিন্দমের মুখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। হতাশা বা রাগের ভাব নেই মুখে বিন্দুমাত্রও। কিন্তু এটা তো ওরই পাওয়া উচিত ছিল। যাকগে, ভেবে লাভ নেই। সুযোগ নষ্ট করার মানে হয় না। বসল না অভি, অরিন্দমের দিকে ফিরে বলল। -‘তোমার ওখানে বসবে? না কনফারেন্স রুমে?’
-‘তোমার যা ইচ্ছে।‘ অরিন্দমের ভাবলেশহীন কণ্ঠস্বর।
-‘চলো তাহলে কনফারেন্স রুমে বসা যাক, পাঁচ মিনিটে ওখানে দেখা হচ্ছে। কেমন?’
-‘না বোসো একটু।’ বাধা দিলেন অমিতাভদা।
-‘বলুন স্যার।’ অরিন্দমের পাশের চেয়ারটায় বসে বলল অভি। 
-‘শোনো এই প্রজেক্টের কয়েকটা পয়েন্ট তোমার জানা দরকার।’ বলে প্রজেক্টের বিবরণ আর নিজের পরিকল্পনা ভালো করে বুঝিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন অমিতাভদা। 

আলোচনার পর অরিন্দমের সঙ্গে বসে আগের বারের সব খুঁটিনাটি বুঝে নিয়েছিল অভি। দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল এতে। এক প্রজেক্টটা অভি পেলেও,অরিন্দমের সহযোগিতায় কোনও খাদ নেই । দুই, আগের বারের কন্ট্রাক্টের সঙ্গে এবারের মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি।
গতবার কেবল বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব ওদের ছিল। কিন্তু এবার এটা কার্যত এক জয়েন্ট ভেঞ্চার। 


♦♦♦


আশাবরী বিল্ডিং এর নিচে গাড়ীটা থামালো অভি। অমিতাভদা বললেন –‘বেসমেন্টে পার্ক করে এসো। আমি ওপরে যাচ্ছি। দেরী হয়ে যাবে নাহলে। তিনটে প্রায় বেজে গেছে।’
অমিতাভদার সময়ানুবর্তীতার ব্যাপারে অবসেশন সবার জানা। অভি মাথা নেড়ে বলল – ‘ঠিক আছে স্যার।’
গাড়িটা পার্ক করে লিফটে উঠতে উঠতে লীনাকে মেসেজ করল অভি। ‘কোথায় আছো? আমি পৌঁছে গেছি।’ লীনার সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করার কথা ভেবে ভাল লাগছিল। কাল রাতেই দুজনে এটা নিয়ে কথা বলেছে।
উত্তর এলো ‘অপেক্ষা করছি। নতুন অনুভূতি।’ সঙ্গে স্মাইলি। 
‘ঠিক বলেছ। এক সঙ্গে কাজ করাটা দারুণ হবে – তাই না?’
‘এক্সাক্টলি।’
লিফটের দরজা খুলে সাবধানে হোঁচট খাওয়া সামলে আশাবরীর অফিসের দিকে এগিয়ে গেল অভি।

♦♦♦


ম্যানেজিং ডিরেক্টরের অপেক্ষায় কনফারেন্স রুমে বসে ছিলেন অমিতাভ। সামনে দাঁড়িয়ে অরিজিত।
 - ‘এম ডি আসছেন। ততক্ষণ কফি খান।’ বলে বেড়িয়ে গেলেন অরিজিত। একটু পরেই কফি দিয়ে গেল একজন। 
কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলেন অমিতাভ। এম ডি তাঁর মেয়ের বয়েসি – অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটা চিন্তা মাথায় এলো। আজ যদি লীনার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? একই সঙ্গে আশা আর দ্বিধার দ্বন্দ্বে বিচলিত হয়ে গেল মন। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন অমিতাভ। এখানে কাজ করতে এসেছেন। আর একজন কনসাল্টেন্টকে এই মিটিঙে ডাকার কোনও কারণ নেই। লীনার সঙ্গে দেখা হবেই কিন্তু আজ নয়। এই পরিবেশে নয়। অমিতাভ প্রস্তুত নন। কোনদিন কি পারবেন প্রস্তুত হতে?

♦♦♦


এম ডির কেবিনে বসে অভিকে মেসেজটা পাঠিয়ে হাত বাড়িয়ে সামনে রাখা ধূমায়িত দার্জিলিং চায়ের কাপটা তুলে একটা চুমুক দিল লীনা। বুঝতে পারলো পেছনে কাঁচের দরজা ঠেলে কেউ ঢুকছে। মুখের ভেতর দার্জিলিং চায়ের সুস্বাদটা অনুভব করতে করতে ফিরে তাকাল লীনা। অরিজিত বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে মিসেস গুপ্তা এসে ঢুকেছেন। 
ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেকে পাঠিয়েছেন বলে খুশি বা ত্রস্ত হবার দলে লীনা নয়। নিজের কর্ম ক্ষমতার ওপর তার অগাধ ভরসা। এর আগে মিসেস গুপ্তার সঙ্গে তার কয়েকবার দেখা হয়েছে। সেগুলো সবই ছিল লৌকিকতার আদান প্রদান। প্রধানত অরিজিত বিশ্বাসই লীনার যোগাযোগ বিন্দু। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে পরিস্থিতি অন্য রকম।
এম ডির চোখে চোখ পড়তে শালীনতা বোধে উঠে দাঁড়ালো লীনা। হাতের ইশারায় লীনাকে বসতে বলে টেবিলের উলটো দিকে নিজের চেয়ারের দিকে যেতে যেতে বললেন মিসেস গুপ্তা –‘আরে বোসো বোসো। আমার কলীগেরা আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালে আমার নিজেকে কেমন যেন বুরজোয়া মনে হয়। প্লীজ সীট।’ 
ভাবনাটা যদি জেনুইন হয় তবে এর সঙ্গে কাজ করতে ভাল লাগবে। মনে মনে ভাবল লীনা।
টেবিলের ওপাশে নিজের হাই ব্যাক চেয়ারে বসতে বসতে বলতে লাগলেন এম ডি। 
-‘তোমার সঙ্গে একটু লম্বা আলোচনা করতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু আজ অস্বাভাবিক ট্রাফিক দেরি করে আমার সময়টা খেয়ে নিয়েছে। মিটিঙটা তিনটেয় সেটা তো জান আর আমি দেরি করা পছন্দ করি না। সেটা আনপ্রফেশনাল। তাই সংক্ষেপে বলছি। তুমি আমাদের সঙ্গে ফুল টাইম যোগ দেবে কিনা সেটা এখনো জানাও নি। আমি আশা করছি তুমি আসবে। কিন্তু যদি তা না হয় সেক্ষেত্রে এই প্রজেক্টে তোমার পুরোপুরি ইনভল্ভমেন্টের প্রতিশ্রুতি চাই আমি। কার্যত আশাবরীর তুমি এখন ডিজাইনের হেড। প্রাথমিক ভাবে আমি চাই তুমি আমাদের নতুন পার্টনারদের সঙ্গে মিলে এই প্রজেক্টটা আগে বাড়াবে। আমি তোমার কাজ দেখেছি - ব্রিলিয়ান্ট। তা ছাড়া গত বছরের ঝামেলার সময় তোমার ইনভলভমেন্টও জানি। নিজের কাজের জন্যে ইউ ডু গো দ্য এক্সট্রা মাইল। আমার তেমন লোকই চাই এটা সফল করার জন্য। আর ইউ রেডি টু কমিট দ্যাট?’ 
-‘ইয়েস আই এম।’ 
সিদ্ধান্ত লীনা কাল রাতেই নিয়ে নিয়েছিল। বিনা চেষ্টায় সুযোগ এসেছে। দেখাই যাক না কোথায় দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে অভি তো একটা ফ্যাক্টর আছেই। সিদ্ধান্তটা পেশাদারি কতটা - সেটা ভাবছে না আপাতত সে, হারানোর তো কিছু নেই।
- ‘এক্সেলেন্ট। চল যাওয়া যাক ওরা অপেক্ষা করছেন।’ বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন এম, ডী। 

♦♦♦


আশাবরীর কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে ঢুকে অমিতাভদার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল অভি। বেশ এক্সাইটেড লাগছে। ওর প্রথম বড় প্রজেক্ট এই কোম্পানিতে। এটাও খেয়াল করেছে যে, অমিতাভদা ওকে একা পাঠান নি। নিজে এসেছেন তার মানে ওকে গড়ে পিটে নেবার সুযোগটা তৈরি করছেন। এটাই তো চাই ওর। নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ, যাচাই করারও।
এবার কাঁচের দরজা খুলে ভেতরে এলেন অরিজিত বিশ্বাস। -‘ম্যাডাম আসছেন।’ বলে অভির দিকে চেয়ে ঘাড় নাড়লেন। অভি মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর দিল। -‘আপনাদের প্রপোজালটা নিয়ে আলোচনা করতে চান। মোটামুটি সব ঠিকই আছে শুধু কয়েকটা মাইনর বিষয়ে কথা বলার আছে – আজই ফাইনাল হয়ে যাবে।’

♦♦♦


ভিনাইল টাইলিং ফ্লোরের ওপর দিয়ে ব্রায়ান অ্যাটুডের ডিজাইনার জুতোর পাশাপাশি হেঁটে আসছিল একজোড়া খাদিমের স্নীকারস্‌। দুজোড়া পায়ের বাইরের মোড়কের পণ্যমুল্যের যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, বক্তব্যে আর আত্ম বিশ্বাসে কেউ পিছিয়ে নেই। “সাহসই স্বাধীনতার ভিত্তি।” এই আপ্ত বাক্যের প্রেরণা ব্রায়ান্ কোথায় পেয়েছিলেন লীনার জানা নেই কিন্তু ওর কথাটা খুব পছন্দ। তবে এটাও সত্যি এটুডের জুতো কেনার ক্ষমতা থাকলেও ইচ্ছা কখনোই হয়নি. জিন্স আর টি-শার্ট এর সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানীর জুতো পায়ে ঘুরে বেড়াতে ওর কোন রকম হীনমন্যতা হয় না।
ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে সেলফ এস্টিমের উপদেশ শুনেছে। এখন বোঝে, জীবনে আত্মবিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেটা কতটা জরুরী।
কিন্তু কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে এমডির সঙ্গে ঢুকতে ঢুকতে - অভির পাশে যে ভদ্রলোক পিছন করে বসেছিলেন তাকে চিনতে না পারলেও কেন যেন ভেতর থেকে একটা আওয়াজ হঠাৎ লীনাকে অস্থির করে দিল।

আর লোকটি যখন দাঁড়িয়ে ওদের দিকে ফিরলেন... লীনার মনে হচ্ছিল কয়েক মুহুর্তের জন্য সময় থেমে গেছে।
-‘ঐতো এসে গেছেন।’ বলে উঠে দাঁড়ালেন অরিজিৎ। উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে অভি এবং অমিতাভ ফিরতেই একইসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল চারজন মানুষ। নিয়তির একি পরিহাস!!!
নিশ্চুপ পিতা পুত্রীর একে অন্যের দিকে অপলকে চেয়ে থাকা। এক জনের চোখে জমে থাকা অপত্য স্নেহের প্লাবন আর অন্যজনের দৃষ্টিতে না চাইতেও উপচে পড়া অভিযোগ আর কান্না মেশানো অভিমান।
নিয়তির অবোধ্য পরিহাসের এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা চারটি মানুষের জীবনের এক অদ্ভুত মুহূর্তের আগমনের সংকেত এদের কারো মনে ঘুণাক্ষরেও ছিলনা।

দুজনের কেউ শুনতে পেলেন না অভির অস্ফুট স্বরে বলা -‘রিয়া!!!’
না তাদের কানে এলো আরোরিয়া কারিওয়াল গুপ্তা ওরফে অভির রিয়ার চাপা আর্তস্বর -‘অভি!!!’ 
অরিজিৎ বিশ্বাসের হাসিমুখে বলে যাওয়া পরিচিতি বিবরণ তখন চারজনের কেউ শুনতে পাচ্ছিল না। থেমে থাকা সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই যেন মন্থর গতিতে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন অমিতাভ। একইসঙ্গে  অভির হাত থেকে খসে পড়া ফাইলের ভেতরকার কাগজগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝের উপর। দরজার পাল্লায় হাত রেখে নিজেকে সামলাচ্ছিল লীনা। একরাশ অনুভূতির ঝড় বোধবুদ্ধি নিশ্চল করে দিয়েছে তার। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা রিয়া সবার আগে নিজেকে সামলে নিল।

                                                                                                                                                          ক্রমশ

 

Sun 17 Oct 2021 15:37 IST | দেবপ্রিয় চক্রবর্তী