ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ২২ |

dharabahik-koekti-premer-golpo-part-22

চিত্র: দেব সরকার

জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর  ধারাবাহিক কথামালা...

 

| পর্ব ২২ |

আশঙ্কা ও আমন্ত্রণ

অরুনের কলটা কেটে ফোনটা পাশের টেবিলে রেখে বিছানা থেকে উঠে পড়ল জয়িতা। জীবনের অবিচারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখে যাওয়া তার মনটাকে নিয়তি আবার এক অবাঞ্ছিত দোটানায় ফেলে দিয়েছে। এটা কি সত্যিই অবাঞ্ছিত? হয়তো নয়। কিন্তু অপ্রত্যাশিত তো বটেই। 

জয়িতার বাবা জয়ন্ত সরকার হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠিত উকিল। জয়িতার বিয়েটা ভেঙে যাবার পর নিজের মেয়ের কাছে একদিন ভেঙে পড়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। বন্ধুর ছেলেকে যোগ্য পাত্র ভেবে, কোন খোঁজখবর না নিয়ে বিয়েটা দিয়ে দেয়ার ফলে জয়িতার জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। সেটার জন্য নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবেন না বলেছিলেন। 

জয়িতা নিজের দুঃখ চেপে বাবাকে বুঝিয়ে ছিল যে, ওর আর কোন কষ্ট নেই। কেরিয়ার এবং স্বাধীন জীবন নিয়ে সুখে আছে ও। বাবাকে এভাবে ভেঙে পড়তে আগে কখনো দেখেনি সে। এরপর থেকে মা-বাবার সামনে যাতে নিজের অতৃপ্তি বা শূন্যতা বেরিয়ে না আসে, সে ব্যাপারে কড়া নজর তার। আজ তাই নিজের সমস্যাটা নিয়ে তাদের কাছে যেতে দ্বিধা হচ্ছে।
অনেক ভেবে অভিকে ফোন করল জয়িতা। অভির ফোন এনগেজড্। কলটা কেটে অপেক্ষা করছিল - মিনিট খানেকের মধ্যে অভির কল এল।
-কি ব্যাপার? এত রাতে জেগে আছিস্‌ যে। ওটা তো আমার অভ্যেস। সব ঠিক আছে তো? - প্রশ্ন করল অভি।
-কিসের ঠিক আছে! সবই তো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তুই এত রাতে কার সঙ্গে কথা বলছিলি? উত্তরটা অবশ্য আন্দাজ করছিল জয়িতা, সেটাই ঠিক হলো।
-লীনার সঙ্গে। কাল আশাবরীর এমডির সঙ্গে মিটিং। আমি আর অমিতাভদা যাচ্ছি। একটা খুব ইন্টারেস্টিং কথা জানতে পারলাম। 
-কি? নিজের অস্থিরতার চেপে অভির উৎসাহে ভরা কথা শুনছিল জয়িতা।
-আশাবরীর ডিজাইন হেড কে ভাবতে পারিস?
-কে? কিছু ভাবার মত মনের অবস্থা নেই জয়িতার।
-লীনা। কি অদ্ভুত ব্যাপার বলতো।
-তাই নাকি? ভালই তো হল।
-হ্যাঁ। একসাথে কাজ করবো। দারুন হবে, তাই না? 
অভির খুশিটায় বাগড়া দিতে মন চাইছিল না জয়িতার। কিন্তু আর কেউ নেই এ ব্যাপারে পরামর্শ করার মত তার কাছে। তাই বলে ফেলল –‘অভি, আমি একটা কথা আলোচনা করতে চাই তোর সঙ্গে।
জয়িতার গলার স্বরে অভি বুঝলো কিছু একটা সমস্যা। নিজের কথা মুলতবি রেখে প্রশ্ন করল, -‘কি হয়েছে বল তো? তুই খুব ডাউন মনে হচ্ছে।’
-অরুণ ফোন করেছিল। ওর মা আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
-সে তো ভালো খবর? প্রতিমা কাকিমা দারুন ভালো মানুষ। তোর ভাল লাগবে। অভি বলল।
-তুই চিনিস নিশ্চয়ই ওর মা বাবাকে ভালো করে? প্রশ্ন করল জয়িতা।
-অবশ্যই। অরুণের বাবা বিমান কাকু আমার বাবার বন্ধু। উনি একটু রাশভারী লোক। কিন্তু মানুষ ভালো। প্রতিমা কাকিমা কিন্তু একদম নরম মনের। আমাকে খুব ভালোবাসেন। তুই নিশ্চিন্তে যা।
-নিশ্চিন্তে কি বলছিস অভি? বুঝতে পারছিস না? ওনার সঙ্গে দেখা করার মানে এমন এক দিকে পা বাড়ানো যা আর আমার পথ নয়।
-বাজে কথা বলিস না। ওটাই তোর পথ এখন। ডেস্টিনি একই সঙ্গে আমাদের দুজনকে নতুন পথ খুলে দিয়েছে মনে হচ্ছে। আমি এগোচ্ছি, তুইও এগো।
-কিন্তু এটার ফল কি হবে? এই সম্পর্ক বাড়ানোর পর যদি আবার আঘাত পেতে হয়? 
-অরুণের কাছ থেকে আঘাত? কি বলছিস? প্রশ্নই ওঠে না। আমি ওকে ভালো করে চিনি। ও হাত ছেড়ে দেবার মানুষই নয়।
-অরুণ হয়তো নয়। কিন্তু ওর মা বাবা, পরিবার? তাদের অমত হলেও তো এটার ফল ভাল হবে না। 
মনের ভয়টা কাটছিল না জয়িতার। এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল অভি, -‘শোন তুই তো কিছু লুকোস্‌নি। অরুণ সব জেনেই তোকে বিয়ে করতে চেয়েছে। ও কোনও হালকা রোমিও নয়। আমি জানি। আর আমি শিওর প্রতিমা কাকিমাকে ও সব বলেছে।
-হ্যাঁ বলেছে। আমি জানি বলেছে। 
-তাহলে? এরপর উনি তোর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন সে তো ভালো কথা। যা কাল দেখা করে নিজের ভয়টা বল। নিজের ফিলিংসটা অনেস্টলি জানা। তারপর দেখ। এতো কেন ভাবছিস।
-কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।
-যা বললাম তাই কর। আমার কথা শোন, সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন ঘুমো।
একটু অস্থিরতা কমলেও জয়িতা ভরসা পাচ্ছিল না ততটা।
-হ্যাঁ ঠিক আছে কাল অফিসে কথা হবে। দেখি ঘুম আসে কি না।
ঘুম সে রাতে আর হয়নি খুব একটা তার। সকালে অল্প ঘুমিয়ে পড়ায় উঠতে দেরি হয়ে গেল। সাধারণত খুব ভোরে ওঠে সে। সূর্য ওঠার আগে। নিস্তব্ধ শেষ রাতের একাকিত্ব তার ভালো লাগে। সেটা হল না আজ। তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে গেল অফিসের জন্য।

♦♦♦

বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে একটা অটো নিয়ে এসে পৌঁছলো অভি আর অরুণের ফ্ল্যাটের নীচে। আসার পথে, খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে - অরুণের পছন্দসই রসমালাই আর কিছু ফুল নিয়ে নিল। অভিদের বাড়িতে আগে একবার এসেছে তাই চিনতে অসুবিধা হলো না। 

লিফটে উঠতে উঠতে হৃদস্পন্দনের বেড়ে যাওয়াটা, কতটা অরুণের সঙ্গে দেখা হবে সেই খুশিতে, আর কতটা এই দেখা হবার ভয়ে, সেটা নিশ্চিত ছিল না সে। কিন্তু কলিং বেল টিপতে টিপতে নিজেকে সামলে নিল। বাইরে থেকে যেন ভেতরের অস্থিরতা বোঝা না যায়।

দরজা খুলে যদি তাকে দেখতে পেয়ে হাসিমুখে বললেন প্রতিমা দেবী –‘এসো, এসো। তোমারই অপেক্ষা করছিলাম।’
প্রতিমা দেবীর সাদর আপ্যায়নটাতে এমন কিছু ছিল, যাতে জয়িতার মনের অস্থিরতা অনেকটা কেটে গেল। কিছু না ভেবে, নিচু হয়ে তাকে প্রনাম করে ফেলল সে। 
-‘আরে থাক থাক। বেঁচে থাক মা সুখী হও।’ মাথায় হাত রেখে বললেন প্রতিমা।
-‘অফিস থেকে আসছ তো? আমি লুচি ভাজাছি। চা খাবে তো?’ ফুলগুলো আর মিষ্টির প্যাকেটটা জয়িতার হাত থেকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন প্রতিমা।
-‘শুধু চা হলেই হবে। খাবার টাবার দরকার নেই।’ বিব্রত হয়ে বলল জয়িতা।
-‘তা কি করে হয়? খিদে পেয়েছে তো নিশ্চয়ই। হাত মুখটা ধুয়ে নাও। অরুণও তোমার অপেক্ষা করছে।’ জয়িতার আপত্তি উড়িয়ে দিলেন প্রতিমা।
বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুতে ধুতে জয়িতা বুঝল ওর নার্ভাসনেস অরুণের মার আন্তরিকতায় অনেকটাই কেটে গেছে।

♦♦♦

ঘন্টা দুয়েক পর অরুণের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে অটোয় উঠতে উঠতে জয়িতা অনুভব করলো ওর মনের অস্থিরতার মেঘ কেটে গিয়ে আশার আলো ফুটেছে। তবু বিনা দোষে জীবনের কাছে পাওয়া শাস্তির ভারে নিষ্পেষিত হওয়া মনের অশুভের আশঙ্কা তাকে নিজের এই হঠাৎ পাওয়া সৌভাগ্যকে গ্রহণ করতে আটকাচ্ছিল। 
অরুণের বাবা বাড়ি ছিলেন না। অরুণের কাছে জেনেছিল জয়িতা - তার সঙ্গে নির্বিঘ্নে কথা বলার জন্য প্রতিমা ছুতো করে স্বামীকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জয়িতার সম্পর্কে সব জেনে নিয়েছেন তিনি। জয়িতাও কিছু না লুকিয়ে নিজের জীবন, পরিবার, চাকরি, ভেঙে যাওয়া বিয়ে সব খুলে বলেছিল প্রতিমাকে। 
মন দিয়ে সব শুনে বলেছিলেন প্রতিমা, -‘শোনো মা যাই হয়েছে তোমার সঙ্গে, সেটাতে তোমার তো কোন দোষ নেই। তাহলে এর জন্য শাস্তি তুমি কেন পাবে? আমার জীবনে আমি সেরকম দুঃখ কখনো পাইনি। তাই তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারলেও অনুভব করতে পারব না। কিন্তু আমার কথা যদি শোনো তাহলে বলব কখনো ভগবানে বিশ্বাস হারিয়ো না। যদি যা চাও তা না পাও তাহলে জানবে আরো ভালো কিছু দেবার জন্যেই এটা তোমাকে উনি দিলেন না। 
এক কাজ কর আমাদের একটা সাবেকি বাড়ি আছে এলাহাবাদে। ওখানে আমার শাশুড়ি আর আমার দুই দেওর থাকেন সপরিবারে। প্রতি বছর পুজোর সময় আমরা ওখানে যাই। আমাদের পুরো পরিবারটা সেখানে জমায়েত হয়, এবারও হবে। অনেকে আসে, বন্ধুবান্ধবরাও। পুজো তো সামনেই। আমি বলি কি? এবার তুমিও চলে এসো। সবার সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবে। তোমারও তো দেখা উচিত কোন পরিবারে যেতে হচ্ছে তোমাকে।’
প্রতিমার এই প্রস্তাবে হতভম্ব হয়ে অরুণের দিকে চাইল জয়িতা। মুখ দেখে বুঝতে পারল ওই আমন্ত্রণটা অরুণের কাছেও অপ্রত্যাশিত। কি বলবে বুঝতে পারছিলো না সে।
তার বিভ্রান্তিতে বুঝতে পেরে প্রতিমা আশ্বস্ত করলেন, - ‘অত ভেবো না তো। চলে এসো। আমি আছি তো। আর দেখো ঠাকুর সব রাস্তা খুলে দেবেন। এখন তোমরা কথা বলো। অরুণের বাবাও এসে পড়বেন। আমি খাবারটা রেডি করি।’ বলে রান্নাঘরের চলে গিয়েছিলেন প্রতিমা।
অরুণ বলল, -‘না করো না জয়িতা। মা যখন আসতে বলেছেন, চলে এসো প্লীজ।’
-‘সেটা কি ঠিক হবে?’ ভয় কাটছিল না জয়িতার।
-‘কেন ঠিক হবে না? কি অসুবিধে?’
- ‘আমার যে ভয় হয় অরুণ।’
- ‘কিছু ভয় নেই। আমি বদলাবো না। শুধু তুমি আমার উপর ভরসা রাখো।’
-‘আচ্ছা ঠিক আছে। শোনো আমি আন্টিকে হেল্প করি লুচি ভাজতে। পরে কথা বলব।’ বলে উঠে রান্না ঘরে এলো জয়িতা। দেখল ময়দা মাখছেন প্রতিমা। বলল, -‘আমি লুচি গুলো বেলে দেই? আপনি ভেজে নিন আন্টি?’
-‘ আরে না। তোমরা গল্প কর না। আমার কোন অসুবিধা হবে না। ক’টা লুচি ভাজতে আর কি?’
- ‘আমার ভালো লাগবে হেল্প করতে।’ মৃদুস্বরে বলল জয়িতা।
-‘আচ্ছা এই নে।’ বলে কড়াইটা স্টোভে চাপাতে চাপাতে ময়দার থালাটা জয়িতার দিকে ঠেলে দিলেন প্রতিমা।
রান্না করা জয়িতার প্রিয় কাজ। লুচি ভাজা চলার মধ্যেই অরুনের বাবা এসে পড়লেন। ময়দা মাখা হাতে দরজা খুলে দিতে গিয়ে আর নিজেকে অরুণের বাড়িতে অপ্রস্তুত লাগছিল না জয়িতার। 
অরুণের প্রতি ভালোবাসার চেয়েও, প্রতিমার সঙ্গে কথা বলে কোথাও যেন একটা একটা নতুন আলোর আভা এসে পড়েছে তার নিভে যাওয়া আশার প্রদীপে।

ক্রমশ
 

 

Sat 9 Oct 2021 15:04 IST | দেবপ্রিয় চক্রবর্তী