ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ১৯ |

KPG-19A-illastration-D-sarkar.png

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 

জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর  ধারাবাহিক কথামালা...

 

সার্জারি ও প্রথম দেখা

| পর্ব ১৯ |

হাসপাতালে কাফেটেরিয়ার কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখল অভিজিৎ । দুপুর দু'টো । সবারই লাঞ্চ টাইম, তাই লোকজনও প্রচুর । একটু দূরে একটা টেবিলে বসে থাকা একটি মেয়েকে অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখছে । কারণও আছে দেখার । এই মেয়েটা সেই ধরনের সুন্দরী যে কোথাও এলে, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই একবার ঘুরে তাকাবে । পরনে একটা গাঢ় নীল রঙের লম্বা স্কার্ট, হাল্কা নীল রঙের ব্লাউজ, গলায় একটা সোনার হারে নীল পাথরের লকেট, ম্যাচিং কানের দুল । খোলা চুলের রাশি পিঠের ওপর নীল রংয়ের রিবনের হালকা ফাঁসে বন্দী । সাজের মধ্যে কোথাও কোনো চেষ্টা নেই জাঁকজমকের, বরং যা আছে তা হলো পরিপূরক রুচিশীলতা । যার ফলাফল সবার সপ্রশংস দৃষ্টিতেই ধরা পড়ছে ।
মেয়েটির অবশ্য সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, নিজের ফোনে মন দিয়ে কিছু পড়তে ব্যস্ত সে ।


♦–♦–♦

অপারেশনের পর অ্যানেস্থেসিয়ার ঘোর কাটানোর জন্য যখন অরুণকে পাশের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হল, তখনই অভিদের জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, সব ঠিক আছে । অভির সঙ্গে ছিল জয়িতা, আর অরুণের অফিসের আরেকজন সহকর্মী - অরুণেরই বন্ধু সমীর । উৎকণ্ঠা কেটে যেতে নিচের লাউঞ্জে নেমে এসেছিল অভি । ফোনটা সায়লেন্ট করা ছিল । এবার খুলে দেখল লীনার মেসেজ, লিখেছে, ‘মেসেজ পেলেই ফোন করো অপেক্ষা করছি ।’
নাম্বারটা ডায়াল করে কানে তুলতে তুলতে চোখ চলে গেল সারি সারি রাখা চেয়ারের দ্বিতীয় সারি থেকে একটা চোখ টেনে নেয়া সুন্দরী মেয়েকে উঠতে দেখে ।

হালকা হাসি মুখে মেয়েটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে । ওদিকে লীনার নম্বরটা রিং হচ্ছে । মেয়েটা চেয়ারের সারি থেকে এগিয়ে এলো তার দিকে । মুখের হাসিটা তখন আরও ছড়িয়েছে তার । এবার হাতের ফোনটা তুলে স্ক্রিনটা অভির দিকে ঘুরিয়ে ধরল মেয়েটা । ওর মুখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে ফোনটা দেখল অভি, সায়লেন্ট ফোনের পর্দায় কল আসছে । নাম পড়তে পারলো ... ‘অভি’ ।
নিজের কান থেকে ফোনটা আস্তে আস্তে নামিয়ে নিল অভি, কাটতে ভুলে গেল ।
মেয়েটাও দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে । কয়েক সেকেন্ড দুজনে হাসিমুখে চেয়ে রইল একে অন্যের দিকে । তারপর কিছু না ভেবেই দু’পা এগিয়ে এসে লীনাকে জড়িয়ে ধরল অভি । লীনা বাধা দিল না । দু’সেকেন্ড পর ওকে ছেড়ে দিয়ে অভি বলল, - ‘তোমার চুলের গন্ধটা খুব সুন্দর ।’ বলে নিজেই হকচকিয়ে গেল । এটা কি বললাম ?
নিঃশব্দ হাসিতে চোখ মুখ ভরে উঠেছে লীনার, বলল, -‘রিয়ালি ? অভি ? প্রথম দেখায় প্রথম কথা তুমি এটা বলবে সেটা কিন্তু স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না । বাট ইট্‌স ওকে, থ্যাঙ্ক ইউ ।’ হেসে ফেলল দুজনেই ।
–‘যা মনে হল, তাই বললাম ।’ সহজভাবেই বললো অভি । -‘চলো খিদে পেয়েছে ।’
–‘অরুণের কি অবস্থা ?’ দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল লীনা ।
–‘সব ঠিক আছে । অপারেশন হয়ে গেছে । চিন্তার কিছু নেই ।’
দুজনে পাশাপাশি দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে অভি অনুভব করল, একবারও মনে হচ্ছেনা লীনার সঙ্গে তার প্রথম বার দেখা হচ্ছে বরং মনে হচ্ছে বহুদিন না দেখার পর অনেক দিনের পুরনো কোনো বন্ধুকে আবার ফিরে পেয়েছে সে ।

♦–♦–♦


স্যান্ডউইচ এবং সালাডের দু প্লেট রাখা ট্রে এক হাতে আর অন্য হাতে খাবার জলের বোতল নিয়ে ধাক্কা বাঁচিয়ে  টেবিলে এসে পৌঁছুল অভি । ট্রেটা রেখে হাসিমুখে চেয়ার টেনে বসল । ফোনটা অফ করে, টেবিলের ওপর রেখে, মুখ তুলল লীনা । গভীর চোখে ঠোঁটের খুশির হাসিটা ছুঁয়ে আছে তারও ।
–‘লাঞ্চ ডেটটা যে হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ায় হবে সেটা কিন্তু একবারও ভাবিনি ।’ ঠোঁটের হাসিটা এবার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল লীনার । খুশিটা নিজের হাসিতে মিশে যেতে দিল অভি । বলল, -‘জন লেনন বলেছিল না ? “দেয়ারস নো হোয়ার ইউ ক্যান বী দ্যাট ইজন্ট হোয়ার ইউ আর মেন্ট টু বি।” আমরাও ঠিক সেখানেই যেখানে আমাদের হওয়ার কথা । আর আমার কোন অভিযোগ নেই । অরুণের অপারেশন ঠিকঠাক হয়ে গেছে । তুমি এসে গেছ । সবকিছু একদম পারফেক্ট ।’

KPG-19B-illastration-d-sarkar_0.png

-‘ঠিক বলেছ।’ অভির চোখে চোখ রেখে বলল লীনা, আর তখনই অভি বুঝতে পারল লীনা তার জন্য শুধু একজন বন্ধু নয় আরও বেশী কিছু ।

♦–♦–♦

 

লাঞ্চ থেকে ফিরে দুজনে লিফট থেকে বেরিয়ে অরুণের কেবিনের দিকে এগুচ্ছে এমন সময় অভির চোখে পড়ল কেবিন থেকে দরজা খুলে জয়িতা বেরিয়ে আসছে, চোখে জল ।
এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, - কি হলো ? সব ঠিক আছে ?’
নিজেকে সামলে জয়িতা বলল, ‘হ্যাঁ । তুই ভেতরে যা । আমি একটু পরে আসছি ।’ বলে ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পাশ কাটিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল । অভি লীনার দিকে তাকাতে লীনা কাঁধ ঝাঁকাল । দুজনে মিলে দরজা খুলে অরুণের কেবিনে ঢুকে পড়ল ।

ক্রমশ...

 

Sun 19 Sep 2021 21:20 IST | দেবপ্রিয় চক্রবর্তী