ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ১৩|

বেসিনের ওপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। হাতে ধরা ফোনটায় খেয়াল হল কলটা কাটা হয় নি

koekti-premer-golpo-dharabahik-illastration-deb-sarkar

অলঙ্করণ: দেব সরকার

জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তী র  ধারাবাহিক কথামালা...

 

| পর্ব ১৩ |

প্রশ্ন ও ওয়াশরুম

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর হঠাৎ মেসেজ এল। ফোন খুলে দেখল অভির মেসেজ।
‘এবার ফ্রি হলাম। তুমি ফ্রি হলে জানাও বা কল কর। অফিস থেকে বেরোচ্ছি। ক্লায়েন্টের কাছে যেতে হবে।’
  ফোনটা বন্ধ করে কাজ করতে গিয়ে বুঝল মন বসছে না। উঠে ডায়াল করতে করতে বাইরে রিসেপশনের সোফায় এসে বসল।
–‘হাই লীনা বলছি।’
–‘বল। এখন ফ্রি হলে?’ ওদিক থেকে অভির গলার স্বর শুনে মনের অস্থিরতাটা কমল একটু। 
–‘না কাজের মধ্যেই তোমার মেসেজ এল। তাই ফোন করছি।’
–‘সরি, ডিস্টার্ব করলাম?’
–‘হ্যাঁ করলেই তো। থ্যাঙ্ক ইউ।’ বলে হাসল লীনা।
অভিও হাসল। -‘বাঃ। দিলে তো কনফিউজ করে। ঠিক করলাম না ভুল সেটাই তো ক্লিয়ার হল না।’
–‘ভালই তো। আমারও অনেক কিছু ক্লিয়ার হচ্ছে না। তাই তো কাজ বন্ধ করে ফোন করছি।’ 
এবার গম্ভীর হল অভি, -‘কি ক্লিয়ার করতে চাও বল।’
–‘কিছু প্রশ্ন আছে। এখন কথা বলবে, না পরে?’
–‘এখনি। এমনিতেই অনেকক্ষণ ধরে তোমার প্রশ্নের অপেক্ষা করছি।’ বলল অভি।
–‘আচ্ছা তা হলে দুটো প্রশ্নের উত্তর দাও। এক, তোমার জীবনের ঐ চ্যাপ্টারটা তুমি কার কার সঙ্গে শেয়ার করেছ? দুই, আমার সঙ্গে শেয়ার করার ইচ্ছে হল কেন?’ দিদির সন্দেহটা পরিষ্কার করতে চাইছিল লীনা অভির কাছ থেকে। 
–‘রিসেন্টলি জয়িতাকে বলেছি। অরুণ আর আরও কয়েকজন বন্ধু জানে। কিন্তু এত ডিটেলে কেউ নয়। আর দু নম্বর প্রশ্নটার উত্তরটা সত্যি বলছি আমিও জানি না। তুমি আগ্রহ দেখালে... আমারও যেন অনেক দিনের জমে থাকা একটা ব্যথা বেড়িয়ে এল। সত্যি বলতে কি, আমিও জান তো - ওটা নিয়ে ভেবে আশ্চর্য হয়েছি। তোমাকে কত অনায়াসে সব বললাম। এর আগে কাউকে বলি নি, বলার ইচ্ছেও হয় নি, পরিস্থিতিও নয়, অদ্ভুত।’ 
–‘হুঁ।’ 
–‘কি হুঁ?’
–‘হুঁ, মানে আমারও অদ্ভুত লাগছে।’
একটু থেমে বলল অভিজিৎ। -‘তোমার কি এমন কিছু মনে হচ্ছে যা বলতে চাইছ না? আমি কিন্তু একদম সত্যিটাই বললাম তোমাকে।’
–‘না না আমারও বিশ্বাস করতে ভাল লাগছে যে, আমাদের বন্ধুত্বটা রিয়েল। আর তাই আমার সঙ্গে অনায়াসে শেয়ার করেছ তুমি।’
–‘তোমার কথা জানি না। কিন্তু সত্যি বলছি আমার জন্য কিন্তু এই দুদিনের সম্পর্কটা একদম রিয়েল। দুদিনের মনেই হচ্ছে না। মনে হচ্ছে অনেক দিনের।’  
ঠাট্টা করতে গিয়েও করল না লীনা, ইচ্ছে হল না। কারণ অভির কথার মধ্যে একটা সততা অনুভব করছিল সে। তাই হেসে না উড়িয়ে দিয়ে প্রসঙ্গটা বদলাল। 
–‘আজ কি প্রোগ্রাম... অফিসের পর?’
–‘আপাতত কিছু নেই। বাড়ি ফিরে তোমার সঙ্গেই আড্ডা দেব ভেবেছিলাম যদি তুমি খালি থাক।’
উত্তরটা দেবার আগেই কাঁচের দরজা দিয়ে চোখে পড়ল লিফট থেকে অপ্রত্যাশিত একজন বেরোচ্ছেন আর সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় সোফা থেকে উঠে পড়ল লীনা। যিনি আসছিলেন তিনি দেখার আগেই প্রায় দৌড়ে ভেতরে ঢুকে এল সে। তার পর সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। 
বেসিনের ওপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। হাতে ধরা ফোনটায় খেয়াল হল কলটা কাটা হয় নি। কাঁপা হাতে ফোনটা কানে তুলে বলল, ‘হ্যালো।’
ওদিক থেকে অভির গলার স্বর একটু নিজের মধ্যে ফিরিয়ে আনল তাকে। 
–‘কি হল বল তো? কথা বলছিলে না কেন? আর গলা হঠাৎ এরকম কেন? শরীর ঠিক আছে?’
–‘অভি... আমি... পরে কথা বলছি। কেমন?’ কোন রকমে বলল লীনা।
অভি কলটা কাটতে দিল না তাকে। 
–‘এক মিনিট লীনা, প্লীজ, ফোনটা কেটো না।  কি হয়েছে বল, আই এম ওয়ারিড। তোমার গলা অদ্ভুত লাগছে। তুমি ঠিক আছ? শরীর খারাপ হয় নি তো? হঠাৎ কি হল সেটা শুধু বল প্লীজ।’
অভির কণ্ঠস্বরের উৎকণ্ঠটা ভেতরের জমে থাকা রাগ, দুঃখ, ঘেন্নার অনুভূতি গুলোকে একসঙ্গে বাইরে নিয়ে এল। ফোনটা কানে ধরেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল লীনা। ভাঙ্গা গলায় বলল -‘অভি, স্যরি। আমি ভীষণ আপসেট হয়ে গেছি।’
অভির উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল। বোঝাই যাচ্ছে গলার স্বরে। -‘লীনা... প্লীজ, আমার এখন টেনশন হচ্ছে। আর ইউ সেফ? কোন বিপদে পড়েছ কি? কোথায় আছো বল। আমি শরৎ বোস রোডে। পনের মিনিতে ডালহৌসি পৌঁছুতে পারি। বল কি হয়েছে।’

KPG-13-A-illastration-td-sarkar.png

ভীষণ কষ্টের মধ্যেও অভির কথাটা একটা ভাল লাগায় ভরিয়ে দিল লীনাকে। অনেক দিনের একাকীত্বের মধ্যে মনে হল কেউ এসে পড়েছে, আর সে একা নয়। বলল, -‘না অভি কোনও বিপদে নেই। তোমাকে আসতে হবে না। থ্যাংকস। আসলে আমি যে অফিসে আছি সেখানে আমার জীবনের সবচেয়ে ঘেন্নার লোকটা এসে পড়েছে। আমি ওয়াশ রুমে লুকিয়ে আছি। কি করব বুঝতে পারছি না... তুমি কথা বল। ভীষণ অসহায় লাগছে। আমি ওর সামনে পড়তে চাই না।’ 
উৎকণ্ঠা ভরা গলায় এখন একটা অন্য নরম ভাব অভির। -‘লীনা ফোন কাটবে না। আমি আছি লাইনে যতক্ষণ চাও। আর লোকটা কে? তুমি কি তোমার বাবার কথা বলছ?’
–‘হ্যাঁ অভি, আর কাউকে তো এতটা ঘেন্না করি না আমি।’ কান্নার বেগ সামলাতে সামলাতে ভাঙ্গা গলায় বলল লীনা। একই রকম নরম গলায় বলল অভি। -‘লীনা, মন দিয়ে শোনো তোমার যদি ইচ্ছে না হয় তাহলে সামনে যেও না। মুখে চোখে জল দাও, আর কথা বল আমার সাথে। ওখান থেকে বেরিয়ে গেলে কে আটকাবে তোমাকে? উনি ওখানে কেন এসেছেন মনে হয় তোমার?’ 
–‘জানি না হতে পারে কারুর সঙ্গে দেখা করতে, হতে পারে ব্যবসা সঙ্ক্রান্ত ব্যাপারে। উনিও তো মিডিয়াতেই। অভি আমি বুঝতে পারছি না কি করব। আমাদের ছেড়ে যাবার পর আর কখনো দেখাই হয় নি ওনার সাথে। মুম্বই চলে গিয়েছিলেন। এখানে ফিরেছেন কবে তাও জানি না।’
একটু চুপ করে থেকে অভি বলল। - ‘একটা প্রশ্ন করব?’ 
–‘কি?’
–‘ তুমি ভালবাস তোমার বাবাকে?’
–‘না ঘেন্না করি।’
–‘কিছু মনে করো না লীনা আমার ধারণা সেটা সত্যি নয় অন্তত একমাত্র সত্যি নয়। যাকগে, এই ব্যাপারে পরে কথা বলব। এখন এটা বল, তুমি যদি অফিস থেকে বেরোতে চাও তবে সামনা সামনি হবার কতটা সম্ভাবনা?’ 
–‘জানি না, আমার মাথা কাজ করছে না।’
–‘শোনো একটা কাজ কর। এমন কাউকে, যাকে বলা যায়... ঐ অফিসে, তাকে ফোন কর, নাহলে রিসেপশনে ফোন কর। জিজ্ঞেস কর উনি কোথায় আছেন। তারপর ভেবে দেখ সামনাসামনি না পড়ে বেড়িয়ে আসতে পারবে কিনা। সিনিয়র কারোর কেবিনে যদি ঢুকে পরে থাকেন তাহলে তো এমনিতেই বেড়িয়ে আসতে পারবে। আর প্লীজ, ঐ ফোনটার পরই আবার আমাকে ফোন করবে, কেমন? মনে রেখো তোমার ভয় পাবার কিচ্ছু নেই। যেভাবে বললাম চেষ্টা কর তারপর জানাও আমাকে, বুঝেছ?’
–‘না অভি। তুমি প্লীজ ফোন ছেড়ো না। আমি একটু এখানেই থাকতে চাই। সামলে নিই নিজেকে তারপর তুমি যেমন বলবে সেটাই করব।’
আবার সেই নরম গলা অভির। -‘আরে আমি তো আছিই। ফোনেও আছি আর যদি বল ওখানেও পৌঁছে যাব। বল, আসব?’
লীনার ইচ্ছে হচ্ছিল বলে, হ্যাঁ চলে এস। একজন বন্ধুর কাছে অঝোরে কাঁদতে পারলে যদি ব্যথাটা কমে একটু। কিন্তু বলতে পারল না। বলল, -‘নানা ফোনে থাক। তবেই হবে। আমি ঠিক হয়ে যাব একটু পরে। আর ততক্ষণ কথা বল।’
–‘আচ্ছা ঠিক আছে। আর প্লীজ তুমি নিজেকে সামলাও। চিন্তার কিচ্ছু নেই। আসলে এই মুহূর্তে হঠাৎ পুরনো আঘাতের স্মৃতিটা জেগেছে বলেই তোমার এই অবস্থা। নতুন করে তো কিছু হয় নি। তাই শান্ত হবার চেষ্টা কর। কথা বল আমার সাথে।’
চোখ মুছতে মুছতে বলল লীনা -‘কি বলব?’
এবার অভির গলায় একটু হাল্কা সুর। -‘ভাল প্রশ্ন। যা খুশি। তোমার তো সব অ্যালাউড। এমন কি আমাকে কতটা ভালবাস বললেও হবে। আমি কত হ্যান্ডসাম, স্মার্ট, গ্রেট, এ ব্যাপারেও আলোচনা করতে পারি। আমার ভালই লাগবে।’ হাসল অভি। 
–‘মানে? হঠাৎ তোমাকে ওসব বলতে যাব কেন?’ আশ্চর্য হয়ে বলল লীনা।
–‘আমিই বলতাম কিন্তু আমার যে অনুমতি নেই। স্বাধীনতা তো শুধু তোমার ফ্লার্ট করার। তাই তুমিই বল।’
–‘যাচ্ছেতাই। আমার এই অবস্থা আর তুমি ইয়ার্কি মারছ?’
অভির স্বর নরম হয়ে এল আবার। 
–এই লীনা – তোমার কান্নাটা থেমে গেল ইয়ার্কিটায়। পারপাস সার্ভড।’
এবার অভির হাসিটা ছুঁল লীনাকেও। সত্যি একটু হালকা লাগছে। বলল -‘অভি।’
অভির উত্তর এল। -‘বল, আছি লাইনে।’
–‘থ্যাঙ্ক ইউ। এবার তোমার প্ল্যানটা কাজে লাগাই।’
–‘হ্যাঁ কিন্তু তারপরই আবার আমাকে ফোন করবে।’ 
–‘হ্যাঁ করব। রাখছি এখন।’ 
ফোনটা কেটে চোখে মুখে জল দিল লীনা। তারপর রিসেপশনে ফোন করল।

ক্রমশ...

 

 

Sun 25 Jul 2021 21:03 IST | দেবপ্রিয় চক্রবর্তী