মুর্শিদাবাদের সম্প্রীতির উৎসব 'বেড়া'

লোকশ্রুতি রয়েছে, সুদূর জলযাত্রা পথে যাতে মাঝি মাল্লা  নৌ-যাত্রী  এবং পণ্য পরিবহনে কোনও বিপদ আপদের সম্মুখীন হতে না হয় তার জন্য বিপদ -আপদের রক্ষাকর্তা 'খোজা খাজের ' কে সন্তুষ্ট করা হয় এই বেড়া উৎসবের মাধ্যমে

The-ancient-festival-fence-of-Murshidabad-by-Tusher-Bhattacherya

| তুষার ভট্টাচাৰ্য |

মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন 'বেড়া' উৎসব বর্তমানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই জেলার লালবাগে প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ভগীরীথী নদীর বুকে ( প্রায় তিনশো কুড়ি বছর ধরে ) জৌলুস ও জাঁকজমকপূর্ণ একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ।  

লোকশ্রুতি রয়েছে, সুদূর জলযাত্রা পথে যাতে মাঝি মাল্লা  নৌ-যাত্রী  এবং পণ্য পরিবহনে কোনও বিপদ আপদের সম্মুখীন হতে না হয় তার জন্য বিপদ -আপদের রক্ষাকর্তা 'খোজা খাজের ' কে সন্তুষ্ট করা হয় এই বেড়া উৎসবের মাধ্যমে। আগে অবিভক্ত বাংলায়  জলপথই ছিল যাত্রী ও পরিবহনের মূল মাধ্যম । সেই জলপথে যাতে কোনও রকম ঝড় বাদল তুফান এবং জল দস্যুদের হাতে নিগৃহীত হতে না হয় সেই জন্যই এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমল থেকে।

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ পূর্ববঙ্গের ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন ১৭০২ - ১৭০৩ খৃষ্টাব্দে।নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে পঁচিশ হাজার টাকা খরচ করা হত এই 'বেড়া ভাসা' উৎসবে। হাজার হাজার কলাগাছ ও বাঁশ দিয়ে নদী বক্ষে একটি বিশাল আকারের ভেলা বা মান্দাস তৈরি করা হত। ভেলাটির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ ছিল তিনশো হাত এবং দেড়শো হাতের মতো । ভেলাটি নদী বক্ষে ভাসিয়ে তার উপরে বাঁশ দিয়ে নানা রঙের কাগজ কেটে সাজানো হত। হাজার হাজার মোমবাতি ও মাটির চিরাগ ( প্রদীপ ) জ্বালিয়ে ভেলাটিকে আলোকিত করা হত। 


ধর্ম,বর্ণের বিভেদ মুছে দিয়ে বর্তমানে বেড়া উৎসব মুর্শিদাবাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে ।


বর্তমানে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারি প্রাসাদের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত জাফরাগঞ্জ ঘাট থেকে সুসজ্জিত ভেলাটিকে ছাড়া হত। ভেলাটি ছাড়ার আগে নবাব ভেলার ( বেড়া ) উপরে একটি সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে বেড়া ছাড়ার নির্দেশ দিতেন। তিনবার তোপধ্বনি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়া ভাগীরথী নদীর বুকে ভাসত। বেড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুসজ্জিত হাতি, উট, ঘোড়া নদীর পাড় বরাবর হেঁটে যেত।

হাজার হাজার আতস বাজি-পটকা ফাটানো হত। এই আতস বাজিগুলি অন্ধকার আকাশে অসংখ্য ফুলের মালা হয়ে ভাগীরথী নদীর বুক আলোকিত করত।সূচনাকাল থেকেই মুর্শিদাবাদের এই বেড়া উৎসব দেখতে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এবং বীরভূম থেকে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ লালবাগে ভাগীরথী নদীর পাড়ে উপস্থিত হন । সারারাত ধরে চলে মেলা ।  বসে যাত্রাপালা বাউল গান, আলকাপ প্রভৃতি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর । 

বর্তমানে এই প্রাচীন বেড়া উৎসব মুর্শিদাবাদ জেলার লোকায়ত উৎসবে পরিগণিত হয়েছে।নবাবী আমলের সেই জাঁকজমক জৌলুস না থাকলেও এখনও সেই প্রাচীন রীতি মেনেই প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে ঐতিহাসিক বেড়া উৎসব। তবে বর্তমানে ভেলার আকৃতিও অনেক ছোট হয়ে গেছে ।

এখন  এই উৎসব পরিচালনা করে নবাব এস্টেট ট্রাস্টি বোর্ড । ধর্ম,বর্ণের বিভেদ মুছে দিয়ে বর্তমানে বেড়া উৎসব মুর্শিদাবাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে । এই বেড়া উৎসব উপলক্ষে মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন একদিনের সরকারি দপ্তর সমূহে ছুটি ঘোষণা করে প্রতিবছর ।

তবে গত বছর করোনা আবহে  এই উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও জনসমাগমে রাশ টানা হয়েছিল । এবছরও করোনা আবহে ট্রেন বন্ধ থাকায় বাইরের জেলা থেকে  খুব বেশি মানুষ হয়তো আসতে পারবেন না এই প্রাচীন উৎসবে শামিল হতে । তবে প্রতি বছরের মতো এই প্রাচীন লোকায়ত উৎসব ভাগীরথী নদীবক্ষে অনুষ্ঠিত হবে যথারীতি । সেই প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে...

 

Sun 12 Sep 2021 15:39 IST | তুষার ভট্টাচাৰ্য