►বিশেষ প্রবন্ধ : বরাকজনের ভোজন বিলাস 

barak-food.png

প্রতীকী চিত্র

|সঞ্জীব দেবলস্কর|

আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবেশ-প্রকৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের উপরই নির্ভরশীল। সে সঙ্গে এর উপর ইতিহাস-ঐতিহ্য-পরম্পরারও একটা প্রভাব আছে। আমরা তো আসলে শুধুমাত্র জিব আর দাঁত দিয়েই খাই না,আমরা খাই স্মৃতি দিয়েও। এই স্মৃতিরই সঙ্গে জড়িত আছে আমাদের রুচি, সৌখিনতাও। কথা হচ্ছে বরাকের খাদ্য আর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। হ্যাঁ প্রতিটি অঞ্চলের মতো বরাকেরও এ ক্ষেত্রে কিছু নিজস্বতা আছে বই কি। অবশ্য বরাক-সুরমা নিয়ে যে অখণ্ড সাংস্কৃতিক ভূগোলের পরিমণ্ডল এ থেকে সাবেক কাছাড় বা আজকের বরাক উপত্যকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে রসনার অনুপ্রবেশ কে ঠেকায়? 

তবে কাছাড়ের খাদ্যাভ্যাস যে একেবারে সিলেটের হুবহু হবে, তা আশা করা যায় না। সাবেক সিলেটিরা অতীতে কাছাড়িদের পরিহাস ছলে এ নিয়ে অনেক কথাও বলতেন যার পুনরুল্লেখ অনেকের অস্বস্তির কারণও হতে পারে। কাছাড়ের জামাইরা সিলেটে শশুরবাড়ি গেলে মাছ খেতে খেতে অতিষ্ট হয়ে যেতেন, অপরপক্ষে সিলেটের বেয়াইরা এখানকার শাকসবজি—কচু-মুখি, বাঁশের করইল, বেতের ডগার পদ নিয়ে মস্করাও করতে ছাড়তেন না।  বরাকের খালে বিলে বিচরণশীল মাছের দঙ্গল নিয়ে সিলেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যাওয়া বাতুলতা। বরাকের মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমানে কচু, মুখি, লতা, ডেঙা, কলমি, লাউ, কুমড়া, সাতকরা, লঙ্কা, বেত, করইল, ভাতুয়া, ক্ষুদমানিক, পালং, পঁই শাক,কিংবা ভুবি, লুকলুকি, ডেফল, মন, মাঠাং, তুতফল, সুলফা, ইত্যাদি বিচিত্র ব্রাত্য সবজির সম্ভারকে তো ওরা ধর্ত্যব্যের মধ্যেই আনবেন না। কিন্তু প্রকৃতিদেবী বরাকের মানুষের রসনাতৃপ্তির যোগান দিতে মোটেই কার্পণ্য করেননি। এখানে নিতান্ত অভাবক্লিষ্ট মানুষের পক্ষেও সামান্য একটু নড়াচড়া করলে অনায়াসেই একবেলার সংস্থান করে নিতে পারা খুব কষ্টকর কিছু নয়। 

এ ভূমির নিজস্ব সম্পদ নিয়ে প্রাচীনেরা একশ্বাসে উচ্চারণ করতেন- ‘লঙ্গাইয়ের বেগুন, হাইলাকান্দির কচু, সোনাইয়ের পাগল, বাউরির ছাগল, মতিনগরের গরু’। তবে এ সঙ্গে আরও দুটো মহাসম্পদের কথা উচ্চারিত হত (এখনও হয়), একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও বিষয়টি কৌতূকজনক। তা হল, ‘খাসপুরের বেটি, মাইবঙের মাটি’।এ হল সাবেক কাছাড়ের চিহ্নায়ক। কাছাড়ের ব্যপ্তি যখন ছিল সমতল আর পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে, তখন মাইবঙ বলতে পুরো উত্তরকাছাড় অর্থাৎ আজকের ডিমা হাসাওকেই বোঝাত। ওখানকার মাটি ভীষণ উর্বরা। পাহাড়ের নিম্নবর্তী সমভূমিতে উৎপন্ন হয় পর্যাপ্ত  ধান। আর ছিল পর্যাপ্ত গরু-মহিষের দুধ। সম্পন্ন গৃহস্থদের  ঘর গেরস্থালি সামলাতেন সমতল কাছাড়ের সুন্দরী, গৃহকর্মে সুনিপুণা, মৃদুভাষিণী মেয়েরা, পাত্রী হিসেবে যাদের কোন জুড়ি নেই।এদের পৈত্রিক বাড়ি সমতলের যেখানেই হোক না কেন এরা সবাই-ই গড়ে খাসপুরের বেটি। বড়াইল পাহাড়ের গ্রাম, বস্তি, পাহাড়তলি, শহর বা গঞ্জে যাদের ভ্রমণের অভ্যাস ছিল এরা  সাক্ষাৎ  পেতেন সমতলের ভগ্নীদের, যাঁরা  চটজলদি ঘরে তৈরি পিঠা, পুলি, চুঙ্গাপিঠা দিয়ে বাপের বাড়ির আত্মীয়কে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এদের অনভ্যস্ত মুখে ফুটত বাংলা বুলি, আর পরিহাসপ্রিয় স্বামীদেবতাটিও একগাল হাসি নিয়ে, ‘শালাকুটুম, শালাকুটুম’ বলে স্বাগত জানাতেন অতিথিকে। বিশ্বাস করুন, আসামের খ্যাতিমান শিক্ষামন্ত্রী জয়ভদ্র হাগজের মশাই সমতল কাছাড়ের অতিথিদের তাঁর সরকারি বাসভবনেও এমনি করে সম্ভাষণ জানাতেন। বলা বাহুল্য তাঁর ঘরণীও ছিলেন ওই খাসপুরদুহিতা (বড়খলা-বিজয়পুর)। 


কাজি নজরুল গেয়েছিলেন ‘আমার নামে রুচি, কারণ পরি-নামে লুচি’? তাঁর ভোজন রসিক ভক্তের কী সরল স্বীকারোক্তি: ‘রাধা-বল্লভিলোভে পুজি রাধা-বল্লভে’। 


আমার অভীষ্ট হচ্ছে রসনা। কাচাড়িআপ্তবাক্যের সূত্র ধরে যাওয়া যাক কচু, মুখি, বেগুনের জগতে। মুখে যা-ই বলি না কেন এ সবজিকে ব্রাত্য বলে সরিয়ে রাখা সহজকম্ম নয়। কাজি নজরুল ইসলাম রেগে মেগে কাঠবিড়ালিকে বলেছিলেন, ‘তুই মর, তুই কচু খা’। আহা! এই কচুর শাক মুখে নিয়ে মরতেও সুখ যদি সেরকম রাঁধুনির কড়াই থেকে আমাদের পাতে নেমে আসে। সামান্য লাল লঙ্কার ফোঁড়ন আর কিছু সেদ্ধ মটরদানা ছড়িয়ে দিন এতে। মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে কবিগুরুকে ব্যঙ্গ করে ডি, এল রায়ের সেই পদটি, ‘সখি বলো  আমি, আদা দিয়ে কচু পোড়া খাবো কি’ (এখনও তাঁরে চোখে দেখিনি শুধু বাঁশি শুনেছি) । হাইলাকান্দির আধোভেজা আধো শুকনো মাঠ থেকে তুলে আনা কচুপোড়া, ঘণ্ট, বাকচুর ছেচকি— এ হচ্ছে এদিকের অতিপ্রিয় নিরামিশ পদ। গুয়াকচুর কান্ড চাকি চাকি করে কেটে, চালের গুড়ো বা বেসম মাখিয়ে সামান্য কালিজিরে ছিটিয়ে সর্ষে তেলে ভেজে মুগ বা অড়হড় ডালের সঙ্গে পাতে দিলে কী হবে এটা বর্ণনা  করতে হলে কলমের জোর লাগবে। সামনে এ উপাদেয় পদ দেখলে আপনি ভিরমি খাবেন কি না জানি না, কিন্তু বর্ণপরিচয়ের ওই পঙক্তিটি নির্ঘাত স্মৃতি থেকে উড়ে যাবে—“ওল খেও না ধরবে গলা/ ঔষধ খেতে মিছে বলা”। মুচমুচে ভাজাটি মুখে দিয়ে আমেজ ভরে চিবোতে চিবোতে সবকিছু ভুলে যাবেন বর্ণপরিচয়ের সাবধানবাণী। ভেতরে মশলা দিয়ে কচু পাতায় মোড়া বড়া খেয়েছেন কখনও? না-খেয়ে থাকলে সত্যিই পস্তাতাবেন।  যদিও কচুর সঙ্গে হাইলাকান্দির নামটি জুড়ে আছে তবু কাছাড়ের বাঁশকান্দির মাঠেকচুর সহোদর মুখি আর  ভগ্নী লতার মাহাত্ম্য বর্ণনা একটু করতেই হয়। এই তো ভাদ্র-আশ্বিন মাস এল, এখনই মাটি ফুটে বেরোবে পঞ্চমুখি কচুর মুড়ো। একেবারে পাঞ্চজন্য শঙ্খের  মতো আকৃতি, গায়ে মোটা মোটা স্ট্রাইফ। ব’টি দাও দিয়ে দুই পিস করে ছেড়ে দিন গরম ভাতের হাড়িতে। সেদ্ধ হয়ে বেরিয়ে এলে আঙুল দিয়ে আলতো চাপ দিন, দেখবেন মাখনের মতো গলে গেছে ভেতরে ভেতরে। এরপর সামান্য একটু সর্ষে তেল (ঘানি ঘর থেকে আনা হলে আরও ভাল) দিয়ে মেখে একটি কাঁচালঙ্কা টিপে এক থালা ভাত মেরে দিন, আর কিছু লাগবে না এ বেলা। আর কচুর সহোদরা লতার কথা কী বলিব? একেবারে পথের ধারে অবহেলায় ফুটে ওঠা এ লতাও দেখাতে পারে ভানুমতির খেল আর এর মধ্যে কাঁঠাল বীজ কেটে টুকরো টুকরো ছড়িয়ে, সঙ্গে যদি কয়েকটি কলাই ডালের বড়ি ভেঙে দেওয়া হয়, আর হয় কালিজিরা ফোঁড়ন, এবং এ কর্মটি যদি হয় কোন নিরামিষাশী বৃদ্ধা ঠাকুমা, দিদিমা বা পিসিমার হাতে সমাধা হয়, তবে তো কথাই নেই। তবে এর আরেকটি দিকও আছে। এটাকে এক লহমায় রূপান্তরিত করা যায় আরেকটি আইটেমে। অর্থাৎ কয়েক পিস তমোগুণী উপাদান সংযোজন করে দিলেএর সুবাস ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর। সমরেশ মজুমদার বছর কয়েক আগে একটি উপন্যাসে বিষয়টি একটু কড়া-মোলায়েম করে লিখে ফেলে বরাকের পাঠকদের বিস্তর গালও খেয়েছেন।  কিন্তু তিনি খুব মিথ্যা বলেন নি, শুটকি মাছের গন্ধ এখন তো দেখি সত্যিই বিয়েবাড়ি তক্‌ পৌঁছেছে।আজকাল চারিদিকে কথঞ্চিৎ উচ্চগ্রামেই সিদল শুটকি চর্চা হয়। আগে কিন্তু বাড়িতে একটু লুকিয়ে চাপিয়ে সিদল বড়া হত। বয়জ্যেষ্ঠ্যরা বলতেন তমোগুণি খাদ্য।  কথাটা বলেছিলেন সেকালের এক তরুণ, যিনি পাড় বাঙাল নির্মলেন্দু চৌধুরীকে আটকে রাখতে শুটকি খাওয়ার প্রলোভন দিয়ে খেয়েছিলেন বিরাট ধমক—‘আমি জমিদারের ছেলে, ওসব আমি খাই না, আমার টিকিট দাও এক্ষুনি।' 

কচু থেকে আসা যাক্‌ লঙ্গাইর বেগুন প্রসঙ্গে। ইয়া মোটা গোল তেলচক্‌চকে বেগুনের বুঝি জন্মই হয়েছে গরম কড়াইতে নেমে সাঁতার কাটতে। এটাকেই বলে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা। লম্বা লম্বি চিলতে চিলতে করে ব’টি দাও দিয়ে কেটে, সারা গায়ে বেসম মাখিয়ে, সঙ্গে একটু মোলায়েম করে ধনে পাতার কুচো ছড়িয়ে গরম তেলে ছাড়া মাত্র শুরু হয় কমলা সুন্দরীর নৃত্য, এবং এই নৃত্যরতা অবস্থায়ই যদি ভোজনবিলাসীর পাতে তাঁর পদার্পণ ঘটেসে সত্যিই হয় এক অভাবনীয় কাণ্ড। সঙ্গে হোক না হিঙের সম্ভাষ দিয়ে সোনামুখি  মুগ। প্রথম প্রকাশেই আসর মাৎ। বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলে চর্চিত পদ্মপুরাণের একটিদিশায় বেগুনের উল্লেখ আছে—শালার বধু, মুখে মধু, ধন্য তোমার দেশ/ দেখাইয়া বাইঙ্গন ভাজা খাওয়াইলায় ঢ্যাড়েশ।বুঝতেই পারছেন বেগুনভাজার লিগ্যাসি অনেক প্রাচীন। বেগুনের রসনা দেখেই খিলঞ্জিয়া নির্ধারণ সম্ভব। 

সোনামুখি মুগ ছাড়াও আরেকটি ডাল ছিল আমাদের, কী জানি কী অপরাধে এ ডালকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিনা বিচারে জেলে(থুড়ি ডিটেনশন ক্যাম্প না ট্র্যানিজিট ক্যাম্পে)  পাঠানো হয়েছে। তবে সেও কম যায় না, জেল থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে, এর প্রমাণ পাবেন ডালমুটের প্যাকেটে। কুড়কুড় করে চিবোতে চিবোতে মোক্ষম স্থানে দাঁতের চাপ পড়লেই বুঝে নেবেন ইনিআর কেউ নন, আমাদের নির্বাসিত খেসারি ডাল। প্রবীণেরা স্মৃতিভারাতুর হতে পারেন। খেসারি ডালের খিচুড়ি ছাড়া বিষহরি পুজা তো অসম্পূর্ণ। ভক্তদের মুখে যে  উচ্চারিত হত –মা গো বিষহরি/ ডাইলে চাউলে খিচুড়ি', এটা অবশ্যইখেসারি ডালের খিচুড়ি। এ ডাল নিয়েও ভাসান গানে একটি দিশা আছে—‘অয় রে খেসারি ডাইল তুমি ইতা কিতা করো/ তেজপাতা দিয়া সম্ভাষ  দিলে বাইয়া বাইয়া পড়ো রে খেসারি ডাইল।'

আজকাল নিমন্ত্রণবাড়িতে মাটিতে আসন পেতে বসে কলাপাতায় খাওয়ার চল উঠে গেছে। তরকারি, ডাল, নিরামিষ বা আমিষ পদ যদি কলার পাতায় পরিবেশিত হয়, দেখবেন আলাদা স্বাদ হয়ে যাবে। আর কলার ডেক, কলার থোড় যে খেয়েছে সে কি ভুলতে পারে এর স্বাদ! মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব তো এ থোড়ের পরম গুণগ্রাহী ছিলেন। পিঠালি মাখা মস্তো বড় থোড়ের টুকরো সামান্য গরম মশলা ছিটিয়ে মাছের কালিয়ার মতো রেঁধে দিলে কোথায় লাগে মাংসের ঝোল? তাছাড়াও কলারডেক, অর্থাৎ বুগলির ঝুরা—এ তো কাছাড়-সিলেটের অতি উপাদেয় এক পদ। 

পাঁচগ্রামের কাগজকল বন্ধ হয়ে যাবার পর আমাদের ঝাড়ের বাঁশগুলো কেমন বিমর্ষ হয়ে চেয়ে থাকে সারা দিনমান। আপনারা যদি জনপ্রতিনিধিনা হয়ে থাকেন তবে নিশ্চয়ই এটা অনুভব করতে পারবেন। আমাদের আছে নানা ধরনের বাঁশ—ডলু, মুলি, বেথুয়া, জাই, মিরতিঙ্গা, বাকাল, পেঁচাআর বরুয়া। চৈত্র বৈশাক মাসে গৃহস্থ বাঁশঝাড়ের নিচে সজাগ দৃষ্টি রাখেন—এখন করইল ফোটার সময়। এ থেকে গোটা পাঁচ ছয়টিকে  বড় হতে দিয়ে বাকিগুলো চলে যাবে রান্না ঘরে।এ করইল নিয়ে একটা এক্সপিরিমেটের কথা বলেছিলেন এক খেয়ালি ডাক্তারবাবু। চৈত্রমাসের মাটি ফুটে বেড়তে না বেরোতেই করইল্টিকে একটা মাটির পাতিল দিয়ে ঢেকে খড় চাপা দিয়ে রাখুন। পাতিলের কারাগারে থেকে ওর আকৃতি হবে একেবারে গোল বাঁধাকপির মতো।  মাস খানেক পর পাতিল ভেঙে বের করুন এবং নরম নরম পিসগুলো রান্নার জন্য কেটে নিন। এটা অবশ্য  পরখ করে দেখা হয়নি, কেউ করলে ভালো হয়। হাঁসে আর বাঁশে একটা পদের কথা গল্পে শুনেছি, খাওয়া হয়নি। সাধারণত ডালে দেওয়া হয় কাটা করইল। এটা কাটার আবার একটা বিশেষ কায়দা আছে, সবাই পারবেন না, তাই সবার ভাগ্যে তা খাওয়াও হয়ে ওঠে না। আমাদের মা, কাকিমারা কী নিপুণ দক্ষতায় ডালে দেবার জন্য দানাদানা করে  টুকরো বের করতেন।দেখতে অনেকটা সেই মাউথ অর্গ্যানের মতো, যেন মুখে লাগিয়ে ফুঁ দিলে বেজে উঠবে (বাঁশির সহোদর তো)। কিংবা অনেকটা খেলনা রেলগাড়ির জোড়া লাগানো কামরার মতোও, বেশ ফ্লেক্সিবল। কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে বুনোগন্ধ ছাড়ানোর পর অড়হর ডালের মধ্যে টুকরো গুলোকে ছেড়ে দিলে ফাঁকে ফাঁকে রসে (ডাল) ভরপুর হয়ে ওঠে। তারপর তো দাঁত আর জিবের যুগলবন্দি। চৈত্র থেকে শ্রাবণ অবধি এ পদ আমাদের রান্নাঘরে নিয়ে আসত বনের বাণী, দূরের আহ্বান। এখন কি আর আনে? আর মুলি বা ডলু বাঁশের ভেতর বিরইন চাল ঢুকিয়ে খড়ের আগুনে পুড়িয়ে যে চুঙ্গাপিঠা তৈরি হয় এটা তো এক কথায় অনবদ্য। 

জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’য় তারাবনের উল্লেখ আছে (তারাবনে বিচূর্ণ দেউল)। এদিকে বলে তেরা। এই তেরার কচি ডগাগুলো কুচো কুচো করে গরম ভাপ দিয়ে শুকনোলঙ্কা আর সামান্য সর্ষে বাটা মেখেতৈরি হয় ঝাল ঝাল একটা পদ। গরম ভাতের সঙ্গে মেখে নিন, দারুন স্বাদ। তবে সেকালের মা কাকিমাদের যুগ চলে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তারাকুচি, বেতের ডগা এসব নিয়ে সময়সাপেক্ষ হাঙ্গামা করার মানসিকতা এযুগের গৃহিনীদের কি আছে? বলে রাখি, এ আইটেমের স্বাদটা যে এমন আহামরি, তা বললে বেড়ালও হাসতে পারে। আসলে এর আবেদন অন্যখানে। এ স্বাদ কতটা জিব বাহিত আর কতটা স্মৃতি বাহিত তা বলা কষ্টকর। মুখে দিলেই বৃদ্ধা ঠাকুমা পিসিমা, আর রান্নাঘরে অক্লান্ত বিচরণশীল মা-কাকিমাদের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। 

  আমাদের চৈত্র সংক্রান্তি বা নববর্ষে একটি তরকারি হয়, হাতের গুণে একেবারে পাঁঠার মাংস। এ হচ্ছে কাঁঠাল তরকারি। বিশুদ্ধ নিরামিষ।পেঁয়াজ ছাড়া, গব্যঘৃত, গরম মশলা, একটুকরো তেজপাতা, সামান্য মেথিফোঁড়ন দেওয়া এপদকে আমিষ ভোজন বিলাসীরা বলেন গাছপাঁঠা। কি অনাচ্ছিষ্টি কাণ্ড! ওঁ বিষ্ণুঃ বিষ্ণুঃ! এ ভারি অন্যায়। আমিষী অনুষঙ্গ এনে এ উপাদেয় পদের ভোক্তা তালিকা থেকে বৈষ্ণবদের সরিয়ে রাখা আমি সমর্থন করি না।  

তবে বৈষ্ণবীয় জীবনচর্যায় সুস্বাদু ব্যঞ্জন আছে বিস্তর যার প্রবল আকর্ষণে মার্কিন মুলুকে হিপি, বিটনিক এবং ছন্নছাড়া নিগ্ররও হরিনামে রুচি হয়। এরা ন্যাড়ামুণ্ডি হয়ে খোল কর্তাল নিয়ে রাস্তায় যে নামগান করে এর পেছনে খিচুড়ি, লাবড়া, শুকতো, ডাঁটা চচ্চরি ছাড়াও মিষ্টান্ন, পুলি, লুচি, রাধাবল্লভিরও ভূমিকা ছিল, এ খবর দিয়েছেন আমার পরমবৈষ্ণব অনুজবন্ধু। কাজি নজরুল কি ওমনি ওমনি গেয়েছিলেন ‘আমার নামে রুচি, কারণ পরি-নামে লুচি’? তাঁর ভোজন রসিক ভক্তের কী সরলস্বীকারোক্তি: ‘রাধা-বল্লভিলোভে পুজি রাধা-বল্লভে’। 

আমি দিনকতক চরিতামৃতসহ বেশ কিছু ধর্মগ্রন্থের পাতায়পাতায় খুঁজে ফিরেছি। উদ্দেশ্য কোন পরমার্থিক কিছু নয়, আহার্য। বলতে সংকোচই হয়, স্বামী বিবেকানন্দের এত অজস্রঅমর বাণীর মধ্যে একটিমাত্র যে বাণী আমার স্মৃতিতে আটকে আছে, এর মধ্য না আছে ধর্ম না আছে জ্ঞান।এক চ্যালার হাতে বাঙালদের মতো রান্না করা মাছঝোল খেয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ভালো রান্না করতে না পারলে ভালো সন্ন্যাসীও হওয়া যায় না।' কথাটি আমার খুব মনে ধরেছে। 

বলছিলাম রাধাবল্লভির কথা। এ পদের অন্যতম উপাদানটি যে আমাদের দেশে মোটামুটি অর্বাচীন, এটা জেনে নিতান্তই চমকিত হলাম। এ চিজটি হল আলু। জানলাম ইনি আমাদের দেশীয় সবজি নন। আলুও অনুপ্রবেশকারির দলে। (জব্বর বেঁচেছে গেছে বঙ্গদেশ থেকে আসেনি)। সাগরের ওপার থেকে এদেশে এসেছে মুঘল আমলে, তবে ইংরেজের হাত ধরে। লক্ষ্য করে থাকবেন হয়তো, প্রাচীন সাহিত্যে আলুর কোন স্থান নেই। কিন্তু হায়! আমাদের রান্নাঘরে কেমন বস্তা বস্তা আলুর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটে চলেছে আজ।  খুঁজে পেতে  যা-ও একটা লৌকিক প্রবচনে আলুর সন্ধান পেলাম, মনে হচ্ছে এটাও খুব প্রাচীন নয়--‘পা ফসকে আলুর দম’। বৈষ্ণবীয় আখড়ায় জনপ্রিয়রাধাবল্লভিও নবীন পদ।শ্রীহট্ট-কাছাড়-আসামে এর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে উনবিংশ শতকের দুই বা তিনের দশকে। ঘটনাটা বলি--তখন খাসি পাহাড়ের চেরাপুঞ্জিতে ছিলেন গভর্নর জেনারেলের (লর্ড উইলিয়ম বেন্টিং) প্রতিনিধি এক স্কটিশ সাহেব, ডেভিড স্কট। শখ ছিল তাঁর এ মাটিতে স্বদেশী লতাপাতা, ফুলফল, বৃক্ষ এসব আমদানি করা। তাঁর নজরে আসে খাসি-গারো পাহাড়ের জনজাতিরা মাটি খুঁড়ে বের করে মোটা শিকড় (মাটি আলু আরকি)। খাবার হিসেবে বেশ উপাদেয়। সাহেব সনাক্ত করলেনএটাকে।  তাঁদের দেশের tuberosumএর এক সহোদর না হয়ে যায় না।দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ঔপনিবেশিক নাবিকদের মাধ্যমে এ বস্তু এসেছিলইউরোপে, আর জাহাজে চড়ে সপ্তদশ শতকে মোঘল আমলে পৌঁছে গেল ভারতবর্ষে। প্রথমে মোঘল সুলতান এবং এর পর ব্রিটিশ শাসকদের আনুকূল্যে উত্তর ভারতের কানপুর, নৈনি প্রভৃতি অঞ্চলে এর চাষও শুরু হয়ে গেল। এই যে I CAR—Potato Research Institute রয়েছে সিমলায় এর আত্মপ্রকাশ এ পথ ধরেই। আমরা যে বলি ললিতা আলু, ইনি রাধাবল্লভির উপাদান হলেও শ্রীমতী রাধার সাহচর্যে তেঁনার এ নামপ্রাপ্তি হননি, শব্দটি নৈনিতালের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

সে যাই হোক ওই ডেভিড স্কট সাহেব (১৮০২-১৮৩১)  খাসি পাহাড়ে ঐ জনজাতিদের দিয়ে কানপুর থেকে সংগৃহীত আলুর চারা, সঙ্গে ক-খানা শুকনোজমি চাষ করার উপযোগী লাঙ্গলও আনিয়ে চাষ শুরু করলেন। উৎপাদনও ভালো হল, খাসিরাজ্য ও সিলেটে জেলার সীমান্তবর্তী ভোলাগঞ্জ বাজার হয়ে উঠল এ উৎপাদিত জিনিসটির বিপণন কেন্দ্র। আমরা এ সূত্রেই পেলাম আরেকটি ব্রান্ডনেম, ভোলাগঞ্জি আলু। এত ভনিতা করে শুধু এ কথাটিই বলতে চাইছি, যে আমাদের পিতামহ বা প্রপিতামহ কেন, বৈষ্ণব চূড়ামণি ঢাকাদক্ষিণের শ্রীচৈতন্যদেবও এ সবজিটির স্বাদ চেখে যেতে পারেননি, রাধাবল্লভি তো দূরের কথা। 

যাঁর নজর যে দিকে, মুজতবা আলি শুনিয়েছিলেন এক পেটুক ছেলের কথা,  যে কোন কিছুতেই খাবারের অনুষঙ্গ টেনে আনত। তাঁকে  একক দশক উচ্চারণ করতে লাগিয়েও দেখা গেল সে  অবলীলাক্রমেই লুচি পুরিতে পৌঁছে গেছিল। ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস পড়তে বসলে কী হয়-- এ অকিঞ্চন লেখকের চলা যে ধর্মের দিকে নয়, জ্ঞানের দিকেও নয়—পাঠক বুঝতে পারছেন। জ্ঞানার্জন ভোজন-বিলাসীর কম্ম নয়। 

এতক্ষণ শুধু ডাঁটাচচ্চরির কথাই বলা হল, একটু রাজসিক খাদ্যের প্রসঙ্গ না এলে সবার পাতে তো লেখাটা দেওয়া যাবে না। পাঠকরা নগদ পয়সা দিয়ে কিনে সামান্য আমিষের স্বাদ না পেলে সম্পাদককে ছাড়বেন কেন? ছদ্মবেশি পাঁঠার গল্পে কি আর রসনা তৃপ্তি হয়? মাছ মাংসের গন্ধ না ছড়ালে অনেকেই ব্যাজার হবেন। তবে বলুন তো কাছাড়ে কি সে রকম মাছ আছে যা নিয়ে অন্য ভুবনের সঙ্গে ট্যাক্কা দেওয়া যায়! তেমন কোন জাতিলা মাছ নেইই আমাদের। দুই দিকে দুই রুই কাতলা আমাদের পুকুরের নয়, পাঠ্য বইতেই ভেসে ওঠে। আমাদের হল মকা, পুঁটি, দারকিনা, গুতুম, রাণী, খলিসা (সে রকম কৈও নেই), বালিগড়া, চ্যাঙ, ট্যাংরা, শউল, মাগুর, সিঙি, চানখিরা, হাগাঠালি, ইচা, কাংলা, বাইন, বাচা, বাইয়া চেলা, উপল (তাঁর আবার একটা বদনামও আছে) হুগা (আজকাল অ্যাফিডেভিট  করে নাম হয়েছে চাপিলা), ঘোড়া, আর এইসব আগড়ম বাগড়ম কিছু ব্রাত্য সম্প্রদায়। অবশ্য মুখভরে উচ্চারণ করার জন্য আছে বাঘমাছ, মহাশউল, পাখিরাঙ্গ, বোয়াল, চিতল, আইড়। কখন যে কার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে, ইদানিং মকামাছ অভিজাত শ্রেণিতে উঠে গেছে। বিয়ে বাড়িতে বেগুনের সঙ্গে গলাগলি করে একহাতা মকার ঝালের ডিমান্ড ক্রমেই বাড়ছে। তবে মাছের দিকে আপাতত আর যাচ্ছি না। যেতে হয় নিষিদ্ধ পক্ষীর আইটেমে।  যবনদোষে  অভিযুক্ত এ পাখিটার গায়ে তো ভিন্নদেশী রক্তও নেই। ইতিহাসগ্রন্থ খুঁজে দেখেছি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এর আগমন মোটেই ইতিহাস সম্মত নয়। ফার্সি অভিধানে ‘মোরগ’ নামে অভিহিত এ সুন্দর (থুড়ি সুস্বাদু) পাখিটিকে আমরা ‘মুরগি’ নাম দিয়ে সংস্কৃতায়পন প্রক্রিয়ায় সামিল করার প্রয়াসও নিয়েছি। এখন মালুম হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্র গৌরদাসবাবাজির মুখদিয়ে কেন বলিয়েছিলেন যে পাঁঠাবৈষ্ণবের পক্ষে দুষ্পাচ্য হবে, তাই কুক্কুট মাংস দিয়েই মহাপ্রসাদের আয়োজন চেয়েছেন।  

আমাদের এদিকে বিজ্ঞজনেরা একে রামপাখি নাম দিয়ে যবনদোষ কাটানোর চেষ্টাও করেছেন। তবু হিন্দু রান্নাঘরে এ ব্যাচারা ব্রাত্য। বিখ্যাতচন্দবাড়ির রসিক জননেতা তাই একটু এগিয়ে গিয়ে একেবারে খাঁটি সংস্কৃত নামই দিলেন, ‘সীতাপতি বিহঙ্গম,যদি হিন্দু কূলশ্রেষ্ঠদের স্বীকৃতি লাভ করে পক্ষীটি। এর স্বাদ বা রন্ধন পদ্ধতি নিয়ে কিছু বলা ধৃষ্টতা হবে। আমি শুধু একটু ব্যাকরণ প্রসঙ্গ টেনেই ক্ষান্তি দেব। কবিগুরুর ভ্রাতুষ্পুত্র, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, বাংলার কোনও ছাত্র  যদি মুরগি দিয়ে বাক্য রচনা করতে দিলে উত্তরে লেখে মুরগি একটি  সুন্দর পাখি, তাঁকে শূন্য দিতেই হবে। তাঁর মতে ব্যাকরণসিদ্ধ (না রসনাসিদ্ধ) বাক্যটি হবে--মুরগি একটি সুস্বাদু পাখি।মুরগির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্বাদের, সৌন্দর্যের নয়।

 

Fri 8 Oct 2021 15:12 IST | সঞ্জীব দেবলস্কর