অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কাবুলে তালেবান সরকার চায় আমেরিকা

 

আবদুল গফফার চৌধুরী

আমেরিকার ধারণা— ভারত ও চিনের মধ্যে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে। তালিবানও স্থিতিশীল সরকার গড়তে পারবে না। আফগান মুলুকে ছড়িয়ে পড়বে গৃহযুদ্ধ। এতে আখেরে লাভবান হবে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেছেন মহান ২১-শের ভাষাযোদ্ধা আর আন্তর্জাতিক খ্যাতির রাজনৈতিক ভাষ্যকার।  

আফগানিস্তানে তালেবানেরা এখনও শাসন ক্ষমতায় সুস্থিরভাবে বসতে পারেনি। তবে তারা বসবে। পশ্চিমা শক্তিগুলোই বসাবে।  দর কষাকষি চলছে। যাঁরা মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ভুল করে মার্কিন সৈন্য অপসারণ করেছেন, তাঁরা আসল পরিস্থিতি বুঝতে পারেননি। বাইডেন ভুলটি ইচ্ছা করেই করেছেন। বিদেশে মার্কিন সৈন্য রাখা এখন মার্কিন অর্থনীতির ওপর অসম্ভব চাপ। তার ওপর কাবুলে একটি তাঁবেদার সরকার যেভাবে দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠেছিল তা মার্কিন ফৌজের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছে। তারা কৃষকদের পপি চাষে উত্সাহিত করছে এবং অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।

এটা গেল সমস্যার একটি দিক। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার জন্য আফগানিস্তানে তাঁবেদার সরকার রাখা এবং তাদের ব্যয় বহন করা আমেরিকার আর দরকার নেই। সৌদি আরবসহ অধিকাংশ আরব দেশে ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আফগান তালেবানেরাও এই প্রভাব বলয়ের বাইরে যাবে না। আগেকার তালেবান সরকার যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যে ক্ষমতায় ছিল, এবারও থাকবে। তারা সন্ত্রাস ছড়াতে চাইলে ছড়াবে পাকিস্তানে, ভারতে, বাংলাদেশে। পাকিস্তান তো ইতিমধ্যে তালেবানদের সঙ্গে মিত্রতামূলক চুক্তি করতে চাইছে।

বাকি রইলো ভারত। ভারতই যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে শাসনের চাইতে বেশি দেশটির উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ নিয়োগ করেছে। দেশটির রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করেছে। ভারতে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে মৈত্রী করে আফগান যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ করে। ভারত ও আফগানিস্তানের মৈত্রী শতাব্দী প্রাচীন। এমনকি ভারত বিভাগের পর যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিস্ময়করভাবে আফগানিস্তান ভারতের সঙ্গে মৈত্রী করে। ফলে দীর্ঘকাল তাকে পাকিস্তানের বৈরিতা সহ্য করতে হয়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের সীমান্ত সংঘর্ষও হয়।

অবস্থার পরিবর্তন ঘটে আমেরিকার মদতে আফগানিস্তানে তালেবান রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর। তালেবানের পেশোয়ারে ঘাঁটি গাড়তে দেওয়া হয়। মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের সামরিক অফিসারেরা তাদের আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র চালনা শেখায়। আফগানিস্তানে যেসব মৌলবাদী শক্তি গণতান্ত্রিক নজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটায়, তাদের মধ্যে তালেবানরাই অধিক শক্তিশালী ও সংগঠিত। তালেবান সরকার ভারতবিরোধী ছিল। এ সরকারের পতনের পর কারজাই সরকার আবার ভারতের সঙ্গে মৈত্রী প্রতিষ্ঠার নীতিতে ফিরে যায়।

এই নীতি এত দিন অব্যাহত ছিল। এক সময় কাবুলে ভারতের দূতাবাসে ইসলামি জঙ্গি হামলা সত্ত্বেও দিল্লি আফগানিস্তানে তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করেনি। এখন যদি আফগানিস্তানে তালেবান সরকার তার আধিপত্য ফেরত পায়, তা হলে ভারতের বিপুল ইনভেস্টমেন্টের ক্ষতি হবে। আফগানিস্তানের উন্নয়নও ব্যাহত হবে। চিন যে তালেবানদের ওপর আস্থা স্থাপন করেছে এবং তাদের সমর্থন দিচ্ছে তার মূল কারণ—এক. আফগান মুল্লুক থেকে আমেরিকা সরে যাচ্ছে। দুই. তালেবান সরকারের মদতে চিন ভারতকে হটিয়ে দেশটিতে তার অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে তালেবানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং তালেবানরাও বলেছে, পাকিস্তান তাদের দ্বিতীয় স্বদেশ।

আমেরিকা আশা করে, ভারত ও চিনের মধ্যে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে। তালেবানও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে না। আইএস ও মুজাহেদিন গ্রুপ গণ্ডগোল শুরু করতে পারে। ইতিমধ্যেই কাবুল এয়ারপোর্টে বোমা হামলা হয়েছে। ১৩ জন মার্কিন সেনাসহ নিহতের সংখ্যা শতাধিক। আফগানিস্তানে যদি সিভিলওয়ার হয়, তাহলে লাভ মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের। সিভিল ওয়ারের বিভিন্ন গ্রুপের কাছে তারা চড়াদামে অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে। অস্ত্র বিক্রি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে কি না কে বলবে।

মার্কিন অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র ব্যবসায়ের ওপর নির্ভরশীল। ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ত্র ব্যবসা বাড়াতে চেয়েছিলেন, যুদ্ধের হুমকি নিয়ে বিশ্বে অস্থিতীশীল অবস্থা সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের যুদ্ধের হুমকি শুনে মনে হচ্ছিল এই বুঝি কোরিয়ায় আবার যুদ্ধ বাধছে। অথবা ইরান বুঝি আক্রান্ত হচ্ছে। অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আশান্বিত হয়েছিলেন, তাদের ব্যবসা বাড়বে। কিন্তু ট্রাম্পের নীতিতে যুদ্ধের দামামা বেজেছে। যুদ্ধ হয়নি। ফলে হতাশ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। ট্রাম্পকে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হতে দেয়নি। এক প্রকার টেনে তাকে প্রেসিডেন্টের গদি থেকে নামিয়েছে।

ট্রাম্প এই সত্যটা জানেন। তাঁর দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তা হতে দেয়নি। ট্রাম্প তাই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের গদি সহজে ছাড়তে চাননি। কিন্তু অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার কাছে তাঁকে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। জো বাইডেন ট্রাম্পের মতো যুদ্ধবাজ নন। কিন্তু অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অস্ত্র বিক্রির মার্কেট তাঁকে বাড়াতেই হবে। এজন্য তাঁর প্রথম টার্গেট চিন, দ্বিতীয় টার্গেট আফগানিস্তান।

জো বাইডেন দেখতে ভদ্রলোক। কথা বলেন কম, যেটুকু বলেন তা খুবই নরম সুরে। কিন্তু তাঁর নীরব ডিপ্লোমেসির আসল লক্ষ্য ঠিক আছে। তাহল মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অস্ত্র উত্পাদন বাড়ানো এবং তার মার্কেট খোঁজা। চিনকে ক্রমাগত হুমকির মুখে রেখে মার্কিন সমরাস্ত্র কিনতে বাধ্য করা, সাইবার যুদ্ধে চীনকে ব্যাপৃত রাখা এবং গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে মার্কিন সমরাস্ত্রের বিরাট মার্কেট সৃষ্টি করা বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির একটা মূল লক্ষ্য হতে পারে।

শান্তিকামী বিশ্ববাসীর বিশ্বাস, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য অপসারণ করে বাইডেন ভুল করেছেন। কেউ কেউ তাঁর বিচার দাবি করছেন। কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগও দাবি করছেন। টনি ব্লেয়ার তো তাঁকে সরাসরি গালি দিয়েছেন। কিন্তু বাইডেন ভুল করেননি। তিনি মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। বাইডেনের এই আফগাননীতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। চিন ও রাশিয়া আফগানিস্তানে মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হবে জেনেও সেখান থেকে মার্কিন সেনা অপসারণে সায় জানিয়েছে। সমর্থন জানিয়েছে তালেবানকে। এটা তাদের নিজস্ব স্বার্থের খেলা।

এখন প্রশ্ন ভারত কী করবে? তালেবান আফগানিস্তানে তাদের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলে পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী জোরদার করবে। তাহলে তাদের তৃতীয় স্বদেশ কোনটি? বাংলাদেশ? অতীতে তালেবান বাংলাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী পাঠিয়ে দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছিল। হাসিনা সরকার কঠোরভাবে এ সন্ত্রাস দমন করেছেন।

আবার তালেবান সন্ত্রাস চালাবার চেষ্টা করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তারা কি এবার ভারতের সঙ্গেও মৈত্রী পাতাবার চেষ্টা করবে? তারা তা চাইলেও পাকিস্তান তা হতে দেবে না। ভারত বিরোধিতার নীতির ওপর পাকিস্তান ও তালেবান মৈত্রী গড়ে উঠেছে। দিল্লিকে এই অবস্থায় তালেবানবিরোধী নীতি গ্রহণ করতে হতে পারে।

তা যদি হয়, চাপ আসবে বাংলাদেশের ওপর। চিন চাইবে ঢাকাকে তাদের দিকে টানতে। ভারত চাইবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার পাশে থাকুক। হাসিনা সরকারের জন্য কঠোর পরীক্ষার দিন আসছে। শেখ হাসিনার ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি সঙ্কটের সম্মুখীন হবে। কথায় বলে পরীক্ষিত বন্ধু ভালো, অপরীক্ষিত বন্ধুর চাইতে। তালেবানের সন্ত্রাসী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো যৌথ নীতি গ্রহণ করতে চায়, তাহলে তাতে সম্মতি জানানোই হবে বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান রোধের শ্রেষ্ঠ উপায়।

বাংলাদেশে জামাতি ও হেফাজতি মহলে আফগানিস্তানে তালেবানরাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর  যথেষ্ট উত্সাহ দেখা যাচ্ছে । কয়েক লাখ মাদ্রাসা ছাত্রের মধ্যে রয়েছে তালেবানের ধর্মান্ধতার শিকড়। সরকার এই শিকড় উপড়ে ফেলেননি। সযত্নে রক্ষা করেছে ঝাপিবদ্ধ সাপের মতো। এবারের আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে জানা যাবে হেফাজত ও জামায়াত কী ভূমিকা গ্রহণ করে। সরকারকে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতেও হবে।

সৌজন্য: ইত্তেফাক 

Mon 30 Aug 2021 14:15 IST | আবদুল গফফার চৌধুরী